Monday, October 26, 2026
WA
Home Bangla গল্প – বিন্দোলের ভৈরবী মা

গল্প – বিন্দোলের ভৈরবী মা

0
1087
বিন্দোলের ভৈরবী মা
বিন্দোলের ভৈরবী মা

(গল্পের স্থান কাল এমনকি ছবি সবই সত্যি শুধু লেখকের নাম গোপন করা হলো| লেখকের কলম যেন অনির্বান শিখায় শাণিত চক্রবর্তী রাজার তরোয়াল) 

– এবারে তাহলে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? – হাতের সিগারেট টা সিগারেটের বক্সে দুবার ঠুকে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন গোপালপুর স্কুলের ইতিহাসের অবসরপ্রাপ্ত  শিক্ষক দেবব্রত বাগচী। 

– রায়গঞ্জ। ছোটো করে উত্তর দিলাম।

– রায়গঞ্জ মানে উত্তর দিনাজপুর?  

– হ্যা,এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম পক্ষী নিবাস আর ফরেস্ট, তার সাথে বিখ্যাত তুলাইপাঞ্জি চাল।

হাতের সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে বাগচী বাবু মৃদু হাসলেন। – এই তো তোমাদের সমস্যা।চলতি  কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে কোনো জায়গার গুরুত্ব বিচার এবং যাত্রাপথ ঠিক করো, অথচ সেখানে আরো যা দেখার বিষয় বরং বলতে গেলে যেগুলো আসলেই দেখার  কিন্তু প্রচলিত নয় অথচ দিনের পর দিন বছরের পর বছর ইতিহাসের স্বাক্ষী বহন করে চলেছে তাদের উপেক্ষা করো অথবা জানতেই চাওনা।

একমাথা সাদা চুল আর বয়সের ভারে সামান্য নুইয়ে পরা মাথা র ওজন যে কতখানি তা আমি ভালো করেই জানি। তাই আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 

– রায়গঞ্জ এ এরকম কিছু আছে নাকি বাগচী বাবু?

– ভায়া,শুধু রায়গঞ্জ কেনো প্রতিটি জায়গারই এরকম নিজস্ব কিছু লুকনো গুপ্তধন আছে যা প্রকৃতি যক্ষের মতো আগলে রাখে। রায়গঞ্জে নয়,সেখান থেকে ২৫ কিমি দূরে একটি গ্রাম আছে বিন্দোল। একসময় এটি বর্তমান বাংলাদেশের ভাতুরিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিলো। বিন্দোল থেকে ভাতুরিয়ার দুরত্ব মাত্র সাত কিমি।

– তারমানে বিন্দোল আর বাংলাদেশের বর্ডার খুবই কাছে। 

– হ্যা শুধু কাছেই নয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিক এবং আতংক দু দিক থেকেই।

এবারে আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। – ঐতিহাসিক তো না হয় বুঝলাম কিন্তু আতংক কেনো?

– ভায়া, এ এক গল্প, না গল্প নয় বলতে পারো ভয় ভক্তি আর আধ্যাত্মিকতার এক অসাধারণ মকটেইল। 

এই বলে বাগচী বাবু নিজের পা দুটো রঞ্জিত দার চায়ের দোকানের বেঞ্চে উঠিয়ে বাবু হয়ে বসলেন। বুঝলাম এবার শুরু হবে ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী। তারসাথে এই ভেবেও শিহরিত হচ্ছিলাম আগামী শুক্রবার আমার আর ক্যামেরা ম্যান সায়নের রাধিকা পুর এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট, গন্তব্যস্থল উত্তর দিনাজপুর। 

