Tuesday, September 29, 2026
WA
Home Bangla ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি শ্রীমতী দ্রৌপদী মুর্মুর ভাষণ

৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি শ্রীমতী দ্রৌপদী মুর্মুর ভাষণ

0
55
১৪ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে নয়াদিল্লিতে ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুর্মু জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন।
১৪ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে নয়াদিল্লিতে ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুর্মু জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন।

৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি শ্রীমতী দ্রৌপদী মুর্মুর ভাষণ

By PIB Kolkata

নয়াদিল্লি, ১৪ আগস্ট ২০২৬

আমার প্রিয় দেশবাসী,

নমস্কার!

স্বাধীনতা দিবসের পূর্ব সন্ধ্যায় আমি আপনাদের সকলকে এই জাতীয় উৎসবে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। এখন থেকে আর কয়েক ঘন্টা পর, আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষ উদযাপনের শুভারম্ভ হবে। দেশ-বিদেশের সকল ভারতীয় এই উৎসব আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করবেন। আমাদের ত্রিবর্ণ রঞ্জিত জাতীয় পতাকা আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক। আমরা গর্বের সঙ্গে এই পতাকা উন্মোচন করব।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতমাতা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। প্রত্যেক দেশবাসী স্বাধীন ভারতের ভাগ্য নিয়ন্তা। প্রত্যেক দেশবাসী তাঁদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে সমস্ত সুযোগকে কাজে লাগাতে পারবেন এবং ভারতকে জগৎসভার শ্রেষ্ঠ আসনে অধিষ্ঠিত করবেন – এর মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হবে।

নিষ্ঠাবান ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকা, উন্নয়নের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ বৈজ্ঞানিক ও ইঞ্জিনিয়ার, স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, মেহনতী শ্রমিক এবং আমাদের অন্নদাতা কৃষক – এঁরা নিজেদের উদ্যোগে দেশ গড়ার কাজে স্ব স্ব ভূমিকা পালন করছেন। প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ, কারুশিল্পী ও শিল্পী, দূরদর্শী বুদ্ধিজীবী, বেসরকারি ও সরকারি ক্ষেত্রের পরিশ্রমী কর্মীরা, জনসাধারণের সেবায় নিবেদিতপ্রাণ জনপ্রতিনিধিরা, বিচার ব্যবস্থার কর্মকর্তারা, কর্তব্যপরায়ণ সরকারি কর্মচারীরা, আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলা ছোট-বড় বিনিয়োগকারীরা, নিঃস্বার্থ সমাজকর্মীরা এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সামনের সারিতে থাকা প্রত্যেক সাফাই মিত্র—সকলেই দেশের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। অন্যান্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত অগণিত নাগরিক এবং আমাদের সংবিধানে উল্লিখিত মৌলিক কর্তব্যসমূহ বিশ্বস্ততার সঙ্গে যারা পালন করছেন অর্থাৎ প্রত্যেক নাগরিকই আমাদের জাতি গঠন প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার। আমি আপনাদের প্রত্যেককে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। আমি বিশেষত আমাদের তিন সশস্ত্র বাহিনীর সৈনিকরা, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং সব পুলিশ সদস্যের কর্তব্যনিষ্ঠার প্রশংসা করি। আমি প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায় এবং আমাদের দূতাবাসগুলিতে কর্মরত কর্মকর্তাদেরও প্রশংসা করি, যাঁরা বিশ্বমঞ্চে ভারতের মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করে চলেছেন।

প্রিয় দেশবাসী,

স্বাধীনতার শততম বর্ষে ২০৪৭ সালের মধ্যে আমরা বিকশিত ভারত গড়ার পথে এগিয়ে চলেছি। অন্ত্যোদয়ের ভাবনায় আমাদের সঙ্কল্প হল উন্নয়নের সুফল প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শকে পাথেয় করে আমরা আধুনিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছি। ‘বয়ম রাষ্ট্রে জাগ্রীয়াম’ – এই বেদবাক্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা দেশসেবার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকি। 

আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কালে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ একটি অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন – ভারতের স্বাধীনতা। স্বদেশী আন্দোলনের যুগে বন্দে মাতরম গানটি জনসাধারণের গান হয়ে উঠেছিল। অগণিত ভারতবাসী জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। বাবাসাহেব ডঃ ভীমরাও আম্বেদকর সামাজিক সংস্কার এবং দেশাত্মবোধের ভাবনায় উচ্চ এক আদর্শ গড়ে তুলেছিলেন। আমি ভারতমাতার সেইসব মহান সন্তানদের বিনম্র চিত্তে শ্রদ্ধা জানাই, তাঁদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। 

আজ ১৪ আগস্ট, আমরা বিভাজন বিভীষিকা স্মৃতি দিবস উদযাপন করছি। দেশভাগের সময় বিভিন্ন হিংসাত্মক ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছিলেন কিংবা বাস্তুচ্যুত হওয়ার মতো দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন, সেইসব লক্ষ লক্ষ ভারতবাসীকে আমরা স্মরণ করি। সাম্প্রদায়িক হিংসার কারণে এবং দেশভাগের বিভিন্ন বিভীষিকার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছিলেন। কিন্তু, তাঁরা তাঁদের পরিচিতিকে কখনও ত্যাগ করেননি।

আমাদের স্বাধীনতার সময় দেশভাগের মতো হৃদয় বিদারক ঘটনার পাশাপাশি ৫৫০টির বেশি রাজন্যশাসিত রাজ্যের সদ্য স্বাধীন ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সর্দার প্যাটেল রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে রাজন্যশাসিত রাজ্যগুলিকে আমাদের স্বাধীন গণতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। আধুনিক ভারতের একতার কারিগর, লৌহপুরুষ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের পবিত্র স্মৃতির প্রতি আমি বিনম্র চিত্তে শ্রদ্ধা জানাই। 

প্রিয় দেশবাসী,

ভারতের জনগণ যে সংবিধান তৈরি করেছেন, সেটি আমাদের জনসাধারণের অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের জননী ভারতভূমির নাগরিকরা জন-অংশীদারিত্বের ভাবনাকে লালিত করেন। সেই ভাবনাকে অনুসরণ করে নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনায় আমাদের দেশবাসী এগিয়ে চলেছেন। জনসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এটিই আমাদের গণতন্ত্রের অনুপ্রেরণাদায়ক অর্জন।

সকলের জন্য সমান সুযোগ এবং প্রত্যেকের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সংবিধানের মূল আদর্শ। আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাধারণ পটভূমিকা থেকে উঠে আসা মানুষেরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আজকের ভারতে প্রত্যেকে বড় বড় স্বপ্ন দেখতে পারেন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িতও হতে পারে। 

আমাদের সংবিধানে নির্বাহী, আইনসভা এবং বিচার বিভাগের দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা আছে। আইনসভায় জনগণের প্রতিনিধিদের কর্তব্য হলো তাদের আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরা। নির্বাহী বিভাগ রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।সম্পদের অভাবে কেউ যাতে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয় সেটি নিশ্চিত করা বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। সমাজের বঞ্চিত অংশের মানুষ সহ প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদার সঙ্গে সময়মতো ন্যায়বিচার পাওয়ার সমান অধিকার থাকা উচিত। 

প্রিয় দেশবাসী,

এক দশকের কিছু বেশি সময়কালে আমাদের দেশ প্রত্যক্ষ করেছে:

দ্রুত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন;

ঐতিহ্য ও উন্নয়নের মেলবন্ধনকে অগ্রাধিকার দেওয়া; এবং,

উন্নয়নের পথে অতীতের কয়েক দশকের পুরোনো অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা।

