
রাইস পুলার কেলেঙ্কারি: মিথের নেপথ্যের বিজ্ঞান এবং কীভাবে প্রতারকরা এটিকে কোটি টাকার প্রতারণায় পরিণত করে
কাল্পনিক ইরিডিয়াম বস্তু থেকে জাল ল্যাবরেটরি রিপোর্ট—বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ব্যবহার করে কীভাবে RP চক্র একটি বিশাল সম্পদের বিভ্রম তৈরি করে
By Suman Munshi | IBG NEWS
নয়াদিল্লি | ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বাংলায় প্রতারকদের একটি বহুল প্রচলিত গোপন প্রতারণার ধরন হল RP মেটাল বিক্রির কেলেঙ্কারি, যার কথিত মূল্য একাধিক কোটি টাকা। গোটা বাংলাজুড়ে একটি চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সম্ভাব্য ক্রেতার সামনে একটি ধাতব বস্তু দেখানো হয়। দাবি করা হয়, তার কাছে রাখলে চালের দানা নাকি নিজে থেকেই এগিয়ে আসে। এরপর শুরু হয় ইরিডিয়াম, তেজস্ক্রিয়তা, উন্নত প্রযুক্তি এবং গোপন বিদেশি ক্রেতার গল্প। তারপর আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—পরীক্ষা, সার্টিফিকেশন, সরকারি অনুমোদন কিংবা কথিত আন্তর্জাতিক লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য টাকা চাওয়া।
এটাই সাধারণভাবে ‘রাইস পুলার’ বা ‘RP’ কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত প্রতারণার মূল কৌশল।
এই বস্তুগুলির কথিত বিপুল মূল্যকে সমর্থন করে এমন কোনও স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক ঘটনা নেই, যেখানে কোনও বিশেষ পদার্থের চাল আকর্ষণ করার অনন্য ক্ষমতা রয়েছে এবং সেই কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তার মূল্য কোটি কোটি টাকা।
তবুও এই প্রস্তাব অনেক সময় বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়, কারণ এর সঙ্গে বাস্তব বৈজ্ঞানিক ধারণাকে মিশিয়ে দেওয়া হয় কাল্পনিক দাবি।
সরকারি নথিতেও রয়েছে সতর্কবার্তা
এই বিষয়ে সরকারি নথির সতর্কতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৮ সালে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) তথাকথিত কপার/ইরিডিয়াম ‘রাইস পুলার’ নিয়ে প্রতারণামূলক পরিকল্পনার বিষয়ে জনসাধারণকে সতর্ক করেছিল। RBI জানিয়েছিল, এই ধরনের যন্ত্রের অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে বলে মিথ্যা দাবি করা হচ্ছে।
পরমাণু শক্তি দফতর (Department of Atomic Energy)-ও সংসদে এই বিষয়টি উত্থাপন করেছে। সেখানে ‘Rice-puller’ এবং ‘Anti-radiation pack’ নামে বর্ণিত বস্তুকে ঘিরে প্রতারণামূলক কার্যকলাপের কথা উল্লেখ করা হয়। দফতর জানিয়েছিল, এই ধরনের ঘটনায় বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবি করা জাল বা পরিবর্তিত নথি ব্যবহার করা হয়েছিল।
গল্পের শুরু একটি সাধারণ বস্তু দিয়ে
চারপাশের গল্প বাদ দিয়ে বস্তুটিকে দেখলে সাধারণত তার মধ্যে অসাধারণ কিছু থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় না।
এটি হতে পারে পুরনো ধাতব সামগ্রী, কোনও পাত্র, প্লেট, যন্ত্রাংশ অথবা অদ্ভুত দেখতে কোনও সংকর ধাতু।
এরপর বিক্রেতা বস্তুটির সঙ্গে একটি চমকপ্রদ ইতিহাস জুড়ে দেয়।
বলা হতে পারে, বস্তুটি—
- আকস্মিকভাবে পাওয়া গেছে;
- পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ;
- পুরনো বাড়ি বা ধর্মীয় স্থাপনা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে;
- কোনও প্রাক্তন সরকারি কর্মচারীর কাছ থেকে পাওয়া;
- কোনও গোপন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত; অথবা
