বিজেপির জনপ্রিয়তার ভাটা: পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
লেখক: সুমন মুন্সী, মুখ্য সম্পাদক, আইবিজি নিউজ
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) গত এক দশকে জাতীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজ্যে তাদের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, কিছু অপ্রয়োজনীয় স্বার্থকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব বিজেপির জনভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনে।
অহংকার পতনের মূল একথা যুগে যুগে সত্যি, গনতন্ত্র কাউকে চিরস্থায়ী ক্ষমতা দেয়না, রেগন,বুশ, থ্যাচার,ইন্দিরা,জ্যোতি বাবু কেউ টেকেনি জনতার কাঠগড়ায়, কিন্তু শুভেন্দু সরকারের বিচার কি একটু বেশি দ্রুত হয়ে যাচ্ছে না? আসলে পঞ্চাশ বছরের না পাওয়া আর বিশ্বাস ভঙ্গের তৃণমূলিকারণ জনতা মানতে পারছেন না , এই দেয়াল লিখন না পড়তে পারা শুভেন্দু বাবুর মত বিচক্ষণ নেতা, মাটির কাছেই থাকা নেতার না বোঝার কারণ নয় । এখনও সময় আছে , না হলে বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখার্জির পরিণতির মত আর এক মেদিনীপুরের দামাল ছেলে দেখবে বাংলা ।
রাজনীতিতে জনসমর্থন কেবল মতাদর্শের ওপর নির্ভর করে না, বরং মানুষের আবেগ, সম্মানবোধ এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার’ প্রকল্প ঘিরে অসন্তোষ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি অসম্মানের অভিযোগ—এই দুই ইস্যু সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
‘অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার’ প্রকল্পটি অনেক সাধারণ পরিবারের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে, যেখানে এই ধরনের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প সরাসরি ভোটারদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে এর প্রভাব আরও বেশি স্পষ্ট।
অন্যদিকে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নন, তিনি বাঙালির আত্মপরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর প্রতি যে কোনও ধরনের অসম্মান বা অবহেলার ধারণা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এই ইস্যুটি আবেগের স্তরে পৌঁছে গিয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘তৃণমূলের বিজেপিকরণ’—অর্থাৎ রাজনৈতিক দলবদল ও আদর্শগত বিভ্রান্তি। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া বহু নেতার উপস্থিতি বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে পুরনো কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে, অন্যদিকে নতুনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দলের শক্তিকে দুর্বল করতে পারে।
রাজনীতির ময়দানে এই ধরনের ‘মিশ্রণ’ প্রক্রিয়া কখনও কখনও স্বল্পমেয়াদে শক্তি বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে আদর্শগত স্পষ্টতা নষ্ট করে। ফলে সাধারণ ভোটারদের কাছে দলটির অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে সচেতন রাজ্যে এটি একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচন এই সমস্ত ইস্যুর প্রথম বড় পরীক্ষা হতে চলেছে। গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্কে বিজেপির অবস্থান কতটা শক্তিশালী রয়েছে, তা এই নির্বাচনের ফলাফলেই স্পষ্ট হবে। যদি বর্তমান অসন্তোষ ও সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারে, তাহলে বিজেপির জন্য এই নির্বাচন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে, তা বলাই বাহুল্য। তবে শেষ কথা বলবে সাধারণ মানুষ, যারা তাদের অভিজ্ঞতা, সুবিধা-অসুবিধা এবং আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিজেপির জন্য এটি আত্মসমালোচনার সময়। জনপ্রিয়তার ভাটা সাময়িক না দীর্ঘমেয়াদি—তা নির্ভর করবে দলটি কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারে তার ওপর। পঞ্চায়েত নির্বাচন সেই উত্তর দেওয়ার প্রথম মঞ্চ হতে চলেছে।

















