মনিপুর নিয়ে পর্বতের মুষিকপ্রসব

0
438
Manipur (Image from wikipedia)
Manipur (Image from wikipedia)
0 0
Azadi Ka Amrit Mahoutsav

InterServer Web Hosting and VPS
Read Time:11 Minute, 32 Second

মনিপুর নিয়ে পর্বতের মুষিকপ্রসব
অমিত গোস্বামী

সংসদে বাদল অধিবেশন চলছে। হাতে-গরম মনিপুর ইস্যু নিয়ে বিরোধীরা সোচ্চার। বিরোধী জোটের নেতৃত্বে থাকা কংগ্রেস জানিয়েছিল লোকসভায় মণিপুর নিয়ে আলোচনা করতে চায় কংগ্রেস। অথচ যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংহ যখন মণিপুর নিয়ে আলোচনা করতে চাইলেন, তখন তাঁরা সংসদের বাইরে বলেছেন – মণিপুর নিয়ে শুধু সংসদে আলোচনা নয়, মণিপুর নিয়ে সংসদে বলতে হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে। সেইজন্যে অনাস্থা প্রস্তাব আনা। তিনশর ওপরে শাসক দলের আসন। সেখানে অনাস্থা প্রস্তাব ধুলোয় উড়ে যাবে জেনেও তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিবৃতির দাবীর গোঁ ধরে এই অনাস্থা প্রস্তাব আনলেন। কাজেই প্রত্যাশা ছিল বিরোধীদের মুখ রাহুল গান্ধী কী বলবেন। কি বললেন তিনি?

“গোটা দেশে আগুন লাগানোর ব্যবস্থা করছেন মোদী,গোটা দেশে কেরোসিন ছড়াচ্ছেন। আপনি মণিপুরের লোককে মেরে ভারতমাতাকে হত্যা করেছেন। আপনি দেশভক্ত নন। আপনি দেশদ্রোহী। দেশপ্রেমী নন। তাই আপনি মণিপুরে যেতে পারেন না। কারণ আপনি মণিপুরে ভারতমাতাকে হত্যা করেছেন। আমি মণিপুরে গিয়েছিলাম। এক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনার সঙ্গে কী হয়েছে? উনি আমার সামনে কাঁপতে কাঁপতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। মণিপুরকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই অশান্ত মণিপুরে তিনি একবারের জন্যও যাননি। কেন মণিপুরে যাননি? তার কারণ উনি মণিপুরকে ভারতের অংশ বলে মনে করেন না। আজ বেশি আক্রমণ করব না। তবে দুটো-একটা গোলা তো ছুড়বই।”

এটুকু বলে অনাস্থা বিতর্ক চলাকালীনই সংসদ ভবন ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেলেন রাহুল গান্ধী। এরপরে বলতে উঠলেন স্মৃতি ইরানি। বললেন, ‘‘রাহুল গান্ধী বলেছেন দেশে কেরোসিন ঢালা হচ্ছে। আপনি বিদেশে কি দেশলাই কাঠি খুঁজতে গিয়েছিলেন। বিদেশে গিয়ে উনি বলেছেন, ভারতে সৌহার্দ্য নেই। খুব শীঘ্রই গণ্ডগোল হবে। দেশ জুড়ে কেরোসিন ছড়িয়ে আছে এখন শুধু একটি স্ফুলিঙ্গের দরকার। তথ্য বলছে দেশ বিরোধীদের সঙ্গে আমেরিকায় গিয়ে দেখা করেছেন রাহুল। আমেরিকায় ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তানজিম আনসারির। দেখা হয়েছিল মিনহাজ খানেরও। যাঁরা দেশের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। স্ফুলিঙ্গে খুঁজতেই কি সেই সাক্ষাৎ হয়েছিল?’’ তারপরে রাহুলের মহিলাদের প্রতি ‘ফ্লায়িং কিস’ ছোড়ার বিতর্ক।

