শ্রম সংহিতার আছিলায় দেশে খর্ব হতে চলেছে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অধিকার

0
221
Migrant Labours in UP during COVID-19 Disinfectant Spray
Migrant Labours in UP during COVID-19 Disinfectant Spray

শ্রম সংহিতার আছিলায় দেশে খর্ব হতে চলেছে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অধিকার

হীরক মুখোপাধ্যায় (১৯ নভেম্বর ‘২০):- সদ্য নির্মিত ৪ ‘শ্রম সংহিতা’র আছিলায় দেশে খর্ব হতে চলেছে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অধিকার।

শ্রম আইন সংস্কারের নামে শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের অধিকার হননের বিরোধীতা করে ভবিষ্যতে সচেতনতা অভিযান চালাবে বলে ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে ‘ভারতীয় মজদুর সংঘ’।

ভারত সরকার ২৯ টা শ্রম আইন বাতিল করে তার জায়গায় ৪ টে শ্রম সংহিতা বানিয়েছে। সম্প্রতি এই বিষয়ে গেজেটও প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন যে ৪ টে শ্রম সংহিতা তৈরী হয়েছে সেগুলো হলো :
👉 দ্য কোড অন ওয়েজেস ২০১৯।
👉 দ্য কোড অন সোস্যাল সিকিউরিটি ২০২০।
👉 দ্য ইণ্ডাস্ট্রীয়াল রিলেশন কোড ২০২০।
👉 দ্য অকুপেশনাল সেফটি, হেল্থ এণ্ড ওয়ার্কিং কণ্ডিশন কোড ২০২০।

একনজরে দেখে নেওয়া যাক কোন কোন শ্রম আইন রদ করে কোন কোন শ্রম সংহিতা প্রণয়ণ করা হচ্ছে।

০১) দ্য পেমেন্ট অব ওয়েজেস এক্ট ১৯৩৬,
০২) দ্য মিনিমাম ওয়েজেস এক্ট ১৯৪৮,
০৩) দ্য পেমেন্ট অব বোনাস এক্ট ১৯৬৫,
০৪) দ্য ইক্যুয়াল রেমুনারেশন এক্ট ১৯৩৬,
উপরের এই ৪ টে শ্রম আইন বাতিল করে আনা হচ্ছে :
🎤’ দ্য কোড অন ওয়েজেস ২০১৯’

০১) দ্য এমপ্লয়িজ কমপেনসেশন এক্ট ১৯২৩,
০২) দ্য এমপ্লয়িজ স্টেট ইন্সিওরেন্স এক্ট ১৯৪৮,
০৩) দ্য এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফাণ্ডস এণ্ড মিসলেনিয়াস প্রভিশনস এক্ট ১৯৫২,
০৪) দ্য এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জেস (কম্পালসারি নোটিফিকেশন অব ভ্যাকেন্সিস) এক্ট ১৯৫৯,
০৫) দ্য মেটারনিটি বেনিফিট এক্ট ১৯৬১,
০৬) দ্য পেমেন্ট অব গ্র্যাচুইটি এক্ট ১৯৭২,
০৭) দ্য সিনে-ওয়ার্কারস ওয়েলফেয়ার ফাণ্ড এক্ট ১৯৮১,
০৮) দ্য বিল্ডিং এণ্ড আদার কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কারস ওয়েলফেয়ার সেস এক্ট ১৯৯৬,
০৯) দ্য আনঅর্গানাইজড ওয়ার্কারস সোস্যাল সিকিউরিটি এক্ট ২০০৮,
উপরের এই ৯ টে শ্রম আইন বাতিল করে আনা হচ্ছে :
🎤 ‘ দ্য কোড অন সোস্যাল সিকিউরিটি ২০২০’।

