আবেগে আর ভালোবাসায় সিক্ত, কিন্তু ক্ষুরধার লেখনীর অধিকারী ফারুক আহমেদ

0
440
Faruque Ahamed
Faruque Ahamed

পরীর মতো রাজকন্যার ভালবাসায় অনুপ্রেরণিত হয়ে সাহিত্য আকাশে বিরল প্রতিভা হয়ে উঠছেন ফারুক আহমেদ

বিশেষ প্রতিবেদক

ভালবাসা আর ইচ্ছে শক্তির জোরে মাটিতে জন্ম নিয়ে ধীরে-ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে একদিন আকাশ-ছোঁয়া এক মানুষের গল্প শোনাবার অভিলাষ নিয়ে এই কলম ধরেছেন অনেকেই। অত্যন্ত কাছে থেকে সেই বেড়ে-ওঠা প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য হয়েছে অনেকের।

 ১৯৮১ সালের ২৩ নভেম্বর দক্ষিণ ২৪-পরগনা জেলার অবিভক্ত ভাঙড় (বর্তমান কাশীপুর) থানার পোলেরহাট অঞ্চলের নাটাপুকুর গ্রামের এক চিকিৎসক মো: আবেদ আলি ও ফজিলা বেগমের তিন সন্তানের কনিষ্ঠটির একদিন বিশ্ববরেণ্য অমর্ত্য সেনকে ছুঁয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি-ভবনে উপস্থিত হয়ে তাঁর হাতে তাঁর লেখা বই ও সম্পাদিত পত্রিকা তুলে দেওয়ার মাঝের কাহিনী কম রোমাঞ্চকর ছিল না। 

১৯৯৯ সাল। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী একটি ছেলের নামের বানান গরমিলের বিষয়ে রেজিষ্ট্রেশন দপ্তরের সঙ্গে মতবিরোধের ঘটনা বাংলার একটি লিডিং দৈনিকে লেখালেখি হলো এবং ছেলেটা সে-লড়াইতে জিতে গেল। সেই ছেলেটিই অতি সুদর্শন, জেদি-পড়ুয়া সদাহাস্যমুখ এবং স্কুলের শিক্ষকদের ও স্থানীয় এলাকার অতি আদরের প্রাণচঞ্চল কিশোর ফারুক আহমেদ। 

নাটাপুকুরের গ্রামের স্কুলের প্রাথমিক পাঠ শেষ  করে ভাঙড় থানারই (তৎকালীন অবিভক্ত) ঘটকপুকুরে নতুন বাসস্থানের সুত্রে ঘটকপুকুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া কিশোর মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয় প্রথম বিভাগে। ২০০১ সালে ভাঙড় উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে আবারও প্রথম বিভাগ। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ২০০৪ সালে ইংরেজিতে স্নাতক। বিদ্যা ও জ্ঞানার্জনের নেশা তাকে থামতে দেয় না। এম এস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে স্নাতক হয় সে প্রথম বিভাগে। তারপর ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ও কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে। বর্তমানে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অনগ্রসরদের সামাজিক সমস্যা ও উত্তরণ’ বিষয়ে গবেষণায় ব্যস্ত ফারুক আহমেদ। 

এই পর্যন্ত আসতে তাঁকে বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। ক্লাস তখন অষ্টম শ্রেণি স্কুল বন্ধু কুতুবউদ্দিন গাজীর সঙ্গে প্রথম সিনেমা দেখা। ভাঙড়ের বিজয়গঞ্জ বাজারের কাছে চৈতালী প্রেক্ষাগৃহে “ডর” দেখে মুগ্ধ হওয়া। শাহরুখ খানের অভিনয় দেখে তাঁর ভক্ত হয়ে ওঠা। শাহরুখ খান এর জীবন ও কর্ম জানবার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠা।

