পানাম নগর পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি

0
151
Panam City - Bangladesh
Panam City - Bangladesh

পানাম নগর পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি

লোকমান হোসেন পলা,বাংলাদেশ: পানাম নগর (Panam City) পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি যা বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও এ অবস্থিত। World Monument Fund ২০০৬ সালে পানাম নগরকে বিশ্বের ধ্বংসপ্রায় ১০০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় প্রকাশ করে। বড় নগর, খাস নগর, পানাম নগর – প্রাচীন সোনারগাঁর এই তিন নগরের মধ্যে পানাম ছিলো সবচেয়ে আকর্ষণীয়। পথের দু’ধারে কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে থাকা ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন আর কাঠামোগুলো যেন হারানো জৌলুসের কথা জানান দিচ্ছে।

মৃত কোলাহল আর অব্যক্ত ইতিহাস যেন জড়িয়ে আছে এ নগরীর প্রতিটি ইটে। প্রায় ৪৫০ বছর আগে এ নগরী কতটা সমৃদ্ধ ছিলো, তা বারবার ভাবতে বাধ্য করে রাস্তার দু’পাশের দু’তল-ত্রিতল ভবনগুলো।কেমন যেন একটা রহস্য জড়িয়ে আছে জায়গাটিতে। প্রতিটি ধ্বংসস্তুপে যেন জড়িয়ে আছে একেকটা কাহিনী। যদিও ধ্বংসস্তুপ বলছি, তবুও এর আকর্ষণের নেই কমতি। ভবনগুলোর নির্মাণশৈলী দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না।

ইতিহাসে পানাম নগরঃ সোনারগাঁ ছিলো একসময় বাংলার রাজধানী । ১৫ শতকে ঈসা খাঁ বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেছিলেন সোনাগাঁওয়ে। তাই সোনারগাঁকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলো ব্যবসা-বাণিজ্য, বন্দর আর নগরী। সোনারগাঁয়ের ভৌগোলিক অবস্থানের দিকে নজর দিলেই এর গুরুত্ব বোঝা যায়। সোনারগাঁ চারদিক থেকে চারটি নদী দ্বারা বেষ্টিত– উত্তরে ব্রহ্মপুত্র, দক্ষিণে ধলেশ্বরী, পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা। এমন ভৌগোলিক অবস্থান ছিলো ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য উপযুক্ত। ১৩৪৬ সালে ইবনে বতুতা চীন, ইন্দোনেশিয়া (জাভা) ও মালয় দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে এর সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে সোনারগাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর-নগরী রূপে বর্ণনা করেন।

শীতলক্ষ্যা আর মেঘনার ঘাটে প্রতিদিনই ভিড়তো পালতোলা নৌকা।রাজধানীকে কেন্দ্র করে ক্রমেই গড়ে ওঠে এক অভিজাত শ্রেণি, যারা ছিলেন মূলত বণিক বা ব্যবসায়ী। অন্যান্য এলাকা থেকে ব্যবসায়ী ও সওদাগরদের আনাগোনা লেগেই থাকতো এখানে। পানাম নগরের প্রবেশপথের লেখা থেকে জানা যায়, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ধনী হিন্দু বণিকদের দ্বারা এ নগরের প্রসার ঘটে। মূলতঃ নদীপথে বিলেত থেকে আসতো বিলাতি থানকাপড়, আর এই বাণিজ্য নগরী থেকে যেতো বাংলার মসলিন। পরবর্তিকালে এই পোশাক বাণিজ্যের স্থান দখল করে নেয় নীল বাণিজ্য। ইংরেজরা এখানে বসিয়েছিলেন নীলের বাণিজ্যকেন্দ্র।

পানাম নগরের স্থাপত্য রীতি শহরটিতে ঔপনিবেশিক ধাঁচের দোতলা এবং একতলা বাড়ি রয়েছে প্রচুর। যার বেশিরভাগ বাড়িই ঊনবিংশ শতাব্দির (১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দের নামফলক রয়েছে)। মূলত পানাম ছিলো বাংলার সে সময়কার ধনী হিন্দু ব্যবসায়ীদের বসতক্ষেত্র। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ছিলো ঢাকা-কলকাতা জুড়ে। তারাই গড়ে তোলেন এই নগর। বর্তমানে দর্শনার্থীরা যে পানাম নগর দেখতে যান, সেখানে একটি মাত্রই পাকা রাস্তা। ৬০০ মিটার দীর্ঘ আর ৫ মিটার প্রস্থ এ রাস্তার দু’ পাশে রয়েছে সব মিলিয়ে ৫২টি ভবন।পানাম সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি আর দক্ষিণ পাশে ২১টি বাড়ি রয়েছে।

বাড়িগুলোর অধিকাংশই আয়তাকার, উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত, উচ্চতা একতলা থেকে তিনতলা। বাড়িগুলোর স্থাপত্যে ঔপনিবেশিকতা ছাড়াও মোঘল, গ্রিক এবং গান্ধারা স্থাপত্যশৈলীর সাথে স্থানীয় কারিগরদের শিল্পকুশলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। একতলা থেকে তিনতলা পর্যন্ত ভবন রয়েছে এখানে। ভবনের দেয়ালগুলো বেশ প্রশস্ত। দেয়ালগুলো বিভিন্ন আকৃতির ইট আর সুরকি দিয়ে তৈরী। কিছু কিছু ভবনের দেয়ালের অলংকরণ দেখার মতো। নানা ধরনের নকশা, রঙিন কাঁচ, পাথর, কড়ি, চিনামাটি, টেরাকোটা ব্যবহার করা হয়েছে অলংকরণের জন্য।

