দুধ রুটি –
কলমে ড: ধীরেশ চৌধুরী,
বুড়োটা খাবার টেবিলে বসে বসে
এক মনে দুধে রুটি চুবিয়ে
চিবিয়ে চলেছে,
এক ভীষণ আমেজে
পরম তৃপ্তিতে,
এরই মাঝে
আয়ার চিৎকার করে হাঁক
শেষ হলো মেসোমশাই? আর কতক্ষণ?
কানে যতটুকু পৌঁছচ্ছে
তাতে বেশ বিরক্ত বুড়ো,
এই টুকু সময়ের এত টুকু খুশি থাকার
স্বাধীনতাতেও হস্তক্ষেপ!
এদিকে আবার বুড়িও আলাদা ঘরে,
খাবার শেষ করে বিড় বিড় করছে
কি জানি বাপু এত্ত সময় কেন লাগছে!
বুড়োটাকে কি তবে লক্ষ্মী বেশি রুটি আর দুধ দেয়…
প্রায় নব্বুই এ পড়া বুড়ো
খাটো শোনে, দেখেও কম,
আর বুড়িটা তো সেই কবে থেকে অন্য ঘরে,
যেটুকু সম্পর্ক সেতো লক্ষ্মী কে ঘিরে।
ছেলে মেয়ে দুটোও দেশের বাইরে
তাও প্রায় বছর তিরিশ গড়ালো,
ওদের চেহারা, গলার স্বর এমনকি মাঝে সাঝে
নামটাও বিস্মৃতিতে চলে যায়,
সেই লক্ষ্মী যে ভরসা তখন ওদেরকে মনে করিয়ে দেওয়ার,
ঠিক যেমনটা দিনে কখনও বা মাছ ভাত, কখনও সব্জি
আর রাতে ফিক্সড সেই দুধ রুটি…
অথচ যৌবনে কি দেমাক আর অহঙ্কারই না ছিলো বুড়োটার,
বুড়িরও কম ছিলো না মোটেও,
বাড়ি, গাড়ি, শাড়ি, গয়না, ফিক্সড ডিপোজিট
ফরিন ট্যুর আর
মাঝে সাঝেই ককটেল পার্টি,
আর ছিল
“টাকা মাটি, মাটি টাকা” বলা লোকটাকে পাগল ভাবা আর
দুধ রুটি খাওয়া তাচ্ছিল্যের বেশ কয়েকজন চাকর বাকর…
জীবনের প্রায় শেষ সীমায় এসে পৌঁছনো
বুড়ো আর বুড়ির এখন
ব্যাঙ্কে টাকা আছে, লকারে গয়না আছে,
আলমারিতে দামী শাড়ি ঝুলানো আছে,
ড্রয়িং রুমে কিছু দামী সুরার বোতল সাজানো আছে,
ফাইলে গর্বের ডিগ্রি গুলোর সার্টিফিকেট আছে,
গ্যারেজে ধুলোর আস্তরণ পড়ে যাওয়া গাড়িটা আছে,
নেই শুধু সেই দম্ভটা!
হ্যাঁ, আরও আছে বৈকি,
দুজনের পিল বাক্স তে বেশ কিছু ওষুধ আছে,
দুটো ঘরেই রামকৃষ্ণের ছবি আছে,
ছেলে-মেয়ে র পরিপূরক হিসেবে লক্ষ্মী আছে,
আর লক্ষ্মীর বানানো রাতে দুধ রুটি
খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাসটা আছে…
© ডাঃ ধীরেশ।
৬ই ফাল্গুন, ১৪৩১।
সম্প্রতি দুয়ারে ডাক্তারের ভূমিকায় এক বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে তাঁদেরকে দেখতে গিয়ে এই চিত্র আরও একবার চোখে পড়েছে। যদিও চিত্রটা একেবারেই নতুন কিছু নয়। সত্যিই এক পরম তৃপ্তিতে দুধ রুটি খাচ্ছিলেন বয়স্ক মানুষটি। আর তাঁকে তাড়া লাগাচ্ছিল আয়া মাসী, কারণ তার ডিউটির টাইম পেরিয়ে যেতে চলেছে, নাহলে ট্রেন মিস হয়ে যাবে। ওনাদের খাওয়া হয়ে গেলে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে তারপর বাড়ি যাবে আয়া মাসী। পরের দিন সকালে এসে আবার খুলবে। এর মধ্যে কিছু হলে কি হবে জানা নেই। কারণ রাতে কোন আয়া নেই। এই বৃদ্ধ দম্পতির এখন জীবন বলতে দিনে আর রাতে ওই খাবার টুকু সময়ে খেতে পাওয়ার নিশ্চয়তা। পুরোপুরিই প্রায় ওই মেয়েটির হাতে সমর্পিত। আর বাইরে থাকা ছেলে মেয়ের ফোনে খবর নেওয়া, মূলত আয়ার থেকেই। কারণ বুড়ো অর্ধেকের বেশী কথা শুনতে পায়না, বুড়ি শুনলেও অত বুঝতে পারেনা। এই হচ্ছে আধুনিক সমাজের এক্কেবারে বাস্তব চিত্র। এক বর্ণও মিথ্যা নয়, বানানো নয়…কিন্তু এর সমাধান কি জানা আছে আমাদের? সামর্থ্য থাকলে কি কমিউনিটি লিভিং – এর পরিপূরক! জানিনা…
বুড়ো বা বুড়ি শব্দ আমি ব্যক্তিগত ভাবে প্রয়োগ করতে পছন্দ করিনা। কিন্তু কবিতাটিকে বাস্তবোচিত করতে মনে হলো এটাই বেশি মানান সই লাগছে।
ফটো সুমন মুন্সী
লেখক পরিচিতি:

ড: ধীরেশ চৌধুরী, একজন স্বনামধন্য বয়স্ক রোগীদের বিশেষজ্ঞ। জেরিয়েটিক সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার অন্যতম স্তম্ভ। এছাড়া তিনি কবি, লেখক ও বাঁচবো নামে একটি সমাজ কল্যাণ সংস্থার প্রাণপুরুষ। সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলে তাঁরা প্রান্ত্বাসী শিশুদের স্কুল ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে থাকে। রামকৃষ্ণ মিশন এর সাথে মিলে নার্সিং ট্রেনিং দেবার অন্যতম সহযোগী সংস্থা।

















