ছোটোগল্প ছবি
হীরক মুখোপাধ্যায়
শব্দের সাথে শব্দের পরিণয় ঘটিয়ে সন্তানরূপী নানাবিধ বাক্যের জন্মদানই আমার একমাত্র নেশা। এই নেশার তাগিদেই মাঝেমাঝে সৃষ্টি করে ফেলি আবোলতাবোল অথচ মর্মস্পর্শী কত কাহিনী।
একটা ছবি যে সমাজে বসবাসকারী বিভিন্ন স্তরের মানুষদের কত ভাবে ভাবাতে পারে আজ সেই কাহিনীই আপনাদের বলবো।
আপনারা তো এতদিনে রাজ-কে ভালোভাবেই চিনে গেছেন। ওর কাজ কারবার দেখে কখনো মনে হয়- ও বোধহয় ভারত সরকারের হয়ে কোনো অতিগোপন কাজে লিপ্ত আছে, কখনো মনে হয় ও বোধহয় নেহাতই এক সামান্য সাংবাদিক।
আসলে বাস্তবে যে ও ঠিক কী কাজ করে তা আমরা কেউই ভালোভাবে জানিনা।
গতকাল সকালে হোয়াটসএপে একটা ম্যাসাজ আসার পর থেকে গভীর চিন্তায় পড়ে গেছে রাজ। চিন্তার বিষয় একটা ছবি। ম্যাসাজটা এমন একজনের কাছ থেকে এসেছে যে রাজ উপেক্ষাও করতে পারছেনা।
বিধু হলো রাজ-এর ছায়াসঙ্গী। বিধু যখন কোনো লাফড়ায় ফেঁসে যায় তখন ও সবার আগে রাজ-এর কাছে চলে আসে।
আর রাজ যখন কোনো গভীর চিন্তায় ডুবে থাকে তখন বিধু রাজ-এর সহায়ক রূপে পাশে পাশেই থাকে।
চিন্তার অবসানের উদ্দেশ্যে রাজ আজ সকালে ফোন করে বিধুকে আসতে বলেছে।
(২)
রাজ এর বাড়িতে বিধু এসে পৌঁছতেই রাজ বিধুকে বলল, “গ্যারেজ থেকে গাড়ি বার করে রেডি হ, আমি তিন মিনিটের মধ্যে নীচে নামছি।”
গ্যারেজ থেকে গাড়ি বার করার আগেই বিধু দেখতে পেল রাজ উপর থেকে নীচে নেমে এসেছে।
গ্যারেজ থেকে গাড়ি বার করতেই রাজ বলল, “সবার আগে কিংশুকের বাড়ি চল ?”
কিংশুক চট্টোপাধ্যায় হৃদয়পুরের এক লব্ধপ্রতিষ্ঠিত গীতিকার। বারাসাত ডাকবাংলো মোড়ের কাছে ইন্দ্রপ্রস্থ-এ থাকে। রাজ-এর বিশেষ পরিচিত। সম্প্রতি ওর লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছে জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত স্বনামধন্য শিল্পী রূপঙ্কর বাগচি।
কিংশুক-এর বাড়ির ড্রইং রূমে বসে কথা বলার সময় রাজ কিংশুক-কে ওর মোবাইলের গ্যালারি থেকে একটা ছবি দেখিয়ে জানতে চায়, “তুমি তো কবি মানুষ, গান লেখো এই ছবিটা ভালো করে দেখে বলতো এই ছবিটার অন্তর্নিহিত বক্তব্যটা কী হতে পারে ?”
