ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য মোটর প্রশিক্ষণ: কোথা থেকে শুরু করবেন
পড়াশোনার পাশাপাশি হাতের লেখা, সমন্বয় ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহজ কিছু উপায়
লিখেছেন: সুমন মুন্সি, IBG NEWS
কোনও শিশু পড়তে, লিখতে বা বানান করতে সমস্যায় পড়লে প্রথমেই সাধারণত তার পড়াশোনার দিকটিই আমাদের নজরে আসে। কিন্তু অনেক শিশুর ক্ষেত্রে এর পাশাপাশি হাতের লেখা, শরীরের ভারসাম্য, হাত-পায়ের সমন্বয় কিংবা ছোটখাটো কাজ করার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডিসলেক্সিয়ার সঙ্গে সব শিশুর মোটর সমস্যা থাকবে এমন নয়, তবে কারও ক্ষেত্রে এমন সমস্যা থাকলে সেটিকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মোটর প্রশিক্ষণ ডিসলেক্সিয়া সারানোর কোনও উপায় নয়। তবে কোনও শিশুর যদি হাতের লেখা, হাতের সূক্ষ্ম নড়াচড়া, ভারসাম্য বা শরীরের সমন্বয়ে সমস্যা থাকে, তাহলে সেই দক্ষতাগুলি উন্নত করার ফলে তার দৈনন্দিন কাজ এবং পড়াশোনায় অংশ নেওয়া কিছুটা সহজ হতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণাতেও ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত কিছু শিশু ও কিশোর-কিশোরীর মোটর দক্ষতার ক্ষেত্রে পার্থক্যের কথা উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণা-পর্যালোচনায় বিভিন্ন ধরনের মোটর কাজের ক্ষেত্রে এমন পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৬ সালের আরেকটি বড় গবেষণা-পর্যালোচনাতেও সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতা, হাতের লেখা এবং হাতের কাজের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ডিসলেক্সিয়ার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ডিসলেক্সিয়ার মূল কারণ মোটর সমস্যা। ডিসলেক্সিয়া মূলত পড়া, লেখা ও ভাষা-সম্পর্কিত একটি শেখার সমস্যা। তাই পড়াশোনার জন্য উপযুক্ত শিক্ষাপদ্ধতির পাশাপাশি মোটর সমস্যা থাকলে তারও আলাদা যত্ন নেওয়া দরকার।
লেখার ক্ষেত্রে মোটর দক্ষতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আমরা অনেক সময় ভাবি, লেখা মানেই শুধু অক্ষর জানা। আসলে লেখার সময় শিশুকে একই সঙ্গে অনেক কাজ করতে হয়।
সোজা হয়ে বসা, হাত ও কনুই ঠিকভাবে রাখা, কবজি নিয়ন্ত্রণ করা, আঙুল দিয়ে পেন্সিল ধরা, চোখে দেখে হাত চালানো এবং একই সঙ্গে কী লিখবে ও কীভাবে বানান করবে—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়।
কোনও শিশুর কাছে যদি পেন্সিল নিয়ন্ত্রণ করাই খুব কঠিন হয়ে যায়, তাহলে লেখার বিষয়বস্তুর দিকে মন দেওয়া তার পক্ষে আরও কঠিন হতে পারে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের হাতের লেখা এবং মোটর দক্ষতার মধ্যে সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে প্রত্যেক ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুর যে মোটর সমস্যা থাকবে, এমনটা নয়।
তাই শিশুর বাস্তব সমস্যাটিকে আগে চিহ্নিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশিক্ষণ শুরুর আগে কী দেখবেন?
মোটর প্রশিক্ষণ শুরু করার আগে শিশুকে কিছু সাধারণ কাজে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।
দেখুন, সে—
- ঠিকভাবে বসে থাকতে পারে কি না;
- কয়েক সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়াতে পারে কি না;
- দুই পায়ে লাফাতে পারে কি না;
- বড় বল ছুড়তে ও ধরতে পারে কি না;
- দুই হাত একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারে কি না;
- ছোট জিনিস আঙুল দিয়ে তুলতে পারে কি না;
- কাঁচি ব্যবহার করতে পারে কি না;
- বোতাম লাগাতে বা খুলতে পারে কি না;
- ব্লক বা লেগো দিয়ে কিছু বানাতে পারে কি না;
- পেন্সিল ঠিকভাবে ধরে রাখতে পারে কি না;
- সোজা রেখা, বৃত্ত বা সহজ আকৃতি আঁকতে পারে কি না;
- অক্ষর লিখতে গিয়ে খুব ধীর হয়ে যায় বা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে কি না।
এগুলি কোনও রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা নয়। এগুলির উদ্দেশ্য হল শিশুটি কোথায় সমস্যায় পড়ছে, তার একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া।
যদি সমস্যা বেশি হয় বা দীর্ঘদিন ধরে থাকে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট বা সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রথমে খেলাধুলার মতো করে শুরু করুন
ছোট শিশুর কাছে মোটর প্রশিক্ষণ যেন বাড়তি পড়াশোনার মতো না লাগে। খেলতে খেলতেই শেখানো অনেক বেশি স্বাভাবিক।
১. হাত ও পায়ের সমন্বয়ের খেলা
শিশুকে ডান হাত দিয়ে বাঁ হাঁটু এবং বাঁ হাত দিয়ে ডান হাঁটু ছোঁয়াতে পারেন।
প্রথমে ধীরে করতে দিন। পরে ধীরে ধীরে গতি বাড়ানো যায়।
এখানে দ্রুত করার চেয়ে ঠিকভাবে করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিন।
২. ভারসাম্যের অনুশীলন
প্রথমে দুই পায়ে দাঁড়ানো থেকে শুরু করুন। পরে কয়েক সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করান।
শিশু সহজে পারলে ধীরে ধীরে সময় বাড়ান।
প্রয়োজনে প্রথম দিকে দেওয়াল বা চেয়ার ধরে করতে পারে।
৩. বল ছোড়া ও ধরা
একটি বড়, নরম বল দিয়ে শুরু করুন।
প্রথমে শিশুর কাছাকাছি থেকে বল দিন। সে ভালোভাবে ধরতে পারলে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়ান।
এর ফলে চোখ ও হাতের মধ্যে সমন্বয়, সময় বুঝে নড়াচড়া করা এবং মনোযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
৪. লাফানোর অনুশীলন
প্রথমে দুই পায়ে ছোট ছোট লাফ।
তারপর সামনে লাফানো, পিছনে লাফানো বা মাটিতে আঁকা একটি রেখা টপকে লাফানোর মতো কাজ করা যেতে পারে।
এখানেও লক্ষ্য প্রতিযোগিতা নয়—নিয়ন্ত্রিতভাবে নড়াচড়া শেখানো।
এরপর হাতের সূক্ষ্ম কাজ
শরীরের বড় নড়াচড়ার পর ধীরে ধীরে হাত ও আঙুলের কাজের দিকে আসা যায়।
খেলার মাধ্যমে করতে পারেন—
- মাটি বা প্লে-ডো চেপে ধরা;
- ছোট বল বা মাটির গোলা তৈরি করা;
- লেগো বা ব্লক দিয়ে তৈরি করা;
- বড় পুঁতি গাঁথা;
- কাপড়ের পেগ লাগানো ও খোলা;
- চিমটি দিয়ে ছোট জিনিস তোলা;
- কাগজ ছেঁড়া ও ভাঁজ করা;
- বোতল বা বাক্স খোলা-বন্ধ করা;
- রেখা ধরে কাগজ কাটা।
এসব কাজ হাতের শক্তি, আঙুলের নিয়ন্ত্রণ এবং দুই হাতের সমন্বয় বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
উন্নয়নমূলক সমন্বয়জনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, নিয়মিত এবং বাস্তব কাজের সঙ্গে যুক্ত মোটর অনুশীলন মোটর দক্ষতা, ভারসাম্য ও সমন্বয় উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
তবে এই গবেষণার ফলাফলকে সরাসরি সব ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত নয়।
হাতের লেখা শেখানোর ক্ষেত্রে ধৈর্য জরুরি
মোটর অনুশীলন থেকে সরাসরি দীর্ঘ লেখা লিখতে যাওয়া ঠিক নয়।
একটি সহজ ধাপ হতে পারে:
হাত-পা নাড়ানো → হাতের নিয়ন্ত্রণ → রেখা আঁকা → বিভিন্ন আকৃতি → অক্ষর → শব্দ → বাক্য
প্রথমেই শিশুকে একাধিক পৃষ্ঠা অক্ষর লিখতে না দিয়ে ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করুন।
যেমন—
সোজা রেখা:| | | | |
আড়াআড়ি রেখা:— — — — —
বৃত্ত:○ ○ ○ ○
তির্যক রেখা:////
সহজ নকশা:/\/\/\/\
এরপর অক্ষরের গঠন শেখানো যেতে পারে।
লক্ষ্য হবে শিশুর হাতের নড়াচড়া ধীরে ধীরে আরও নিয়ন্ত্রিত ও স্বাভাবিক করে তোলা।
বারবার অনুশীলন দরকার, কিন্তু চাপ নয়
শিশুকে একটি কাজ একবার দেখালেই সে তা শিখে যাবে—এমনটা হয় না।
প্রথমে দেখাতে হবে, তারপর শিশুর সঙ্গে করে দেখাতে হবে, পরে তাকে নিজে করার সুযোগ দিতে হবে। ভুল হলে শান্তভাবে ঠিক করে দিতে হবে।
অর্থাৎ—
দেখান → সঙ্গে করুন → বারবার করুন → ভুল ঠিক করুন → নিজে করতে দিন।
তবে একই কাজ এত বেশি করানো উচিত নয় যে শিশু বিরক্ত বা হতাশ হয়ে পড়ে।
অনুশীলন এমন হওয়া উচিত যাতে শিশুর কাছে কাজটি একটু চ্যালেঞ্জিং মনে হয়, কিন্তু অসম্ভব না লাগে।
৩০ মিনিটের একটি সহজ অনুশীলন পরিকল্পনা
বাড়ি, স্কুল বা কোনও বিশেষ শিক্ষাকেন্দ্রে প্রাথমিকভাবে ২৫–৩০ মিনিটের একটি সেশন এভাবে সাজানো যেতে পারে:
| সময় | কী করবেন |
|---|---|
| ৫ মিনিট | হালকা শরীরচর্চা ও নড়াচড়া |
| ৫ মিনিট | ভারসাম্য ও সমন্বয়ের খেলা |
| ৫ মিনিট | বল ছোড়া ও ধরা |
| ৭ মিনিট | হাত ও আঙুলের কাজ |
| ৫ মিনিট | রেখা, আকৃতি ও হাতের লেখা |
| ৩ মিনিট | শিশুর পছন্দের আনন্দের খেলা |
সপ্তাহে তিন দিন দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। তবে প্রত্যেক শিশুর ক্ষমতা ও প্রয়োজন আলাদা। তাই অগ্রগতি অনুযায়ী সময় ও অনুশীলনের ধরন পরিবর্তন করা উচিত।
একটি বিষয় মনে রাখা খুব জরুরি
মোটর প্রশিক্ষণকে কখনও বলা উচিত নয় যে এটি—
- ডিসলেক্সিয়া সারিয়ে দেবে;
- শিশুর ডিসলেক্সিয়া দূর করে দেবে;
- পড়া শেখানোর বিকল্প;
- বিশেষ শিক্ষার বিকল্প;
- অথবা কোনও প্রমাণহীন ‘ব্রেন রিওয়্যারিং’ পদ্ধতি।
ডিসলেক্সিয়ার ক্ষেত্রে শিশুকে পড়া, বানান এবং ভাষা শেখানোর জন্য সুশৃঙ্খল, ধাপে ধাপে এবং প্রমাণভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি প্রয়োজন।
International Dyslexia Association-এর মতে, Structured Literacy পদ্ধতিতে ধ্বনি সম্পর্কে সচেতনতা, অক্ষর ও ধ্বনির সম্পর্ক, পড়ে শব্দ ভাঙা, বানান, শব্দভাণ্ডার এবং বোঝার ক্ষমতার মতো বিষয়গুলি ধাপে ধাপে শেখানো হয়।
তাই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হল—
মোটর প্রশিক্ষণ + প্রমাণভিত্তিক পড়াশোনার প্রশিক্ষণ + প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত সহায়তা
একটির জায়গায় অন্যটি নয়।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত?
যদি শিশুর সমস্যা শুধু লেখাপড়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে দৈনন্দিন জীবনেও দেখা যায়, তাহলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
যেমন—
- পেন্সিল বা কাঁচি ব্যবহার করতে খুব সমস্যা;
- জামাকাপড় পরতে অসুবিধা;
- জুতোর ফিতা বাঁধতে সমস্যা;
- চামচ-কাঁটা ব্যবহার করতে সমস্যা;
- বল ধরতে বা ছুড়তে অসুবিধা;
- ভারসাম্য রাখতে সমস্যা;
- খেলাধুলায় অন্যদের তুলনায় খুব বেশি অসুবিধা;
- লেখার সময় হাত দ্রুত ব্যথা বা ক্লান্ত হয়ে পড়া;
- বয়স অনুযায়ী সাধারণ মোটর কাজ করতে না পারা।
এক্ষেত্রে অকুপেশনাল থেরাপিস্ট বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ শিশুটিকে বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন।
শিশুর আত্মবিশ্বাসের কথাও ভাবতে হবে
একটি শিশু যদি বারবার কোনও কাজ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়, তাহলে ধীরে ধীরে সে সেই কাজ থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
তাই “তুমি পারছ না” বলার বদলে কাজটিকে ছোট করে দিন।
যেমন—
“পুরো পাতাটা লেখো”—এর বদলে বলুন,
“আজ শুধু পাঁচটি অক্ষর সুন্দর করে লিখি।”
“বলটা ধরো”—এর বদলে বলুন,
“চলো, কাছ থেকে বলটা ধরার চেষ্টা করি।”
“তুমি এক পায়ে দাঁড়াতে পারো না”—এর বদলে বলুন,
“চলো দেখি তুমি পাঁচ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারো কি না।”
ছোট সাফল্য শিশুকে আরও চেষ্টা করতে উৎসাহ দেয়।
অগ্রগতি কীভাবে বুঝবেন?
শিশুর উন্নতি বোঝার জন্য সহজ কিছু বিষয় লিখে রাখতে পারেন।
যেমন—
ভারসাম্য:
৫ সেকেন্ড → ৮ সেকেন্ড → ১২ সেকেন্ড
বল ধরা:
১০টির মধ্যে ২টি → ৫টি → ৮টি
কাঁচি ব্যবহার:
রেখা ধরে কাটতে পারে না → সোজা রেখা কাটতে পারে → বাঁকা রেখা কাটতে পারে
পেন্সিল নিয়ন্ত্রণ:
এলোমেলো রেখা → নিয়ন্ত্রিত রেখা → পরিষ্কার আকৃতি
হাতের লেখা:
খুব ধীর → কিছুটা নিয়ন্ত্রিত → আরও সাবলীল
এখানে অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করার কোনও প্রয়োজন নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, শিশুটি আগের চেয়ে কতটা এগিয়েছে।
ডিসলেক্সিয়া ও মোটর দক্ষতা: কী বলছে গবেষণা?
