শতরূপা তোমাকে কিছু বলার ছিল সুমনের (সপ্তম ভাগ) – অংশুমানের কৃত্রিম বুদ্ধি ও জ্ঞানগঞ্জ
সুমন মুন্সী,কলকাতা
(আগে যা হয়েছে জানতে ক্লিক করুন প্রথম ভাগ , দ্বিতীয় ভাগ, তৃতীয় ভাগ, চতুর্থ ভাগ,পঞ্চম ভাগ,ষষ্ঠ ভাগ, সপ্তম ভাগ, অষ্টম ভাগ, নবম ভাগ)
অংশুমান দেব রায় মানে পম, বিল্টুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা পৌঁছলো I-57 N route আমেরিকানা এক্সপ্রেস ওয়ে । ১৭ ঘন্টা লাগবে শিকাগো পৌঁছতে । মার্সেডিজ G ক্লাস এসইউভি চালিয়ে এই লং ডিসটেন্স ড্রাইভ ওর খুব প্রিয় পাস টাইম ।
গাড়ি চালাতে চালাতে ভেবে নিলো কি করা যাবে আর কি কি হাতে আছে ।
শুক্রবার মিটিং শেষ করে গল্প গুজব করে শুতে দেরি হয়ে গেছিলো । তবু শনিবার ভোর ৫ টা তে উঠে বেরিয়ে পড়েছে । শতরূপা জোর করে স্যান্ডউইচ, কফি আর পোচ দিয়েছিলো খেতে, সঙ্গে কলা, আপেল কেক বিস্কিট আর জুস দিয়ে দিয়েছে । মেয়ে টা খুব ভালো, সবাই কে খুব আপন করে নিতে পারে ।
শুধু রাত্রে এক ফাঁকে প্রশ্ন করেছিল , “কে এই সুমন সান্যাল যার জন্য সব বন্ধু খেপে উঠেছে? কোনো বড় বিসনেস ম্যাগনেট, নেতা না অন্য কিছু? কলেজে একসাথে পড়তো তোমাদের, কিন্তু কোনো দিন এই তিরিশ বছরে তো তাঁর খোঁজ কেউ করেনি? আজ হটাৎ কি হলো?
পম হেসে বলেছিলো, “অরে আপদ যে আমাদের এতটা বশীকরণ করে ফেলেছে সেটা বুঝিনি। এখন সবাই কুহুকের টানে ছুটবে। তুমি দেখলে তোমারও ওই দশাই হবে । হি ইজ লাইক দ্যাট । ইউ হেট হিম, ইউ ক্যান লাইক হিম, বাট ইউ ক্যান নট ইগনোর হিম । না হলে এই পম শিকাগো টু ডালাস ড্রাইভ করে। আবার খরচ করে ইন্ডিয়া যাবে বলে প্ল্যান করে। তবে হ্যাঁ, যদি দেখা হয় নিশ্চিন্তে ওর সাথে যে কোনো কাজে যেতে পারো এতোটাই ট্রাস্ট অর্দি । কিন্তু ভুলেও গান শোনাতে চাইলে শুনবে না, ওরকম টর্চার হিটলারের গ্যাস চেম্বার ও হয়নি কখনো। ও যখন ভয়েস মেসেজ পাঠাতো আমরা ভয়ে খুলতাম না ।”, বলে হাসতে থাকে পম ।
ওর কথা শুনে হেসে ফেলে শতরূপা।
“বিল্টু বলে ও নাকি মিসপ্লেসড জিনিয়াস আর পাগল। অনেক গুন্ ছিল ব্যাট অল ওয়েস্ট।”, বললো শতরূপা ।
“হয়তো, তবে ওর মতো মজার ক্যারেক্টর দুটো নেই, বুড়ো বয়েসে বন্ধুদের কাছে ৫ বছরের বাচ্ছাদের মতো ফুচকা আইসক্রিম বায়না করে ।”, পম বললো ।
এই বলে লাঞ্চ প্যাক নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে । হাত নেড়ে বিল্টু আর শতরূপা কে বিদায় জানিয়ে গাড়ি I-57 N route আমেরিকান এক্সপ্রেস ওয়ের জন্য এক্সিটের দিকে এগিয়ে চলে ।