ক্লাস নাইনে প্রথম কাউকে দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে অফুরন্ত শক্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে সুপথে চালিত করতে নিজেকে তৈরি করা। সেই তাঁর জীবনে মহামূল্যবান তারা হয়ে আছে বহু আলোকবর্ষ দূরে। না কখনও তাকে সে ছুঁতে পারিনি। সে এক প্রকৃত রাজকন্যার মতো তাঁর কাছে। লেখা পড়াতে সে বরাবরই প্রথম হয়। ফালতু ছেলেদের সঙ্গে সে কখনও সময়ই নষ্ট করেনি। তাঁর মা ও পরিবার অতিরিক্ত আদরের সঙ্গে তাঁকে বড় করেছে। তাঁকে দেখানোর জন্য জেদ নিয়ে কিছু করে দেখানোর তাগিদ নিয়ে মন তৈরি করা। না ফারুক আহমেদ সেই অধরা তারাকে আজও ছুঁতে পারিনি। তবুও তাঁর জন্যে কিছু করতে চায় সমাজের কল্যাণে।

২০০৪ সালে বিএ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ফলাফল প্রকাশের পূর্বেই কর্মজীবনে প্রবেশ। বিষয়টি বেশ ঘটনাবহুল। ঘটকপুকুর নজরুল-সুকান্ত পাঠাগারকে কেন্দ্র করে একটা আড্ডা চলত। মধ্যমনি ওই গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক রফিকুল ইসলাম। তাঁর আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে কেউ ‘সূর্যমুখী’ নামে একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তলে। সেই আড্ডার সর্ব কনিষ্ঠ সদস্যের নাম ফারুক আহমেদ। একটা গ্রন্থাগারের একসঙ্গে প্রচুর বই তাঁর হাতের নাগালে পেয়ে আর গ্রন্থাগারিক রফিকুল ইসলামের আদরে সে সব সময় ওখানে পড়েই থাকে। এই সময় তার হাতে আসে ড. নজরুল ইসলামের (আই পি এস) আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্ত প্রবন্ধগ্রন্থ এবং উপন্যাস ‘বকুল’। বিপুল উৎসাহে পড়ে মুগ্ধ ফারুক লেখকের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে ফোন করে এবং সাক্ষাৎ করার আমন্ত্রণ পায়। প্রথম সাক্ষাতেই রত্ন চিনতে ভুল করেননি প্রবল-প্রতাপ পুলিশ অফিসার ড. নজরুল ইসলাম। ফারুককে বেঁধে ফেলেন স্নেহের বাঁধনে। ২০০১ সালের কলকাতা বই-মেলায় বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। 

এরপর ২০০২ সাল। তরুণ ফারুক প্রথম পত্রিকা প্রকাশ করতে চাইলে  তার নামকরণ করেন ‘উদার আকাশ’। এই সময় তার প্রতিদিনের সঙ্গীরা মুগ্ধ হয় তাঁর কাজে। দিনের একটা ভাগ কলেজ, কলকাতা হলে আর একটা ভাগ সে সাহিত্যের বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করে। ভীষণ প্রাণচঞ্চল কিশোর। এই ভাঙড়ে তো ওই কলকাতায়। যেখানে আবৃত্তি বা প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা সেখানে ফারুক। আর ফারুক মানেই পুরস্কার। 

এই সময় তার সারাক্ষণের আর এক সঙ্গী ছিল প্রবল অর্থসঙ্কট। একদিন ড. নজরুল ইসলামের কাছে একটা কাজ জোগাড় করে দেবার প্রার্থনা জানায় সে। পরদিনই, ২০০৪ সালের ২৯ জুলাই তিনি ফারুক আহমেদকে সঙ্গে করে নিয়ে যান তাঁর স্বপ্নের শিল্পক্ষেত্র বসন্তপুরে, মুর্শিদাবাদে। ফারুককে করে দেন বসন্তপুর এডুকেশন সোসাইটির “অফিস সেক্রেটারি।” দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ১১ বছর ওখানে কাজ করার পর কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষা বিভাগের সহ-নির্দেশক হিসাবে যোগদান করে এ-যাবৎ সেখানেই কর্মরত। বর্তমানে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অফিস কডিনেটোর পদে কর্মরত।

