হুগলী মাদ্রাসাকে বন্ধ করে দেওয়া, এটাই তৃণমূল সরকারের সংখ্যালঘু উন্নয়নের বড় সাফল্য অভিযোগ প্রাক্তন মন্ত্রী ড. আবদুস সাত্তারের

0
561
Hoogly Madrasha
Hoogly Madrasha

হুগলী মাদ্রাসাকে বন্ধ করে দেওয়া, এটাই তৃণমূল সরকারের সংখ্যালঘু উন্নয়নের বড় সাফল্য অভিযোগ প্রাক্তন মন্ত্রী ড. আবদুস সাত্তারের

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে পিছিয়ে দেওয়ার চক্রান্তকে প্রতিহত করতে রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত প্রাক্তন মন্ত্রী ড. আবদুস সাত্তার জোর আওয়াজ তুললেন তাঁর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে কিছু ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন। সম্প্রতি রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হুগলী মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়ার চক্রান্তকে কেন্দ্র করে রাজ্যের মুসলিম সমাজে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে গড়ে ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিন্দু স্কুলের ২০০ বছর ঘটা করে উদযাপন করা হয়েছে, আর ওই সময়ই বাংলার নবজাগরনের অন্যতম পীঠস্থান হুগলী মাদ্রাসাকে বন্ধ করে দেওয়া হল।

এ থেকে সরকারের আলো-আধাঁরি চরিত্রটা স্পষ্ট হয়। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে হুগলী মাদ্রাসা কোন অংশেই হিন্দু স্কুলের তুলনায় মেধা বিকাশে কম ছিল না। এই মাদ্রাসার কৃতি ছাত্র ছিলেন স্যার সৈয়দ আমির আলি, ফুরফুরা শরীফের পীর আবু বক্কর সিদ্দিকী (রহ:), বাংলাদেশের দুই বিখ্যাত রাজনীতিবিদ এবং সেদেশের প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ও শাহ আজিজুর রহমান, প্রখ্যাত বিঞ্জানী আতাউর রহমান এবং অবিভক্ত বাংলার সাহিত্যিক মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর মত ভারত তথা উপমহাদেশের এই সব কৃতি সন্তানরা হুগলী মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। এক সময় হুগলী মাদ্রাসার ছাত্ররা ভারত তো বটেই সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। আজ হিন্দু স্কুলের কীর্তির কথা ফলাও করে প্রচার করা হয়, অথচ আর একটি প্রতিষ্ঠান ভারত তথা বাংলার নবজাগরণে বিশেষ ভূমিকা নেওয়া সত্তেও তা নিয়ে এক অদৃশ্য নিরবতা সংশয় সৃষ্টি করে।

হুগলী মাদ্রাসার সমস্যা বামফ্রন্ট আমলেই প্রকট হয়েছিল। আর তৃণমূল কংগ্রেস হুগলী মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু সমাজকে বিরোধী দলে থাকাকালীন সময়ে যে যে প্রতিশ্রূতি দিয়েছিল তা ক্ষমতার আসার পর এই প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচানোর বিন্দুমাত্র উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ। বামেদের সঙ্গে তৃণমূলের তফাৎ আরও বিস্তর লক্ষ করা যাচ্ছে। বামেরা হুগলী মাদ্রাসা বন্ধ না করেও সমস্যার সমাধানে তৎপরতা দেখিয়েছিল। আর বর্তমান সরকার এই প্রাচীন মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি এর ভেতরের মসজিদটিতে সাধারন মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বলে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ এবং মসজিদটিতে তালা মেরে চাবি না কি ডিএম নিয়েছেন। আর এই ঘটনা নিয়ে রাজ্যের মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এই প্রেক্ষাপটেই ড.আবদুস সাত্তারের সঙ্গে কথা বলেছেন মাদ্রাসা শিক্ষক ও সাংবাদিক সেখ ইবাদুল ইসলাম।

প্রশ্ন : আপনাদের আমলেই হুগলী মাদ্রাসার জানাযা হয়ে গিয়েছিল। দেশ তথা রাজ্যের নবজাগরনের অন্যতম কেন্দ্র হুগলী মাদ্রাসার দুশো বছর পুর্তির আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। আর এই বন্ধ হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে আপনাদের সরকার এবং আপনার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। এ বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া ?