– সুলতানি শাসনের মধ্যসময় আনুমানিক ১৪৭০-৮০ তে এই ভাতুরিয়ার জমিদার ছিলেন গনেশ নারায়ণ। তিনি ছিলেন শিব ভক্ত। তারই নির্দেশে তৈরি হয় বিন্দোলের ভৈরবের মন্দির। লোককথা অনুযায়ী গনেশ নারায়ণ স্বপ্নাদেশ পেয়ে তৈরি করেছিলেন ইট, পাথর, চুন সুড়কি দিয়ে।মন্দিরে দশম শতাব্দীর  একটি কালোপাথরের অপূর্ব কারুকার্য খচিত মার্তণ্ডের মূর্তি রয়েছে। সৌর দেবতার অষ্টমজন মার্তণ্ড ও সূর্যরথ ও ঘটকসমূহ তাঁর বাহন। এই মার্তণ্ড মূর্তির রথে ফুটে থাকা একটি  পদ্মের উপর অবস্থান    । বেদীতে সাতটি ঘোড়া খোদায় করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে ঊষা ও প্রত্যুষা নামে আরও দু’টি নারী মূর্তি। মূল মূর্তিটি  মার্তণ্ড ভৈরবের মূর্তি বলে পরিচিত। মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় সাড়ে তিনফুট।

মন্দিরের উত্তর পূর্ব কোনে প্রায় চারশো মিটার এর একটা সুড়ঙ্গ রয়েছে।পুজোর  ফুল পাতাএই সুড়ঙ্গ দিয়ে মন্দিরের পেছনে চারশো মিটার দুরের তাল দিঘিতে গিয়ে ভেসে উঠতো। 

এমন সময় রঞ্জিত দা কাচের গ্লাশে বাগচী বাবুর চিনি ছাড়া দুধ চা দিয়ে গেলো। গ্লাশে একটা চুমুক দিয়ে স্বস্তির একটা শব্দ করে পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করলেন পতাকা বিড়ির একটা প্যাকেট। বাগচী বাবুর এই অভ্যেস আমি প্রায় সাত বছর ধরে দেখে আসছি। চা য়ের সাথে বিড়ি, আর চা ফুরালে মুখে এক টুকরো সুপুরি আর সাথে জ্বালাবেন মিডিয়াম গোল্ডফ্লেক। বিড়িতে টান দিয়ে বাগচী বাবু আবার শুরু করলেন,

– তা, মন্দির তো হলো মূর্তিও বসলো কিন্তু কথা হলো নিত্য পুজো করবে কে। গনেশ নারায়নের বাড়ির পৌরহিত্য করতেন রামাচরন ভট্টাচার্য। অত্যন্ত শিক্ষিত, ধার্মিক এবং সদা হাস্যমুখ প্রায় আশি র ঘরের বৃদ্ধ। হোক মাত্র সাত কিমি তবুও সেইসময় এই সাত কিমি আসা যাওয়া একজন বৃদ্ধের পক্ষে মোটেও সম্ভব ছিলনা। নিত্য পুজোর উপকরণ জোগাড় , সাজানো, মন্দির পরিস্কার, তালদিঘি কে পরিস্কার করা এসবের জন্যে জমিদার গনেশ নারায়ন লোক নিয়োগ করলেন। কিন্তু নিত্য পুজো তো আর যাকে তাকে দিয়ে হবেনা বিশেষ করে ভৈরবের প্রান প্রতিষ্ঠা। অগত্যা  জমিদার বাবু রামা চরন ভট্টাচার্য কেই অনুরোধ করলেন সঠিক তিথি দেখে ব্যবস্থা করার। 

তিথি নক্ষত্রের অবস্থান অনুযায়ী রামা চরন বাবু আগামী পুর্নিমা তিথি কে স্থির করলেন। সেটি ছিলো শ্রাবণ মাস। হালকা ঝোড়ো বাতাস আর সাথে ছিলো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। চারদিকে বুনো গাছ আর বন্য ফুলের গন্ধের মাঝে ধুপ ধুনোর গন্ধ আর মন্দিরের ঘন্টার আওয়াজ এক অসাধারণ কাল্পনিক জগতের সৃষ্টি করলো। রামাচরন বাবু আসনে উপবিষ্ট ।সামনে সাজানো ফুলের পাত্র, জলের পাত্র, কাশা কুশি, তিল,নৈবেদ্য, রক্ত চন্দন, শ্বেত চন্দন, বেলপাতা, আতপ চাল, ঘি, মধু, নানারকম ফল, মিষ্টি আরও নানাবিধ পুজোর উপকরণ। পাশে বসে জমিদার গনেশ নারায়ন খালি গায়ে সাদা ধুতি গায়ে উত্তরীয়। জমিদার বাড়ির মেয়েরা উপকরণ এগিয়ে দিচ্ছে আর একমনে মন্ত্র পাঠ করে চলেছেন রামা চরন ভট্টাচার্য। চারিদিকে ভীড় করে আছে গ্রামের অনেক মানুষ। দেখতে দেখতে দুপুর পেরিয়ে বিকেল হলো। একসময় মন্ত্রপাঠ এর বিরতি দিয়ে রামাচরন বাবু আসন ছেড়ে উঠে দাড়ালেন।মধ্যমায় রক্ত চন্দন, বুড়ো আঙুল আর কনিষ্ঠায় ধরা বেল পত্র আর আতপ চাল।প্রান প্রতিষ্ঠা র শুভ সময়। রামাচরন এর সাথে জমিদারও উঠে দাঁড়িয়েছেন। ভৈরবের মূর্তির দিকে এগোতে যাবেন এমন সময় আকাশে সজোরে মেঘ ডেকে উঠলো। রামাচরন বাবু থমকে দাঁড়িয়ে পরলেন। 