আমাদের দেশ মহাত্মা জ্যোতিবা ফুলের ২০০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করছে। মহাত্মা ফুলে এবং ক্রান্তি-জ্যোতি সাবিত্রীবাঈ ফুলে সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, মহিলাদের ক্ষমতায়ন এবং সাম্যের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন। তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করে, বিগত কয়েক বছর ধরে জাতীয় স্তরে সমাজের বঞ্চিত অংশের উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড নির্ধারিত হয়েছে। ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ দারিদ্রের নাগপাশ থেকে মুক্তি পেয়েছেন। বিশ্বের বৃহত্তম আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি ‘প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা’-র অধীনে প্রায় ৫৯ কোটি অ্যাকাউন্ট হোল্ডার ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩২ কোটিরও বেশি অ্যাকাউন্ট হোল্ডার মহিলা। বিনামূল্যে রেশন বিতরণের মাধ্যমে ৮০ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। ‘আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা’-র অধীনে ৬০ কোটি মানুষকে বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে। কিষাণ সম্মান নিধি এবং কিষাণ ক্রেডিট কার্ড কৃষি, দুগ্ধ, প্রাণী, মৎস্য ও মৌমাছি পালনের মতো কর্মকাণ্ডে যুক্ত কৃষকদের সহায়তা করেছে। 

একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উন্নয়ন যে দ্রুত এবং সুস্থায়ী হয় বিশ্বের ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই বহন করে। সাংস্কৃতিকভাবে গর্ববো্ধের মধ্য দিয়ে জাতির অভ্যন্তরীণ শক্তি দৃঢ় হয়, দেশজুড়ে আজ সেই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং সৎ আচরণের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রেখে গেছেন। ঐতিহ্য এবং উন্নয়নের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রেখে এগিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি।

ভারত বিশ্বের বৃহত্তম এবং শ্রেষ্ঠ ডিজিটাল পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে। গ্রামাঞ্চলে ছোট ছোট দোকান এবং রাস্তার বিক্রেতাদের মধ্যেও এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে আর্থিক লেনদেন সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি রিয়েল-টাইম ডিজিটাল লেনদেন ভারতেই সম্পন্ন হয়। ভারতের জনগণ এবং সরকার একযোগে সারা পৃথিবীর কাছে ডিজিটাল বিপ্লবের একটি উদাহরণ স্থাপন করেছে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সরকার স্বচ্ছভাবে জনগণের কাছে কল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দিয়েছে। 

আমাদের দেশে মহাসড়ক, জলপথ, রেলপথ ও আকাশপথে আধুনিক পরিকাঠামোর অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটেছে। এর ফলে নতুন নতুন উদ্যোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি হয়েছে।

আমার প্রিয় দেশবাসী,  

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে যুদ্ধবিগ্রহ হচ্ছে, তার ফলে সৃষ্ট অস্থির অবস্থা প্রতিটি দেশকে প্রভাবিত করছে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও, আমাদের অর্থনীতি বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান প্রধান অর্থনীতির মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভারতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের হার আন্তর্জাতিক স্তরে গড় প্রবৃদ্ধির হারের দ্বিগুণেরও বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ‘আত্মনির্ভর ভারত অভিযান’ আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।

আধুনিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলার পাশাপাশি, ভারত আন্তর্জাতিক স্তরে পরিবেশ সুরক্ষায়ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশ নির্ধারিত সময়ের আগেই ২০৩০-এর সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার নির্ধারিত কয়েকটি লক্ষ্য অর্জন করেছে। বিগত কয়েক বছরে, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উন্নয়ন অভূতপূর্ব গতি লাভ করেছে। 

জাতীয় স্বার্থই আমাদের বিদেশনীতির ভিত্তি। শান্তি, সহযোগিতা, আলোচনা এবং ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর আদর্শ আমাদের বিদেশনীতির স্তম্ভ। অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার জন্য আমরা অনেক দেশের সঙ্গে অবাধ বাণিজ্য চুক্তি করেছি। আমরা দক্ষিনী বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছি। আন্তর্জাতিকমঞ্চে আমাদের দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা নিয়ম মেনে চলা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী। রাষ্ট্রসংঘ এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেন যথাযথ প্রতিনিধিত্ব পায় সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আমাদের দেশের এই উদ্যোগ অনেক দেশের পক্ষ থেকে জোরালো সমর্থন পাচ্ছে।

