মেঠো পথের ধুলোয় আঁকা হারানো সময়ের ক্যানভাস
সুরাজ পাল
শহরের জীবন বড় জটিল। আমরা কেবল ছুটছি। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি তা ভাবার সময় নেই। নিশ্বাস ফেলার ফুরসতও নেই। অন্তহীন ইঁদুর দৌড়, দিনরাতের কোলাহলে মন যখন ক্লান্ত, তখন একপশলা বৃষ্টির মতো হাতে এল মো: আবেদ আলির লেখা ‘অন্য গাঁয়ের আখ্যান’। বইয়ের নাম ‘অন্য গাঁয়ের আখ্যান’ হলেও, এই গ্রাম আসলে আমাদের সকলের চেনা গ্রাম। আমাদেরই ফেলে-আসা ছেলেবেলা। আমাদেরই রক্তে মিশে থাকা চিরচেনা পল্লিজীবন। যেখানে আছে মাটির মানুষের সহজ জীবনপ্রবাহ। ‘উদার আকাশ’ থেকে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থটি আসলে বিস্মৃতির অতল থেকে তুলে আনা আমাদেরই শেকড়ের কথা। আজ থেকে পঞ্চাশ বা ষাট বছর আগে গ্রামের অর্থনীতি, সংস্কার, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন ছিল তার নিখুঁত ছবি এখানে পাওয়া যায়। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যুগে বইটি আমাদের শেখায় পারিবারিক বন্ধন, সততা এবং শেকড়ের প্রতি টানের গুরুত্ব।
বইটিতে আছে মোট আটটি গল্প। প্রতিটিই গ্রামবাংলার একেকটি খোলা জানালা। সেই জানলা দিয়ে আমরা দেখতে পাই গ্রামীণ সমাজের বিচিত্র সব রূপ। শুরুতেই ‘গ্রাম্য বধূর গল্প’। হাসির হুল্লোড়, অথচ কী গভীর মায়া! লালবাবু ও সাদাবাবু দুই ভাই। ওদিকে ছোটবউ পেটের অসুখে কাতর। কিন্তু ডাক্তারের কাছে স্বামীর নাম বা রোগের কথা—কোনোটাই মুখে আনতে পারছে না লজ্জায়। স্বামীর নাম সাদাবাবু, তাই সে বলছে “আগে দেখা দেলো আঙ্গা উনি” (সাদা আমাশা)। আর ভাশুরের নাম লালবাবু, তাই পরে বলছে “এখন দেখা দেছে ভাশুর” (লাল আমাশা)। গ্রাম্য নারীদের আজন্মলালিত সংস্কার ও আড়ালে লুকিয়ে থাকা সরলতাটুকু ছুঁয়ে যায় মন।
এরপরই আসে ‘মাদারের মা’ গল্পটি। গ্রন্থের অন্যতম শক্তিশালী রচনা। মাদারের মা সংগ্রামী বিধবা নারী। সন্তানদের মানুষ করতে কঠোর পরিশ্রম করে। কিন্তু গল্পের মোড় ঘুরে যায় অন্য জায়গায়। বেয়ানের পাল্লায় বায়োস্কোপ বা সিনেমা দেখতে গিয়ে বাধে বিপত্তি। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে গ্রাম্য সরলতার সংঘাত এখানে বেশ কৌতুকপ্রদ। সিনেমার পর্দায় আলো ও ধোঁয়া দেখে সে ভাবে আগুন লেগেছে! তার শিশুসুলভ বিস্ময় মুগ্ধ করে। এই ঘটনা বুঝিয়ে দেয় গ্রামের মানুষ কতটা সহজ-সরল। তবে লেখক কেবল হাসির গল্পই লেখেননি। সমাজ জীবনের অসঙ্গতিগুলোকে খুব নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। ‘বায়োডাটা’ গল্পটি তার প্রমাণ। গ্রামের বনেদি পরিবারের আদেল মাস্টার এবং তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত ব্যারিস্টার সাদাত মোল্লার বৈপরীত্য এখানে প্রকট। নাটু ঘটক যখন ব্যারিস্টারের মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়, তখন ব্যারিস্টারের কৃপণতা এবং আভিজাত্যের ভেক ধরা পড়ে যায়। ব্যারিস্টার সাহেবের বাড়িতে নাটু ঘটককে যে কাপে চা দেওয়া, তার বিশাল আকৃতির বিপরীতে ভেতরে চায়ের পরিমাণ দেখে নাটুর মনে যে ক্ষোভ জন্মায়, তা চিরকালীন শোষিত মানুষেরই অব্যক্ত যন্ত্রণা। শেষমেশ, আদেল মাস্টারের পরিবারের উচ্চশিক্ষা ও উদারতার কাছে ব্যারিস্টারের ‘বায়োডাটা’ চাওয়ার দম্ভটি যেভাবে চূর্ণ হয়, তা এক ধরনের তৃপ্তি এনে দেয়।
‘পাঁচু দালাল’ গল্পে দেখি গ্রামীণ অর্থনীতির আরেক রূপ। পাঁচু দালাল চরিত্রটি ধূর্ত। সে অসুস্থ বা অচল গোরুকেও কৌশলে বিক্রি করে দেয়। গোরুর লেজে সূচ ফুটিয়ে বা সোন্না দিয়ে খুঁচিয়ে তাকে চনমনে দেখানোর যে কৌশল পাঁচু অবলম্বন করে, তা নিষ্ঠুর হলেও জীবনসংগ্রামের রূঢ় বাস্তব। কিন্তু গল্পের শেষে সেই পাঁচুরই যখন নিজের ফাঁদে পা পড়ার উপক্রম হয়, তখন প্রকৃতির বিচার যেন নিঃশব্দে নেমে আসে। গ্রামের হাটে গোরু কেনাবেচার চালচিত্র এখনকার সাহিত্যে প্রায় বিরল। অন্যদিকে, ‘দিলবার ও কাজেম’ গল্পটি ভাইয়ে-ভাইয়ে সম্পর্ক, উত্থান-পতন এবং অকৃতজ্ঞতার ট্র্যাজিক আখ্যান। একই মায়ের পেটের দুই ভাই—দিলবার ও কাজেম। কাজেম