Tuesday, September 22, 2026
WA
Home Bangla আমরা কি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে ঠিকভাবে চিনেছি?

আমরা কি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে ঠিকভাবে চিনেছি?

0
35

আমরা কি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে ঠিকভাবে চিনেছি?

সুরাজ পাল

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে আমরা কীভাবে চিনি? নারী জাগরণের অগ্রদূত, মুসলিম সমাজের অচলায়তন ভেঙে ফেলা শিক্ষাব্রতী, অথবা ‘অবরোধবাসিনী’র ক্ষুরধার লেখিকা হিসেবে। কিন্তু এই সমস্ত পরিচিতিই কি অখণ্ড রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে তুলে ধরতে সক্ষম? আমাদের খণ্ডিত পাঠ এবং সীমিত উপলব্ধি কি তাঁকে কেবল ‘মুসলিম নারীমুক্তি’র পরিসরেই আবদ্ধ করে রাখেনি? এই আংশিক পরিচয়ের পর্দা সরিয়ে রোকেয়ার সামগ্রিক সত্তা, তাঁর দেশপ্রেমিক ও সংস্কারক রূপটিকে যিনি সার্থকভাবে উন্মোচন করেছেন, তিনি হলেন প্রথিতযশা প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক সমাজসংস্কারক অনন্যসাধারণ প্রতিভা মীরাতুন নাহার। তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘সংস্কারপন্থী সাহিত্যস্রষ্টা রোকেয়া’ গ্রন্থটি রোকেয়া-পাঠের নতুন দিগন্ত। রোকেয়ার প্রথম ও প্রধান পরিচয় তিনি ‘সংস্কারপন্থী’, সাহিত্য তাঁর সেই সংস্কার সাধনের অস্ত্র মাত্র। সাহিত্য রচনার জন্য সাহিত্য সৃষ্টি তাঁর লক্ষ্য ছিল না; তাঁর লক্ষ্য ছিল পরাধীন, খণ্ড-বিখণ্ড, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভারতবর্ষের দেশগঠন ও দেশোন্নয়ন।

গ্রন্থের প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ‘সংস্কারপন্থী রোকেয়া’-তে মীরাতুন নাহার দশটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রোকেয়ার সংস্কার-ভাবনাকে বিশ্লেষণ করেছেন। লেখিকা দেখান, রোকেয়ার সমালোচনার কেন্দ্রে ছিল পরাধীন ভারতের মূল ব্যাধি: “রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় অন্তর্লীন ঐক্যঘাতী বিচ্ছিন্নতা”। এই বিচ্ছিন্নতারই নানা রূপ হল ‘লিঙ্গবৈষম্যজনিত অনৈক্য’, ‘বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী দেশবাসীর ধর্মান্ধতা’ এবং ‘হিন্দু দেশবাসীর ঔদাসীন্য ও অবহেলা’। লেখিকা বিশ্লেষণ করেছেন, রোকেয়া কতটা নির্মোহভাবে স্ব-সমাজের দুর্বলতাকেও চিহ্নিত করেছেন, যাকে তিনি বলছেন ‘বাঙালি মুসলমান সমাজের উন্নয়নবোধহীনতা’। একইসাথে তিনি বাঙালির ‘জাতিগত দৌর্বল্য’, অর্থাৎ তার শ্রমবিমুখতা, অলসতা ও আত্মমর্যাদাহীনতারও কঠোর সমালোচক ছিলেন। রোকেয়ার দৃষ্টি যে কতটা সুদূরপ্রসারী ছিল, তা স্পষ্ট হয় যখন লেখিকা বলেন, রোকেয়া ‘ভারতবাসীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক অসচেতনতা’ বা নারীদের ‘অলঙ্কার ও সাজসজ্জাপ্রীতি’র মতো বিষয়কেও জাতীয় অনগ্রসরতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই বিশ্লেষণ রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে বিচ্ছিন্ন নারী অধিকার কর্মীর স্তর থেকে উন্নীত করে রাষ্ট্রনৈতিক দ্রষ্টার স্তরে।

