সা রং – প্রথম পর্ব

0
537
সা রং
সা রং
0 0
Azadi Ka Amrit Mahoutsav

InterServer Web Hosting and VPS
Read Time:13 Minute, 31 Second

(গল্পের স্থান , কাল, এমনকি ছবি সবই সত্যি শুধু লেখকের আসল নাম গোপন করা হলো লেখকের অনুরোধে তবে গল্পের শেষে আপনাদের কাছে লেখক কে পেশ করা হবে তাঁর পরিচয় সহ ) 

প্রথম পর্ব –

অতিন দাসের বাড়ি মালদা জেলায়। ঝলঝলিয়া স্টেশন থেকে নেমে রিক্সায় বুলবুলচন্ডী মোড়। সেখান থেকে আইহো,সামসি, মুচিয়া পার হয়ে প্রায় ছয় কিলোমিটার যাওয়ার পর “লন্ঠনিয়া” চার মাথার মোড়। সেখান থেকে ডান দিকে মাটির রাস্তা ধরে চার কিমি গেলে অতিন দাসের গ্রাম গোপালগঞ্জ। – এই হলো আমাদের চিফ এডিটর অফিসে অতিন দাসের দেওয়া তার বাড়ির ঠিকানা। 

মূর্তিটি তার বাড়ির লাগোয়া দিঘি  থেকে উদ্ধার হয়েছে। এখনো খবরটা রটেনি বরং বলতে গেলে আমরা রটতে দেইনি। নিউস কভারটা করতে পারলে মনে হয় টিয়ারপি খারাপ হবেনা। মালদা জেলায় আমাদের প্রতিনিধি সাংবাদিক হিমাংশু র গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে র পাশের গ্রামে। গ্রামের মুখিয়া অতিন দাসের বাড়ির পেছনের পদ্মদিঘি তে মাছ ধরার জালে উঠে এসেছে এক বিকটদর্শন কালো পাথরের মূর্তি। 

হিমাংশু র রিপোর্ট অনুযায়ী চার ফুটের সেই মূর্তির রুপ নাকি এতটাই ভয়াবহ যে গ্রামের আবহাওয়া ও গুমোট হয়ে উঠেছে। কেউ ভয়ে সেই মূর্তির কাছে যাওয়া তো দূরে থাক পদ্মদিঘির কাছেও যাচ্ছে না। আরও আশ্চর্যের বিষয় মূর্তি জলের ওপরে তোলার পর শুধু মানুষ নয়, কুকুর, গরু, ছাগল ও পদ্মদিঘির কাছে যেতে চাইছে না। অথচ এই দিঘির পাশে ঘন ঘাসের বন আর তার পাশেই বিস্তৃত বাশ বন। সেখানে সন্ধ্যে অবধি গ্রামের গরু, ছাগল, কুকুর সবই নির্বিবাদে ঘুরে বেড়াতো। শালিক,কাক, চড়াই বিভিন্ন পাখির আওয়াজে মুখরিত হয়ে থাকতো বাশবন। আজ সেখানে শ্মশানের নীরাবতা। 

সমস্যা হলো এ-ই বাশ বনের মাঝ দিয়েই গ্রামে ঢোকার রাস্তা।সন্ধ্যের পর পারতপক্ষে না কেউ গ্রামের বাইরে যাচ্ছে, না তো কেউ আসছে। কেউ যে কিছু দেখেছে বা কিছু ঘটেছে এমন নয় কিন্তু সূর্য ডোবার সাথে সাথে বাশবন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে, এক অশরীরী ঘুরে বেড়ায় সেই বনে। গাছের পাতায় আওয়াজ তুলে কথা বলে, ডালে ডালে ঘসা খেয়ে এপাশ থেকে ওপাশে যায়, হাওয়া ছাড়াই দুলে ওঠে বাশের মাথা গুলো। শেয়ালের ডাক, তক্ষকের ডাক, ব্যাং এর কোরাস, এমনকি ঝিঝি পোকার ডাকও শোনা যায়না। 

– টিকিট কনফার্ম। আগামীকাল সকাল ৯ টায় ট্রেন। হিমাংশু কে বলা আছে স্টেশনে গাড়ি নিয়ে থাকবে। 

চিফ এডিটর কল্যাণ বোসের কথায় মুখ তুলে তাকালাম। 

– ঠিক আছে স্যার,তবে আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোবো। 

– সে যাও তবে দেখো কাজটা যেন হয়।আর হ্যা এই কাজের  ওপরেই কিন্তু নির্ভর করছে তোমার চাকরির কনফার্মেশন।  কাজটা আশুকে দিতে পারতাম বাট ইউ আর লাকি।

খুব ভালো করেই জানি শ্যালক অংশুমান ওরফে আশুকে পাঠানোর ক্ষমতা আমার চিফ এডিটর এর নেই। কারন সে ক্ষেত্রে আশুবাবুর  লোকাল অভিভাবিকা আর আমার এডিটর এর স্থায়ী অভিভাবিকা মিসেস বোসের অনুমতি র প্রয়োজন। সেই রিস্ক তিনি নেবেন না। কোন উত্তর না দিয়ে টেবিলের ওপর থেকে নিজের জিনিসগুলো গোছাতে শুরু করলাম। 

অফিস থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় যখন নামলাম ঘড়িতে তখন বিকেল চারটে। প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর হিসেবে এটি আমার প্রথম কেস। কাজেই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আমার কেরিয়ার এর পক্ষে। অশরীরী বা ভুত সম্ভন্ধে আমার ধারনা বা বিশ্বাস খুব একটা স্বচ্ছ নয়,কে জানে থাকতেও পারে আবার নাও পারে। কাল বেরতে হবে আজ কিছু কেনাকাটা করা আবশ্যক। 

………………………..