আমার প্রিয় দেশবাসী,

প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও আমাদের মতোই সমান অধিকার রয়েছে। আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, আমাদের কোনো কাজ যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এই অধিকার ভোগ করার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করে। আমরা তাদের জন্য প্রকৃতির আরও সমৃদ্ধ দান যাতে রেখে যেতে পারি সেই চেষ্টা আমাদের করা উচিৎ। পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি আমাদের আস্থা আমাদের ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সাঁওতালি ভাষার একটি সাধারণ গানের এক গভীর অর্থ রয়েছে। পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু রচিত সেই গানের কয়েকটি লাইন হলো: 

দারে গুজুগ কান নাইল তে

মিরু চেনেয় রাগ বায়হা দায়া হায়া গে।

গুজুগ কান আপওয়াগ জাতি ধরম দারে

চেদাগ বাবোন রাগ বয়হা আবো অনা নাইল তে। 

এই গানে কবি একটি গাছ সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ায় শোকে কাতর এক তোতাপাখির কান্নার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: “ওগো আমার প্রিয় ভাইয়েরা! মরণাপন্ন গাছ দেখে তোতাপাখি বিলাপ করছে। ওগো আমার ভাইয়েরা! মানব সংস্কৃতির বৃক্ষ যখন ধ্বংস হচ্ছে, তখন আমরা, মানুষেরা, কেন বিলাপ করি না?” এই গানের বার্তা হলো, প্রত্যেক মানুষকে প্রাকৃতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। একটি সবুজ সতেজ গাছ মানব সমাজের নৈতিক আদর্শ এবং কল্যাণের প্রতীক। ‘এক পেড় মা কে নাম’ এবং ‘লাইফস্টাইল ফর এনভায়রনমেন্ট’ বা লাইফ-এর মতো প্রচারাভিযানের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের পরিবেশ রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

আমার প্রিয় দেশবাসী,

আমাদের মেয়েরা শিক্ষাক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করছে দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এছাড়াও, কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখা ড্রোন দিদি কিংবা বিমান বাহিনীর ফাইটার কমব্যাট লিডার পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। সম্প্রতি গ্লাসগোতে সমাপ্ত কমনওয়েলথ গেমসে, ভারতের মোট ১৩টি স্বর্ণপদকের মধ্যে ৮টিই মহিলারা জিতেছেন। আমাদের মহিলারা আর্থিক ক্ষেত্রে ক্রমশ স্বনির্ভরতা অর্জন করছে। ১০ কোটিরও বেশি নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য। ৩ কোটি লাখোপতি দিদি তৈরির একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। এখন আমাদের দেশ নতুন করে আরো ৩ কোটি লাখোপতি দিদি তৈরির লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। ‘মুদ্রা যোজনা’-র অধীনে আর্থিক সহায়তা প্রাপ্ত উদ্যোক্তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মহিলা।  

আর্থিক ক্ষেত্রে মহিলাদের স্বনির্ভর করে তোলার উদ্যোগের পাশাপাশি, আমরা অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানের ভূমিকাতেও তাদের দেখতে পাচ্ছি। ভোটাধিকার প্রয়োগকারী নারীর সংখ্যা যে বাড়ছে তা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য এক উল্লেখযোগ্য অর্জন। লোকসভা ও বিধানসভাগুলিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০২৩ সালে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ আইনটি প্রণীত হয়েছে। এই আইনের উদ্দেশ্যগুলি অর্জিত হলে নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে মহিলাদের ভূমিকা আরও বাড়বে এবং আমাদের গণতন্ত্র আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। 