০১) দ্য ট্রেড ইউনিয়নস এক্ট ১৯২৬,
০২) দ্য ইণ্ডাস্ট্রীয়াল এমপ্লয়মেন্ট (স্ট্যাণ্ডিং অর্ডারস) এক্ট ১৯৪৬,
০৩) দ্য ইণ্ডাস্ট্রীয়াল ডিসপিউটস এক্ট ১৯৪৭,
উপরের এই ৩ টে শ্রম আইন বাতিল করে আনা হচ্ছে :
🎤 ‘দ্য ইণ্ডাস্ট্রীয়াল রিলেশন কোড ২০২০’।

০১) দ্য ফ্যাক্টরিজ এক্ট ১৯৪৮,
০২) দ্য প্ল্যান্টেশনস লেবার এক্ট ১৯৫১,
০৩) দ্য মাইনস এক্ট ১৯৫২,
০৪) দ্য ওয়ার্কিং জার্ণালিস্টস এণ্ড আদার নিউজ পেপার এমপ্লয়িজ (কণ্ডিশন অব সার্ভিস) এণ্ড মিসলেনিয়াস প্রভিশনস এক্ট ১৯৫৫,
০৫) দ্য ওয়ার্কিং জার্ণালিস্টস (ফিক্সেশন অব রেটস অব ওয়েজেস) এক্ট ১৯৫৮,
০৬) দ্য মোটর ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কারস এক্ট ১৯৬১,
০৭) দ্য বিড়ি এণ্ড সিগার ওয়ার্কারস (কণ্ডিশনস অব এমপ্লয়মেন্ট) এক্ট ১৮৬৬,
০৮) দ্য কনট্রাক্ট লেবার (রেগুলেশনস এণ্ড এবোলিশন) এক্ট ১৯৭০,
০৯) দ্য সেলস প্রমোশন এমপ্লয়িজ (কণ্ডিশনস অব সার্ভিস) এক্ট ১৯৭৬,
১০) দ্য ইন্টার স্টেট মাইগ্রান্ট ওয়ার্কমেন (রেগুলেশন অব এমপ্লয়মেন্ট এণ্ড কণ্ডিশনস অব সার্ভিস) এক্ট ১৯৭৯,
১১) দ্য সিনে ওয়ার্কারস এণ্ড সিনেমা থিয়েটার ওয়ার্কারস (রেগুলেশন অব এমপ্লয়মেন্ট) এক্ট ১৯৮১,
১২) দ্য ডক ওয়ার্কারস (সেফটি, হেল্থ এণ্ড ওয়েলফেয়ার) এক্ট ১৯৮৬,
১৩) দ্য বিল্ডিং এণ্ড আদার কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কারস (রেগুলেশন অব এমপ্লয়মেন্ট এণ্ড কণ্ডিশনস অব সার্ভিস) এক্ট ১৯৯৬,
উপরের এই ১৩ টে শ্রম আইন বাতিল করে আনা হচ্ছে :
🎤 ‘দ্য অকুপেশনাল সেফটি, হেল্থ এণ্ড ওয়ার্কিং কণ্ডিশন কোড ২০২০’।

২৯ টা চলতি শ্রম আইন রদ করে তার বদলে নতুন ৪ টে শ্রম সংহিতা তৈরী করার পদ্ধতি নিয়ে ইতিমধ্যে চারদিকে জলঘোলা হতে শুরু হয়েছে।
তথ্যাভিজ্ঞ মহলের মতে, “নতুন আইনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সঙ্কটে পড়বেন শ্রমিকগণ।”

তথ্যাভিজ্ঞ মহলের মতামতকে হাতিয়ার করে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আওয়াজ তুলতে শুরু করেছে ‘ভারতীয় মজদুর সংঘ’।

