বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি চলুক কালচারাল ন্যাশনালিজমের পথে
অমিত গোস্বামী
বাংলা সাংস্কৃতিক জগতে হিন্দুত্ববাদ তথা কালচারাল ন্যাশনালিজম নিয়ে সোচ্চার মানুষজনের সংখ্যা ছিল বড় কম। ‘তুমি বিজেপি’, ‘তুমি চাড্ডি’ কথাগুলি কানে বাজে বারবার। আমরা কবিতা অ্যাকাডেমি’র কবিতা উৎসবে অনুচর ও প্রসাদধন্যদের দাপাদাপি, বিভিন্ন পুরস্কার প্রদাণে সেই বিদুষকদের আর্থিক ও শংসাপত্র দান যেমন দেখেছি, তেমনই দেখেছি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলা অ্যাকাডেমি পুরস্কার দেওয়া, তাকেই সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার দেওয়ার তীব্র চেষ্টা। হিন্দু দেব-দেবী নিয়ে কটাক্ষ, সনাতনী অনুভুতিতে আঘাত করে প্রকাশ্যে গো-মাংস খেয়ে প্রতিবাদ দেখেছি। পুরোটাই ছিল সিউডো সেক্যুলারিজমের ন্যারেটিভ। ‘হিন্দুত্ববাদ’কে কথায় কথায় অস্পৃশ্য প্রমাণ করার সোচ্চার বিজ্ঞাপন।
আগে দেখা যাক পশ্চিমবঙ্গের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের চালচিত্র। পশ্চিমবঙ্গের এই দপ্তরের অধীনে আছে ১৮ টি অ্যাকাডেমি। বাংলা অ্যাকাডেমি, কবিতা অ্যাকাডেমি, নাট্য অ্যাকাডেমি, সঙ্গীত অ্যাকাডেমি, যাত্রা অ্যাকাডেমি, লোক ও জনজাতি সংস্কৃতি সেন্টার, বাউল অ্যাকাডেমি (জয়দেব, বীরভূম), শিশু কিশোর অ্যাকাডেমি, কাজী নজরুল অ্যাকাডেমি, চারুকলা পর্ষদ, দলিত সাহিত্য অ্যাকাডেমি, রাজবংশী ভাষা অ্যাকাডেমি, হিন্দি অ্যাকাডেমি, মানভূম সাংস্কৃতিক অ্যাকাডেমি, নৃত্য অ্যাকাডেমি, কামতাপুরী ভাষা অ্যাকাডেমি, বিরসা-মুন্ডা অ্যাকাডেমি ও মিনার্ভা নাট্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র।
কেন এত অ্যাকাডেমি সৃষ্টি হয়েছে গত সরকারের আমলে? স্রেফ কলাচর্চাকারীদের অনুগৃহীত প্রসাদভোগী চামচে বানানোর জন্যে। প্রত্যেক অ্যাকাডেমির চেয়ারম্যানরা বিভিন্ন অনুগ্রহ লাভ করে যাতে রসে-বশে থাকেন তার ব্যবস্থা। বাংলা অ্যাকাডেমি ছিল, তারপরে হল কবিতা অ্যাকাডেমি, কাজী নজরুল অ্যাকাডেমি, দলিত সাহিত্য অ্যাকাডেমি। এদের প্রধানদের নাম মনে করুন, বুঝবেন কোথাকার তরবারি কোথায় রাখা হয়েছে। অ্যাকাডেমিগুলি গত পনের বছরে ‘ ক্যা-ক্যা-ছি-ছি ও আপনি দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী বলা ছাড়া কী করেছে?
এবার আসা যাক পুরস্কারে। পশ্চিমবঙ্গের তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর প্রতি বছর ৩০ টি পুরস্কার দেয়। বাংলা সাহিত্যে পুরস্কার দেখা যাক ক’টি। বাংলা অ্যাকাডেমি – ৩ (নজরুল, বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর), কবিতা অ্যাকাডেমি – ৫ (সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, কাজী সব্যসাচী, নীলাদ্রি শেখর ও আবুল কাসেম রহিমুদ্দিন), শিশু কিশোর অ্যাকাডেমি – ২ (উপেন্দ্র কিশোর ও বিদ্যাসাগর), দলিত সাহিত্য অ্যাকাডেমি – ০। এছাড়া চালু হয়েছে দু’বছর অন্তর বাংলা অ্যাকাডেমি পুরস্কার যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে আপাতত স্তব্ধ। অন্য কলাচর্চা বাদ দিলাম আপাতত, কিন্তু বাংলা সাহিত্যে এই ১০ বা ১১ টি পুরস্কার কারা পেয়েছেন? কেন পেয়েছেন? কারা বিচারক ছিলেন? খোঁজ নিন, দেখবেন পুরোটাই প্রসাদবন্টন।
সম্প্রতি লক্ষ্য করছি যে এইসব অ্যাকাডেমিগুলিতে প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্যে পূর্বের সিউডো সেক্যুলাররা গৈরিক রঙ মাখামাখি করে নিজেদের ‘আমি তোমাদেরই লোক’ বিজ্ঞাপন করার চেষ্টায় মরীয়া। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ এই প্রশ্নগুলি তুলছেন না তা হল –
১) কবিতা অ্যাকাডেমি, দলিত সাহিত্য অ্যাকাডেমি ও শিশু কিশোর অ্যাকাডেমি বাংলা অ্যাকাডেমির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে না কেন?
২) কবিতা উৎসব বা লিটল ম্যাগাজিন মেলা কেন কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, মালদা, মুর্শিদাবাদ, মেদিনীপুরে হবে না?
৩) এই উৎসবগুলিতে দিনের পর দিন যোগ্যদের বঞ্চিত রাখা হবে? অংশগ্রহণকারীদের ন্যুনতম যোগ্যতামান কেন নির্ধারিত হবে না?
৪) পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা কেন আসবে না?
৫) গোর্খালি ভাষা অ্যাকাডেমি কেন দার্জিলিং-এ প্রতিষ্ঠিত হবে না?
৬) ভাষা ভিত্তিক বিভেদ গুঁড়িয়ে কীভাবে আমরা সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে মিশব?
৭) সাহিত্য অ্যাকাডেমিতে প্রতিনিধি পাঠায় রাজ্য সরকার। সেখানে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধাচারীদের আর যেন পাঠানো না হয়।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার পরে জোড়াসাঁকোয় গিয়ে বলেছেন যে বাঙালির সংস্কৃতিকে শেষ করা হয়েছে গত পনেরো বছরে। বিজেপি রাজ্য সভাপতি আগেই বলেছেন যে বাংলায় সিউডো সেক্যুলারিজম নয়, বাংলা চলবে কালচারাল ন্যাশনালিজমের ভিত্তিতে। কাজেই আমাদের সাংস্কৃতিক পুনর্বিন্যাস হওয়া প্রয়োজন কালচারাল ন্যাশনালিজমের পথে। আর এই বিষয়ে পূর্বতন সরকারের চেয়ে বর্তমান কান্ডারীরা অনেক বেশি সুচিন্তক। কাজেই গৈরিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রত্যাশা করতে দোষ কোথায়?