গ্রন্থের দ্বিতীয় বিভাগ, ‘সাহিত্যস্রষ্টা রোকেয়া’, প্রথম বিভাগের তাত্ত্বিক কাঠামোটিরই প্রায়োগিক প্রদর্শন। এখানে লেখিকা দেখিয়েছেন কীভাবে ওই দশ দফা সংস্কার-ভাবনা রোকেয়ার প্রবন্ধে, কবিতায়, উপন্যাসে ও কল্পকাহিনিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে। ‘প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ঔপন্যাসিক’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসের বিশ্লেষণটি অনবদ্য। লেখিকার মতে, এই উপন্যাসের ‘তারিণী ভবন’ কেবল একটি আশ্রম নয়, এটি রোকেয়ার স্বপ্নের ভারতবর্ষের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের ঊর্ধ্বে ‘মানুষ’ই একমাত্র পরিচয়। তারিণী ভবন প্রচলিত প্রতিষ্ঠানকে অস্বীকার করে; এখানে “গবর্নমেন্ট হইতে আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করা হয় না” পাছে স্বাধীনতা খর্ব হয়। এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা “বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাঁচে ঢালিয়া বিলাসিতার পুত্তলিকা গঠন” করে না, বরং ছাত্রীদের “আত্মনির্ভরশীলা” হতে শেখায়। এজন্য উপন্যাসের শেষে নায়িকা জয়নবের বিবাহ প্রত্যাখ্যান কোনও ব্যক্তিগত অভিমানের ফল নয়, তা ছিল প্রচলিত ‘বিবাহ’ নামক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক ঘোষণা, এই সত্য প্রতিষ্ঠা করা যে, “একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারীজন্মের চরম লক্ষ্য নহে; সংসার ধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে।“

‘নারীমুক্তিকামী নকশা স্রষ্টা’ নিবন্ধে মীরাতুন নাহার ‘অবরোধবাসিনী’র ভিন্নতর পাঠ দিয়েছেন। তিনি দেখান, রোকেয়া কেবল মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দেননি, তিনি তা করেছেন তীব্র শ্লেষাত্মক ও ‘সরস ভঙ্গিতে’। যখন রোকেয়া লেখেন, “কষ্ট সহ্য করিতে না পারিলে আর অবরোধবাসিনীর বাহাদুরী কি?” বা “জয়, অবরোধের জয়!”, তখন তা কান্নার নয়, বিদ্রোহের ভাষা। লেখিকা রোকেয়ার দুঃসাহসকেও কুর্নিশ জানিয়েছেন। ‘অবরোধবাসিনী’র নিবেদনে রোকেয়ার উক্তি—“যদি আমি দোজখের ভয়ে এবাদত করি তবে আমাকে দোজখে নিক্ষেপ কর…”। তবে গ্রন্থের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিশ্লেষণটি এসেছে রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ রচনার আলোচনায়। লেখিকা এখানে রোকেয়াকে দুটি বিরল পরিচয়ে ভূষিত করেছেন: ‘বিজ্ঞানপ্রেমী’ ও ‘ন্যায়তাত্ত্বিক স্বপ্নদ্রষ্টা’। তিনি লেখেন, রোকেয়ার ‘নারীস্থান’ কোনো জাদুবলে চলত না, তা চলত বিজ্ঞানের শক্তিতে। মেয়েরা সেখানে সৌরতাপে রান্না, কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টিপাত এবং ‘বায়ুযান’ (যা লেখার সময় রোকেয়া এরোপ্লেন দেখেননি ) আবিষ্কারের মাধ্যমে পুরুষের দৈহিক শক্তির অহংকারকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছিল। কিন্তু লেখকের চূড়ান্ত মুন্সিয়ানা ধরা পড়েছে ‘ন্যায়তাত্ত্বিক’ রোকেয়ার নির্মাণে। তিনি তাত্ত্বিক যুক্তিতে তুলে ধরেছেন, রোকেয়া এই রচনায় ভারতীয় ন্যায়দর্শনের ‘তর্ক’ পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের জন্য ‘জেনানা’র ব্যবস্থা করেছে। রোকেয়া এর ‘বিপরীত’ পরিস্থিতি কল্পনা করে পুরুষদের ‘মর্দানা’য় বন্দি করলেন। পুরুষরা এই ‘মর্দানা’র ধারণাকে ‘অসম্ভব’ ও অযৌক্তিক বলে মনে করবেন। ঠিক এই স্বীকৃতিটুকুর মাধ্যমেই রোকেয়া তাঁদের দিয়ে তর্ক পদ্ধতিতে মানিয়ে নিচ্ছেন যে, নারীদের ‘জেনানা’য় রাখাও ঠিক ততটাই অসম্ভব ও অযৌক্তিক ।