নিউ মার্কেট থেকে একটু কলকাতা প্রেসক্লাবে গিয়েছিলাম। ক্যানটিনে চা আর ডিম টোস্ট খেয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সন্ধ্যে ৬ টা বেজে গেলো। চার হাজার টাকা ভাড়ার আড়াইশো স্কোয়ার ফিটের একটি ঘর সাথে লাগোয়া বাথরুম। আমার একার পক্ষে যথেষ্ট। বিছানায় শরীর এলিয়ে মোবাইলের ইন্টারনেটে লিখলাম গোপালগঞ্জ। বেশকিছু গোপালগঞ্জ এলেও আমার গন্তব্যস্থান এলো না। বুঝলাম এ জায়গায় এখনো গুগুলের পায়ের ধুলো পরেনি।সারাদিন মায়ের সাথে কথা হয়নি। 

– কি করছো মা?

-আর কি আমার যা কাজ বাড়ি পাহারা দিচ্ছি।বিনা পারিশ্রমিকের পাহারাদার তো।

এই হলো মা র সমস্যা।কোথাও নিয়ে যেতে চাইলে যাবেনা। কেউ এসে ডাকলেও যাবেনা। সারাদিন রাধাগোবিন্দ আর রান্নাঘর। আবার আক্ষেপ করতেও ছারবে না।

– তা বাইরে বেরোলেই তো পারো।কে বারন করেছে তোমায়।

– হ্যা তোদের তো বললেই হয়ে গেলো।বাড়িতে থাকবে কে শুনি?

-আচ্ছা ঠিক আছে, শোনো কাল আমাকে একটু মালদা যেতে হচ্ছে।আবার বোলোনা বাড়ি থেকে ঘুরে যাওয়ার কথা।সময় হবেনা।

– সে কি রে বাড়ির এতো কাছে এসেও মা কে দেখার সময় হবেনা?

-ওহ মা, আমি কি ঘুরতে যাচ্ছি?  সময় খুব কম। দুদিনের মধ্যে কাজটা করে অফিসে ফিরে রিপোর্ট জমা দিতে হবে তবে চাকরি টা কনফার্ম হবে।

-হুম বুঝলাম। যা ইচ্ছে হবে সেটাই করবি।

মা য়ের গলায় অভিমানের সুর। 

– ব্যাস এই জন্যেই আমি বলতে চাইছিলাম না।আচ্ছা শোনো কাজ টা শেষ করে কনফার্মেশন টা পেয়ে আমি সাত দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি। 

– হুম,সাবধানে যাবি, খাওয়া দাওয়া ঠিক করবি। জল বেশি করে খাবি।তোর শরীর খুব চড়া।একটুতেই নাক দিয়ে রক্ত পরে।

– ওহ মা, সেটা ছোটোবেলায় পরতো এখন পরে না। আচ্ছা শোনো আমি এখন রাখি পরে আবার ফোন করছি।

-রাখ, ফোন করিস।

ফোনটা কেটে দিলাম। 

রাতের খাওয়াটা হাল্কা করেই করলাম।মুসুরি র ডাল, আলুসিদ্ধ সাথে ছোটো মাছের ঝোল ঝোল তরকারি। শুতে শুতে রাত বারোটা বেজে গেলো। চোখ কখন লেগে এলো টের পাইনি। 

গভীর ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম এক দিগন্ত বিস্তৃত বাশবনের মধ্যে দিয়ে আমি প্রাণপণে ছুটে চলেছি। পেছনে ভয়াবহ অপ্রাকৃতিক শব্দে কিছু একটা ছুটে আসছে। সেই শব্দ জাগতিক কোনো প্রানীর হতেই পারেনা। মনে হচ্ছে পৃথিবীর গভীর অতলে  নরকের কোনো এক প্রানী প্রবল আক্রোশে ক্রমাগত চিৎকার করেই চলেছে। গাছের পর গাছ তার ভেতর দিয়ে কোনমতে ছুটে চলেছি পেছনে ধাওয়া করে আসছে সেই অপ্রার্থিব চিৎকার। দৌড়াতে দৌড়াতে কোনভাবে ঘাড়  ঘুরিয়ে পেছনে তাকালাম এক সাদা ধোঁয়ার আস্তরণ ছাড়া আর কিছুই দেখলাম না। কিন্তু আমি জানি ঐ ধোঁয়ার ভেতরেই আছে নরক থেকে আসা সেই বীভৎসতা। আরো জোরে, আরো জোরে ছুটতে চাইছি কিন্তু পারছি না ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে আমার শক্তি। তবুও টলতে টলতে ছুটে চলেছি ঝোপঝাড় – বাশ ঝাড় এর ভেতর দিয়ে। হটাৎ পায়ে জড়িয়ে গেলো পাতাসহ বাশগাছের একটি ডাল,ছিটকে পরলাম একটা ঝোপের মধ্যে। আর সাথে সাথেই আমাকে ঘিরে ধরলো সাদা ধোঁয়ার কুয়াশা। শরীরে র প্রতিটি রোম কুপ দিয়ে প্রবেশ করতে থাকলো ধোঁয়া রুপি নরকের জীব।নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি নিজের পরিবর্তন। না শারীরিক নয় মানসিক। চেপে থাকা অতৃপ্ত কামনা বাসনা গুলো আমার সমস্ত স্বাভাবিক চিন্তাধারা কে গ্রাস করছে। পাশবিক এক চিন্তা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে সেই আদিম সময়ে যেখানে নেই মানুষের সাথে পশুর কোনো পার্থক্য। প্রকৃতি র সমস্ত রঙ সরে গিয়ে সবকিছু দেখছি সাদা কালো। স্পষ্ট বুঝলাম আমি ধীরে ধীরে পরিনত হচ্ছি এক নরপিশাচে। 

ধরফর করে উঠে বসলাম বিছানায়। এ কি ধরনের স্বপ্ন,  সমস্ত শরীর নভেম্বরের শীতেও ঘেমে উঠেছে। হ্যা,ভয় পেয়েছি যথেষ্ট ভয় পেয়েছি।এ যেন স্বপ্ন নয়, বাস্তব। চোখের সামনে এখনো যেন দেখতে পাচ্ছি সেই ধোঁয়া অনুভব করতে পারছি নিজের সেই পরিবর্তন। 

 হটাৎ চোখ গেলো বাথরুমের দরজার দিকে।অবাক হলাম। পরিস্কার মনে আছে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে লাইট নিভিয়ে বিছানায় শুয়েছিলাম। অথচ এখন দরজাটা ভেজানো আর তার ফাঁক দিয়ে  দেখা যাচ্ছে বাথরুমের আলো। বিছানা থেকে নামতে গিয়ে নিজের পা দেখে চমকে উঠলাম। পায়ে এতো মাটি কাদা লাগলো কি করে? মাটি আসার তো প্রশ্নই নেই কারন সারাদিন জুতো পরা তাছাড়া শোবার আগে স্নান করা আমার পুরনো অভ্যাস। পায়ের মাটি ঝেড়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। দরজার কাছে যেতেই ভেতরের আলো নিজে থেকে বন্ধ হয়ে গেলো। সুইচের দিকে  তাকালাম অফ করা। দরজাটা লাগিয়ে বিছানায় এসে শুতে যাব শরীরে একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে গেলো। দরজার ভেতর থেকে আবার আলো দেখা যাচ্ছে। সুইচের দিকে তাকালাম অফ করা। দরজা নিজের হাতে লাগালাম কিন্তু এখন আবার আগের মতো ভেজানো। খাট থেকে নামলাম, ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম বাথরুমের দরজার দিকে। আলো এবারে নিভলো না। দরজাটা খুলে ফেললাম। আর তারপরই আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল শিহরন সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পরলো।

দেখলাম সমস্ত বাথরুম জুরে এক আবছা ধোঁয়ার আবরণ। আর দেওয়ালে আটকানো আয়নার দিকে মুখ করে আমার দিকে পেছন করে মাথা নিচু দাঁড়িয়ে আছে এক অবয়ব। আয়নায় চোখ পরার সাথে সাথে সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে আয়নার দিকে তাকালো। একি,এ কি দেখছি আমি, এ তো অবিশ্বাস্য অকল্পনীয়। এ তো আমি নিজে। আমার হাত পা বরফের মতো অসার ঠান্ডা হয়ে আসছে। আমি নিজেকে দেখছি আয়নায় আমার সামনে। এক উজ্জ্বল জ্বলন্ত হলুদ দৃষ্টি আর এক কান থেকে অপর কান অবধি চেরা হিংস্র হাসি যার থেকে বেরিয়ে এসেছে এক গুচ্ছ সুতীক্ষ্ণ শ্বদন্ত।  মুখ দিয়ে নিজের অজান্তে বেরিয়ে এলো তীব্র চিৎকার। (ক্রমশ)…. 

About Post Author

Editor Desk

Antara Tripathy M.Sc., B.Ed. by qualification and bring 15 years of media reporting experience.. Coverred many illustarted events like, G20, ICC,MCCI,British High Commission, Bangladesh etc. She took over from the founder Editor of IBG NEWS Suman Munshi (15/Mar/2012- 09/Aug/2018 and October 2020 to 13 June 2023).
Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Advertisements

USD





LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here