– কি হলো ঠাকুর মশাই?  জমিদারের চোখে মুখে উৎকন্ঠার ছাপ। হাতের ঈশারায় তাকে চুপ থাকতে বললেন রামা চরন। কয়েক মুহূর্তে র অপেক্ষা তারপরেই বেজে উঠলো মন্দিরের বড়ো ঘন্টা। সবাই মুখ ফিরিয়ে মন্দিরের বারান্দায় তাকাতেই দেখতে পেলো এক অদ্ভুত দৃশ্য। রক্তবস্ত্র পরিহিত এক আলো আঁধারে ঢাকা মহিলা মূর্তি। মাথার জটা চুল নেমে এসেছে কোমড়ের নিচ অবধি।গলায় ঝুলছে শ্বেত বেড়েলা, রুদ্রাক্ষ আরও নানাবিধ গাছের শেকড় দিয়ে বানানো মালা, কোমড়ের ঘাটে স্থান পাচ্ছে  গাজার কল্কে।মাথার জটা চুলে কোন এক প্রানীর কালো হয়ে যাওয়া শিং। সমস্ত মুখ অমাবস্যার কালো রঙে মাখানো কিন্তু তাতে সাপের মনির মতো উজ্জ্বল দুটো টানা টানা চোখ। সেই চোখের দৃষ্টি প্রার্থিব হতেই পারেনা।দুই হাতে শাখা পলা মাথায় লেপটানো সিদূর জটা চুলের মধ্যভাগ অবধি বিস্তৃত। নগ্ন পায়ে আলতার ছাপ।ডানহাতে ত্রিশূল আর সেই ত্রিশুলের মাথায় আকা রয়েছে এক রক্ত বর্ন চোখ।

সবাই  এই দৃশ্য দেখে হতবাক, এমনকি জমিদার গনেশ নারায়ণ ও  দেওয়ালের দিকে কিছুটা সরে গেলেন। কিন্তু রামা চরন ভট্টাচার্য র মুখে ভেসে উঠলো তৃপ্তির হাসি আর চোখে এলো সাধনা প্রাপ্তির অবর্ননীয় তৃপ্তি র জল। 

দ্বিতীয় পর্ব… 

রামা চরন ভট্টাচার্য এগিয়ে এসে দু হাত জোড় করে নমস্কার করলেন। অভয় মূদ্রার সাথে ধীরে ধীরে সেই নারী মূর্তি প্রবেশ করলেন মন্দির গৃহে। উচ্চারণ করলেন, ওম নমহঃ শিবায়ো ধ্বনি। হতবাক জমিদার, বিস্ফারিত সমস্ত মানুষ। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রামাচরন এর আসনে তিনি উপবিষ্ট হলেন। আসন শুদ্ধি মন্ত্র পাঠ করে ধ্যানে নিমগ্ন হলেন ভৈরবী। সমস্ত মন্দির যেন এক লহমায় ভরে উঠলো স্বর্গীয় পবিত্রতায়। জমিদার আর আসন গ্রহণ করার সাহস পেলেন না তিনি আর সবার মতোই দাঁড়িয়ে রইলেন হতবাক কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে। সময় বয়ে যেতে লাগলো। সূর্য সম্পূর্ণরুপে অস্ত যাওয়ার পর ভৈরবী মা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন ভৈরব মূর্তির দিকে।বেলপত্র আর দুধ জল আর আতপ চাল দিয়ে অভিষেক করলেন মূর্তিকে। এবারে ধ্বনি দিয়ে উঠলেন রামাচরন ভট্টাচার্য মহাশয় আর তার সাথে মন্দিরে হাতজোড় করে থাকা সমস্ত গ্রামবাসী। 