আমাদের দেশের জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই তরুণ জনগোষ্ঠীই আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আমাদের দেশের যুবসম্প্রদায় প্রতিভাবান, অঙ্গীকারবদ্ধ এবং দক্ষ। আমি দেখেছি, তৃণমূল স্তরের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় যুব সম্প্রদায় উদ্ভাবনী ও বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরি করছে। এটি সমাজ ও দেশের প্রতি আমাদের যুব সম্প্রদায়ের নিষ্ঠারই প্রতিফলন।গড়পড়তা মাত্র ২৮ বছর বয়সের তরুণ একটি দলের সাম্প্রতিক সফল রকেট উৎক্ষেপণ মহাকাশে অনুসন্ধানের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। 

আমাদের অনেক যুবক যুবতী স্ব- নির্ভরতার পথ অনুসরণ করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উদ্যোগী হয়েছেন। তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের ফলে আমাদের দেশে একটি শক্তিশালী স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে। বিশ্বের প্রধান প্রধান সংস্থাগুলি ভারতীয় যুব সম্প্রদায়ের প্রতিভা ও নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে তাদের ওপর নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পণ করছে। এই ধরনের তরুণ কৃতী ব্যক্তিরা বিশ্বজুড়ে ভারতের যুবশক্তির সুনাম বৃদ্ধি করেছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মর জন্য ভারতের উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের প্রতি আমার আস্থাকে আরও শক্তিশালী করে। 

আমাদের ছাত্রছাত্রীরাই ভারতের ভবিষ্যতের স্থপতি। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেমন সরকার ও সমাজকে যেমন ঐক্যবদ্ধ থাকতে হয়, তেমনি আমাদের ছাত্রছাত্রীদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতেও যৌথ ও সম্মিলিত উদ্যোগে সকলের ভূমিকা থাকা আবশ্যক। সরকারি পরীক্ষাগুলি আমাদের ছাত্রছাত্রীদের সুযোগের জন্য প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে। সরকার এই পরীক্ষাগুলির সংস্কারের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এই সংস্কারগুলির উদ্দেশ্য হলো সরকারী পরীক্ষায় সম্পূর্ণভাবে অসদুপায় অবলম্বন বন্ধ করা এবং যুব সম্প্রদায়ের জন্য পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, আরও নিরাপদ ও আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।  

সরকারের উদ্যোগ এবং উদীয়মান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণদের জন্য নানা ধরণের নতুন নতুন পথ উন্মোচিত হচ্ছে। এই ধরনের নতুন সুযোগের সন্ধান করে আমাদের তরুণ তরুণীরা সাফল্যের নতুন পথে যাত্রা শুরু করতে পারেন।

আমাদের যুব সম্প্রদায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাই দেশের ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। আমাদের তরুণ তরুণীদের উৎসাহের সঙ্গে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করার দায়িত্ব পরিবার ও সমাজেরও রয়েছে।

আমাদের যুব সমাজের উন্নয়ন এবং জাতি গঠনের মাধ্যম হিসেবে খেলাধুলাকে গ্রহণ করা হচ্ছে। খেলো ইন্ডিয়া কর্মসূচির অধীনে, তৃণমূল থেকে জাতীয় স্তর পর্যন্ত দেশজুড়ে খেলাধুলার পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে। খেলাধুলার প্রসারের জন্য সরকার বিপুল বিনিয়োগ করছে। এই উদ্যোগগুলির সুফল পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিকক্ষেত্রে ক্রীড়া প্রতিযোগিতাগুলিতে আমাদের ক্রীড়াবিদদের নৈপুণ্য ও সাফল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। 

একদিকে যেমন বিশ্বের বৃহত্তম তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের দেশে রয়েছে, আবার প্রবীণ নাগরিকদের সংখ্যাও বাড়ছে। প্রবীণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ৬ কোটি প্রবীণ নাগরিক বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিসেবা পেতে পারেন। সমগ্র সমাজের উচিত প্রবীণ নাগরিকদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া, তারা যে আমাদের নিজের লোক, সেই অনুভূতি জাগিয়ে তোলা এবং তাদের আত্মসম্মান যাতে বজায় থাকে সেটি নিশ্চিত করা।  