- অত্যন্ত বিরল ধাতুর সংমিশ্রণে তৈরি।
গল্প যত বেশি অস্বাভাবিক হয়, কথিত মূল্যও তত বাড়তে থাকে।
চাল আকর্ষণের প্রদর্শনী
‘Rice Puller’ নামটি এসেছে এই দাবি থেকে যে বস্তুটি নাকি চালের দানা আকর্ষণ করে।
কিন্তু কোনও ধাতু, আইসোটোপ বা তেজস্ক্রিয় পদার্থ শনাক্ত করার স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এটি নয়।
চাল হালকা পদার্থ এবং সাধারণ শারীরিক প্রভাবেও তার অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে। স্থির বিদ্যুৎ, আর্দ্রতা, বাতাসের চলাচল, পৃষ্ঠের আকর্ষণ এবং পরীক্ষার পরিবেশ—সবকিছুই ক্ষুদ্র কণার গতিবিধিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই কয়েকটি চালের দানা নড়তে দেখা কোনওভাবেই প্রমাণ করে না যে বস্তুটির মধ্যে ইরিডিয়াম, তেজস্ক্রিয় পদার্থ বা কোনও বিশেষ সংকর ধাতু রয়েছে।
ইরিডিয়ামের নাম কেন আসে?
প্রতারণাটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয় যখন ‘ইরিডিয়াম’ শব্দটি আলোচনায় আসে।
ইরিডিয়াম একটি বাস্তব রাসায়নিক মৌল এবং প্ল্যাটিনাম-গ্রুপের ধাতুর অন্তর্ভুক্ত। এটি বিরল এবং এর প্রকৃত শিল্প ও বৈজ্ঞানিক ব্যবহার রয়েছে।
ইরিডিয়ামের তেজস্ক্রিয় আইসোটোপও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, Iridium-192 একটি বৈধ সিল করা তেজস্ক্রিয় উৎস হিসেবে বিশেষ করে শিল্পক্ষেত্রের রেডিওগ্রাফিতে ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু এই তথ্য থেকে পরবর্তী দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য হয়ে যায় না:
‘এই অজ্ঞাত বস্তুটি বিপুল মূল্যের ইরিডিয়াম আইসোটোপ।’
এমন সিদ্ধান্তের জন্য যথাযথ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন।
কোনও বস্তু দেখে বা বাড়িতে পরীক্ষা করে তার মধ্যে নির্দিষ্ট আইসোটোপ রয়েছে কি না, তার পরিচয় বা পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না।
এরপর আসে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম
গল্পের পরবর্তী স্তরে সাধারণত কোনও বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের নাম জুড়ে দেওয়া হয়।
সম্ভাব্য ক্রেতাকে বলা হতে পারে যে বস্তুটি কোনও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন, যার সঙ্গে যুক্ত—
BARC, DRDO, ISRO, NASA, কোনও প্রতিরক্ষা গবেষণাগার অথবা বিদেশি সরকার।
এই নামগুলি অত্যন্ত প্রভাবশালী, কারণ অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এগুলিকে উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করেন।
সরকারি নথিতে দেখা গেছে, RP-সম্পর্কিত প্রতারণার অভিযোগে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের নাম অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে।
পরমাণু শক্তি দফতর সংসদে জানিয়েছিল, BARC ও DAE-এর সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা কিছু নথি প্রতারণামূলক Rice Puller লেনদেনে পরিবর্তিত বা ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল।
মূল কথা সহজ:
কোনও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের নাম বা লোগো থাকা কোনও নথি প্রমাণ করে না যে নথিটি সেই প্রতিষ্ঠানই দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে স্বাধীনভাবে যোগাযোগ করে তা যাচাই করতে হবে।
নথিপত্রও হয়ে ওঠে প্রতারণার অভিনয়ের অংশ
