১৬ বছরের ‘আনকাট ডায়মন্ড’: ১৩৫তম ডুরান্ড কাপে নতুন প্রতিভার উত্থান
অন্তরা ত্রিপাঠী | IBG NEWS BANGLA
রাঁচি: বিরসা মুন্ডা স্টেডিয়ামে তখন ম্যাচ কার্যত একতরফা হয়ে গিয়েছে। SC Delhi-র হয়ে প্রথমবারের মতো শুরু করে Rodriguinho ইতিমধ্যেই Defenders FC-র বিরুদ্ধে পাঁচ গোল করে ফেলেছেন। ম্যাচের ফলাফল নিয়ে তখন আর কোনও সংশয় নেই।
কিন্তু ৮৫ মিনিটে মাঠে নামা ১৬ বছরের এক তরুণের জন্য সেই কয়েক মিনিটই হয়ে উঠল স্মরণীয়। Thokchom Diamond Singh বাঁ দিক থেকে বল নিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নিচু শট নেন। গোলরক্ষক দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই প্রচেষ্টা রুখে দেন।
শটটি গোল হয়নি। ম্যাচের বিশাল জয়ের পাশে সেই মুহূর্তও হয়তো বড় কোনও হাইলাইটে জায়গা পাবে না। কিন্তু Diamond-এর কাছে সেটিই ছিল সিনিয়র ফুটবলে নিজের সামর্থ্যের প্রথম বড় পরীক্ষা—মাত্র ১৬ বছর বয়সে, প্রথম সিনিয়র চুক্তির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভারতের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ফুটবল প্রতিযোগিতায় নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার সুযোগ।
চার বছর বয়স থেকে ফুটবলের পথে
Diamond Singh-এর ফুটবলযাত্রা ভারতের যুব ফুটবলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
মাত্র চার বছর বয়সে মণিপুরের Bishnupur-এর TYDA Football Academy-তে তাঁর ফুটবল প্রশিক্ষণ শুরু। এরপর তিনি একে একে পেরিয়েছেন FC Imphal City Football Academy, Sudeva Delhi-র যুব কাঠামো এবং Bhaichung Bhutia Football Schools।
পরবর্তী সময়ে সুযোগ আসে AIFF-FIFA Talent Academy-তে। দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ ফুটবলারদের পরিচর্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে নিজেকে প্রমাণ করার পর Diamond জায়গা করে নেন Bibiano Fernandes-এর India U-17 দলে। পরবর্তীতে তিনি AFC U-17 Asian Cup-এর স্কোয়াডেও সুযোগ পান।
নিজের যাত্রাকে খুব সাধারণভাবেই দেখেন Diamond। তাঁর কথায়, চার বছর বয়সে নিজের শহরের অ্যাকাডেমি থেকে শুরু করে তিনি ধাপে ধাপে এগিয়েছেন।
এই গল্পে কোনও রাতারাতি সাফল্য নেই। রয়েছে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, ধারাবাহিক উন্নতি এবং প্রতিটি স্তরে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা।
১৩৫তম ডুরান্ড কাপে নতুন প্রজন্ম
ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে ডুরান্ড কাপ একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। ১৮৮৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতা ভারতীয় উপমহাদেশের ফুটবল ইতিহাসের দীর্ঘতম ধারাগুলির একটি।
ব্রিটিশ শাসন, দুই বিশ্বযুদ্ধ, ভারতের স্বাধীনতা ও দেশভাগ—অসংখ্য ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও ডুরান্ড কাপ তার অস্তিত্ব ধরে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কাঠামো বদলেছে, কিন্তু এর ঐতিহ্য আজও অটুট।
২০২৬ সালের ১৩৫তম ডুরান্ড কাপ-এ কলকাতা, গুয়াহাটি, শিলং, জামশেদপুর ও রাঁচির মতো শহর প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু হিসেবে উঠে এসেছে। Indian Army, ISL-এর শক্তিশালী দল এবং আন্তর্জাতিক অতিথি দলগুলিও এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের মঞ্চেই Diamond-এর মতো এক কিশোরের সিনিয়র ফুটবলে পা রাখা নতুন প্রজন্মের আগমনের প্রতীক।
সিনিয়র ফুটবলারদের বিরুদ্ধে খেলার অভিজ্ঞতা যে সহজ নয়, তা স্বীকার করেন Diamond। তবে তাঁর মতে, প্রথমদিকে মানিয়ে নিতে কিছুটা সমস্যা হলেও এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে এবং খেলার অনেক নতুন দিক শিখিয়েছে।
SC Delhi-র দুর্দান্ত গ্রুপ পর্ব
Diamond-এর অভিষেকের পর SC Delhi-ও দুর্দান্ত ছন্দে এগিয়ে চলেছে। গ্রুপ পর্বে Indian Air Force FT-কে ৭-১ গোলে হারিয়ে দলটি নয় পয়েন্ট নিয়ে Group C-র শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে।