কিন্তু এই আলোচনায় মণিপুর বা দেশের কী লাভ হল? এখানে বেশ বোঝা গেল যে ডিগ্রী থাকলেই শিক্ষিত হওয়া যায় না। ইতিহাস-ভূগোল সম্পর্কে জ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা যে আলোচনা চালাচ্ছেন সেটা অর্থহীন। এ বিষয়ে কয়েকটা প্রশ্ন থাকবেই।

১) মনিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি যে জাতিদাঙ্গা সেটা স্বীকার করছেন না কোন দলই। এর পিছনের কারণগুলি নিয়ে কোন আলোকপাত নেই পারস্পরিক দোষারোপ ছাড়া। ২০০৪-এর ১১ জুলাই অসম রাইফেলসের একদল জওয়ান ইম্ফলের থাংজাম মনোরমাকে তাঁর বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে। বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে তাঁর বুলেটবিদ্ধ, ক্ষতবিক্ষত দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। অভিযোগ ওঠে, তাঁকে প্রবল অত্যাচার করে ধর্ষণের পর গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে সে বছরের ১৫ জুলাই মণিপুরের কাংলা দুর্গে অসম রাইফেলসের সদর দফতরের সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সেখানকার জননীরা। তাঁদের দু’হাতে তুলে ধরা ফেস্টুনে লেখা ছিল: ‘‘ভারতীয় সেনা, এসো, আমাদের ধর্ষণ করো।‘ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সংশোধন করে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং উপদ্রুত এলাকা আইন পাকাপাকি ভাবে তুলে দেওয়া হবে। তার পরে ১৯ বছর কেটে গিয়েছে। এক জন অভিযুক্তকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়নি। এই নেতাদের ক্ষমা করতে পারবেন থাংজাম মনোরমা?

২) মনিপুর নিয়ে সবচেয়ে বড় রাজনীতি করেছে কংগ্রেস। ১৯৪৮ সালে রাজা বোধচন্দ্র সিংকে রীতিমত ধমকে ভারত ইউনিয়নে যোগ দেওয়ানো হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে সেটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ১৯৫৮ সাল থেকে মণিপুরে বলবৎ হল সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং উপদ্রুত এলাকা আইন । সেখানে সেনার হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল তারা যখন খুশি, যাকে ইচ্ছে তাকেই তুলে নিয়ে আসতে পারত। কাউকে সন্দেহ হলেই তুলে নিয়ে তার ওপরে অত্যাচার করা যেত ওই বিশেষ ক্ষমতা বলে। তার অপব্যবহার শুরু হয় ১৯৭৪ সাল থেকে। কিন্তু ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে ২০০৪ সালে। সে বছরের ১৫ জুলাই মণিপুরের কাংলা দুর্গে অসম রাইফেলসের সদর দফতরের সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সেখানকার জননীরা। এই আইন তুলে নেওয়ার সাহস এখনও দেখান নি কোন সরকার। কিন্তু কেন?

৩) ২০১৬-য় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় এক্সট্রা জুডিশিয়াল এগজ়িকিউশন ভিক্টিম ফ্যামিলিজ় অ্যাসোসিয়েশন, মণিপুর (ইইভিএফএএম)। এই সংগঠনের সদস্যদের পরিবারের কেউ না কেউ ভুয়ো সংঘর্ষের শিকার। ২০১৬-র ৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট এই সব ঘটনার তদন্ত করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দেয় এবং ২০১৭-র ১৪ জুলাই সিবিআইয়ের পাঁচ জন অফিসারকে নিয়ে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গড়ে দেয়। সুপ্রিম কোর্টের কাছে সরকার ইতিমধ্যে তালিকা পেশ করেছে ও নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু সেনাবাহিনীর ওপরে ন্যস্ত নিশেষ আইন তোলার প্রক্রিয়ার চলাকালীন সৃষ্টি হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি। মনিপুরের দীর্ঘদিনের সমস্যার মুখ ঘুরে গেছে জাতিদাঙ্গায়। এখানে শাসকদলের প্রধানমন্ত্রী কী বিবৃতি দেবেন যা মনিপুরের কাজে লাগবে?