ড. আবদুস সাত্তার : না, আমাদের সরকারের আমলে হুগলী মাদ্রাসা বন্ধ হয়নি। আপনাদের মনে রাখতে হবে হুগলী মাদ্রাসা কোনকালেই সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের হাতে ছিল না। এটা সর্ম্পূণভাবে বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তরের অধীন। এর শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে বদলী সবটাই করত রাজ্য সরকারের স্কুল শিক্ষা দপ্তর। এটি রাজ্যের সেই সময়ের ৪৪ টি সরকার পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি। এর সমস্যা ছিল অনেক। স্কুল শিক্ষা দপ্তর যখন খুশি শিক্ষকদের বদলী করত। ফলে শেষের দিকে এই প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। একইসঙ্গে এটা স্বীকার করতে আমার কোনও বাধা নেই যে, স্কুল শিক্ষা দপ্তর নিজেদের ইচ্ছামত শিক্ষক বদলী করার ফলে সংকট তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে প্রধান সংকট ছিল প্রায় ১২/১৩ বছর ধরে ওই মাদ্রাসায় কোন প্রধান শিক্ষক না থাকা। দ্বিতীয় কারণ ছাত্র সংখ্যা কমে যাওয়া। আমি যখন মাদ্রাসা বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলাম তখন থেকে এই মাদ্রাসাটি যাতে ভালভাবে চলে তার জন্য স্কুল শিক্ষা দপ্তরে বিভিন্ন সময়ে দরবার করেছি। এমনকি কিদওয়াই কমিটিতেও এই মাদ্রাসার উন্নয়নে জন্য আলাদা করে প্রস্তার রাখার ব্যবস্থাও করেছিলাম।

প্রশ্ন : আপনারা প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে বসা এই প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে সচল করার জন্য কোন বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছিলেন কী ?

ড. আবদুস সাত্তার : রাজ্যের ৪৪ টি সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করে পাবলিক সার্ভিস কমিশন। এদের যে পরিকাঠামো ছিল তার বিকল্প পথ তৈরি করার জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেই সময় আমরা সিদ্ধান্ত নিই ২০ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বসাবস করে এমন জেলাগুলিকে চিহ্নিত করে সংখ্যালঘু শিক্ষার উন্নয়নের জন্য স্কুল বা মাদ্রাসা তৈরি করা হবে ।

সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা রাজ্যের ১২ টি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলার জন্য একটি করে সরকারি ইংরেজী মা্ধ্যম মাদ্রাসা  তৈরির সিদ্ধান্ত নিই। তাহলে ১২ টি সরকারি ইংরেজি মাধ্যম মাদ্রাসার সঙ্গে হুগলী মাদ্রাসাকে যুক্ত করলে ১৩টি মাদ্রাসা হয়। এই মাদ্রাসার জন্য আলাদা ক্যাডার তৈরির করার উদ্যোগ আমরা নিয়েছিলাম। এমনকি হুগলী মাদ্রাসাকে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গে রেখে আলিগড়ের মত পঠন-পাঠন চালানো যায় কিনা তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আলিয়ার প্রথম উপাচার্য ড. সামশুল আলম সাহেবও এ বিষয়ে উৎসাহ দেখিয়ে ছিলেন। কিন্ত এসব করতে করতেই ২০১১ চলে আসে আমরা সরকার থেকে বিদায় নিই।

প্রশ্ন : হুগলী মাদ্রাসা নিয়ে আপনার বিশেষ কোনও পরামর্শ আছে কী ?