পথে বিশেষ কোনো অসুবিধা হয়নি । শুধু ফোন করে সমীরণকে মানে সমীরণ ব্যানার্জী কলকাতার ছেলে ডাটা সাইন্স এক্সপার্টকে বলে দেয় কি কি ডাটা মাইন করে আমাজন, গুগল আর অনন্য অনলাইন ডাটা প্যাটার্ন দেখতে হবে সুমন সান্যালের । ডিসিপি উত্তরার কন্টাক্ট নম্বর ও দিয়ে দেয়, যদি স্পেশাল এক্সেস লাগে সেই জন্য।
গ্যাস স্টেশন মানে আমাদের পেট্রল পাম্প । সাথেই মোটেল ছিল, ২ ঘন্টা ঘুমিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছিল । লাঞ্চ এ পিজ্জা আর জুস খেলো ।
খাওয়ার সময়ই সুমনের হোয়াটস আপ মেসেজ আর ইউটুবের গানের লিংক গুলো সমীরণ কে পাঠিয়ে দেয়। তিন বছরেও ডিলিট করতে পারে নি । সাইকোসোম্যাট্রিক টেস্ট এনালাইসিস করে প্যাটার্ন বোঝার দরকার। Neural Networks models using Keras and Tensorflow Libraries on Python এর কাজ ই হলো ডিপ লার্নিং কে মডেল এর সাহায্যে এনালাইসিস করা । সমীরণ এই বিষয়ে চ্যাম্পিয়ন । পম নিজে হাতে তৈরী করেছে ছেলেটাকে।
সেই টুয়েলভের শান্তি বাবুর কোচিং এর অংকের ক্লাসে এক সাথে যেত সুমন আর পম । সব সময় কিছু না কিছু উল্টো কাজ করে লাইম লাইট পেত । কলেজ গাঁট চুক্তি নিয়ে ডিবেটে চলছে, সবাই যখন তৎকালীন কমিউনিস্ট বাংলায় এর বিরোধিতা করলো ও তখন WTO কে স্বাগত জানিয়ে বললো, ওপেন মার্কেট ইকোনমি প্রয়োজন, না হলে ভারত ডেট ট্রাপের বাইরে আস্তে পারবে না । ডাঙ্কেল প্রস্তাবের পক্ষে মত দিলো। বিচারকগণ মার্ক্সবাদী আদর্শের প্রশংসা শুনে অভ্যস্ত বিপরীত কথায় স্পষ্টত ক্ষুব্ধ ।
তাতে ওর কি যায় আসে। বলে দিয়ে ভাগের বাপুজি কেক, কলা আর ডিমসিদ্ধ নিয়ে ল্যাবরেটরির সিঁড়িতে সবার সাথে ভাগ করে খেতে লাগলো। প্রবল ক্যাপিটালিস্ট প্রস্তাবে সায় দিয়ে বেরিয়েই সোসালিস্ট আচরণ। প্রশ্ন করলে বললো,”সুমন ক্যাপিটালিস্ট বাই ব্রেন, সোসালিস্ট বাই হার্ট।”
তারপর কেমিস্ট্রি স্যার রাজেন বাবুর ছেলে ২র জায়গায় ৪টা ডিম্ পেয়েছে দেখে হাল্লা করে আরো দুটো ডিম্ বুঝে নিয়ে এলো, কিন্তু দিয়ে দিলো বন্ধুদের ।
বললো “অধিকার কেড়ে নিতে হয়, কেউ দেয় না ” ।

ইন্ডিয়া থেকে কল আসছে ।
“হ্যালো কে?”, পম বললো ।
“আমি অর্পিতা বলছি রে। চিনতে পারছিস।”, ও পাস্ থেকে নারী কণ্ঠ ।
“অরে রিনা ব্রাউন, কি খবর।”, পম খুশি হয়ে বললো, অর্পিতা ওদের সাথেই পড়তো একই ব্যাচ । ভীষণ নম্র অথচ পার্সোনালিটি ছিল মেয়ে থুড়ি বৌদির, বিয়ের পর ডিগ্রী করে । শুনেছিল এখন ঝুমুর আর ফোক গানে বেশ নাম করেছে অর্পিতা হালদার । রিনা ব্রাউন নাম টা সুমন দিয়েছিলো অর্পিতা কে । সপ্তপদীর সুচিত্রার সেই বিখ্যাত “ও যেন আমায় টাচ না করে”, সেই ডায়লগ অর্পিতার মুখে শুনে ।
