শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী, বাংলাদেশের উদ্বেগ
অমিত গোস্বামী
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার আগে ও পরে বাংলাদেশের মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের মারফৎ জানতে পারলাম যে সেখানকার নাগরিকরা বিজেপি এই সুনামি ফল করায় বেশ দুঃখিত এবং শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় বেশ চিন্তিত। তাদের মনে কিছু উদ্বেগপ্রসূত প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে আমি সে’দেশের টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়েছি (আপলোড করা আছে) ও প্রশ্ন শুনে খুবই অবাক হয়েছি। আরো অনেক প্রশ্ন আমায় করা হয়েছে। সবগুলির উত্তর আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
১) পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কোন প্রভাব পড়বে কি?
উত্তরঃ ভারতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি গর্বিত রাজ্য। এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুধুমাত্র এই রাজ্যের স্বার্থবিরোধী কোন কাজ যদি বাংলাদেশ করে যেমন সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়া, সীমান্ত চোরাচালান তাহলে মুখ্যমন্ত্রী অবশ্যই কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক চাপ দেবেন এবং কোন দোষী ধরা পড়লে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।
২) ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক (ওরা বলে পুশ ইন) হবে কিনা?
উত্তরঃ এখানে দুটি শব্দ খেয়াল করুন – শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারী। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে যারা বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রশাসনিক অনুমতি সাপেক্ষে আশ্রয় নিয়েছেন তারা শরণার্থী। কিন্তু যারা অর্থনৈতিক কারণে বিনা অনুমতিতে ভারতে এসে রুজি-রোজগার করছেন তারা অনুপ্রবেশকারী। শরণার্থীদের এদেশে থাকার কিছু শর্ত আছে, সে’গুলি পূরণ করলে তাদের থাকার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। কিন্তু অনুপ্রবেশকারী? নৈব নৈব চ। সোজা ঘাড়ধাক্কা। তবে আর খুব বেশি তারা নেই। এসআইআর-এর গুঁতোয় তাদের বড় অংশ আগেই চলে গেছে।
৩) ২০২৪ এর ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পরে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পক্ষে কথা বলেছিলেন, কাজেই মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সাথে কেমন সম্পর্ক রাখবেন?
উত্তরঃ শেখ হাসিনাকে মুখ্যমন্ত্রী কেন সব ভারতীয়রা মনে করেন যে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে যেভাবে নির্বাসিত করা হয়েছে তা অগনতান্ত্রিক। তিনি আমাদের অতি সম্মানীয় অতিথি। সেই সম্মান ও সহযোগিতা ভারত সরকার করছেন। ভারত অন্য কোন রাস্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলায় না। কাজেই বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়েও নাক গলাবে না। তবে… তবে শেখ হাসিনা তার ব্যক্তিত্ব দিয়ে, ক্যারিশমা দিয়ে, সম্পর্কের জোরে যে সুবিধা বাংলাদেশের পক্ষে আদায় করেছিলেন, সেটার সমাধি ঘটেছে বহু আগে।
৪) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা জল বন্টন রুখে দিয়েছিলেন। এদিকে এ’বছরের শেষে গঙ্গাচুক্তি নবীকরণের সময়। ভারত কি বাংলাদেশকে ন্যায্য জল দেবে?
উত্তরঃ প্রথমেই প্রশ্ন হল ‘ন্যায্য’ মানে কি? আগের কাহিনীর অবতারনা করে লাভ নেই। এখন তিস্তা বাঁধের মুখে জল আসে ১০০ কিউসেক। তাতে বন্টন হয় না। চুক্তি হওয়ার কথা যখন ছিল তখন আসত ১৬০০ কিউসেক। তিস্তা এখন অববাহিকা বা ঢালের জলে চলে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে এই অববাহিকার জল ধরে রাখার আধার তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন। সেটা ভারত থেকে নেওয়া ২ বিলিয়ন ডলার দীর্ঘমেয়াদী স্বল্পসুদের ঋণ নিয়ে। ইউনুস সরকার সেই চুক্তি বাতিল করেছেন। কাজেই দায়িত্ব এখন বাংলাদেশ সরকারের।
গঙ্গাচুক্তিতে বাংলাদেশকে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে খরা মরশুমে ৪০০০০ কিউসেক জল দেওয়ার কথা ছিল। ২৫ বছর আগের চুক্তি। ইতিমধ্যে জলপ্রবাহ অনেক কমে গেছে। তবু ভারত শেখ হাসিনার আমলে ৩২০০০ থেকে ৩৮০০০ কিউসেক পলিবিহীন জল খরা মরশুমে দিয়েছে। বাংলাদেশ সমমর্যাদা চেয়েছিল। যদিও তারা আন্তর্জাতিক নদী আইনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, তবুও এবারে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা পঞ্চাশ পঞ্চাশ ভাগে। তবে পলিসহ। এটাই আন্তর্জাতিক আইন। এতে বাংলাদেশের ড্রেজিংয়ের খরচ বাড়বে।
৫) সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে কি?
উত্তরঃ আন্তর্জাতিক সীমান্ত লঙ্ঘন করা আন্তর্জাতিক অপরাধ। মেক্সিকো সীমান্তে আমেরিকাও গুলি চালায়। বরং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী খুব কমই চালায়। এতদিন বিএসএফ-কে টহলদারিত্বের জন্যে জমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেন নি। নতুন মুখ্যমন্ত্রী দু’একদিনের মধ্যেই দেবেন। ভারত সীমান্ত জুড়ে ‘স্মার্ট ফেন্সিং’ বসাবে। সেই অবকাঠামো স্থাপনে বাধা আসলে ও বসানোর পরে তার ক্ষতি করা হলে (সীমান্ত পারাপারের জন্যে) অতি অবশ্যই যথোপযুক্ত ব্যবস্থা সীমান্ত রক্ষীরা নেবেন।
৬) ভিসা দেওয়া শুরু হলে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উন্নতি হবে কি?
উত্তরঃ কিছু যাওয়া আসা বাড়লেও ২০১৪ থেকে ২০২৪ এর মত স্বর্ণসময় ফিরবে বলে আমার মনে হয় না। তার কারন এপারের সাংস্কৃতিক আমজনগনের বাংলাদেশ সম্পর্কে মোহভঙ্গ হয়েছে। ৩২ ধানমন্ডি নেই, কাজী নজরুলের পাশে সন্ত্রাসী হাদীর কবর, মুক্তিযোদ্ধা যাদুঘর ক্ষতবিক্ষত। পরিচিত কবি সাহিত্যিকরা অন্তরালে। কিসের টানে যাবে এপারের সংস্কৃতিমনা মানুষ। পারস্পরিক বিশ্বাসটাই তো ভেঙে গেছে। বাংলাদেশের বই আসছে না, বই যাচ্ছে না। শুধু সোশাল মিডিয়া রীলস ও তাতে মিথ্যে উস্মার উদ্গার।
পরিশেষে একটা কথা স্পষ্ট বলি যে এবারে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র পর্বতসম বিজয়ে বাংলাদেশের বিরাট ভূমিকা আছে। এত বছর অসাম্প্রদায়িকতার দায় ছিল সনাতনীদের। কিন্তু হাসিনা উত্তর সময়ে যে ভারতবিরোধী কার্যকলাপ ও হিন্দু নির্যাতনের ছবি আমরা দেখেছি তা এখানে সনাতনীদের সংহত করেছে। এই সংহতি সৃষ্টিতে সরাসরি ভূমিকা নেওয়ায় বাংলাদেশের কাছে এপারের বাঙালিরা কৃতজ্ঞ।