এই পর্যায়ে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর হাতে অত্যন্ত পেশাদার বলে মনে হয় এমন নথি তুলে দেওয়া হতে পারে।
সেগুলিতে থাকতে পারে—
- ল্যাবরেটরির বৈজ্ঞানিক পরিভাষা;
- সিরিয়াল নম্বর;
- সরকারি ধরনের সিল;
- স্বাক্ষর;
- প্রযুক্তিগত পরিমাপ;
- মূল্যায়নের অঙ্ক;
- ছবি;
- সরকারি দফতরের উল্লেখ;
- কথিত আন্তর্জাতিক ক্রয়-চুক্তির প্রতিশ্রুতি।
এই নথিগুলির উদ্দেশ্য হল সন্দেহ তৈরি হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর প্রশ্নগুলির উত্তর দিয়ে দেওয়া।
কিন্তু জাল নথিতে প্রযুক্তিগত ভাষা থাকলেই তা আসল হয়ে যায় না।
বরং আপাতদৃষ্টিতে সরকারি নথির ব্যবহারই এই ধরনের প্রতারণাকে দীর্ঘদিন চালিয়ে যেতে এবং বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিতে সাহায্য করে।
তেজস্ক্রিয়তা যোগ করে ভয়—এবং মূল্য
আরেকটি সাধারণ কৌশল হল তেজস্ক্রিয়তার প্রসঙ্গ আনা।
ভুক্তভোগীকে বলা হতে পারে যে বস্তুটি থেকে বিকিরণ বের হচ্ছে এবং তাই সেটিকে স্বাভাবিকভাবে স্পর্শ করা যাবে না।
কখনও রেডিয়েশন মিটার দেখানো হয়। কখনও প্রতিরক্ষামূলক পোশাক ব্যবহার করা হয়। বস্তুটি বিশেষ কোনও পাত্রের মধ্যে রাখা হতে পারে।
বিপদ + বিরলতা + গোপনীয়তা—এই তিনটি বিষয় একত্রে বস্তুটির কথিত মূল্যকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
কিন্তু বিকিরণ পরিমাপ করা যায়।
কেউ যদি সত্যিই সন্দেহ করেন যে কোনও বস্তু তেজস্ক্রিয়, তাহলে উত্তর খোঁজার পদ্ধতি লেবুর রস, হলুদ, চাল বা ডিজিটাল ঘড়ির পরীক্ষা নয়।
এর জন্য উপযুক্ত রেডিয়েশন-পরিমাপক যন্ত্র এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট রেডিওনিউক্লাইড শনাক্ত করতে সক্ষম পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
পরমাণু শক্তি দফতরের সংসদীয় জবাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে এমন ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে যেখানে এই ধরনের প্রতারণামূলক দাবির সঙ্গে যুক্ত বস্তু পরীক্ষা করে তেজস্ক্রিয় নয় বলে পাওয়া গিয়েছিল।
টাকা চাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়
একবার ভুক্তভোগী বিশ্বাস করতে শুরু করলে যে বস্তুটির বিপুল মূল্য রয়েছে, তখন শুরু হয় আর্থিক প্রতারণার মূল পর্ব।
বিক্রেতা বলতে পারে, বস্তুটির মূল্য ইতিমধ্যেই বিপুল, কিন্তু একটি প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে কিছু টাকা দরকার।
এই টাকা চাওয়া হতে পারে—
পরীক্ষা, সার্টিফিকেশন, পরিবহণ, নিরাপত্তা, বিমা, ছাড়পত্র, যন্ত্রপাতি অথবা রপ্তানি সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতার জন্য।
কথিত চূড়ান্ত লাভের তুলনায় প্রাথমিক অর্থের দাবি তুলনামূলকভাবে ছোট বলে মনে হয়।
যেমন, কাউকে যদি বলা হয় যে বস্তুটি শেষ পর্যন্ত ₹১০০ কোটি দেবে, তাহলে ₹১০ লক্ষের দাবি তার কাছে তুলনামূলকভাবে সামান্য বলে মনে হতে পারে।
এই তুলনাটিই প্রতারণাটিকে মানসিকভাবে এত শক্তিশালী করে তোলে।
একটি পেমেন্টের পর শুরু হতে পারে আরেকটি
প্রথম টাকা দেওয়ার পর কথিত লেনদেনে নতুন নতুন শর্ত যোগ হতে পারে।
কোনও ল্যাবরেটরির আরও একটি পরীক্ষা প্রয়োজন।
কোনও সরকারি দফতর নাকি নতুন সার্টিফিকেট চাইছে।
বিমা করতে হবে।
নিরাপত্তা খরচ হঠাৎ বেড়ে যায়।
বিদেশি ক্রেতা নাকি আরও একটি নথি চেয়েছে।
ভুক্তভোগীকে বোঝানো হয় যে কথিত লেনদেন প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে, তাই আরও একটি অর্থ প্রদান করলেই সব শেষ হবে।
এভাবে টাকা দিতে থাকা চলতে পারে যতক্ষণ না ভুক্তভোগীর অর্থ শেষ হয়ে যায় অথবা তিনি বুঝতে পারেন যে কথিত ক্রেতা ও লেনদেন স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।
প্রকৃত ঘটনাগুলিই আর্থিক বিপদের প্রমাণ
RP ঘটনা কেবল ইন্টারনেটের কোনও কল্পকাহিনি নয়।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশি তদন্তে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠে এসেছে।
মহারাষ্ট্রের একটি ঘটনায় The Indian Express-এর প্রতিবেদনে পুলিশ জানিয়েছিল, NASA-র নাম ব্যবহার করে কপার-ইরিডিয়াম সম্পর্কিত কথিত রাইস-পুলার প্রকল্পে বহু মানুষকে অর্থ বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করার অভিযোগ রয়েছে।
বেঙ্গালুরুর একটি ঘটনায় এক ব্যবসায়ী কথিত RP প্রতারণায় ₹৩.৫ কোটি হারানোর অভিযোগ করেন। সেখানে NASA, বিশেষ যন্ত্রপাতি এবং প্রতিরক্ষামূলক পোশাকের মতো বিষয় ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
The Times of India-তে প্রকাশিত মুম্বইয়ের একটি পৃথক ঘটনায় কথিত কপার-ইরিডিয়াম থেকে বিপুল লাভের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত প্রায় ₹২০ লক্ষ টাকার ক্ষতির অভিযোগ উঠে আসে।
২০২৬ সালে দিল্লি পুলিশের Economic Offences Wing প্রায় ₹৯ কোটি টাকার একটি কথিত RP-সম্পর্কিত প্রতারণার তদন্ত করে। এটি দেখায় যে এই প্রতারণার ফর্মুলা এখনও বিভিন্ন জায়গায় ফিরে আসছে।
তবে এগুলি অপরাধমূলক তদন্তে উঠে আসা অভিযোগ; অভিযুক্তরা আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং নির্দোষতার অনুমানের অধিকারী।
কেন এই প্রতারণা কাজ করে?
এই চক্র একাধিক আলাদা বিষয়কে এমনভাবে সাজায়, যাতে সবকিছু একই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে বলে মনে হয়।
যেমন:
চাল নড়ছে → বিশেষ ধাতু
বিশেষ ধাতু → ইরিডিয়াম
ইরিডিয়াম → বিরল আইসোটোপ
তেজস্ক্রিয়তা → উন্নত প্রযুক্তি
সরকারি লোগো → সরকারি অনুমোদন
বিদেশি ক্রেতা → বিপুল মূল্য
পরীক্ষার ফি → চূড়ান্ত পেমেন্ট
কিন্তু আগের কোনও ঘটনাই পরের ঘটনাটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ করে না।
এটাই RP গল্পের মূল দুর্বলতা।
প্রকৃত আইসোটোপের পরিচয় পরিমাপযোগ্য
‘ইরিডিয়াম আইসোটোপ’ শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
কোনও আইসোটোপ তার চেহারা দেখে শনাক্ত করা যায় না।
বৈজ্ঞানিক শনাক্তকরণের জন্য এমন পরিমাপ প্রয়োজন যার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে কোন রেডিওনিউক্লাইড উপস্থিত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তার কার্যকলাপ নির্ধারণ করা যায়।
যেমন:
‘ঘড়ি বন্ধ হয়ে গেছে, তাই বস্তুটি তেজস্ক্রিয়।’
এর কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
একইভাবে:
‘হলুদের রং বদলে গেছে, তাই বস্তুটির মধ্যে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ রয়েছে।’
এটিও বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নয়।
রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং বিকিরণ শনাক্তকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয়।
সবচেয়ে নিরাপদ পরীক্ষা হল স্বাধীন যাচাই
কেউ যদি সত্যিই মনে করেন যে তাঁর কাছে কোনও অস্বাভাবিক ধাতু বা তেজস্ক্রিয় উৎস রয়েছে, তাহলে দুটি প্রশ্নকে আলাদা করতে হবে:
বস্তুটি আসলে কী?
এবং
এর মূল্য কত?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
শুধুমাত্র প্রকৃত শনাক্তকরণের পর দ্বিতীয় প্রশ্নটি নিয়ে যুক্তিসঙ্গতভাবে আলোচনা করা যায়।
যে বিক্রেতা শুরুতেই মূল্য—বিশেষ করে দশ বা শত কোটি টাকার অঙ্ক—নির্ধারণ করে দেয় এবং তারপর সম্ভাব্য ক্রেতার কাছ থেকেই ‘যাচাইয়ের’ খরচ চায়, তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
RP দাবি যাচাই করার আগে পাঁচটি প্রশ্ন
টাকা দেওয়ার আগে প্রশ্ন করুন:
১. কোন স্বাধীন পরীক্ষাগার বস্তুটির উপাদান শনাক্ত করেছে?
২. ঠিক কোন আইসোটোপ বা রাসায়নিক গঠন শনাক্ত হয়েছে?
৩. পরীক্ষাগারটি কি স্বাধীনভাবে রিপোর্টটি নিশ্চিত করতে পারে?
৪. আইনগতভাবে শনাক্তযোগ্য ক্রেতা কে?
৫. কথিত ক্রেতা যদি কোটি কোটি টাকার পণ্য কিনতে চায়, তাহলে সেই ক্রয়ের জন্য কেন বিক্রেতা বা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকেই টাকা দিতে হবে?
এই প্রশ্নগুলির সরাসরি এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য উত্তর পাওয়া না গেলে প্রস্তাবিত লেনদেনকে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বাড়িতে পরীক্ষা করবেন না
কোনও অজ্ঞাত বস্তু সম্পর্কে যদি দাবি করা হয় যে সেটি তেজস্ক্রিয়, তাহলে নিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা থেকে বিরত থাকুন।
কখনও—
- সেটি কাটবেন না;
- ঘষে গুঁড়ো করবেন না;
- গরম করবেন না;
- সিল করা পাত্র খুলবেন না;
- অ্যাসিড দেবেন না;
- গৃহস্থালির রাসায়নিকের সঙ্গে মেশাবেন না;
- ইচ্ছাকৃতভাবে ইলেকট্রনিক যন্ত্রের কাছে নিয়ে যাবেন না;
- কোনও ‘রেডিয়েশন ডেমোনস্ট্রেশন’ তৈরি করার চেষ্টা করবেন না।
রাসায়নিক রঙের পরিবর্তন কোনও আইসোটোপের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারে না। একইভাবে কোনও ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ত্রুটি দিয়ে বিকিরণের মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না।
শেষ কথা
রাইস পুলার গল্পের প্রকৃত বিপদ কোনও রহস্যময় ধাতব বস্তু সত্যিই মূল্যবান কি না, তা নয়।
প্রকৃত বিপদ হল—একজন মানুষকে এমন একটি বৈজ্ঞানিক দাবির জন্য বাস্তব টাকা খরচ করানো, যার সত্যতা স্বাধীনভাবে কখনও প্রমাণিত হয়নি।
ইরিডিয়াম বাস্তব।
তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বাস্তব।
বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগার বাস্তব।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানও বাস্তব।
প্রতারণা শুরু হয় যখন এই বাস্তব তথ্যগুলিকে একটি অজ্ঞাত বস্তুকে ঘিরে কাল্পনিক বাণিজ্যিক গল্পে জুড়ে দেওয়া হয়।
বিজ্ঞান শুরু হয় পরিমাপ দিয়ে, মূল্য নির্ধারণ দিয়ে নয়।
কেউ যদি দাবি করে যে কোনও ধাতব বস্তু RP হওয়ার কারণে শত শত কোটি টাকা মূল্যের, তাহলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত নয় দাম নিয়ে দরাদরি করা।
প্রথমে চাইতে হবে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক শনাক্তকরণ এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নথি।
আর সেই প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত শুধুমাত্র বিপুল ভবিষ্যৎ লাভের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে কোনও অগ্রিম অর্থ দেওয়া উচিত নয়।
১০টি নথিভুক্ত Rice Puller-সম্পর্কিত মামলা
