আরশোলা আন্দোলনের লক্ষ্য শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা নয়, ভারতে অস্থিরতা সৃষ্টি
অমিত গোস্বামী
ধর্মেন্দ্র প্রধানের উত্থান প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলন থেকেঃ
নিটের প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে দিল্লির রাস্তায় দীর্ঘ দিন ধরে আরশোলা আন্দোলন চলছে। দাবি উঠেছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের। এখানেই রাজি নয় কেন্দ্রীয় সরকার। এই আবহে প্রকাশ্যে এসেছে প্রায় ৩০ বছর আগের একটি ঘটনা। সালটা ১৯৯৭। কংগ্রেস-শাসিত ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জানকীবল্লভ পট্টনায়ক। তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধেও ওঠে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ। ফলে ভুবনেশ্বরে জানকীর বাসভবনের কয়েক কিলোমিটার দূরে ধর্নায় বসেন হাজার দেড়েক ছাত্র-ছাত্রী। তাঁদের নেতৃত্ব দিয়ে রাতারাতি খবরের শিরোনামে উঠে আসেন আজোকেড় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। সে’দিন তার বক্তব্য ছিল, কোনও অবস্থাতেই এর দায় এড়াতে পারে না জানকী পট্টনায়ক সরকার। ধর্মেন্দ্র প্রধান উর্দিধারীদের হাতে বেধড়ক মার খেয়েছিল। ওর বেশ কয়েকটা হাড়ও ভেঙে যায়। তবে আন্দোলনের জায়গা থেকে সরে আসেনি। কিন্তু আজ কেন নরেন্দ্র মোদী সরকার ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিয়ে গররাজী?
ধর্মেন্দ্র প্রধানের সাংগঠিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা প্রশ্নাতীতঃ
ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উঠে আসা ধর্মেন্দ্রের সাংগঠিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা প্রশ্নাতীত। ২০২১ সালে শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার আগে পেট্রলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। এ ছাড়া সামলেছেন দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা মন্ত্রকও। ২০২৪ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে উড়িষ্যা রাজ্যের কুর্সি দখল করে পদ্ম শিবির। ওড়িশায় বিজেপির এই বিপুল জয়ের কৃতিত্ব অনেকাংশেই ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দিয়ে থাকেন রাজনৈতিক মহল। চলতি বছরের ৩ মে ডাক্তারির প্রবেশিকা নিটের (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট) প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা বাতিল করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। ৮ মে সিবিআই তদন্দের নির্দেশ দেন। ১৫ মে ধর্মেন্দ্র প্রধান সর্বসমক্ষে প্রকাশ্যে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। ২১ মে পুনর্বার নিট পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং কম্পিউটার বেসড টেস্ট পদ্ধতির মাধ্যমে যাতে দুর্নীতি না হয়। ২১ জুন পুনরায় নিট পরীক্ষা হয়। ১৬ জুলাই রেজাল্ট বের করা হয়। এখন কাউন্সেলিং চলছে। তাই সরকারের বক্তব্য খুব পরিস্কার এই যে প্রশ্নপত্র ফাঁস নতুন নয়। কিন্তু এত দ্রুত দোষীদের ধরা ও পুনরায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করে ফলপ্রকাশের কৃতিত্ব তো ধর্মেন্দ্র প্রধানের। দোষী কারা ছিল?
