আজ জীবন্ত ইতিহাসের জন্মদিন
তৈমুর খান
একটা জীবন্ত চলমান ইতিহাসের সাক্ষাৎ পেলাম। বৈচিত্র্যময় বহুবিধ জীবনের প্রজ্ঞা নিয়ে তিনি বাঙালির সাহিত্য-মননে বিরাজ করছেন। দেশ স্বাধীনের পূর্বে এবং দেশ স্বাধীনের পরে যে ভৌগোলিক পরিবর্তন হয়েছে, এবং জনমানসে যে প্রভাব পড়েছে ইতিহাস, রাজনৈতিক উত্থান, সমাজ-সংস্কৃতির রূপ ও রূপান্তর তাঁর অব্যর্থ লেখনিতে সেসব তুলে আনতে পেরেছেন। ১৯৭১ থেকে আজ অবধি নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তিনি অগ্রসর হয়েছেন। সদ্য শেষ করা ছাত্রজীবনে ‘খাস বাঙাল’ মেয়েকে বিয়ে করে অনেক বিড়ম্বনাও সামলেছেন। কিন্তু কিছুতেই পিছিয়ে আসেননি। তেমনি একটা সময়ে বহু রাজনৈতিক নেতৃত্ব দানকারী, সাহিত্য ব্যক্তিত্ব, বিতর্কিত মানুষেরও সঙ্গ লাভ করেছেন। সাংবাদিকতা থেকে সাহিত্য, অনুবাদক হতে সম্পাদক কোনো কাজ করতেও বাকি রাখেননি। অবশেষে ফিরে এসেছেন নিজের জন্মশহর বহরমপুরে। তারপর পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতা। শিক্ষকতার পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেও এখনো সৃষ্টির কাজে নিজেকে সচল রেখেছেন। সেই মানুষটিকে আমরা ক’জন চিনি? ‘পয়গাম’ থেকে ‘কাফেলা’, ‘তন্বী’ থেকে ‘তিনজন’, ‘একস’ থেকে ‘ছন্নছাড়া’ তাঁর যৌবনের সংরাগে কত পত্রিকা-ই না উদ্দীপ্ত হয়েছে তার হিসেব আমরা করতে পারব না। দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক এমন কোনো পত্রিকা নেই যাতে তিনি লিখেননি। হ্যাঁ যাঁর কথা বলছি তিনি খাজিম আহমেদ।
১৯৪৭ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি মুর্শিদাবাদ জেলার মালিপাড়া-কাতলামারিতে জন্মেছিলেন। ইতিহাসে অনার্স নিয়ে পড়েছিলেন মৌলানা আজাদ কলেজে। তারপর সর্বশেষ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সদ্য দেশভাগের যন্ত্রণা তিনি ওইটুকু বয়সেই আঁচ করেছিলেন যেমন, তেমনি মানুষের হাহাকার-পীড়নও চোখের সামনে দেখেছিলেন। অনার্স পড়াকালীন সময়েই তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত। নিজের সময়ই যে ইতিহাসের সময় হয়ে উঠেছিল তা বলাই বাহুল্য। তাই ইতিহাসকে তিনি নিজেই ধারণ করেছিলেন। শুধু তথ্য ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণই নয়, মানব মহিমার অন্তরায়কেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। যে সমাজ অন্ধকারাচ্ছন্ন, যে সমাজের আষ্টেপৃষ্ঠে কুসংস্কার লেপ্টে আছে, যে সমাজে মানবহৃদয়ের আর্তধ্বনি কেউ শুনতে পায় না—তিনি সেই সমাজেরই রূপকার। দেশ স্বাধীনের এতদিন পরেও কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এই বাঙালি সমাজ, সাম্প্রদায়িক হানাহানির উৎস কোথায়, বাঙালি কেন তার ঐতিহ্যকে ভুলে গেল, রাজনীতি কেন ধর্মাচারের অন্ধকারে পথ খুঁজে পায়—এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি একের পর এক গ্রন্থ লিখে গেছেন। কোথায় দেশভাগের ঐতিহাসিক ভুল, ধর্ম-জাত-পাতের অন্ধকার থেকে কিভাবে মানবজাতিকে রক্ষা করা যাবে সেইসব পথেরই অনুসন্ধান করেছেন।
ইতিহাস ও সময়কে আত্মস্থ করেই জীবন মহিমার চৈতন্যে মানবিক সত্তার প্রজ্ঞাময় রূপকার খাজিম আহমেদ। আমরা তাঁকে আজও চিনতে পারিনি। আজও তাঁর জীবনদর্শনকে আপন করে নিতে পারিনি। তাঁর শিক্ষা, রুচি, জীবনধারা, উদার মানসিকতা, স্নেহশীলতা কতখানি আকর্ষণীয় তা যারা তাঁর কাছাকাছি গেছেন তারাই জানেন। কিন্তু আশ্চর্য বাংলা সাহিত্যের বহু পাঠকই জানেন না। তাই দীর্ঘজীবনের পথ অতিক্রম করে গেলেও তিনি আমাদের কাছে অচ্ছুত হয়ে রয়েছেন। আজ আসুন আমরা তাঁর সঙ্গে পরিচয় করি।তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাঙালি মুসলমান আপন ভুবনের সন্ধানে’ আজ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে অদ্বিতীয় বলেই আমার মনে হয়েছে।