রাজ-এর কাছ থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে কিংশুক দেখল, মানব হৃদয়ের আকারে কাঠ দিয়ে তৈরি একটা ব্লকের ভেতর একটা জানলার মতো ফাঁকা জায়গার ভেতর একটা চাবি ঝুলছে।
বেশ কিছুক্ষণ গম্ভীর ভাবে ছবিটা দেখতে দেখতে কিংশুকের মুখে হাসি ফুটে উঠল ও গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠল হিন্দী গানের একটা কলি, “ভোলেভালে লড়কী খোল তেরী খিড়কি..।”
কিংশুকের গুনগুনানিকে কোনোরকম পাত্তা না দিয়ে রাজ বলল, “বছর ৪৫-এর আশেপাশের কোনো এক মহিলা পাঠিয়েছেন এই ছবিটা, তোমার প্রাথমিক চিন্তা মিলল না। অন্যভাবে আবার একটু ভেবে দেখো।”
আজ রবিবারের সকাল। কিংশুকের বউ চা বিস্কুট দেওয়ার অবসরে ইতিমধ্যে একবার কিংশুককে মাংসের দোকানে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে গেছে।
বউয়ের কথা সবার আগে শুনতে হয়, নইলে সংসারে শান্তি বিঘ্নিত হয়। তাই বৃথা কালহরণ না করে কিংশুক বলল, “তবে তো মিটেই গেল, ম্যাডাম আপনাকে আপনার হৃদয়ের দরজা উন্মুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন; উনি এন্ট্রি নিতে চাইছেন মনে হচ্ছে।
আর কতদিন হৃদয় অবরুদ্ধ করে সন্ন্যাসের জীবন কাটাবেন দাদা, ‘মন জানালা খুলে দেনা, বাতাস লাগুক প্রাণে; শীতল শীতল…’।”
কিংশুকের কথা শুনে রাজ হাসতে হাসতে সোফা থেকে উঠে পড়ে বলল, “হোপলেস, সি ইজ আ ম্যারেড ওম্যান।”
(৩)
কিংশুকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিধুর দিকে তাকিয়ে রাজ বলল, “অভিরূপ-এর বাড়ি চল।”
রাজ-এর কথা মতো গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল অভিরূপ চ্যাটার্জি-র বাড়ির পোর্টিকোতে।
এই বাড়িতে সবাই রাজ আর বিধু-কে ভালোভাবে চেনে।
ডাইনিংরুমে ঢুকেই রাজ গলা চড়াল, “অন্তরা তোমার গাধাটা কোথায় ?”
রান্নাঘরে কাজ করছিল অন্তরা। ওখান থেকেই ও উত্তর দিল, “দেখুন ড্রইংরুমে বসে গুচ্ছের ঘাস বিচুলি চিবচ্ছে হয়তো!”
অন্তরার কথা শুনে ড্রইংরুমের দিকে চোখ ফেরাতেই রাজ দেখল পড়ার টেবিলে বসে ইকনমিক টাইমস দেখছে এই যুগের অন্যতম সেরা অর্থনীতিবিদ অভিরূপ চ্যাটার্জি।
অভিরূপের পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে ধপাস করে ওর পাশে বসে পড়ল রাজ।
“সাত সকালে কী মনে করে ?”
“আরে, একটা মহা সমস্যায় পড়েছি…।”
“আবার কী হলো ?”
“আর বলিস না, এই ছবিটা আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ভালো করে দেখে বলতো, ছবিটার অন্তর্নিহিত মানেটা কী হতে পারে ?”
রাজ-এর হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে ছবিটা একনজরে একটু দেখেই অভিরূপ বললেন, “এটা অবরুদ্ধ অর্থনীতির একটা সুন্দর গ্রাফিক্যাল ইমেজ। এখানে একটা চাবিও দেখা যাচ্ছে, এর মানে হলো উদার অর্থনীতির একটা প্রচ্ছন্ন হাতছানি।
ইলাস্ট্রেশনটা কিন্তু ঘ্যামা। এই ছবিটা আমার হোয়াটসএপে পাঠিয়ে দেতো।”
“সাধে কী অন্তরা তোকে গাধা বলে! জ্যান্ত আপদ একটা। তুই তোর অর্থনীতি নিয়েই পচে মর জানোয়ার,” অভিরূপের দিকে কটমট করে তাকিয়ে কথাগুলো বলে স্মার্টলি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো রাজ।
(৪)
অভিরূপদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে রাজ বলল, “এবার এসপি বারাসাতের বাংলোয় চলতো।”
রাজাজ্ঞায় গাড়ি কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেল এসপি-র বাংলোয়।
বাংলোর গেটে কিছু নিয়মরক্ষার কাজ সেরে গাড়ি নিয়ে বিধু ঢুকে পড়ল বাংলোর হাতার মধ্যে।
সকাল সকাল বিধুকে দেখে মুখে কিছু না বললেও ঠারেঠোরে রাজনারায়ণ মুখার্জী বুঝিয়ে দিলেন উনি কতখানি বিরক্ত হয়েছেন।
“গুডমর্ণিং মিস্টার মুখার্জী।”
“মর্ণিং … কিন্তু কোন আগাম খবর না দিয়ে আপনি এভাবে হুট করে চলে এলেন যে ?”
“কেনো, ফেক কারেন্সী নোট ছাপার কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালাম নাকি ?”
রাজ যে এইরকম ভাষায় কথা বলতে যথেষ্ট দর সেটা বোধহয় এসপি সাহেব সেভাবে জানতেন না, তাই একেবারে শামুকের খোলার মধ্যে নিজের বিক্রমটুকু ঢুকিয়ে নিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “বলুন বলুন আপনার সমস্যাটা বলুন ?”