এই সময়কালের মধ্যে ২০০৭ সালের ২৯ জুলাই ড. নজরুল ইসলাম তাঁর বন্ধু-কন্যা মৌসুমী বিশ্বাসের সঙ্গে বিবাহ দেন। বর্তমানে তাদের পাঁচ বছরের এক ফুটফুটে কন্যা-সন্তান রাইসা নূর। 

২০০২ সালে টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে প্রথম পত্রিকা প্রকাশ – ‘উদার আকাশ’। বাংলার গ্রামে-গঞ্জে এমন ব্যাঙের ছাতার মতো বহু পত্রিকার জন্মের পর সুতিকা-গৃহেই মৃত্যু হয়। মূলত: অর্থাভাবে। কিন্তু এমন ব্যতিক্রম দেখা যায় না। এত অর্থাভাবেও কেবল উদ্যোমের জোরেই ‘উদার আকাশ’ এখন ডাগর-ডোগর ১৮ বছরের ঝকঝকে তরুণ। উদার আকাশ এখন আন্তর্জাতিক। দুই বাংলা তথা বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি লেখক ও পাঠক-কুলের পৃষ্ঠপোষকতায় সমৃদ্ধ। উদার আকাশ-এ প্রকাশিত উপন্যাস-এর জন্য প্রখ্যাত সাহিত্যিক আফসার আমেদ বঙ্কিম পুরস্কার লাভ করেছেন ২০০৬ সালে। এই পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধের জন্য খাজিম আহমেদ ও আমিনুল ইসলাম ‘বর্ণপরিচয়’ পুরস্কার লাভ করেন কলকাতার মর্যাদাপূর্ণ টাউন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ২০১০ সালে। বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য ড. শেখ মকবুল ইসলামের জগন্নাথ দেব-এর উপর একটি গবেষণাপত্র প্রথম প্রকাশিত হয় উদার আকাশে এবং পরে তিনি ওই গবেষণার জন্য ডি লিট পান। অধ্যাপক ড. ইসলামের কয়েকটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেছে উদার আকাশ।

২০১১ ও ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ ছোটো পত্রিকা সমন্বয় সমিতি উদার আকাশকে শ্রেষ্ঠ শারদ সংখ্যা নির্বাচিত করে। ২০১২ সালে লিটল ম্যাগাজিন বিভাগে উদার আকাশ ‘নতুন গতি’ পুরস্কার পায়। অল ইন্ডিয়া ইমাম-মুয়াজ্জিন এণ্ড সোশাল ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশন-এর মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটির পক্ষ থেকে ২০১৬ সালে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ফারুক আহমেদকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। বারাসত রবীন্দ্রভবনে কথামালা আয়োজিত ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উৎসব ২০১৭-র অনুষ্ঠানে ফারুক আহমেদকে ‘কথামালা ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করা হয়। অল ইন্ডিয়া এস সি এণ্ড এস টি রেলওয়ে এমপ্লয়িজ এসোসিয়েশন তাঁদের নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এনুয়াল জেনারেল মিটিং-এ ফারুক আহমেদকে সম্মাননা জ্ঞাপন করে ২০১৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর।  নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য সংসদ কবি ফারুক আহমেদকে ২০১৭ সালে “চর্যাপদ” পুরস্কার দিয়ে সসম্মানিত করে। এছাড়াও ফারুক বহু পুরস্কার পেয়েছে। 

বাংলার স্বনামধন্য সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ ফারুককে স্নেহের বাঁধনে বেঁধেছেন। তাঁর প্রতিটি বিশেষ সংখ্যা সস্নেহে উদ্বোধন করেছেন ও মূল্যবান পরামর্শ দান করেছেন মহাশ্বেতা দেবী, শঙ্খ ঘোষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আবুল বাশার, জয় গোস্বামী, কবীর সুমন, মোস্তাক হোসেন, সুনন্দ সান্যাল প্রমুখ।

স্নেহের বাঁধনে বেঁধেছেন সাহিত্যের আর এক পৃষ্ঠপোষক ও উদ্যোগপতি মোস্তাক হোসেন।

সাহিত্যের পৌরোহিত্য করার সাথে-সাথে একজন সমাজ সচেতন নাগরিক হিসেবে সমকালীন সময়ে ঘটে যাওয়া নানান অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেমন জোরালো কলম ধরেছে তেমনি জোরালো কন্ঠস্বরে প্রতিবাদ করেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের মিছিলে পা মিলিয়েছে। ২০১৪ সালে আক্রান্ত আমরা-র নেতৃত্বে ও আরও কয়েকটি সংগঠন মিলে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কাছে যে স্মারকলিপি দেওয়া হয় ফারুক আহমেদ তার অন্যতম সদস্য। এই ডেপুটেশনের পর আলাদা সাক্ষাৎ করে ফারুক আহমেদ তাঁর হাতে উদার আকাশ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা ও প্রকাশনার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ তুলে দেয়। ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন ডঅধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনী এবং দিলীপ বেঙ্গসরকার-এর হাতেও উদার আকাশ প্রকাশনের গ্রন্থ তুলে দিয়ে তাঁদেরকে সম্মানিত  করেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর হাতেও উদার আকাশ-এর বিশেষ সংখ্যা ‘উদার ভারত নির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’ তুলে দিয়েছে। রাজ্যের অনেক মন্ত্রীগণ তার প্রকাশনার থেকে গ্রন্থ ও পত্রিকার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেছেন।

২০১৬ সালে বিখ্যাত তাজ হোটেলে একটি অনুষ্ঠানে ফারুকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন-এর। এরপর ওই সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি অমর্ত্য সেন প্রকাশ করেন পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের উপর গবেষণা মূলক একটি রিপোর্ট।  ড. অমর্ত্য সেন-এর প্রতিষ্ঠিত প্রতিচি ট্রাস্ট, গাইডেন্স গিল্ড এবং স্ন্যাপ সংগঠনের উদ্যোগে কলকাতার গোর্কি সদনে বই আকারে ওই রিপোর্ট প্রকাশের অনুষ্ঠানে আয়োজকদের মধ্যে ফারুক আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। 

ফারুকের সবচাইতে বড়ো গুণ সে নিজে লেখার চাইতে অপরকে বেশি লেখাতে ভালোবাসে। বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে অনেক প্রতিভা কুঁড়ে-ঘরের অন্ধকারে বসে নিরবে সাহিত্য-সাধনায় মগ্ম আছেন। শহরের নামজাদা পত্র-পত্রিকাগুলিতে তাদের স্থান হয় না। বলা ভালো পাত্তা মেলে না। ফারুক তাঁদের লেখাকে উদার আকাশের পাতায় মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরছে নিরন্তর। অন্যদিকে কারও-কারও ভালো লেখার হাত, কিন্তু লিখতে চান না। এঁদের পিছনে লেগে থেকে সুন্দর লেখা বের করে আনার মতো পূণ্যের কাজ ফারুক আহমেদ করে চলেছে প্রতিনিয়ত। 

