জীবনরসিক আব্দুল হান্নান আজও সকলের কাছে অচেনা

0
582
Abdul Hannan
Abdul Hannan

জীবনরসিক আব্দুল হান্নান আজও সকলের কাছে অচেনা
তৈমুর খান

বাংলায় ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকারের সংখ্যা কম, তবু প্রায় ১৫ টি উপন্যাস লিখেও মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘি ব্লকের প্রান্তিক গ্রাম বোখারাতে প্রায় নির্বাসিতই থেকে গেলেন পেশায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ঔপন্যাসিক আব্দুল হান্নান।

আব্দুল হান্নান জন্মেছিলেন ১৯৪৮ সালের ১২ জানুয়ারি। পিতা মহম্মদ মোজান মণ্ডল ও মাতা রাজিয়া বিবির বড়ো ছেলে হিসেবে। সেযুগে এই বোখারা গ্রাম শিক্ষায় তেমন অগ্রসর ছিল না। তিনি সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করেই বি এ, বি এড ডিগ্রি অর্জন করেন ; ফার্মাসিস্ট হন, এবং এম বি ই এইচ অনার্স পাশ করেন। কৈশোর থেকেই সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক। অণুগল্প গল্প লিখে লেখকজীবনের সূত্রপাত। ছোটবড় বহু পত্রিকাতেই লেখা প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপন্যাস হল : “ সমাধান”, “এইদিন সেইদিন”, “পূজার ফুল” , “ভোরের শিশির” , “সময় কথা বলে” , “বাবার বউ” , “সম্পর্ক” , “স্রোতে ভাসা ফুল” , “অন্তর্দাহ”, “এলোমেলো হাওয়া” , “পরানের পরান” , “বসন্ত বিলাসিনী” , “মনের ভিতর মন” প্রভৃতি। সব লিখেছেন এই গ্রামে থেকেই। কখনোই শহরমুখী হতে চাননি। বিগত বছর দশেক আগেই পড়ে গিয়ে পা ভেঙে প্রায় পঙ্গু জীবন কাটাচ্ছেন। স্ত্রীরও বিয়োগ ঘটেছে বহু আগেই। এখন তিনি আরও নিঃসঙ্গ। স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন। পাঠক কি জানেন এই লেখকের নাম? পড়েছেন কখনও এঁর লেখা?

শুধু ঐতিহাসিক স্থান হিসেবেই নয়, কবিগান, আলকাপ-থিয়েটার, বন্দগান, ফকিরি গান, কীর্তনের রসে ভেজা মাটি এই মুর্শিদাবাদের। এখানেই তিনিও নিষিক্ত সম্পৃক্ত হয়েছেন নানাভাবে। রাজমিস্ত্রি, কুলিকামিনদের জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজেও জীবন কাটিয়েছেন। আর সেইসব জীবনের উষ্ণতায় জারিত হয়েছেন।

গ্রাম্য গালগল্পের রূপকথা উপকথা মিশে একাকার হয়েছে তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্র। মানবিক অবক্ষয়ের যুগেও কল্পনা ও বাস্তবের সংমিশ্রণে তিনি যে মায়াজাল বুনেছেন তা পাঠককে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। একদিকে হৃদয়ের আদিম প্রবৃত্তি, অন্যদিকে সামাজিক বা ধর্মীয় অনুশাসনের ভয় চরিত্রগুলিকে দ্বান্দ্বিক দোলাচলে ক্ষতবিক্ষত করে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রবৃত্তির জয়ঘোষণা যে বাস্তবোচিত তা বলাই বাহুল্য। “বসন্ত বিলাসিনী” উপন্যাসে দুটি চরিত্রে নিষিদ্ধ প্রেমের সম্পর্কটি এভাবে বর্ণনা করেন “দীর্ঘদিন থেকে তার সঙ্গে যে প্রতারণা করে চলেছে নাজমা, আলাউদ্দিন তা বেশ বুঝতে পারছে। পথেঘাটে পাশকাটিয়ে যাবার সময় ইশারা করলে নাজমা একদম ঝেড়ে ফেলে না। সেও চুপিচুপি বলে — পরে…। এই `পর’ যে কখন হবে, কবে সেইদিন আসবে আলাউদ্দিন একদমই বুঝে উঠতে পারে না।” প্রশ্রয় বা প্রতারণা দুটিই তো নারী চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। তাদের ছলাকলা, রহস্যময়তা লেখক খুব মননশীল দক্ষতার সঙ্গে তুলে এনেছেন।

“পরানের পরান” উপন্যাসে ডাক্তারির সঙ্গে মানুষের হৃদয়েরও চমৎকার বিশ্লেষণ আছে। মানুষের যৌনজীবনের নিষিদ্ধ সম্পর্কের খুব বাস্তবসম্মত পর্যবেক্ষণ যা প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রেই উপলব্ধির বিষয়। তবে লেখকের ব্যক্তিজীবনেরও একটা ছায়াপাত ঘটেছে। যখন শুনি “তবুও তো রক্তমাংসের মানুষ একটা। ষড়রিপুর ঊর্ধ্বে তো নয়। একটা রোজগেরে বিধবা ঠিক করে দাও তো সুরভী। আর একটা বিয়ে করি। একা একা ফাঁকা বিছানা আর ভালোলাগে না। রাত্রে ঘুম ধরে না।” পুরুষের বয়স হলেও পুরুষজীবনের মনের কথা তো এটাই।