রাজ ছবি দেখিয়ে ওর জ্ঞাতব্য বিষয়টা জানতে চাওয়ায় অনেকক্ষণ ভেবে মুখার্জীবাবু বললেন, “আমার মনে হয় এটা কোনো কলগার্ল পাঠিয়েছে।”
“কীভাবে বুঝলেন ?” জানতে চায় রাজ।
“ভেরি সিম্পল, দেখুন বেশ্যা বা কলগার্ল ওদের যাই বলুন- ওরা ওদের হৃদয়টাকে কাঠের মতো নির্জীব করে তাদের ক্লায়েন্টদের কাছে শরীরটাকে কিছুক্ষণের জন্য ভাড়া খাটায়। ওরা টাকা পেলে সব করতে দেয়।
এই ছবিতে দেখুন হৃদয়টা কাঠের আর ওখানে একটা চাবিও আছে। মানেটা হচ্ছে ফেলো কড়ি মাখো তেল, অর্থাৎ টাকা দিলেই তার হৃদয় নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অনুমতি পাওয়া যাবে।”
ছবিটা দেখতে দেখতে রাজনারায়ণ মুখার্জী যখন তাঁর ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন, তখন ওঁনার দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে ছিল রাজ।
এসপি-র কথা শেষ হতেই রাজ বলল, “আপনার ব্যাখ্যা পেয়ে সমৃদ্ধ হলাম। আচ্ছা এবার চলি।”
কথা শেষ হতেই রাজ উঠে পড়ল।
রাজ বেরিয়ে আসছিল, পেছন থেকে এসপি সাহেব জানতে চাইলেন, “মুখার্জীবাবু ছবিটা কে পাঠিয়েছেন সেটা তো একটু বলে যান।”
রাজ পেছন ফিরে হাসতে হাসতে বলল, “সি এম।”
(৫)
এসপি বাংলো থেকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে রাজ ফোনে ধরল বারাসাত জেলা ও দায়রা আদালতের স্বনামধন্য আইনজীবী রণি কর-কে।
রণির মূল নাম রাণী কর। ছোটোবেলায় কোনো এক অতিগাড়ল মাস্টারমশাই মাধ্যমিকের এডমিট কার্ডে ওর নাম আর ও এন আই এর জায়গায় আর এ এন আই করে দেওয়ার ফলে রণি-র জায়গায় ও এখন লিঙ্গ পরিবর্তন না করেই রাণী হয়ে গেছে।
ফোনটা যেতেই ওপ্রান্ত থেকে কথা ভেসে এলো “সুপ্রভাত দাদা, কেমন আছেন ?”
“রবিবার সকালে চেম্বারে বসো না তোমার বাড়িতে যেতে হবে ?”
“এখন আসতে চাইলে বাড়িতে চলে আসুন দাদা।”
“পাঁচ মিনিটের মধ্যে তোমার বাড়িতে ঢুকছি।” বলে ফোন কেটে দিল রাজ।
রণির বাড়ির দোতলায় এখন ওর দাদা বৌদি ওদের মাস দুয়েকের ছেলেকে নিয়ে থাকে। নীচে থাকে রণি আর রণির মা।
একতলার বারান্দায় বসে রণির সাথে প্রাথমিক আলাপচারিতা সেরে রাজ ওর মোবাইল থেকে বহুচর্চিত ছবিটা বার করে রণিকে দেখিয়ে জানতে চাইল, “ছবিটা ভালো করে দেখে বলোতো, ছবিটার অন্তর্নিহিত মানেটা কী হতে পারে ?”
ছবিটা দেখতে দেখতে রণি জানতে চাইল, “ছবিটা কে কাকে পাঠিয়েছেন এটা অন্তত যদি একটু বলেন তাহলে ভাবতে সুবিধা হয়..।”
“একজন বিবাহিতা মহিলা কোনো একজন পুরুষকে পাঠিয়েছে,” রাজ বলল।
“তাহলে আর ভাবতে হবেনা দাদা, কেস একেবারে জলের মতো পরিষ্কার।”
রণি-র আতিশয্যে উৎসাহিত হয়ে রাজ জানতে চাইল, “জলের মতো পরিষ্কার মানে !”