এই চিন্তা-ভাবনা থেকেই তার প্রকাশনার জগতে পা-রাখা। এ-বিষয়ে তার ঐকান্তিক ইচ্ছায় জন্ম হয়েছে ‘উদার আকাশ প্রকাশনার’। এখানেও ইতিমধ্যেই মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছে সে। দুই বাংলার লেখকদের ৭৭টি বই এযাবৎ প্রকাশিত হয়েছে তার প্রকাশনায়। প্রতিটি বইয়ের বিষয়, ছাপার মান, কাগজ ইত্যাদি যে-কোনও বড়ো প্রকাশনার সঙ্গে টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। প্রকাশনার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো ‘পশ্চিমবাঙলার বাঙালি মুসলমান অন্তবিহীন সমস্যা’ – খাজিম আহমেদ, ‘জীবনশিল্পী রোকেয়া’ – মীরাতুন নাহার, ‘ইসলামের ভুবন’ এবং ‘মোদীর ভারত, গান্ধীর ভারত’ – গৌতম রায়, ‘মানুষ-মাটি-মা’ ও ‘জন্মভূমিশ্চ’ – মোশারফ হোসেন, ‘নজরুল সাহিত্যের দিগ্বলয়’ নুরুল আমিন বিশ্বাস,  ‘জলের কান্না’ – পলাশকুমার হালদার, ‘সাম্যবাদ : ভারতীয় বিক্ষণ’ আর ‘নজরুল নানামাত্রা’- শেখ মকবুল ইসলাম, ‘পরিবর্তনের সন্ধানে মুর্শিদাবাদের বাঙালি মুসলমান’ – সৌমেন্দ্রকুমার গুপ্ত’ ‘মহাশ্বেতা দেবীর গল্পবিশ্ব : লৈঙ্গিক প্রতিরোধ’ ড. শিবুকান্ত বর্মন, ‘দ্য সেকুলার ভিশন অফ কাজী নজরুল ইসলাম’ ড. আবুল হোসেন বিশ্বাস, ‘নজরুল সাহিত্যে দেশকাল’ ড. সা’আদুল ইসলাম, ‘গৌরকিশোর ঘোষ মুসলিম জীবন ও অভিমানস’ ড. শেখ মুঈদুল ইসলাম প্রমুখ।

ফারুক আহমেদের নিজের সম্পাদনার কাজেও তাঁর মুন্সিয়ানার ছাপ পরিলক্ষিত হয়েছে। তাঁর সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো ‘রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অনগ্রসর ও সংখ্যালঘু’, ‘কংগ্রেস ও বাম-শাসনে মুসলিম ভোট-ব্যাঙ্ক’, ‘আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ’, ‘পশ্চিমে সূর্যোদয় রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের উলটপূরাণ’, ‘প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়ন’, ‘মূল্যবোধের অবক্ষয়’ সহ বেশ কয়েটি গ্রন্থ। 

আগেই বলেছি নিজে লেখার চাইতে অন্যকে লেখাতে বেশি আনন্দ পায় ফারুক। তবুও ধীর গতিতে হলেও নিজের মৌলিক লেখালেখি ও গবেষণার কাজ নীরবে চালিয়ে যাচ্ছে সে। ইতিমধ্যে গুণগ্রাহীদের চাপে তাঁর কাব্যগ্রন্থ  ‘বিশ্বপ্রেম’  প্রকাশিত হয়েছে ও তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘বিনির্মাণ’ প্রকাশিত হতে চলেছে। 

বাংলায় তাঁর জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি বৈদ্যুতিন চ্যানেলের টক-শোতে চ্যানেলের আমন্ত্রণে উপস্থিত থেকেছে সে। তাঁর মূল্যবান বক্তব্য তুলে ধরেছে বাংলার কল্যাণের জন্য। ২০০৭ সাল থেকে সে মুর্শিদাবাদ জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার জন্য প্রতিনিয়ত সামাজিক ভাবে জনমত গড়ে তুলতে আন্দোলন করছে এবং সরকারের কাছে লিখিত ভাবে আবেদনও করেছে।

একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামের মাটি থেকে তাঁর এই যে উড়ান, তা কেবল তাঁর একার প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরেই নয় তাঁর পরীর মতো রাজকন্যার অনুপ্রাণায় সে এতো দূরে এগিয়ে আসতে পেরেছে। বর্তমান সময়-কালে শহরের পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলে কেউই ওড়ার সাহস দেখাতে পারেনা। খুব কাছ থেকে দেখেছি তাই বলতে পারি কেবলই ইচ্ছে-ডানায় ভর করেই তাঁর এই উড়ান। এই মুহূর্তে ফারুক আহমেদ একাধারে জনপ্রিয় সম্পাদক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সমাজ-চিন্তাবিদ ও দক্ষ সংগঠক।