দোষীদের কীর্তি আজ সর্বসমক্ষেঃ
পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক পি ভি কুলকার্নি ছিলেন কেমিস্ট্রির প্রশ্নকর্তা প্যানেলে। দ্বিতীয়জন মনীষা মান্ধারে যিনি ছিলেন জীবনবিজ্ঞানের প্রশ্নকর্তাদের প্যানেলে। এবারে দেখুন আরেকজন বিউটি পার্লার চালানো মনীষা বাঘমারেকে। সে ও তার বয়ফ্রেন্ড ধনঞ্জয় লোখান্ডে এই দুই অধ্যাপকের প্রশ্নপত্র বিক্রির এজেন্ট হলেন। এদের মাধ্যমে প্রথম মক টেস্টের নামে হুবহু প্রশ্নপত্র পায় মহারাস্ট্রের কিছু ছাত্রছাত্রী। এবার মঞ্চে এন্ট্রি ঘটে নাসিকের বিএমএস-এর ছাত্র শুভম খেরনারের। এই ছেলেটি মনীষা বাঘমারের কাছ থেকে ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে প্রশ্নপত্র কেনে। সে আবার রাজস্থানের জয়পুরের মাঙ্গিলাল বেওয়ালকে ১৫ লক্ষ টাকায় বিক্রি করে দেয়। মাঙ্গিলালের ছেলে পরীক্ষার্থী ছিল। কিন্তু মাঙ্গিলাল ব্যবসায়ী। সে এই বিনিয়োজিত টাকা তোলার জন্যে ছেলের বন্ধুদের অভিভাবকদের এই প্রশ্নপত্র বিক্রি শুরু করে। ইতিমধ্যে সিখরের এক ছাত্র এই প্রশ্নপত্র পায় ও তার বাবাকে পাঠিয়ে জানায় যে প্রশ্নপত্র পেয়েছি, টাকা পাঠাও। সেই ভদ্রলোক সোজা সিখর থানায় যায় ও এফআইআর করে। পরীক্ষা হতেই দেখা যায় হুবহু সেই প্রশ্নপত্র। কাজেই সরকার ঘোষনা করে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।
সমস্যার সমাধান ‘ইগো’য় আটকে আছেঃ
এত দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সত্তেও ৬ জুন ২০২৬ দিল্লির যন্তর মন্তর রোডে ককরোচ জনতা পার্টি বিক্ষোভের ডাক দেয়। উদ্দেশ্য দেশকে অস্থির করা। এদের সাথে যোগ দেয় প্রথমে অতি বাম ও বিভেদকামী কিছু দল, সোনম ওয়াংচু ও পরে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি। বড়জোর দশ থেকে পনেরো হাজারের বিক্ষোভ। কেন্দ্রীয় সরকার প্রথম থেকেই নমনীয় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা পাথর ছুঁড়তে শুরু করায় চরিত্র বদলে যায় আন্দোলনের। এর মধ্যেই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে স্পেশাল কমিশনার, জয়েন্ট কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার, একাধিক আইপিএস অফিসার-সহ অন্তত ১১৮ জন পুলিশ কর্মী জখম হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৬০ জন আন্দোলনকারীও। আজ ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিনিধিদের ফের আলোচনায় ডাকল কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে জিতেন্দ্র ছাড়াও থাকবেন আর এক মন্ত্রী জেপি নড্ডা। নড্ডার বাড়ি বা অফিসে আলোচনা হতে পারে। কথা বলে সমস্যার সমাধানের আর্জি জানিয়েছেন মন্ত্রী। সরকার বার বার ডাকলেও নড্ডার বাড়ি বা দফতরে আলোচনায় রাজি নয় সিজেপি। ককরোচ পার্টির প্রধান অভিজিৎ দীপকে প্রস্তাব মতো নড্ডার বাড়ি বা অফিসে বৈঠকে বসতে তাঁরা নারাজ। তার দাবি, মন্ত্রীদের বাড়িতে গিয়ে কোনও আলোচনা হবে না। সকলের সামনে ‘জনগণের আদালতে’ আলোচনা করতে হবে। মন্ত্রীদের আসতে হবে বিক্ষোভস্থলে।
রাহুল গান্ধীর বালখিল্য আবদারঃ
নিট প্রশ্নফাঁস নিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য আগেই রাজি হয়েছিল নরেন্দ্র মোদীর সরকার। প্রশ্নফাঁস নিয়ে সংসদের উভয় কক্ষেই আলোচনার জন্য প্রস্তুত সরকার। কিন্তু এই আন্দোলনে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আজ তিন দফা দাবী করেছেন। তাঁর প্রথম দাবি, ধর্মেন্দ্রকে বরখাস্ত করতে হবে। দ্বিতীয় দাবি, ছাত্রদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। তৃতীয় দাবি, ছাত্রদের উপর হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকার পরিস্কার জানিয়েছে যে সংসদে আলোচনার জন্য কোনও পূর্বশর্ত রাখা যায়না। যে সব রাজ্যে কোনও না কোনও পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, সে সব নিয়ে আলোচনা হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করবেন না। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। কেন্দ্রে ২০১৪ সালে বর্তমান বিজেপি (NDA) সরকার ক্ষমতায় আসার আগে, অর্থাৎ মূলত কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউপিএ (UPA) সরকারের আমলে (২০০৪-২০১৪) এবং তার পূর্ববর্তী সময়েও বেশ কিছু বড় সর্বভারতীয় এবং রাজ্য স্তরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল। পাঞ্জাব (২০০২) পিএসসি, অন্ধ্রপ্রদেশ (২০০৬) মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবেশিকা, উত্তরপ্রদেশ (২০০৪-১২) সাব-ইন্সপেক্টর এবং শিক্ষকমিত্র নিয়োগ, আরো অনেক উদাহরণ আছে। তখন তো কোন মন্ত্রী এই দায় নিয়ে পদত্যাগ করেন নি।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ধর্মেন্দ্র প্রধান মুল উদ্যোগীঃ
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রশ্নফাঁসের এই চক্র কোনো নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের আমলের সমস্যা নয়, বরং এটি ভারতের পরীক্ষা এবং নিয়োগ ব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী ও পদ্ধতিগত ত্রুটি। ভারতে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটলে পরীক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের ‘বলির পাঁঠা’ করা হলেও প্রশ্নফাঁসের কারণে কোনো শিক্ষামন্ত্রীর (কেন্দ্রীয় বা রাজ্য) নৈতিক দায়বদ্ধতা স্বীকার করে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার কোনো সরাসরি নজির ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেই। কোন শিক্ষামন্ত্রী ক্ষমাপ্রার্থনাও করেন নি জনসমক্ষে যা ধর্মেন্দ্র প্রধান করেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বীকারই করা হয়নি যে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। আজ যখন ধর্মেন্দ্র প্রধান ভারতে পরীক্ষা পদ্ধতি সিবিটি পদ্ধতিতে আনার উদ্যোগ নিলেন, ঠিক তখনই আরশোলা আন্দোলন শুরু হল। সিবিটি (CBT) বা কম্পিউটার বেসড টেস্ট (Computer Based Test) হলো এমন একটি পরীক্ষা পদ্ধতি যেখানে খাতা-কলম বা ওএমআর (OMR) শিটের বদলে কম্পিউটারের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হয়। সনাতন (Pen and Paper) পদ্ধতির তুলনায় সিবিটি পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত অনেকটাই কম। এর পেছনে মূলত বেশ কয়েকটি প্রযুক্তিগত এবং পরিচালনাসংক্রান্ত কারণ রয়েছে যদিও প্রথাগত ‘প্রশ্নফাঁস’ (পরীক্ষার আগে প্রশ্ন বাইরে চলে আসা) সিবিটি-তে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ, তবে সিস্টেম হ্যাকিং-এর ঝুঁকি আছে। তবে, উন্নত ফায়ারওয়াল, নেটওয়ার্ক জ্যামার এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন ব্যবহার করে বর্তমানে এই ঝুঁকিগুলোকেও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সার্বিকভাবে বিচার করলে, প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে কাগজের পরীক্ষার চেয়ে সিবিটি অনেক বেশি আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
এ’ভাবে চললে পরিসমাপ্তি উজ্জ্বল নয়ঃ
পরিশেষে একটা কথা বলে রাখি। গনতান্ত্রিক নমনীয়তা যা নরেন্দ্র মোদী সরকার দেখাচ্ছে সেটা তাদের দুর্বলতা বলে কেউ কেউ মনে করলেও এই এপিসোডের পরিসমাপ্তি যে খুব ভালোদিকে এগোবে তা মনে করার কারণ নেই। ভারত কিন্তু বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা নেপাল নয়। এখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী জনগন। গণতন্ত্রে মিম বা সোশাল মিডিয়া বড় ভূমিকা নেয় না। ভূমিকা নেয় জনমত। গত তিন-চার দিনে ভারতীয় জনগন যে এই ঘটনায় তুমুলভাবে বিক্ষুব্ধ তা স্পষ্ট বোঝা গেছে তাদের মতপ্রকাশে। জনগন যদি রাস্তায় নেমে যায় এই আরশোলা আন্দোলনের বিরুদ্ধে সেটা সামলানো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ‘টুকরে গ্যাং’, অতি বাম, কিছু কংগ্রেসি ও সমাজবাদী কর্মীদের রক্ষা করাই তখন মাথাব্যথার কারণ হবে সরকারের। কলকাতা থেকে কুড়ি কোম্পানি কেন্দ্রীয় সুরক্ষা বাহিনীকে বিমানে তড়িঘড়ি দিল্লি পাঠানো হয়েছে বিমানে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা ও উদ্যোগ গ্রহণ সরকারের অবশ্য কর্তব্য। অবশ্যই সংসদে আলোচনা হোক। কিন্তু তা শর্ত সাপেক্ষে করতে চাইলে লাভ কিছুই হবে না। মাঝখান থেকে কিছু অতি উৎসাহী আরশোলা মারা পড়বে।
*** Published under freedom of expression IBG NEWS neither agree nor Disagree with the views of the author***