“দাদা এটা ম্যাট কেস, মানে ম্যাট্রিমনিয়ল কেস। হয় সেপারেশন চলছে, নয় কেসের হিয়ারিং শুরু হয়ে গেছে নয়তো খোরপোষের জন্য ঝামেলা চলছে..।”
রাজ বেশ উৎসুক হয়ে বলল, “কীভাবে বুঝলে একটু বুঝিয়ে বলো, নইলে আমার স্যাঙাতটা আবার ঠিক ধরতে পারবেনা। ফলে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমাকে বকে মরতে হবে।”
রাজ-এর কথা শুনে বিধুর দিকে তাকিয়ে রণি বোঝাতে লাগল, “ছবিটা ভালো করে দেখলেই বুঝতে পারবেন হৃদয়ে আর কোনো রস নেই, বিবাহবিচ্ছেদের সময় অনেকসময় স্বামীদের উপর স্ত্রীদের মনটা ওই রকম নীরস কাঠের মতো হয়ে যায়।
আবার এই কাঠের হৃদয়ে একটা ফাঁকা জায়গাও রয়েছে, যদিও সেখানে একটা চাবি ঝুলছে।
মানে দরজাটা কোথাও অবরুদ্ধ…, অর্থাৎ বিবাহিতা মহিলা ওই দমবন্ধকর সংসার থেকে মুক্তি চাইছেন। কিন্তু অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান আইন ব্যবস্থা ও আদালত।
মনে হচ্ছে বদ্ধজীবনে থাকতে থাকতে নারী মন হাঁপিয়ে উঠেছে। মুক্তির আশায় আপনাদের সহযোগিতা চাইছে।”
রণি-র কথা শুনে রাজ গম্ভীর হয়ে বলল, “কী জানি! উনি কী ভেবে এই ছবিটা আমাকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু এই রকম বিষয় হলে তো ভয়ানক বিষয়।
“আমি থাকতে ভয়ানক ভাবছেন কেনো..ওসব একদম ভাববেন না। আমি রয়েছি তো, আপনি শুধু ওঁনার সাথে আমাকে একবার বসিয়ে দিন, আমি ডিভোর্স করিয়েই ছাড়ব।”
“আরে রণিদা, আপনি ফোনে বললেন আমাকে একটা এক্সক্লুসিভ খবর দেবেন। এদিকে বিধুকেও ডেকে নিলেন, আপনার ব্যাপার কী বলুন তো ?” রণি-র কথা শেষ হওয়ার প্রায় সাথে সাথে বাইরে থেকে চেঁচাতে চেঁচাতে বারান্দায় ঢুকে পড়ল সুমন।
রণি চোখ তুলে দেখল ওর সামনে দাঁড়িয়ে ‘জাগো বাংলা’-র সাংবাদিক সুমন।
“আরে না না আমি বিধুকে ডাকিনি ও রাজদা-র সাথে এসেছে একটা ইন্টারেস্টিং ছবি নিয়ে,।”
“তাই, কী ছবি আমাকেও একটু দেখান দেখি!”
ছবিটা দেখতে দেখতে সুমন জানতে চাইল, “ছবিটা কে পাঠিয়েছেরে বিধু ?”
“কে পাঠিয়েছে ওটা বড়ো বিষয় নয়, ছবিটা কী বোঝাচ্ছে সেটা বুঝতে পারলে বল।”
“ছবি আবার বোঝাবে কী ?”
“না, ছবি আর কী বোঝাবে! যত বোঝাবে তোমার দিদির বলিহারি কবিতা ‘এপাং ওপাং ঝপাং’..।”
“বিধু তোকে শেষবারের মতো বলছি সবসময় দিদিকে টানবিনা।”
“ওরে আমার দিদির একমাত্র ভাই রে… ছবিটা দেখে মানেটা বলতে পারলে বল নইলে ছাড়।”
“আহ্! সুমন ছবিটা দেখে বলোতো এই ছবিটার মানেটা কী হতে পারে ?”
“রণিদা, ছবিটা দেখে মনে হচ্ছে হস্তশিল্প মেলা থেকে একটা চাবির রিং-এর ছবি তুলে ফটোশপে গিয়ে ওটার উপর এফেক্ট ফেলে কেউ বিধুকে পাঠিয়ে দূর থেকে মজা নিচ্ছে।”
কোথায় দুটো পয়সা করে নেওয়ার বিবাহবিচ্ছেদের তত্ত্ব, আর কোথায় ফটোশপের এডিটিং-এর তত্ত্ব।
সুমণের কথা শুনে তাই সাতসকালে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল রণি, “কী !”