“শোন বিরাটিতে একটা গানের অনুষ্ঠানে এসেছিলাম, সুমনের ফটোতে মালা দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো ।একটা সমবায় সংস্থার অনুষ্ঠান। সেক্রেটারি বললেন সুমন ওনার গুরু ভাই ছিল । নিজের দাদার মতো ভালোবাসতো । আমি ভদ্রলোকের নম্বর নিয়ে এসেছি উত্তরা কে দিয়েছি, তোকেও দিলাম। অসীম ব্যানার্জী ভদ্রলোকের নাম,”|
“ওকে, আমি কথা বলবো ওনার সাথে যদি কোনো তথ্য পাওয়া যায়।”, বোলো পম।
গাড়ি চালাচ্ছে শুনে অর্পিতা আর কথা বাড়ায় না ।
শিকাগো ঢোকার আগেই সমীরণ কল করলো । সমীরণ পাইথন আর হাডুপ এক্সপার্ট, বিগ ডাটা এনালাইসিসে হাত অসাধারণ।
“স্যার, ডিটেলস ডাটা প্যাটার্ন আপনা কে মেইল করে দিয়েছি। লোকটা কে স্যার, জেনেটিক্স, প্রোটিন এনালাইসিস, ক্রিসপার, আরটিপিসিএর কাজ করেছে । ডাটা সাইন্স নিয়ে আইআইটি রুড়কী project, ন্যাশনাল জিওগ্রাফির অ্যাওয়ার্ড, জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড আবার তিব্বতি তন্ত্র, আগামবাগীশের তন্ত্র নিয়েও নাড়াচারা করেছে। ওরাকল এসকিউএল সার্ভার ডাটাবেস নিয়ে কাজ আছে আবার নেচার কনসারভেশন নিয়েও কাজ করেছে । বাট মোস্ট ইন্টারেষ্টিং হি ওয়াস রিডিং এ লটস অফ মেটেরিয়াল ওন সাংগ্রিলা এন্ড জ্ঞানগঞ্জ । আই এম ট্রায়িং টু ফাইন্ড মোর ডিটেলস ওন জ্ঞানগঞ্জ। সামথিং রিলেটেড তো হাই স্পিরিচুয়াল একটিভিটি ইন দাট প্লেস ইজ একটিভ, বাট নো অথেন্টিক ডাটা ।”
“আমার ছোটবেলার বন্ধু, এনিওয়ে থাঙ্কস, আমি দেখে বলছি,” পমের গলায় একটু গর্বের সুর ।
এমন সময় পেনড্রাইভে থেকে গাড়ির মিউসিক সিস্টেমে বেজে উঠলো একটা গান অমিতাভের দো ওর দো পাঁচ ছবির “তু নে অভি দেখা নাহিন”।
ড্রাইভওয়েতে গাড়ি পার্ক করে যখন দরজা খুলছে ঘড়িতে রাত ২:৪৫, ভাগ্গিস শনিবার রাত, না হলে কাল অফিস ছিল। ছেলে বৌ দুজনেই ইডিয়াতে অনেক করে যেতে বলেছিলো তখন যায়নি। এখন বন্ধুর জন্য যাচ্ছি বললে কুরুক্ষেত্র অনিবার্য । একটা বুদ্ধি বের করতে হবে ।
আর কোনো কথা নেই সোজা ফ্রীজে রাখা খিচুড়ি গরম করে খেতে লেগে গেলো । খুব খিদে পেয়েছে । নিজের বানানো চিকেন ভুনা খিচুড়ি ওর খুব প্রিয় । রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট পমের সেরা পাস টাইম । এ বিষয়ে ও নিজেই অবাক হয়ে যায়, রান্নাই জানতো না। মেসে রোজ বাসন মাজার হাত থেকে বাঁচতে আমেরিকায় এসে রান্না শেখা । আর আজ ডাটা সায়েন্টিস্টের সাথে সাথে একজন পাকা সেফ ।
আই ফোনে সানডে সাসপেন্স চালিয়ে ঘুমিয়ে যায় । ঘুমোনোর আগে থ্রিলার শোনা ওর অভ্যাস ।
(ক্রমশ)
*** কাল্পনিক গল্প বাস্তবের চরিত্র ***