গ্রন্থটির প্রাঞ্জল ভাষা ও গভীর, মননশীল বিশ্লেষণের অপূর্ব মেলবন্ধন আকৃষ্ট করে। মীরাতুন নাহার নিজে দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপিকা, তাঁর গবেষণার গভীরতা ও যুক্তিবিন্যাস গ্রন্থের প্রতি পাতায় স্পষ্ট। বইটি রোকেয়ার খণ্ডিত পাঠকে বর্জন করে অখণ্ড, দেশপ্রেমিক, মানবতাবাদী ও দার্শনিক রোকেয়াকে আমাদের সামনে উপস্থিত করে। ‘ন্যায়তাত্ত্বিক রোকেয়া’র ধারণাটি রোকেয়া-গবেষণার জগতেও মৌলিক সংযোজন। লেখিকা নিজেই স্বীকার করেছেন, রোকেয়ার সংস্কারক ও সাহিত্যিক সত্তা দুটি ‘মিলে-মিশে একাকার’ হয়েছিল। ফলে গ্রন্থের দুটি ভাগে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও, প্রথমাংশের সংস্কার-ভাবনাগুলিই দ্বিতীয়াংশে ঘুরেফিরে এসেছে, যা হয়তো কোনও কোনও পাঠকের কাছে সামান্য পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হতে পারে। কিন্তু এই পুনরাবৃত্তিই এই গ্রন্থের শক্তি, কারণ এটিই প্রমাণ করে যে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতিটি সাহিত্যকর্ম তাঁর সংস্কার-ভাবনা থেকেই উৎসারিত। আজকের ধর্মীয় বিভাজন, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও ভয়াবহ নারী-নির্যাতনের যুগে দাঁড়িয়ে বইটির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। লেখিকা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, এক শতাব্দী পূর্বে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন যে ‘ঐক্যঘাতী বিচ্ছিন্নতা’কে দেশের প্রধান শত্রু ভেবেছিলেন, আমরা আজও সেই শত্রুর হাতেই বন্দি। রোকেয়া নারীমুক্তির যে লড়াই শুরু করেছিলেন, তা আজও অসমাপ্ত। রোকেয়াকে কেবল ‘মুসলমান সমাজ ও নারী-উন্নয়নকামী’ ভাবা এক বিরাট ‘ভ্রান্তিমোচন’। রোকেয়া মুসলমান নারীদের কাছে প্রথম পৌঁছেছিলেন কারণ, দেশের মেয়েদের মধ্যে ‘তারাই ছিল সর্বাপেক্ষা অনগ্রসর এবং রোকেয়ার অপেক্ষাকৃত নাগালের মধ্যে ছিল মুসলমান নারীসমাজ। ‘কিন্তু তাঁর ভাবনার বৃত্ত ‘সমগ্র দেশের উন্নয়ন বিষয়ক সমস্যাদি’ অধিকার করেছিল। এই গ্রন্থ প্রমাণ করে যে, রোকেয়া কেবল মুসলিম নারীদের নন, তিনি সমগ্র ভারতের লেখিকা ছিলেন। রোকেয়ার অখণ্ড রূপটিকে জানতে এবং তাঁর সংস্কার-ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা বুঝতে গেলে বইটি পড়তেই হবে।

সংস্কারপন্থী সাহিত্যস্রষ্টা রোকেয়া
মীরাতুন নাহার
প্রথম প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল, ২০২৫।
প্রকাশক: উদার আকাশ। ঠিকানা: ঘটকপুকুর, ভাঙড় গোবিন্দপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। যোগাযোগ: ৭০০৩৮২১২৯৮। মূল্য: ২৫০ টাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights