পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বাজেট পুরো মেসির হ্যাট্রিক
অমিত গোস্বামী
রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের এক ধাক্কায় ২০% বেতনবৃদ্ধিঃ
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাজেট পেশ হল ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের। আমি অর্থনীতিবিদ নই। কিন্তু এই বাজেটে কোথাও আমি ‘অতি চালাকি’র নিদর্শণ দেখতে পাইনি। সোজাসুজি সহজবোধ্য বাজেট। প্রথমেই আসি যে ইস্যু নিয়ে রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা দীর্ঘদিন লড়াই করছেন। তা হল মহার্ঘ ভাতা বা DA বৃদ্ধি। এই ভাতা হল মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলার জন্য সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের দেওয়া অতিরিক্ত ভাতা। এটি কর্মচারীর মূল বেতনের (Basic Pay) নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে গণনা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার রাজ্য সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের জন্য মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) ২০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা করেছে। ফলে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মোট ডিএ বেড়ে ৩৮ শতাংশ হবে। নতুন ডিএ হার আগামী ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ কোনও কর্মচারীর মূল বেতন যদি ৪০,০০০ টাকা হয়, তাহলে ডিএ বৃদ্ধির ফলে তিনি মাসে প্রায় ৮,০০০ টাকা অতিরিক্ত পেতে পারেন। বছরে এই অতিরিক্ত আয়ের পরিমাণ প্রায় ৯৬,০০০ টাকা হতে পারে (কর কাটার আগে)। ডিএ বৃদ্ধির সুবিধা পেনশনভোগীরাও পাবেন। তাঁদের ক্ষেত্রে এটি ডিয়ারনেস রিলিফ (DR) হিসেবে কার্যকর হবে। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের সাথে তবু পার্থক্য থাকছে ২২ শতাংশ। সেটা আগামী বাজেটের মধ্যে মেক আপ করে দেওয়া হবে। তবু নাক উঁচু কিছু মেকো বলছেন যে “২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি করা হয়েছে ঠিকই। তবে এটা অল ইন্ডিয়া কনজ়িউমার প্রাইস ইনডেক্স (এআইসিপিআই) অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটা দেখতে হবে।“ বুঝুন! এতদিন ৩ বা ৪% ডিএ দিয়ে ১৮ শতাংশে পৌঁছন রাজকর্মচারীদের ২০% একধাক্কায় বাড়ল। “ঘেউঘেউ করবেন না” শুনতে হল না। তারপরেও কেউ খুশি না হলে তিনি কোষ্ঠকাঠিন্যের রুগী তা নিশ্চিত।
১ লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগঃ
এরপরের ঘোষণা ১ লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগ। নতুন নিয়োগের ৩৩ শতাংশ পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। সরকারি চাকরিতে যত নিয়োগ হবে, তার অর্ধেকই শিক্ষাক্ষেত্রে। ২০ হাজার পুলিশ বিভাগে। বাকি ৩০ হাজার অন্য সরকারি দফতরে বিয়োগ পাবেন এবং ১০ শতাংশ পদ অগ্নিবীরদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সের ঊর্ধ্বসীমায় ইতিমধ্যে ৫ বছর ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ বার এই বয়সের ঊর্ধ্বসীমায় ছাড়ের সুবিধা পরবর্তী দু’বছরের জন্য বহাল থাকবে।
ভাতা বৃদ্ধিঃ
অঙ্গনওয়াড়ি আশাকর্মীদের ৫০০০ টাকা, সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রীন পুলিশ, এনভিএফ, প্রাণিবন্ধু, প্রাণিমিত্রদের ২০০০ টাকা বেতন বৃদ্ধি। বয়স্ক, বিধবা ও বিশেষভাবে সক্ষমদের ৫০০ টাকা ভাতা বৃদ্ধি। অন্নপূর্ণা যোজনায় ৩০০০ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এগুলি সামাজিক উন্নয়নের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
ভারসাম্যের বাজেটঃ
এবারের বাজেটে বাজেটে সেবা, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এই পাঁচ বিভাগই গুরুত্ব পেয়েছে। কীভাবে দেখা যাক।
১) এই রাজ্যে যাঁরা সেবা দান করেন, আংশিক সময়ের চুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত, সর্বোপরি সরকারি সিদ্ধান্ত নীতি কার্যকর করতে যে সরকারি কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তাদের ভাতা ও কাজের শর্ত চাপমুক্ত করা হয়েছে।
২) রাজ্যে শিল্পের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে আইনশৃঙ্খলা সুদৃঢ় করে, চাঁদাবাজি, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট বন্ধ করে, ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ ব্যবস্থার মাধ্যমে শিল্প, ব্যবসার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হবে রাজ্যে। ১০০ কোটি টাকার বেশি যাঁরা বিনিয়োগ করবেন, তাঁদের পঞ্চায়েত বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে না। স্থানীয় স্তরে হয়রানির শিকার থেকে মুক্তি পাবেন। আগের সরকার যে ‘ইনসেনটিভ’ ব্যবস্থা তুলে দিয়েছিল, এই সরকার তা ফিরিয়েছে এনেছে। ৫০০০ কোটি টাকার প্রভিশন রাখা হয়েছে। ব্যবসা, ভর্তুকি সংক্রান্ত ট্রেনিং নিয়ে যাঁরা নিজের ব্যবসা করতে চান, তাঁদের দায়িত্ব অনেকটাই নিয়েছে রাজ্য।
৩) কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ২ টাকা করে ছাড় দেবে সরকার। এ জন্য ৮০০ কোটি টাকা খরচ হবে রাজ্য সরকারের। আলুচাষি, ধানচাষিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। যেমন ধানের সহায়ক মূল্য ২০০ টাকা প্রতি কুইন্টল বাড়ানো হয়েছে। আলুচাষীদের সহায়তা, হিমঘর, বীজ আলুর ব্যবস্থা করা হবে।
৪) স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে স্পেশালিটি হাসপাতাল সত্যিকারের বিশেষ চিকিৎসা দিতে পাড়ে সেটা নিশ্চিত করা হয়েছে। রুগীদের তিনবেলা খাবারের বরাদ্দ ছিল ৫৬ টাকা, সেটা বাড়িয়ে করা হল।
৫) রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে করপাস ফান্ড দেওয়া হবে শিক্ষা বিস্তারের জন্যে। মিড ডে মিল ছিল ৫.৪৪ পয়সা, বেড়ে হল ১০.০০ টাকা। শুধু তাই নয়, ইস্কনকে মিডডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নাহ, সে;জন্যে হরেকৃষ্ণ বলতে হবে না। কিন্তু শুদ্ধ খাবার পাবে বাচ্চারা।
নো ‘ঋণং কৃত্বা’ঃ
এই বাজেটে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কথা বলা নেই। অতিরিক্ত ঘাটতিও নেই। সামান্য এক-দু’কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। প্রায় দশ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ রেখে গেছে আগের সরকার। তাহলে আয় আসবে কোথা থেকে? নিন্দুকেরা প্রশ্ন তুলবেন, জানি। স্রেফ চুরি আটকে প্রাপ্য শুল্ক রাজকোষে জমা পড়বে। তাতেই রাজ্যের আয় অন্তত দ্বিগুণ হবে। দুটি জায়গা নিয়ে আমি উল্লেখ করতে উৎসাহী। তা হল –
দুটি ক্ষেত্র নতুন দিশার প্রতিশ্রুতিঃ
১) উত্তরবঙ্গ উন্নয়নঃ এবার উত্তরবঙ্গবাসী পাচ্ছে এমস, আইআইটি, আইআইএম থেকে শুরু করে নতুন বিমানবন্দরও। পূর্বতন সরকারের অন্তর্বর্তী বাজেটে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল ৯২০.১৩ কোটি টাকা। নতুন সরকার চলতি অর্থবর্ষে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে বরাদ্দ করেছে ১,৮২১.৫২ কোটি টাকা। উত্তরবঙ্গে ক্যানসার হাসপাতাল তৈরির কথা বলা ছিল বিজেপির ‘সংকল্পপত্রে’। সেটা হচ্ছে। কোচবিহারের তুফানগঞ্জে তৈরি হবে মহিলা কলেজ। দার্জিলিঙে তৈরি হবে একটি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং ট্রমা সেন্টার। আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে মেডিক্যাল কলেজ তৈরির কথাও বলা হয়েছে বাজেটে। উত্তরবঙ্গের চা শিল্পকে চাঙ্গা করতে শিলিগুড়িতে একটি কমন টি প্রসেসিং সেন্টার তৈরি হবে। এর জন্য চলতি অর্থবর্ষে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে বাজেটে। সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ উন্নত করে শিলিগুড়িকে একটি লজিস্টিক এবং ব্যবসাকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। এই কাজের জন্য চলতি অর্থবর্ষে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। শিলিগুড়ির আইটি পার্কের উন্নয়নের জন্য ২৬ কোটি টাকা খরচ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
২) তথ্য সংস্কৃতি বাজেটঃ গত সরকারের বাজেট ছিল ৯৯০.২৭ কোটি টাকা। আজ বাজেট করা হল ৮০৫.০৪ কোটি টাকা। তাহলে কি বর্তমান সরকার সংস্কৃতির ওপরে মনোযোগ কমিয়ে দিলেন? একেবারেই নয়। ৮ অ্যাকাডেমি থেকে ১৮ অ্যাকাডেমি বানানো, প্রসাদভোগীদের আর্থিক বদান্যতা। খেলা, মেলা, উৎসব, মচ্ছবের নামে কাটমানির ঝড় আমরা দেখেছি। সেগুলো বন্ধ হবে। বরং জোর দেওয়া হবে পশ্চিমবঙ্গব্যাপী রাস্ট্রবাদী সাংস্কৃতিক চর্চায় এবং তা রাজ্য জুড়ে। কলকাতাকেন্দ্রিক সবকিছু হবে না।
বদহজমের উদ্গার তোলার আগে ভাবুনঃ
সবশেষে একটি বাক্য বলতে খুবই ইচ্ছে করছে তা হল প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তির অঙ্ক বড় হয়ে গেলে অনেক সময়ই হজম হয় না। তাই অনুরোধ বদহজমের উদ্গার তোলার আগে ভাবুন আপনি দায়িত্বে থাকলে এর চেয়ে ভাল বাজেট তৈরি করতে পারতেন? তুলনা করুন গত বাম জমানা ও তৃণমূল জমানার বাজেটের সাথে। একটাও বাজেট এই বাজেটের চেয়ে বেশি উন্নয়ণ দেখাতে পেরেছে কি সার্বিকভাবে?