আমার প্রিয় দেশবাসী, 

মানবতার যারা শত্রু সেই শক্তিকে পরাস্ত করে সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করার ঐতিহ্যে আমরা গর্বিত। ২৬শে জুলাই আমরা কার্গিল বিজয় দিবস পালন করেছি। এর আগে, ৭ই মে আমরা ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সূচনার এক বছর পূর্তি উদযাপন করেছি। আমরা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর অতুলনীয় বীরত্বকে স্মরণ করেছি। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সেই ঐতিহাসিক অভিযানের মাধ্যমে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর নিখুঁতভাবে কাজ করার ক্ষমতা প্রদর্শিত হয়েছে। এর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ এবং তাদের সমর্থকদের কাছে একটি স্পষ্ট ও দৃঢ় বার্তা পাঠান হয়, তারা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, তাদের কাজের ফল ভোগ করতে হবে। যে দেশ সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় দেয়, তার সঙ্গে সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করা আমাদের দেশের, বিশেষ করে কৃষকদের স্বার্থরক্ষার জন্য একটি নির্ণায়ক পদক্ষেপ।

নকশালবাদ কয়েক দশক ধরে দেশের জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ ছিল। ভারতকে নকশালমুক্ত করা একটি বড় অর্জন। একসময়ের নকশালবাদ প্রভাবিত অঞ্চলগুলিতে আজ, উৎসাহ উদ্দীপনা বিরাজ করছে। এই অঞ্চলগুলিতে সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন চলছে। বস্তার অলিম্পিকে বহু সংখ্যক খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করেছিলেন, বস্তার পাণ্ডুমে বহু শিল্পী তাঁদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন, বিপুল সংখ্যক দর্শক সেটি উপভোগ করেন। 

মারাঠা সামরিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত, জাতীয় গৌরব রক্ষার নির্মিত ১২টি দুর্গ গত বছর ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আর, এই বছর ভগবান বুদ্ধের প্রথম ধর্মোপদেশের স্থান সারনাথ ইউনেস্কোর সেই বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একদিকে, ভারতভূমিতে ভগবান বুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত আধ্যাত্মিকতার স্মারক রয়েছে, অন্যদিকে, এখানে আমাদের গর্ব ও গৌরবময় ঐতিহ্য রক্ষার জন্য লড়াই করার অসাধারণ ক্ষমতার প্রতীকও রয়েছে।

আমার প্রিয় দেশবাসী,

বিকশিত ভারত গড়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য হল প্রত্যেক ভারতীয়ের উন্নয়ন ও কল্যাণ নিশ্চিত করা । তেলুগু ভাষায় লেখা মহান জাতীয়তাবাদী লেখক গুরজাদা আপ্পারাও তাঁর একটি গানে দেশপ্রেমের এক শাশ্বত বার্তা তুলে ধরেছেন:

দেসমুনু প্রেমিঞ্চুমন্না, মংচি অন্নদি পেঞ্চুমন্না।

দেশমংটে মট্টি কাদোয়, দেশমংটে মনুষুলোয়।

এর ভাবার্থ হলঃ

দেশকে ভালোবাসো, 

সততার বিকাশ ঘটাও।

একটি দেশের অর্থ শুধু তার ভূখণ্ড নয়,

একটি দেশের অর্থ তার সকল নাগরিক। 

আমার বিশ্বাস, সমাজের অংশগ্রহণ এবং সরকারের উদ্যোগে ভারতের প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি শহর এবং প্রতিটি পরিবারের মানুষ আরও স্বাস্থ্যবান, সুখী ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবেন। 

দেশপ্রেমের এই সর্বজনীন চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে, আসুন আমরা স্বতন্ত্র ভারতকে বিকশিত ভারতে রূপান্তরিত করার পবিত্র জাতীয় লক্ষ্যে নিজেদের উৎসর্গ করি।

ধন্যবাদ!

জয় হিন্দ!

জয় ভারত! 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights