পাকিস্তানের চাল ফুটবে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে
অমিত গোস্বামী
বাংলাদেশে নির্বাচন আসছে। বাংলাদেশের দখলদার সরকার চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পাকিস্তানের ঘরোয়া বাজার থেকে চাল কেনার দরপত্র আহ্বান করল। এই সরকারের খাদ্য দপ্তরের মতে গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে চলতি বছরের অক্টোবরের মধ্যে সে দেশে মোটা, মাঝারি এবং সরু— সব ধরনের চালের দামই বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মাসে বাংলাদেশে মোটা চালের দাম (বাংলাদেশি মুদ্রায়) ছিল ৫২.৪৩ টাকা, মাঝারি দানার চালের দাম ছিল ৬২.৪৩ টাকা এবং সরু দানার চালের দাম ছিল ৭৭.১০ টাকা। যদিও ট্রেডিং কর্পোরেশন অফ বাংলাদেশ-এর বক্তব্য ঢাকায় চালের দাম আরও বেশি (২০ নভেম্বরের তথ্য অনুসারে)। এ অবস্থায় চাল আমদানি বৃদ্ধি করে বাংলাদেশের বাজারে চালের দাম সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বেশ কয়েক দফায় পাকিস্তান থেকে ৫০ হাজার টন চাল আমদানি করে বাংলাদেশ এবং ভারত থেকে রপ্তানিকৃত চালের চেয়ে অধিক মূল্যে। কিন্তু তাতেও চালের জোগানে টান ধরেছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অফ পাকিস্তান এক লক্ষ টন চাল কেনার জন্যে আন্তর্জাতিক বাজারে দরপত্র আহ্বান করেছে। এর মূল কারণ একেই চাল উৎপাদক দেশ হিসেবে পাকিস্তান ক্রমশই জায়গা হারিয়েছে। তার ওপরে সিন্ধু নদীর জলস্রোত ভারত স্তিমিত করে দিয়েছে।
পৃথিবীর চাল উৎপাদনে প্রথমেই যে দেশগুলি তারা হচ্ছে চিন ও ভারত। চিনের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ২০ কোটি ৬৬ লাখ টন। ভারতের বার্ষিক উৎপাদন ২০ কোটি ৬৭ লাখ টনেরও বেশি। এই দুটি দেশের পর বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চাল উৎপাদন করে। যদিও বাংলাদেশের ‘প্রথম আলো’র সুত্র অনুযায়ী ২০২৪ এর উৎপাদন এই রকমঃ চিন – ১৪ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন । ভারত – ১৪ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন। বাংলাদেশ – ৩ কোটি ৬৬ লাখ মেট্রিক টন। ইন্দোনেশিয়া – ৩ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন। ভিয়েতনাম – ২ কোটি ৬৫ লাখ মেট্রিক টন। থাইল্যান্ড – ২ কোটি ১ লাখ মেট্রিক টন। ফিলিপাইন – ১ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন। মিয়ানামার – ১ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। পাকিস্তান – ১ কোটি মেট্রিক টন। ব্রাজিল – ৮০ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাল উৎপাদনে তৃতীয় বাংলাদেশের চাল কেনার জন্যে দ্বারস্থ হতে হয়েছে চাল উৎপাদনে নবম পাকিস্তানের কাছে যাদের উৎপাদন বাংলাদেশের চার ভাগের এক ভাগ।
এদিকে বাংলাদেশের চাল আমদানি গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (FY25) সাত বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। চাল আমদানি করতে হয়েছে ১৪.৩৬ লক্ষ টন চাল। এর আগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের চাল উৎপাদন প্রাকৃতিক কারণে এতটাই নেমে গিয়েছিল যে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি এড়াতে তৎকালীন সরকার ভারতের কাছে আবেদন করেছিল। ভারত সুলভ মূল্যে চাল দিয়েছিল ৩১.৬ লক্ষ টন। এই তথ্য আইআরইএফ –এর। গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের দৈনিক জনকন্ঠ’র প্রতিবেদনে লিখছে – “বিশ্ববাজারে চালের দাম গত এক বছরে ১৩ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশে বেড়েছে ৮ শতাংশ। বৈশ্বিক বাজারে চালের দাম গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এলেও বাংলাদেশে বেড়েছে। সরকারি সংস্থা টারিফ কমিশনার হিসেব অনুযায়ী দেশে প্রতি বছর চালের চাহিদা ৩ কোটি ৫০ লাখ টন থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অথ্য অনুযায়ী গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ কোটি ১৫ লাখ টনের বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। যে কারণে বলা হয় চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রায় স্বনির্ভর। অর্থাৎ দেশে চালের উৎপাদন হয়েছে ৩৫ থেকে ৬৮ লাখ টন বেশি। এ সময়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হয়েছে ১৪ লাখ টনের বেশি।“ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের এইমুহুর্তে কন্ঠ রোধ করায় তারা এই মুহুর্তে এর কারণ বর্ণনা না করলেও গল্পটা সহজবোধ্য।
ভারতের চাল ব্যবসায়ীরা এই মুহুর্তে চাল রপ্তানিতে আগ্রহী নয়। তার কারণ বাংলাদেশ ভারতীয় পণ্যে প্রতি কিলোমিটার প্রতি কেজিতে যে কর বসিয়েছে তা তাদের কাছে গ্রহনযোগ্য নয়। চিনের নিজ চাহিদা মেটাতে উৎপাদিত চাল খরচ হয়। তাহলে দেবে কে? দুর্ভাগ্যবশত পাকিস্তানের লেজ ধরতে হয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু তার প্রয়োজন ছিল কি? এককথায় একেবারেই নয়। আগে সরু ফাইন চাল ভারত থেকে যেত। এর বাইরে যা যেত সেটা চাহিদা-জোগানের ভারসাম্য রাখার জন্যে। বিরাট কোন কারণ নেই। কিন্তু এবারে বাংলাদেশ মরিয়া হয়ে পাকিস্তানের কাছ থেকে চাল কেনার জন্যে ঝুলে পড়ল এ’কথা জেনেও যে অন্য কোন দেশের চাল অয়াকিস্তান মারফৎ তারা কিনতে চলেছে যার মূল্য অধিক ও সেই চালের মাণের গ্যারান্টি সেই দেশ দেবে না। এই উদ্যোগের কারণ একটাই। তা হল আর্থিক দুর্ণীতি। নির্বাচন হয়ে গেলে নতুন সরকার আসবে এবং ইউনুস গংয়ের হাতে ক্ষমতা থাকবে না। কাজেই ‘খিঁচে লে, খিঁচে লে, আয়ো আয়ো খিঁচে লে’, তাতে দেশ জাহান্নামে গেল যাক, গঙয়ের কী! অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ফুটবে তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তগন্ধী ভাত। তিন লক্ষ মা-বোনের ইজ্জৎ হারানো শব্দে ফুটবে পাকিস্তানী চাল। সে ভাতে তৃপ্ত হবে নিখাকী বাঙালি।

অমিত গোস্বামী

A popular poet, columnist, and writer from Kolkata, equally popular among Bangladeshi readers. He also has stage and film acting credits. He is known for his sharp criticism of current affairs in the light of reality and facts.
***Published under freedom of expression, IBG NEWS neither agrees nor disagrees with the author’s view***

