অধিকাংশ ভবনের মেঝে ধ্বংস হয়ে গেলেও কয়েকটি টিকে আছে। এছাড়া বাড়িগুলোতে নকশা ও কাস্ট আয়রনের কাজ নিখুঁত। কাস্ট আয়রনের এই কাজগুলো ইউরোপের কাজের সমতূল্য বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এর সাথে আছে সিরামিক টাইল‌্‌সের রূপায়ণ। প্রতিটি বাড়িই অন্দরবাটি এবং বহির্বাটি -এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। বেশিরভাগ বাড়ির চারদিকের ঘেরাটোপের ভিতর আছে উন্মুক্ত উঠান। এ বাড়িগুলোর প্রতিটির ছিল নিজস্ব কুয়া বা জলের ব্যবস্থা। একটি বাড়ি থেকে আরেকটির মাঝে আছে বিশাল ফাঁকা স্থান যা সম্ভবত বাগান হিসাবে ব্যবহার করা হত। প্রার্থনা এবং চিত্তবিনোদনের জন্যও ছিল অনেক জায়গা। পানাম নগরীর পরিকল্পনাও নিখুঁত।

পানাম নগরী চারদিক থেকে পঙ্খীরাজ খাল দিয়ে ঘেরা যেটি মেঘনা নদীতে গিয়ে মিশেছে। এই নগরীকে সুরক্ষার জন্য এ ছাড়াও ছিল প্রবেশপথে বিশাল গেট, যা সূর্যাস্তের সাথে সাথে বন্ধ করে দেওয়া হতো। না জানি প্রতিটি বাড়িরই ছিল আলাদা আলাদা গল্প যা আজ হয়ে গিয়েছে কালের গর্ভে বিলীন। সময় সাথে সাথে পানাম নগর জীবনযাত্রা সংস্কৃতি ইতিহাস হয়ে গিয়েছে । বলা হয়ে থাকে, সে যুগে পানাম নগরী সারাদিন বাণিজ্যের পর সন্ধ্যা থেকে আনন্দের নগরীতে পরিণত হতো। নাচে গানে জীবন্ত হয়ে উঠত প্রতিটি সন্ধ্যা। পানাম নগরের অবশিষ্ট থাকা স্থাপনার মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেলে আজও দেখতে পাওয়া যায় নানান হল, দরবার, নাচের মঞ্চ সহ বিভিন্ন জিনিস। নগরীর ভিতরে আবাসিক ভবন ছাড়াও আছে মন্দির, নাচঘর, পান্থশালা, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, দরবার কক্ষ, বিচারালয় ।

এছাড়া আছে ৪০০ বছরের পুরনো টাকশাল ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক তৈরিকৃত নীলকুঠি। সব কিছুরই শেষ আছে, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিতে মন্ডিত পানাম নগরও দেখেছে তার শেষ। নানান সমস্যা এবং পরিবর্তিত অবস্থায় যখন অনেক ধনী, অবস্থাসম্পন্ন বণিকেরা পানাম নগর ছাড়তে শুরু করলেন, পানাম নগরের শেষটা যেন লেখা হয়ে গিয়েছিল তখনই। ধীরে ধীরে এখানকার মানুষ কমতে শুরু করল এবং ভাঁটা পড়তে শুরু করল এর যৌবনে। ব্যবসায়ীরা এই এলাকার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেললেন। বরং অন্যান্য নতুন নতুন এলাকা হয়ে উঠল তাদের গন্তব্যস্থল। যে নীল আর মসলিন একসময় জমজমাট করে তুলেছিল পানাম নগরকে, সেগুলোর অনুপস্থিতি ধীরে ধীরে একে করে তুলল এক ভূতুড়ে নগরী। এক জমজমাট এলাকার কী করুণ পরিণতি! যেভাবে যাবেন এই নগরেঃ ঢাকা থেকে ৩০ কিলোমিটারের পথ পানাম নগর।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় অবস্থিত পানাম নগর। গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জের বাসে সোনারগাঁ যাওয়া যাবে। নামতে হবে মোগড়া পাড়া মোড়ে। সেখান থেকে সিএনজি চালিত অটোরিক্সা বা ইজিবাইকে করে যাওয়া যাবে পানাম নগর। রাতে থাকার জন্য এখানে কোন ব্যবস্থা নেই। রাতে থাকতে হলে একটু দূরে সোনারগাঁ উপজেলা সদর বা নারায়ণগঞ্জ শহরে এসে থাকতে হবে।যদিও অনেকে একে এখন “ঘোস্ট সিটি” বা ভূতুড়ে নগর বলে ডাকেন, আদতে এটি এখন দর্শনার্থীদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। দেশি বিদেশী নানান পর্যটকের ভিড়ে এখন মুখরিত থাকে পানাম নগর ।

আর যতই প্রাচীন বা “ধ্বংসস্তুপ” মনে হোক না কেন, পানাম নগর যাওয়া আসলে খুবই সহজ। এই ঐতিহাসিক স্থানটিতে যাওয়া যায় নানাভাবে। প্রবেশের জন্যে যদিও টিকেট লাগে তবে তা পাওয়া যায় নামমাত্র মূল্যে।

দেশী যে কেউ টিকেট পাবেন ১৫ টাকায় যেখানে বিদেশীদের দিতে হবে ১০০ টাকা। রাজধানী ঢাকা থেকে একদিনের মাঝে গিয়েই ঘুরে আসা সম্ভব এই স্থান।

দেখার সময় : মঙ্গলবার – শনিবার: সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত উন্মুক্ত।সোমবার: দুপুর ২ টোর থেকে বিকাল ৫ টা। রবিবার ও সরকারী ছুটি বন্ধ।