৪) এবার আসা যাক সংসদের বাইরে বলা রাহুল গান্ধীর একটা বিবৃতিতে। তিনি বলেছেন ‘সেনাবাহিনীকে নামিয়ে একদিনেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যেত’। এর সাথে পোঁ ধরলেন তার দোহারি দলগুলি। শাসক দল যখন মনিপুর থেকে সেনা শাসন তুলে নিতে চাইছেন স্থায়ী সমাধানের উদ্দেশ্যে। সেখানে কংগ্রেস তাদের প্রাচীন মতে বিশ্বাসী। সেনা দিয়ে ঠান্ডা করো। থাংজাম মনোরমার কাছে আজ অবধি ক্ষমা চেয়েছে কংগ্রেস দল বা তাদের নেতা? রাহুল কাল সংসদে বললেন প্রধানমন্ত্রী মনিপুরে যান নি কেন? শাসকদলের পক্ষে স্বরাস্ট্রমন্ত্রীর সফর ও স্বরাস্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দীর্ঘসময় মনিপুরে অবস্থান তাদের সমস্যা সমাধানের ইচ্ছার প্রকাশ যদি না হয় তাহলে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী ও তৃণমূলের ৫ সংসদ মনিপুরে উপদ্রুত অঞ্চল পরিদর্শন করে এসে সমস্যার সমাধানে তাদের বক্তব্য পেশ না করে রাজনৈতিক আক্রমনে যত্নবান কেন হলেন?

৫) প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের সামনে মনিপুর নিয়ে যা বলেছেন গতকাল স্বরাস্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কাল তাই বললেন – মণিপুরে যা হয়েছে, তাকে ‘সমাজের কলঙ্ক’। একবারও তারা পূর্ববর্তী কংগ্রেস সরকারের বিচারবুদ্ধিহীন পদক্ষেপের উল্লেখ করেন নি। কিন্তু এই আলোচনায় একবারও উঠে এল না মনিপুরে বলবৎ আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট বা আফস্পা আইনের কথা। একবারও উচ্চারিত হল না মাদক চোরাচালান ও আফিং চাষের কথা। একবারও উচ্চারিত হল না কুকি ন্যাশনাল আর্মি, কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্ট, ইউনাইটেড কুকি লিবারেশন ফ্রন্ট-সহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী যারা মিয়ানামারের প্রশ্রয়ে ও আশ্রয়ে মনিপুরের বুকে সন্ত্রাস চালাচ্ছে, তাদের কথা। একবারও কেউ বলল না মনিপুরের সমস্যার সমাধানের রাস্তা কী। যা হল তা বুলিং ও ট্রলিং।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে এত পয়সা খরচ করে এই ইতিহাসবিস্মৃত বা সামাজিক সমস্যা নি অনভিহিত রাজনীতিবিদদের সংসদে আমরা কেন পাঠাই?

About Author

Shree Amit Goswami

লেখক অমিত গোস্বামী
লেখক অমিত গোস্বামী

A man with a mighty pen sharper than sword yet , not ready to strike any innocent with his words. Poet of international repute and saught after cultural figure in both side of Bengal border and in India.

Socially active person with fearless analysis of the present time in respect to imperial patriot point of view

About Post Author

Editor Desk

Antara Tripathy M.Sc., B.Ed. by qualification and bring 15 years of media reporting experience.. Coverred many illustarted events like, G20, ICC,MCCI,British High Commission, Bangladesh etc. She took over from the founder Editor of IBG NEWS Suman Munshi (15/Mar/2012- 09/Aug/2018 and October 2020 to 13 June 2023).
Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Advertisements

USD





LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here