“অন্তর্দাহ” উপন্যাসেও এরই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই — “মনেপড়ে সেসব পুরানো কথা। চোখের তলে ভেসে ওঠে ফরিদার শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। মনে জেগে ওঠে সুপ্ত কামনা। কোনো একজন নারীর সঙ্গকামনার অভাব বোধে শরীর মন হয়ে উঠল চঞ্চল, উচাটন।” কামপ্রবৃত্তির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তদন্ত প্রতিটি উপন্যাসেরই মূলস্রোতকে মানবিক রসে প্রগাঢ় করে তুলেছে। ঘনীভূত হয়ে উঠেছে জীবনরসও। এই কারণে Psychology of Love এ সিগমুন্ড ফ্রয়েড ঠিকই বলেছেন “The behavior of a human being in sexual matters is often a prototype for the whole of his other modes of reaction in life.”

“মনের ভিতরে মন” উপন্যাসেও দাম্পত্যজীবনে প্রেমের সম্পর্ক সম্পর্কে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণটি চমৎকার — “দাম্পত্যজীবনের যেটা মূল সুর ভালোলাগালাগি আর তা থেকেই ভালোবাসাবাসির জন্ম হওয়া। এখানেই যদি ব্যবধান বা ফারাক তৈরি হয় তো সেই ফাটল কোনোকিছুতেই পূরণ করা যায় না।” অসন্তুষ্টি ও অতৃপ্তি থেকে জীবন হয় রুক্ষ রিক্ত মরুময়। “দীর্ঘশ্বাস ও হতাশায় দুজনকেই ভুগতে হয় সারাজীবন।” অনেকেই তখন আত্মহননের পথ বেছে নেয়। লেখক যে Sex depression এর কথা বলছেন তা সকলেরই শিক্ষণীয়। এভাবেই লেখকের জীবন সম্পর্কে গভীর ও চিরন্তন দার্শনিক প্রজ্ঞাটি উঠে এসেছে।

প্রান্তিক জীবন ও মধ্যবিত্ত জীবনের ছায়াময় আলোআঁধারি রূপ, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রভাব, অর্থনীতি কীভাবে ব্যক্তিজীবনের উপর ছায়া ফেলেছে তার স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারি। ঘটনাপ্রবাহ নয়, জীবনপ্রবাহ ; গ্রাম্যতা, বিশ্বাস, সংস্কার, লোকায়ত জীবনকথা, মানুষের উচ্চারিত মুখের ভাষা, প্রেম ও পীড়ন, ক্ষরণ ও সহিষ্ণুতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, মায়ামমতা, বিষণ্ণতা সবই সময়কে ধারণ করে এগিয়ে গেছে তাঁর লেখার বিষয়। বিচিত্র জীবনবোধের ছায়াময় এক স্বপ্নঝলকে তিনি উত্থাপিত করেছেন প্রান্তিক জীবনের ক্ষুণ্ণিবৃত্তি ও বেঁচে থাকার দুর্মর অভীপ্সাকে। তাঁর উপন্যাসের নায়ক-নায়িকারা আমাদের চারপাশের খুবই চেনা ; গায়ের ঘামের গন্ধ ও নাড়ির স্পন্দন উপলব্ধি করা মানুষ। তাদের হাসি-কান্না, শোক-তাপ ও উৎসব পালনে আমারও সমবর্তী হই। প্রেমের ও মৃত্যুর কাছে নুয়ে আসা হৃদয়ের সংরাগ ও নোনা কাতরতা বেজে উঠতে শুনি । গ্রাম্যজীবনের সারল্য অভিব্যক্তির পরম্পরা তাঁর সব লেখাতেই খুঁজে পাই। বন্দগান, বিয়ের গান, লোকগান, উপকথা ও মন্ত্রতন্ত্র ঝাড়ফুঁকের রীতিরেওয়াজের নানা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হই। কী চমৎকার বর্ণনা, মাটির কাছাকাছি সহজেই টেনে নিয়ে যেতে পারেন। বর্তমানের নাগরিক জীবন এই গ্রাম্যজীবনকে চেনে না। গ্রাম্যজীবনের আলোবাতাসে বালক-বালিকার হৃদয়ে সেই প্রেমের রসায়ন কীভাবে মুকুলিত হয় তারও খোঁজ রাখে না। কখনও অসম অথবা নিষিদ্ধ প্রেমের ঝটিকায় দুটি প্রাণ ছিন্নভিন্ন হয় তারও মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ খুব বাস্তব অভিজ্ঞতায় নির্ণীত করেছেন। দক্ষ উপন্যাসিকের মতোই তিনিও জানেন :“One way to get the most out of life is to look upon it as an adventure” .(William Feather)
কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, আব্দুল হান্নানকে বাংলা সাহিত্যের পাঠক আজও চিনতেই পারল না। যেসব প্রান্তিক মানুষের কথা কেউ শোনে না, কেউ জানে না তাদের সমস্যা — তাদের কথাই আব্দুল হান্নান বলতে চেয়েছেন। তাই তাঁর উপন্যাসে আঞ্চলিকতার টান সব থেকে বেশি। মানুষের আচরণ ও অভ্যাসকে তিনি অকৃত্রিমভাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের অজ্ঞতা, ভণ্ডামিকেও বাদ দিতে পারেননি।