রঞ্জিত দা দু গ্লাস  চা দিয়ে গেল। আমারটা হাতে নিয়ে প্রশ্ন করলাম -কিন্তু ভৈরবী মা এলেন কোথা থেকে?

বাগচী বাবু  বিড়ি বের করতে করতে বললেন,- এই গল্পে অনেক প্রশ্নই উঠে আসবে ভায়া, যার সব উত্তর পাওয়া যাবেনা। সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা এখনো তোমাদের বিজ্ঞানের নাগালের বাইরে।তাই মাথায় প্রশ্ন না এনে ঘটনার মধ্যে ঢুকে যাও। 

 রামাচরন বাবুর পরামর্শে জমিদার মন্দির লাগোয়া তালদিঘি র পারে সারি সারি তালগাছের ছায়ায় মা ভৈরবীর থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। মন্দিরের তালা চাবি দেখে ভৈরবী মা কৌতুকের সুরে বললেন,- তালা কেনো রে?

রামাচরন বাবু বললেন –  মা, মন্দিরে যাতে চুরি না হয় অথবা কুকুর ছাগল যাতে না ঢোকে তারজন্যে।

ভৈরবী হাসেন,বলেন- ওরে পাগল ঐ কুকুর ছাগলও তো বাবারই সৃষ্টি। আর চোর কি নিয়ে যাবে? বাবার পুজোর উপকরণ?  বাবার তো কিছু লাগেনা রে। দরজা খোলাই রাখ। আর নিশ্চিন্ত থাক,কিছু হবেনা। আমি আছি।

শেষের দুটো শব্দে এক অদ্ভুত রকম অনুভূতি হলো রামাচরন এর মনে। মনে হলো বহুদূর আকাশ থেকে দৈববাণী র মতো শোনা গেলো, – আমি আছি।

………………………….

সুখার বাড়িতে আজ খুব আনন্দ। সুখার বৌ আজ মা হবে। গ্রামের দাইমা এসে আরো দুজন মহিলাকে নিয়ে সুখার বৌকে যে ঘরে রাখা হয়েছে সেখানে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো।সুখার ভাই শ্যামা আরও গ্রামের দু একজন মুরুব্বী সুখাকে নিয়ে বাড়ির উঠোনে। সুখার বৌ এর চিৎকার থামার সাথে সাথে একটি সদ্যোজাত শিশুর কান্না শোনা গেলো। সুখা আনন্দে জড়িয়ে ধরলো ভাই শ্যামাকে। সবাই উদগ্রীব হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে। দাইমা দরজা খুলে বেরোলো, ছেলে হয়েছে রে তোর সুখা। হাতে কাপড়ে জড়ানো সুখার একমাত্র বংশধর। আনন্দে সুখার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরলো জলের ধারা। 

মাঠে হাল বইতে বইতে সুখার মনটা হটাৎ কু গেয়ে উঠলো। সকালে বাচ্চাটার গায়ে জ্বর দেখে এসেছে। তার যতটা সামর্থ্য তার মধ্যে চিকিৎসার কোনো ত্রুটি রাখেনি।তবুও জ্বর যাচ্ছেনা। কবিরাজ বলেছেন আজকের দেওয়া বড়িতেও যদি কাজ না হয় তাহলে শহরে বড়ো ডাক্তার দেখাতে হবে। অন্নসংস্থান এর জন্যে অন্যের জমিতে হাল বওয়া সুখার কাছে তা অসম্ভব। এই সামর্থ্য সুখার নেই। ছেলেটার জল ভরা চোখ দুটো ভেবে মনটা হাহাকার করে উঠলো।আকাশের দিকে তাকিয়ে দুটো হাত নমস্কার করে কার কাছে যেন কি অনুরোধ করলো সুখা। সন্ধ্যে হওয়ার একটু আগে সুখা জমি থেকে নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিলো। জমি থেকে সুখার বাড়ি প্রায় মাইল দুয়েকের পথ। মাঝে পরে ভৈরব মন্দির। গামছা কোমড়ে জড়িয়ে কাধে কোদাল নিয়ে সুখা তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে পা চালালো। মন্দির আসার আগেই সন্ধ্যে নামলো। মন্দিরের সামনে ঘনো জংগল। 