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলি দেখাচ্ছে, কিছু ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুর মধ্যে মোটর দক্ষতার পার্থক্য দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে হাতের সূক্ষ্ম কাজ, হাতের লেখা এবং চোখ-হাতের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এমন পার্থক্যের কথা গবেষণায় উঠে এসেছে।
অন্যদিকে Developmental Coordination Disorder বা DCD-এর মতো মোটর-সমন্বয়জনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত এবং কাজের সঙ্গে যুক্ত মোটর প্রশিক্ষণ তাদের বিভিন্ন মোটর দক্ষতা উন্নত করতে পারে।
তবে এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা যাবে না।
সহজ কথায়—শিশুর যে সমস্যা আছে, সেই সমস্যারই প্রশিক্ষণ দরকার।
শুধু ডিসলেক্সিয়া রয়েছে বলে প্রত্যেক শিশুকে মোটর প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি নয়।
কিন্তু যদি একই সঙ্গে হাতের লেখা, ভারসাম্য, সমন্বয় বা হাতের সূক্ষ্ম কাজে সমস্যা থাকে, তাহলে সেই দক্ষতাগুলির উন্নতির জন্য আলাদা সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
আর শিশুর প্রধান সমস্যা যদি পড়া ও বানানে হয়, তাহলে তার জন্য সরাসরি এবং প্রমাণভিত্তিক পড়াশোনার প্রশিক্ষণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে একটি ভালো পরিকল্পনা তৈরি করবেন?
একটি শিশুকেন্দ্রিক পরিকল্পনা তৈরি করতে সাতটি বিষয় মনে রাখা যায়—
১. সমস্যা খুঁজে বের করুন
শিশুর ঠিক কোথায় অসুবিধা হচ্ছে?
২. শুরুটা লিখে রাখুন
প্রথম দিনে সে কী করতে পারছে, তা নথিভুক্ত করুন।
৩. ছোট ধাপে অনুশীলন করান
একসঙ্গে অনেক কিছু শেখানোর চেষ্টা করবেন না।
৪. বাস্তব জীবনের কাজ ব্যবহার করুন
লেখা, আঁকা, খেলা, পোশাক পরা বা জিনিসপত্র ব্যবহার করার মতো কাজের সঙ্গে অনুশীলনকে যুক্ত করুন।
৫. পড়াশোনার প্রশিক্ষণ চালিয়ে যান
মোটর প্রশিক্ষণ কখনও পড়া ও বানান শেখানোর বিকল্প নয়।
৬. নিয়মিত অগ্রগতি দেখুন
শিশুটি আগের তুলনায় কতটা উন্নতি করছে তা লিখে রাখুন।
৭. প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন
সমস্যা বেশি হলে বা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
শেষ কথা
ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত কোনও শিশুর জন্য মোটর প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য তাকে ‘ঠিক করে দেওয়া’ নয়। উদ্দেশ্য হল—যদি তার সত্যিই কোনও মোটর বা হাতের লেখার সমস্যা থাকে, তাহলে সেই বাধা কিছুটা কমিয়ে তাকে আরও স্বচ্ছন্দে শেখার সুযোগ করে দেওয়া।
ডিসলেক্সিয়া কোনও শিশুর বুদ্ধিমত্তা বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মাপকাঠি নয়। সঠিক শিক্ষাপদ্ধতি, ধৈর্য, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং শিশুর নিজের গতিকে সম্মান করা—এই চারটি বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য শুরুটা খুব সহজ হতে পারে: শিশুকে আগে বুঝুন, তার প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করুন, ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করুন, নিয়মিত অনুশীলন করান এবং প্রতিটি ছোট সাফল্যকে গুরুত্ব দিন।
একটি শিশুর জন্য কখনও কখনও বড় পরিবর্তনের শুরু হয় একটি ছোট সাফল্য থেকেই।
— সুমন মুন্সি,IBG NEWS













