ট্রফি সফর শেষ, ১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপকে ঘিরে ফুটবল জ্বরে মাততে প্রস্তুত কলকাতা
অন্তরা ত্রিপাঠী | আইবিজি নিউজ বাংলা
কলকাতা, ২২ জুলাই: এশিয়ার প্রাচীনতম ফুটবল প্রতিযোগিতা ১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপ-এর ঐতিহ্যবাহী ট্রফিগুলিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানাল তিলোত্তমা কলকাতা। পাঁচটি আয়োজক রাজ্য ঘুরে ট্রফি সফর সফলভাবে শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে গেল ঐতিহাসিক এই টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত কাউন্টডাউন। আগামী ২৫ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে প্রতিযোগিতা, আর আগের মতোই এবারেরও প্রধান আয়োজক শহর কলকাতা।
কলকাতার এওআই বিজয় দুর্গে (AOI Vijay Durg) আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হয় ডুরান্ড কাপের তিনটি ঐতিহ্যবাহী ট্রফি—ডুরান্ড কাপ ট্রফি, প্রেসিডেন্টস কাপ এবং সিমলা ট্রফি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফুটবলপ্রেমী, বিশিষ্ট নাগরিক, সেনা ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিক এবং ক্রীড়াজগতের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুবকল্যাণ ও ক্রীড়া এবং ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ড. ইন্দ্রনীল খান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল গম্ভীর সিং, পূর্বাঞ্চলীয় সেনা কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ ও ডুরান্ড কাপ আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান, রাজেশ পান্ডে, অতিরিক্ত মুখ্যসচিব, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং মেজর জেনারেল দিনেশ কুমার সিং, বেঙ্গল সাব এরিয়ার জিওসি ও ডুরান্ড কাপ আয়োজক কমিটির সহ-সভাপতি সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি।
কলকাতায় হবে ১৬টি ম্যাচ
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ড. ইন্দ্রনীল খান বলেন, এবারের ডুরান্ড কাপে উদ্বোধনী ম্যাচ ও ফাইনালসহ মোট ১৬টি ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ পাওয়া পশ্চিমবঙ্গের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।
তিনি রাজ্যের ফুটবলপ্রেমীদের আহ্বান জানান, টুর্নামেন্টের প্রথম দিন থেকে ফাইনাল পর্যন্ত স্টেডিয়াম ভরিয়ে ভারতীয় ফুটবলারদের উৎসাহিত করতে। ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে যেমন ভারতীয় সমর্থকরা বিশ্বের বিভিন্ন ক্লাবকে সমর্থন করেছিলেন, তেমনি এবার দেশের ফুটবল ও ভারতীয় ফুটবলারদের পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানান তিনি।
ঐতিহ্যের উদযাপন
অনুষ্ঠানে ডুরান্ড কাপের ১৮৮৮ সাল থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে একটি অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা প্রদর্শিত হয়। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ভবনে ট্রফি উন্মোচনের বিশেষ ভিডিওও দেখানো হয়। অনুষ্ঠানে বলিউড অভিনেতা জন আব্রাহাম-এর একটি শুভেচ্ছা বার্তাও সম্প্রচারিত হয়।
এরপর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিনিধিদের সংবর্ধনা জানানো হয় এবং স্বাগত ভাষণ দেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল গম্ভীর সিং।
তিনি বলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে ডুরান্ড কাপ শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়, বরং সেনা ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ২০১৯ সালে কলকাতায় ডুরান্ড কাপের পুনরুজ্জীবনের পর থেকেই এই শহর আবারও টুর্নামেন্টের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ট্রফি সফরে দেশজুড়ে ফুটবল উন্মাদনা
দুই সপ্তাহব্যাপী ট্রফি সফর পাঁচটি আয়োজক রাজ্য ঘুরে কলকাতায় শেষ হয়। এই সফরের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ডুরান্ড কাপকে ঘিরে উৎসাহ ও আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অতিরিক্ত মুখ্যসচিব রাজেশ পান্ডে বলেন, ভারতের খুব কম ক্রীড়া প্রতিযোগিতাই ডুরান্ড কাপের মতো এত সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের দাবিদার। কলকাতা ডার্বি দিয়ে টুর্নামেন্টের সূচনা হওয়ায় ফুটবলপ্রেমীদের উৎসাহ আরও বেড়েছে। তিনি এই ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতা সফল করতে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূর্ণ সমর্থনের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
২০৩২ সাল পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলীয় সেনা কমান্ডের তত্ত্বাবধানে ডুরান্ড কাপ
মেজর জেনারেল দিনেশ কুমার সিং জানান, ২০৩২ সাল পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলীয় সেনা কমান্ডের তত্ত্বাবধানে ডুরান্ড কাপ আয়োজনের মেয়াদ বৃদ্ধি টুর্নামেন্টটির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও সাফল্যেরই স্বীকৃতি।
তিনি বলেন, আগামী দিনে আরও নতুন শহরে ডুরান্ড কাপ নিয়ে যাওয়া, তরুণ ফুটবলারদের সুযোগ বাড়ানো এবং ভারতীয় ফুটবলকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই আয়োজকরা কাজ করে চলেছেন।
কলকাতা ডার্বি দিয়েই শুরু
আগামী ২৫ জুলাই ঐতিহাসিক বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা দ্বৈরথ মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট বনাম ইস্টবেঙ্গল এফসি-র ম্যাচের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপ।
কলকাতায় অনুষ্ঠিত হবে উদ্বোধনী ম্যাচ, গ্রুপ ‘এ’ ও গ্রুপ ‘বি’-র সমস্ত ম্যাচ, একটি কোয়ার্টার ফাইনাল, একটি সেমিফাইনাল এবং ২৩ আগস্টের ফাইনাল।
গ্রুপ ‘এ’-তে রয়েছে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট, ইস্টবেঙ্গল এফসি, সাউথ ইউনাইটেড এফসি এবং সিআইএসএফ প্রোটেক্টর্স।
গ্রুপ ‘বি’-তে রয়েছে মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ইন্ডিয়ান আর্মি ফুটবল টিম, বাঘপত এফসি এবং সমলেশ্বরী স্পোর্টিং।
এশিয়ার প্রাচীনতম, বিশ্বের তৃতীয় প্রাচীনতম ফুটবল প্রতিযোগিতা
ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড তিন বাহিনীর পক্ষে এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। ১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ডুরান্ড কাপ আজও বিশ্বের তৃতীয় প্রাচীনতম জীবিত ফুটবল টুর্নামেন্ট এবং এশিয়ার প্রাচীনতম ফুটবল প্রতিযোগিতা হিসেবে নিজের ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।
২৫ জুলাই থেকে ২৩ আগস্ট, ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য ১৩৫তম ডুরান্ড কাপে অংশ নেবে ২৪টি দল, যার মধ্যে শ্রীলঙ্কা সশস্ত্র বাহিনীর একটি দলও রয়েছে। কলকাতা, রাঁচি, গুয়াহাটি, শিলং এবং ইম্ফল—এই পাঁচটি শহরে মোট ৪৩টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।
ট্রফি সফর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ফুটবল উৎসবের মঞ্চ প্রস্তুত। আর সেই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে আবারও রয়েছে ফুটবলপ্রেমের শহর কলকাতা।