-এখন পাকা রাস্তা হয়েছে তখন তা ছিলোনা। অবশ্য এখনও রাস্তা থেকে নেমে বেশ কিছুটা জমির আলের ওপর দিয়ে গেলে মন্দির পাবে।

এই বলে চা য়ের গ্লাসটা নামিয়ে রেখে একটা গোল্ডফ্লেক ধরালেন বাগচী বাবু। আমি অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছি বাগচী বাবুর দিকে। 

মন্দিরের গন্ডীর মধ্যে প্রবেশ করার সাথে সাথে বুনো ফুলের মিষ্টি গন্ধ আর শীতল হাওয়ায় প্রানটা জুড়িয়ে গেলো । সারাদিনের হাড়ভাঙা  পরিশ্রম আর এতোটা পথ দ্রুত আসার জন্যে সুখা খুব ক্লান্ত হয়ে পরেছিলো। জলতেষ্টা ই গলা শুকিয়ে এসেছে। তালপুকুরের পরিস্কার টলটলে জল খুব মিষ্টি। সুখা তালপুকুরের পারে বসে দুহাতে সেই জল নিয়ে তেষ্টা মিটিয়ে পারের ওপরে উঠে আসতে গিয়েই চমকে গেলো সাথে ভয়ও পেলো। পারের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে মা ভৈরবী। জ্যোৎস্নার  আলোয় ভৈরবী কে দেখে মনে হচ্ছে সাক্ষাৎ মা কালী। সুখা দুহাত জড়ো করে ভৈরবী কে প্রনাম করলো। নিচু জাত বলে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে রইলো সুখা। 

– আয় আমার সাথে আয়।

সুখার মনে হলো ছোটোবেলায় হারিয়ে যাওয়া মা যেন তাকে ডাকছে। সে কোনো কথা না বলে ভৈরবীকে অনুসরণ করলো। ভৈরবী মন্দিরের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো। সুখা মন্দিরের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকলো। সে জাতে মুচি, কি করে মন্দিরে প্রবেশ করবে। এমন সময় মা য়ের ডাক এলো।

– কি রে বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো, ভেতরে আয়।

– কিন্তু মা আমি তো মুচি। কথাটা বলেই নিশ্বব্দে দুফোঁটা জল সুখার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরলো।

– আমাকে তো মা ডেকেছিস, তাহলে তুইও যা আমিও তা।আমি ঢুকতে পারলে তুই কেনো পারবি না? আয়, ভেতরে আয়। 

এই ডাক উপেক্ষা করার ক্ষমতা সুখার নেই। ছুটে এসে লুটিয়ে পরলো  ভৈরবের মূর্তির সামনে। অঝোরে পরা চোখের জল মন্দিরের মেঝেকে যেন আরো পবিত্র, আরো স্বর্গীয় মায়ায় ভরিয়ে তুললো। কতক্ষন চোখের জল ভৈরবের কাছে নিবেদন করেছে সুখার জানা নেই হটাৎ মাথায় এক শীতল ছোয়া।

– নে ওঠ, এবারে ওঠ। বাবা তোর মনের কথা শুনেছে। এই নে, এই ফুলটা  বাড়ি গিয়ে ছেলেকে খাবারের সাথে খাইয়ে দে।বাবার ইচ্ছায় সব ঠিক হয়ে যাবে। 

বলে একটা নীল অপরাজিতা সুখার হাতে দিলো মা ভৈরবী। সুখা সাষ্টাঙ্গ হয়ে মা ভৈরবীকে প্রনাম করে বাড়ির দিকে ছুটলো। যেতে যেতে শুনতে পেলো মন্দিরের ভেতর থেকে মায়ের গলায়, ওম নমহঃ শিবায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights