লক্ষ্মী-লাভ
– রঘুপতি ষড়ংগী
“ওঁপাশাঙ্কুশমালিকাম্ভোজ শৃণিভির্য্যাম্যসৌময়োঃ।
পদ্মাসনস্থাং ধ্যায়েচ্চ শ্রীয়ংত্রৈলোক্য মাতরম্।।
গৌরবর্ণাং সুরুপাঞ্চ সর্বালঙ্কার ভূষিতাম্।
রৌক্মপদ্মব্যগ্রকরাং বরদাং দক্ষিণে তু।”
দেবীর এই ধ্যান মন্ত্র থেকে জানা যাচ্ছে ” সব ধরণের অলঙ্কার এ ভূষিতা, লালচে ফর্সা, সুরুপা-দর্শনা দেবী পদ্মফুলের ওপরে অধিষ্ঠিতা। তাঁর বাম হাতে অক্সমালা ও স্বর্ণ কমল। ডান হাতে বরমূদ্রা।”
পুরাণ ভেদে লক্ষ্মী’র রূপ ও তাঁর আরাধনা করার পৃথক পৃথক উদ্দেশ্যের কথা বলা আছে। আমি লক্ষ্মী বলতে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার কথা বলতে চাইছি। এখন “কোজাগরী লক্ষ্মী”র এই পূজা বাংলার অঙ্গন ছেড়ে সারা ভারতবর্ষে তো বটেই, ভারত এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
কেন ? “লোক বিভূতয়ে ” …. কারণ, দেবী যে মানুষ কে ধনশালী, বিত্তবান বানাতেই আসেন।”
কবে, হয় এই পূজা ? ” আশ্বিনে পৌর্ণমাস্যান্তে চরেৎ জাগরণং নীশি।”… মানে, অশ্বিনী পূর্ণিমার রাতে জাগ্রত থেকে এঁর পূজাপাঠ করাই বিধান।
প্রশ্ন হোল, এতো বড়ো দিন থাকতে রাতের বেলায় কেন ? স্মার্ত-পণ্ডিত, রঘুনন্দন তাঁর টিকা তে লিখছেন,” নীশিথে বরদা লক্ষ্মী…..” মানে, দিনে নয়; রাতেই মা ধন ওঐশ্বর্যা দান করতে ব্যাকুলা হয়ে ওঠেন । তিনি নাকি সারাটি রাত শহরের রাজপথে এবং গ্রামের আলো-ছায়া মিশানো অলিগলি তে ঘুরে দেখেন, ” কোঃ জাগর্তি ? “…. কে কে জেগে আছে। ” তস্মৈ বিত্ত প্রয়চ্ছামি “…… গুনে গুনে সেই ক’জন কেই তিনি ধনসম্পত্তি দান করবেন।
দেখুন, লাল-গোলাপী- হলুদ যা খুশি ফুল দিয়ে আপনি এ পুজো করতেই পারেন। কিন্তু তিনি যে ‘কুমুদিনী’ ! তাই “কৌমদ্যাং পূজয়ে লক্ষ্মীঃ”। কুমুদ ফুল তাঁর লাগবেই। ‘কুমুদ’ যেমন শালুক গোত্রের একটি জলজ ফুল তেমনি ‘কুমুদ’ অর্থে মায়াবী জ্যোৎস্না রাত কে ও বোঝানো হয়।
আচ্ছা, লক্ষ্মী কি কোনো বৈদিক দেবী ? উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এই দু’টোই ঠিক। একথা সত্যি বেদ এ অন্তত ঋক্ বেদ এ লক্ষ্মী নামের কোথাও কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। কিন্তু ঋক্ বেদ এর প্রক্ষিপ্ত অংশে শ্রীসূক্ত বলে একটি সূক্ত আছে। বেদ-বেত্তারা এই ‘শ্রী’ এর অর্থ করেন লক্ষ্মী।
এনার নাম পদ্মা, পদ্মালয়া, কমলা, শ্রী, হরিপ্রিয়া, রমা আরও অনেক। পল্লী-বাঙলা’র রাতে ঘোরাফেরা করতে ইনি পেঁচা কে ব্যবহার করলেও দঃ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে কোথায় চাপেন হাতির পিঠে,কোথাও যান আবার ঘোড়ায় চড়ে। গরুড়ের পিঠেও এনাকে উড়তে দেখা গেছে।
সে যে যা খুশি ভাবুন, কিন্তু মা যে আমাদের অর্নব-তনয়া। সাগর মন্থন এর পরে অনেকের সাথেই তিনি একসাথে বেরিয়েছেন। তাই স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর দেহ-মনেও থাকে প্রতিবেশী দের কিছু গুন। তাঁর মাঝে খুঁজে পাবেন পারিজাত এর সুভাস, উচ্চৈশ্রবার দূরন্ত গতি, কালকূট এর মোহাচ্ছন্ন করার ক্ষমতা আর তার সাথে কৌস্তব মনি’র দৃঢ়তা।
এতো সব গুনাবলী’র অধিকারিণী মা লক্ষ্মী তবে থাকেন কোথায় ? এ প্রসঙ্গে বলা যায় …. শ্রী বিষ্ণুর বক্ষ ছাড়া ও তার আবাস ” বিভূষনেষু রত্নেষু শোভারূপা চন্দ্রেষু জলেষু ফলেষু দিব্যস্ত্রীণাং গৃহেষু চ…. সর্বশষ্যেষু সংস্কৃতেষু চ।”
এই ভূ-মন্ডল এর সমস্ত ধন-সৌন্দর্য্য-ঐশ্বর্য্য এর মালিক যিনি সেই সদা-চঞ্চলা, অবাধ-গতির মাতা জী কে আল্পনা এঁকে, পান-সূপারী আর জলভরা ঘট দিয়ে আপনি আটকে রাখবেন কী ভাবে ? স্থিতধী থেকে ঐকান্তিক মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে নিরলস শ্রম করে চললে তবেই তো ধন -লক্ষ্মী’র লাভ, আর ই বা কিসে ?



