এর ফলে SC Delhi পৌঁছে যায় কোয়ার্টার-ফাইনালে।
দলের একজন তরুণ সদস্য হিসেবে Diamond-এর জন্য প্রতিটি ম্যাচ এবং প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডুরান্ড কাপের মতো প্রতিযোগিতায় সিনিয়র ফুটবলারদের সঙ্গে একই মাঠে খেলার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য বড় শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
তাঁর কয়েক মিনিটের ক্যামিও তাই শুধুমাত্র একটি ম্যাচের পরিসংখ্যান নয়—এটি একজন তরুণ ফুটবলারের শেখার প্রক্রিয়ার অংশ।
মণিপুরের ফুটবল সংস্কৃতির আরেক প্রতিনিধি
Diamond Singh-এর উত্থানের সঙ্গে মণিপুরের ফুটবল ঐতিহ্যও জড়িয়ে রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে উত্তর-পূর্ব ভারতের এই রাজ্য ভারতীয় ফুটবলকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় উপহার দিয়ে আসছে। স্থানীয় অ্যাকাডেমি, জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা এবং ফুটবলকেন্দ্রিক সামাজিক পরিবেশ বহু তরুণকে পেশাদার ফুটবলের দিকে এগিয়ে দিয়েছে।
Diamond-ও মণিপুরের এই ফুটবল সংস্কৃতির কথা গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, রাজ্যে বহু ভালো অ্যাকাডেমি রয়েছে এবং তাঁর শৈশবের TYDA Football Academy-ও বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করেছে।
India U-17 দলের সঙ্গে তাঁর সময়কেও নিজের বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখেন তিনি।
সাফল্যের নেপথ্যে কোচ ও পরিবার
নিজের অনুপ্রেরণার কথা বলতে গিয়ে Diamond কোনও বিশ্বখ্যাত তারকার নামের পরিবর্তে তাঁর জীবনের সঙ্গে যুক্ত কোচদের কথা স্মরণ করেন।
শৈশব থেকে যাঁরা তাঁকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, তাঁদের অবদান তিনি বিশেষভাবে স্বীকার করেন। তাঁর ফুটবলজীবনের পিছনে রয়েছে বহু কোচের পরিশ্রম, নির্দেশনা এবং ধৈর্য।
তবে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তিনি দেন তাঁর বাবা-মাকে।
Diamond-এর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা ও মা তাঁর ফুটবলজীবনের জন্য অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেছেন। এমন সময়ও এসেছে যখন পরিবারের পক্ষে খাবার কিংবা ফুটবল সরঞ্জামের খরচ বহন করা সহজ ছিল না। তবুও তাঁরা তাঁর প্রয়োজন মেটাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।
আজ সিনিয়র ফুটবলের মঞ্চে Diamond-এর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে তাই জড়িয়ে রয়েছে তাঁর পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম।
লক্ষ্য—আরও খেলা, আরও শেখা
মাত্র ১৬ বছর বয়সে Diamond Singh ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় কোনও ঘোষণা দিতে চান না। তাঁর লক্ষ্য অনেক বেশি বাস্তব—আরও বেশি ম্যাচ খেলা, অভিজ্ঞতা অর্জন করা এবং নিজেকে ক্রমাগত উন্নত করা।
ব্যক্তিগতভাবে তিনি আরও বেশি খেলার সুযোগ চান। আর দলের জন্য তাঁর লক্ষ্য একেবারে স্পষ্ট—জয়।
রাঁচির সেই ম্যাচে তাঁর শটটি গোল হয়নি। Rodriguinho-র দুর্দান্ত গোলের উৎসবের মধ্যে কয়েক সেকেন্ডের সেই মুহূর্ত দ্রুত হারিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডেই দেখা গেল একজন সম্ভাবনাময় তরুণকে—মণিপুরের মাটি থেকে উঠে আসা ১৬ বছরের এক ফুটবলার, যিনি ভারতীয় ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় নিজের প্রথম পদচিহ্ন রেখে দিলেন।
Diamond এখনও সম্পূর্ণ প্রস্তুত খেলোয়াড় নন। কিন্তু তাঁর যাত্রার দিকনির্দেশ স্পষ্ট—প্রশিক্ষণ, পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা এবং শেখার ধারাবাহিকতা।
ডুরান্ড কাপের ইতিহাসে বহু ফুটবলারের যাত্রা শুরু হয়েছে ছোট ছোট মুহূর্ত থেকে। Diamond Singh-এর ক্ষেত্রেও সেই কয়েক সেকেন্ড হয়তো ভবিষ্যতের একটি বড় গল্পের প্রথম অধ্যায়।
Copyright © IBG NEWS BANGLA


