তেলেঙ্গানার আদালতের নথিতে একই বৃহত্তর অপরাধমূলক ঘটনা/চক্রের সঙ্গে যুক্ত বলে বর্ণিত পৃথক ঘটনাগুলির মধ্যে চারটি Crime Number—100/2009, 224/2009, 69/2009 এবং 537/2009—বিভিন্ন ভুক্তভোগী ও পুলিশ স্টেশনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ রয়েছে।
একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
IBG NEWS-এর অনুসন্ধানের জন্য দিল্লি হাইকোর্টের নথি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কেবল সংবাদ প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে না।
FIR 86/2016-এর ক্ষেত্রে আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে যে কথিত Rice Puller সার্টিফিকেটগুলি প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO), বালাসোরের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দেখানো হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলিকে জাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আদালতের নথিতে আরও বলা হয়েছে, মানুষকে প্রতারিত করার উদ্দেশ্যে Rice Puller-এর ওপর ভুয়ো DRDO প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছিল বলে রাজ্যের অভিযোগ ছিল।
একই বিচারিক নথিতে রাজ্যের বক্তব্য হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে কোনও Rice Puller তৈরির সঙ্গে DRDO/NASA-র কোনও সম্পৃক্ততা ছিল না।
RBI-এর সরকারি সতর্কবার্তা
ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ৩১ জুলাই, ২০১৮ তারিখে একটি জনসচেতনতামূলক সতর্কবার্তা প্রকাশ করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, অসাধু ব্যক্তিরা কথিত কপার/ইরিডিয়াম ‘Rice Puller’ বিক্রি করছে এবং এগুলির অলৌকিকভাবে চাল আকর্ষণ করার ক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করছে। RBI জনসাধারণকে সতর্ক করে জানায়, এর ফলে সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হতে পারে এবং এমন ঘটনা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে জানাতে পরামর্শ দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদকীয় সতর্কতা
এই ঘটনাগুলিকে ‘একই প্রতারণা চক্রের ১০টি FIR’ হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়। এগুলি ভারতের বিভিন্ন সময়, স্থান, অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত Rice Puller/Rice Pulling-সম্পর্কিত নথিভুক্ত অপরাধমূলক মামলা।
কোনও উৎসে FIR নম্বর প্রকাশিত না থাকলে তা অনুমান করে তৈরি করা উচিত নয়। IBG NEWS-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
IBG NEWS এই প্রতিবেদনটি জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রকাশ করছে। অপরাধমূলক মামলার উল্লেখ সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগের ভিত্তিতে করা হয়েছে; আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত এগুলিকে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
এই সংস্করণটি সরবরাহ করা প্রতিবেদনের বাক্য-অনুবাদ নয়; বরং মূল তথ্য ও বক্তব্যের কাঠামো বজায় রেখে স্বাভাবিক ও মৌলিক বাংলা ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। RBI/DAE-এর সতর্কতা এবং বিভিন্ন মামলার তথ্য সংশ্লিষ্ট উৎসের সঙ্গে যথাযথভাবে সংযুক্ত করে প্রকাশ করা উচিত।
By Suman Munshi | IBG NEWS