গত ১৪ নভেম্বর ২০১৭ তাঁরই উদ্যোগে কলকাতার আইসিসিআর সত্যজিৎ রায় অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় ‘গঙ্গা-পদ্মা সাহিত্য-সৌহার্দ্য’ বা ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী-উৎসব–২০১৭।’ দুই বাংলার সংস্কৃতি ও  সাহিত্যি-জগতের মেলবন্ধনের মাধ্যমে দুই বাংলা একত্রিত থাকবে আজীবন, ফারুকদের এই কামনা একদিন যথার্থ হয়ে উঠবে, দল-মত-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে, যেদিন থাকবে না কোনও লুকনো বিদ্বেষ, ভারতবাসী হিসেবে আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছি। সেই সুদিন, –যা অনিবার্য, এবং একদিন আসবেই। 

ফারুক আহমেদ এক মূল্যবান দীপ্তিময় তারা, পিতা, মাতা আপনজনের সঙ্গে পরীর মতো রাজকন্যার ভালবাসা আর অনুপ্রেরণাতেই সাহিত্য আকাশে সে এক বিরল প্রতিভা হয়ে উঠছে। আজ তাঁর রাজকন্যাকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা দিয়ে শেষ করলাম।

দেশপ্রেমিক

ফারুক আহমেদ

পরীর মতো রাজকন্যা চোখের দিকে তাঁকাও
অফুরন্ত সৃষ্টি খেলা করে তোমার প্রেমিকের চোখে।

বাঁচার আকাশ দেখাও তাঁকে

জানো সে দেশপ্রেমিক মন নিয়ে
রাস্তায় পড়ে থাকা বিপদ
কলার খোসা ইট পাথরের টুকরো সরিয়ে রাখে
তোমারই অনুপ্রাণা হয়ে।

যারা বলে লোক দেখানো সমাজসেবক
তাদের বলতে দাও।

পরীর মতো রাজকন্যা তুমি তো জানো
তোমার হৃদয় কাঁপানো প্রকৃত দেশপ্রেমিক হতে পারিনি সে আজও
স্বাভাব যায় না তাঁর
তাই সে যা খুশি লিখে যায়
রাগ তোমার আসমান স্পর্শ করে।

সাহিত্য আকাশ জুড়ে কার নাম

পরীর মতো রাজকন্যা
সৃষ্টির ক্যানভাস জুড়ে কে আছে?

যে দিকে তাকাই শুধুই কার মুখ?

পরীর মতো রাজকন্যা হয়ে আছ কার হৃদয় জুড়ে?

পাপ মোচন
শেষ দোয়া ক্ষমা করো রাজকন্যা
না সে কখনও আর ধরা দেবে না
সে অধরাই থাক।

তারার দেশে

ফারুক আহমেদ

তামাম আসমান জুড়ে যে নাম
সে নাম তোমার
এক অনন্য উচ্চতায় অবস্থিত উড়ানের কথা বলি
সে কথা তোমার

হাজার বন্ধন অগ্রাহ্য করে
চোখে চোখ হাতে হাত…

তেজী যুবকের স্বপ্নপূরণ অফুরন্ত অনুপ্রেরণা জুগিয়েছ

না ভাবনার দেশ সুইডেন
সব অন্ধকার মুছে আলোর পথযাত্রী

বেলা অবেলায় এ কোন আত্মশুদ্ধি

ওপরে দাঁড়িয়ে আছে পবিত্র হজরত
ছুঁটে গিয়ে বুকে বুক রাখার পরম সুখ আর নেই কোথাও

শুধুই তোমার হাতে হাত রেখে এভুবনে ছুঁটে চলেছি…

মহান আল্লাহর দূত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর দেখানো পথে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here