শিক্ষিত হয়ে বড়সাহেব হয়, আর দীলবার পড়ে থাকে দারিদ্র্যের তিমিরে। কাজেমের বিত্তবৈভব তাকে এতটাই অন্ধ করে দেয় যে, সে তার মৃত্যুপথযাত্রী মাকেও দেখতে আসার সময় পায় না। সিঙ্গাপুর ভ্রমণের বিলাসিতা ও এসি গাড়ির ঠান্ডা বাতাসের ওপারে, মায়ের শেষ নিঃশ্বাসের আকুতি তাকে স্পর্শ করে না। অথচ, নিয়তির পরিহাসে কাজেমের করুণ মৃত্যু এবং তার বংশের প্রদীপ নিভে যাওয়ার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়—অহংকার পতনের মূল। শেষে দিলবারই যখন কাজেমের অনাথ কন্যাকে আশ্রয় দেয়, তখন গ্রামীণ উদারতা ও মানবিকতাই শ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণিত হয়।
‘সাতকড়ির স্বপ্নভঙ্গ’ গল্পটি অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের করুণ দলিল। পুত্রসন্তানের আশায় সাতকড়ি ও তার স্ত্রী আলো ভণ্ড সাধুর পাল্লায় পড়ে। সাধুর দেওয়া আশ্বাসে তাদের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় হয়, কিন্তু পুত্রসন্তানের বদলে পরপর দশটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। গরিব সাতকড়ির স্বপ্ন কীভাবে কুসংস্কারের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চুরমার হয়ে যায়, তার বর্ণনা চোখ ভিজিয়ে দেয়। এটি কেবল সাতকড়ির গল্প নয়, আজও ভারতের হাজারও অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের প্রতিচ্ছবি। ‘হোকাই চাচা’ গল্পে উঠে এসেছে জেনারেশন গ্যাপের কথা। হোকাই একজন সাধারণ চাষি। তার ছেলে ব্যবসায় উন্নতি করে বাবার শাসন ও গ্রামীণ নীতিবোধকে অবজ্ঞা করতে শুরু করে। হোকাই ছেলেকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য নাতি রমজানকে প্রখর রোদে দাঁড় করিয়ে রাখে। ছেলের কষ্ট দেখে সে ছেলেকে বোঝায়, “তোর ছেলের জন্য যদি তোর বুকটা জ্বালা করে, তাহলে তোর জন্য তো আমার প্রাণটা ওই রকম জ্বালা করে।” একটি সংলাপেই গল্পটি অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়।
সবশেষে রয়েছে, ‘আনার মাস্টার’। এটি কোনো গল্প নয়, স্মৃতিকথা, শ্রদ্ধাঞ্জলি। আলাকুইলি গ্রামের কাঁঠাল গাছের নীচে পাঠশালা চালানো শিক্ষক ১৯৫৩-৫৪ সালের দিনগুলোতে কীভাবে মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন, তা লেখক গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন। নামমাত্র বেতনে (মাসে এক টাকা বা দেড় টাকা) তিনি যে নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াতেন, আজকের যুগে তা অকল্পনীয়। শনিবারের পরীক্ষা, পড়া না পারলে বেতের বাড়ি, আবার ভালো করলে মুড়ি-মুড়কি খাওয়ানোর চিত্রগুলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সেই হারিয়ে যাওয়া সোনালি দিনগুলোকে মনে করিয়ে দেয়।
লেখকের ভাষা অত্যন্ত সাবলীল। কোনো কঠিন শব্দ নেই। নেই কোনো আড়ম্বর। বলার ভঙ্গিটিও বড় মায়াময়। যেন পাশের বাড়ির কেউ গল্প শোনাচ্ছেন। চরিত্ররা যে ভাষায় কথা বলে, লেখক সেই আঞ্চলিক ভাষাকেই পরম মমতায় ব্যবহার করেছেন। ফলে গল্পগুলো হয়ে উঠেছে জীবন্ত। সারফুদ্দিন আহমেদের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ বইয়ের মেজাজের সঙ্গে দারুণ মানানসই হয়েছে। যারা বলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্য থেকে গ্রামের গন্ধ হারিয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য বইটি জোরালো উত্তর। কিশোর থেকে বয়স্ক সর্বস্তরের মানুষ বইয়ের প্রতিটি গল্প অনুভব করতে পারবেন। জীবনের একঘেয়েমি দূর করতে, একবার জীবনকে জীবনের মতো করে চিনতে, বইটি সবার পড়া প্রয়োজন। ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গল থেকে মুক্তি পেতে চাইলে, মনের জানলা খুলে দিতে চাইলে, ‘অন্য গাঁয়ের আখ্যান’ হতে পারে আপনার বিশ্বস্ত সঙ্গী।
অন্য গাঁয়ের আখ্যান। মো: আবেদ আলি। প্রকাশক: উদার আকাশ। ঠিকানা: ঘটকপুকুর, ভাঙড়, গোবিন্দপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। যোগাযোগ: +৯১ ৭০০৩৮২১২৯৮। মূল্য: ৭০ টাকা।


