ড. আবদুস সাত্তার : আমার দুংখটা অন্য জায়গায়। আমরা যখন সরকারে ছিলাম তখন অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে মুসলিম নেতারা এমনকি উদার আকাশ পত্রিকার সম্পাদক ফারুক আহমেদ ও সেখ ইবাদুল ইসলামরা সমালোচনায় মুখর থাকত। আজ তাঁরা নিরব কেন? কিছু মুসলিম বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক এবং নেতা হুগলী মাদ্রাসা বাঁচাও কমিটি গড়ে মাদ্রাসার সামনে দিনের পর দিন বিক্ষোভ দেখিয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই এখন রাজ্যের মন্ত্রী হয়েছেন, সাংসদ হয়েছেন, বিধায়কও আছেন। তাহলে তাঁদের আমলে সত্যিই কেন ঐতিহ্যবাহী হুগলী মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গেল? ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা জনাব ত্বহা সিদ্দিকী সাহেব ছাড়া আর কাউকে তো দেখতে পাচ্ছি না রাস্তায়?

তবে একথা স্বীকার করতেই হবে হুগলী মাদ্রাসার যে পরিকাঠামো আছে তাকে কাজে লাগিয়ে উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যাবে। হাজী মুহাম্মদ মহসিনের স্বপ্ন যদি সাকার করতে হয় তাহলে শুধু মহসিন কলেজের উন্নয়ন নয়, মাদ্রাসারও উন্নয়ন করতে হবে। আজ যিনি শিক্ষামন্ত্রী তিনি যখন বিরোধী দলের নেতা ছিলেন তখন তিনি হুগলী মাদ্রাসার উন্নয়ন নিয়ে অনেক কথা বলতেন। আজ তাঁর আমলেই একই সময়ে গড়ে ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিন্দু স্কুলের ২০০ বছর ঘটা করে উদযাপন করা হয়েছে, আর ওই সময়ই বাংলার নবজাগরনের অন্যতম পীঠস্থান হুগলী মাদ্রাসাকে বন্ধ করে দেওয়া হল। এ থেকে সরকারের আলো-আধাঁরি চরিত্রটা স্পষ্ট হয়। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে হুগলী মাদ্রাসা কোনও অংশেই হিন্দু স্কুলের তুলনায় মেধা বিকাশে কম ছিল না। এই মাদ্রাসার কৃতি ছাত্র ছিলেন স্যার সৈয়দ আমির আলি, ফুরফুরা শরীফের পীর আবু বকর সিদ্দিকী (রহ:), বাংলাদেশের দুই বিখ্যাত রাজনীতিবিদ এবং সেদেশের প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ও শাহ আজিজুর রহমান, প্রখ্যাত বিঞ্জানী আতাউর রহমান এবং অবিভক্ত বাংলার সাহিত্যিক মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর মত ভারত তথা উপমহাদেশের এই সব কৃতি সন্তানরা হুগলী মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। এক সময় হুগলী মাদ্রাসার ছাত্ররা ভারত তো বটেই সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

হিন্দু স্কুলের কীর্তির কথা ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে এবং হচ্ছে, অথচ আর একটি প্রতিষ্ঠান ভারত তথা বাংলার নবজাগরণে বিশেষ ভূমিকা নেওয়া সত্তে তা নিয়ে এক অদৃশ্য নিরবতা সংশয় সৃষ্টি করে।

রাজ্য সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে হুগলী মাদ্রাসা ও হুগলী মাদ্রাসার মসজিদ চালু করতে সচেষ্ট হবেন নইলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে পিছিয়ে দেওয়ার চক্রান্তকে প্রতিহত করতে সচেতন নাগরিক এর যথাযত বিহিত করতে উদ্যোগে নেবেন আশা রাখি। ১০ হাজার মাদ্রাসা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংখ্যালঘু মন জয়ের চেষ্টা ছিল চমকপ্রদ বাস্তবিক একটাও মাদ্রাসায় আজ প্রয়োজনের তুলনায় যথাযত শিক্ষক নেই। এবার এই মিথ্যাচারের ফল হাতে নাতে পেতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস কারণ সংখ্যালঘুরাও এখন অন্য পালে সামিল হতে আর দ্বিধা করছেন না। দলিত ও সংখ্যালঘু জোটবদ্ধ হয়ে জেগে উঠছেন এবং প্রতিবাদে সামিল হচ্ছেন নতুন সমীকরণ দেখতে পাচ্ছি আগমী দিনের জন্য যা শুভ প্রয়াস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here