নতুন শ্রম আইন সম্পর্কে তথ্যাভিজ্ঞ মহল আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন,
🔊 নতুন শ্রম আইনের হাত ধরে দেশে শিশুশ্রম আইনী স্বীকৃতি পেয়ে গেল।
🔊 বৈধ হচ্ছে ঠিকাদারী।
🔊 বোনাস আইনটাই রদ হয়ে যাওয়ার ফলে মালিকদের অসুবিধা দূর হলো।
🔊 আট ঘণ্টা কাজের বদলে শ্রমিকদের দিয়ে অধিক সময় খাটিয়ে নেওয়ার অধিকার পেয়ে যাচ্ছে মালিকরা।
🔊 নতুন শ্রম আইনের ফলে মহিলা কর্মচারীবৃন্দ কর্মস্থলে রাত্রিবাস করতে বাধ্য হবেন।
🔊 এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে ৫ জন শ্রমিক কাজ করতে গেলে নাম নথীভুক্তকরণ (পঞ্জীকরণ)-এর কোনো প্রয়োজন হবেনা।
🔊 চাকরী স্থায়ী হওয়ার প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দেওয়ার ফলে কর্মক্ষেত্রে ভবিষ্যত সুরক্ষা কমে যাবে।
একটা মেয়াদ শেষ হলে মালিক কাউকে রাখতেও পারেন আবার ইচ্ছা হলে বহিষ্কারও করতে পারবেন।
🔊 শ্রমিকদের শোষণ করার ক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। নতুন নিয়মানুসারে প্রাইভেট কোম্পানীর মালিকেরা নিজেদের পছন্দসই লোক বসিয়েই ইউনিয়ন চালানোর অবস্থায় চলে যাবে।
🔊 যেসব সংস্থায় ৩০০-র কম লোক কাজ করবেন, ওইধরণের সংস্থা সরকারকে না জানিয়েই কর্মী ছাঁটাই করতে পারবে। অর্থাৎ সংস্থা ইচ্ছে মতো কর্মী ছাঁটাই করতে পারবে।
(আগে এই সংখ্যাটা ১০০ ছিল।)
🔊 নতুন শ্রম আইনের ফলে কোনো শ্রমিক ইউনিয়নই চটকরে বন্ধ বা হড়তাল করতে পারবেনা।
🔊 কাজ দেখাতে না পারলে মালিক বা কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় যেকোনো শ্রমিককে বা শ্রমিকদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করতে পারবেন।
🔊 যে সংস্থায় ২০ জনের কম শ্রমিক কাজ করবেন, ওই সংস্থাকে বোনাস দেওয়ার কথা বলা যাবেনা।
🔊 যে সংস্থায় ৩০০-র কম শ্রমিক কাজ করবে ওখানে কোনো স্ট্যাণ্ডিং অর্ডার প্রযোজ্য হবেনা। যা শ্রমিকদের পক্ষে ঘাতক হয়ে দাঁড়াবে।
সর্বজনীন ক্ষেত্র উদ্যোগ ও কিছু হাতেগোনা প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজ কোম্পানীর কথা ছেড়ে দিলে বাদবাকি ৯৮ শতাংশ সংস্থার উপর থেকে স্ট্যাণ্ডিং অর্ডার উঠে যাচ্ছে।
🔊 ইএসআই, ইপিএফ-এর মতো কল্যাণপ্রদ ৬ টা যোজনা সরিয়ে অন্য কোনো সাধারণ যোজনা আনলে শ্রমিকদের সর্বনাশ হবে।
🔊 কারবার সরলীকরণের নামে শ্রমিকহত্যা সরলীকরণ-এর রাস্তা প্রশস্থ হবে।
🔊 মোটর ভেহিকল্স, মাইন এবং মাইগ্রেশন সম্পর্কিত বিষয়ে যদি ঠিকাদার/মালিক/দালাল ৫ জনকে কাজ দিলে নাম নথিভুক্তির প্রয়োজন হবেনা।
🔊 যেখানে ঠিকাদার ৫০ জনের কম শ্রমিক নিয়োগ করবে ওখানে প্রিন্সিপাল এমপ্লয়ার-এর কোনো ভূমিকা থাকবেনা। ঘুরিয়ে বললে ঘুরপথে দেশে ফিরে আসতে পারে ক্রীতদাস প্রথা।
🔊 এই ৪ শ্রম সংহিতা-র ক্ষেত্রেই প্রাদেশিক সরকার বা রাজ্য সরকার আইন বদলানোর ক্ষমতা প্রাপ্ত হওয়ার ফলে এক দেশ এক আইন ব্যবস্থা বাঁধা পাবে।

এই নতুন শ্রম সংহিতা অবলোকন করলে বোঝা যাচ্ছে, পুঁজিপতিদের একচ্ছত্র অত্যাচারের সামনে শ্রমিকদের একটা বড়ো হাতিয়ার ছিল হড়তাল, ‘দ্য ইণ্ডাস্ট্রীয়াল রিলেশন কোড ২০২০’-র মাধ্যমে শ্রমিকদের ওই হাতিয়ারের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। বলা যেতে পারে, আগামী ভবিষ্যতে দেশ থেকে শ্রমিক হড়তাল কথাটাই উঠে যেতে পারে।
এই আইন অনুযায়ী কোনো শ্রমিক সংগঠনই কর্তৃপক্ষকে ২ মাসের আগাম নোটিশ না দিয়ে হড়তাল ডাকতে পারবেনা।
এর পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলার শুনানি চলাকালীন এবং শুনানি শেষ হওয়ার ২ মাসের ভেতর শ্রমিক সংগঠন কোন হড়তাল বা ধর্মঘট ডাকতে পারবেনা।
তথ্যাভিজ্ঞ মহলের আশঙ্কা শ্রমিকদের হাত থেকে এভাবে হড়তাল বা ধর্মঘটের অধিকার ছিনিয়ে নিলে শ্রমিকরা জড়বস্তুতে রূপান্তরিত হবে।

অতিমারীর সময় যখন দেশ ও শ্রমিক পরিবারে আর্থিক মন্দার চিহ্ন স্পষ্ট রূপে ধরা পড়ছে তখন শ্রম আইনের এই পরিবর্তন দেশের আর্থিক সামাজিক পরিমণ্ডলে বড়োধরণের দুশ্চিন্তা তৈরী করবে।
শ্রম আইনের এই পরিবর্তনের ফলে একদিকে যেমন শ্রমিকদের রোজগার কমবে পাশাপাশি ভবিষ্যতে কাজ হারাবার ভয়ে চিন্তায় থাকবে দেশের শ্রমিককুল।
স্বাধীনতার পর দেশে শ্রম আইন সংস্কারের নামে যা করা হচ্ছে তা যদি কোনো কারণে বুমেরাং হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে শ্রমিকদের সংঘর্ষের অধিকার হননের বদলা রূপে সারা দেশে পুনরায় শ্রমিক মালিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের শুরু হতে পারে।

নতুন শ্রম সংহিতা সম্পর্কে নিজেদের বক্তব্য রাখতে গিয়ে দেশের স্বীকৃত শ্রমিক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, “শ্রমিক সংগঠনগুলোর সাথে কোনো রকম শলাপরামর্শ না করে নতুন শ্রম আইন রূপায়ণ করা হয়েছে।
নতুন আইনের ফলে, একদিকে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব হয়ে পুঁজিপতি মালিকগণ সমৃদ্ধ হবেন।

অন্যদিকে শ্রমিক কল্যাণে ভবিষ্যনিধি প্রকল্পে জমা করা অর্থ ঘরোয়া সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার ফলে ওই টাকা শেয়ারবাজার-এর মতো অনিশ্চিত প্রকল্পে খাটবে, এর ফলে শ্রমিকদের ভবিষ্যত নিশ্চয়তা নষ্ট হবে।

সর্বোপরি শ্রম সংহিতা-তে শ্রমিক সংঘের অধিকার ও হস্তক্ষেপ বন্ধ করার প্রয়াস অত্যন্ত নিন্দনীয়।”