সুমনের বক্তব্য শুনে রণি আর সুমনকে ভজাভজি-র জন্য ফেলে রেখে রণির বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো বিধু আর রাজ।
(৬)
রণির বাড়ি থেকে বেরিয়ে বেলা প্রায় দশটা নাগাদ বিধু আর রাজ পৌঁছল সুনেত্রার বাড়িতে।
দরজার ঘণ্টি বাজাতেই দরজা খুলে দাঁড়ালেন এক বয়স্কা মহিলা। এই বাড়িতে রাজ যদিও বেশি আসে না, তবুও বাড়ির সবাই ওকে চেনে। তাই রাজকে দেখে কোনো রকম জিজ্ঞাসাবাদ না করেই দরজার পাশে সরে দাঁড়ালেন ভদ্রমহিলা। ভেতরে ঢুকে পড়ল রাজ আর বিধু।
ওরা ভেতরে ঢুকতেই এগিয়ে এলো কালো রংয়ের এক দোআঁশলা কুকুর ‘কুট্টুস’। বিদেশী নারীর সাথে দেশী সারমেয়র অনাকাঙিক্ষত মিলনের ফসল এই কুট্টুস।
কুট্টুসের জন্মের পর অজানা অপরিচিত চরিত্রহীন এক কুকুরের হাতে কুট্টুসের মায়ের ইজ্জতহানীর কথা চিন্তা করতে করতে লোকলজ্জায় মারা যান সুনেত্রার দাদু।
একে নিজের জন্মের ঠিক নেই তার উপর জন্মানোর কিছুদিন পরে গৃহকর্তার মৃত্যু, ফলে নিজের ঘর ছাড়তে হয় কুট্টুসকে। তারপর থেকেই কুট্টুস এই বাড়িতে।
কুট্টুসটাকে একটু চটকাচটকি করে রাজ হাঁক পাড়ল, “কোন ঘরে আছো গো ?”
রাজ-এর কথা কানে যেতেই বেরিয়ে এলো বছর আঠাশের এক ফুটফুটে মেয়ে।
“আজ কোন দিকে সূর্য্য উঠেছে বলতো ?”
“সকাল থেকে যা মেঘলা তেঁনার তো দর্শনই পেলাম না, তোমাকে কী স্পেশালভাবে দর্শন দিল ?”
“বাঁদরামো বন্ধ করে বলো সকালের জলখাবার খেয়ে বেরিয়েছো না খাবে ?”
রাজ আলতো করে ডানহাত দিয়ে সুনেত্রার গাল দুটো টিপে দিয়ে বলল, “কিছু খাবনা, একটা কৌতূহল মিটিয়ে এখনই বেরিয়ে যাব।”
“বুঝলাম না…।”
“রাজ যে ! কখন এলে ?” বলতে বলতে ওদের কথার ফাঁকে ঘরে ঢুকলেন সুনেত্রার বাবা।
“আরে নেতাজী!
কদিন আগে সুনেত্রা বলছিল আপনার মাঝেমধ্যে হাঁপ ধরে যাচ্ছে, এখন কেমন আছেন ?”
সুনেত্রার বাবার নাম সুভাষচন্দ্র, রাজ ওঁনাকে ওই জন্য নেতাজী বলে ডাকে।
“হ্যাঁ গো সেদিন বড্ড কষ্ট পেয়েছি..।”
“আপনার আর দোষ কী, ঘরে বিয়ের উপযুক্ত আদদামড়ী মেয়ে থাকলে সব বাবারই ওরকম শ্বাসকষ্ট হয়।”
“কিন্তু ও তো…!”
“এখন তবুও অনেকে আপনার মেয়েকে ফোন করছে, হোয়াটসএপ করছে; যেদিন ওসব বন্ধ হয়ে যাবে, সেদিন ও মজা বুঝবে।”
“বাপি তোমরা থামবে দুজনে !” নিজের সমালোচনা শুনে রাগে ঝনঝনিয়ে উঠল সুনেত্রা।
সুনেত্রাকে আরো একটু চটিয়ে দেওয়ার জন্য রাজ এবার সরাসরি ওকেই প্রশ্ন করল, “এই এখনো বিয়ে করছোনা কেনো গো, আর কবে করবে ?”
কথাটা কানে যেতেই রাজের দিকে তাকিয়ে চোখ গোলগোল করে সুনেত্রা বলল, “ন্যাকা, তুমি নিজে বিয়ে করছোনা কেনো ?”
“কী করে করব, মেয়ের বাবা তো এখনো আমার মার কাছে কথা পাড়তেই যায়নি !”
“তাহলেই বোঝা তুমি কত বড়ো অপদার্থ ছেলে।”
“বিশ্বাস করো ডার্লিং, আমিও এই কথাটাই একটু অন্যভাবে ভাবি। একেবারে আব্বাল নম্বরের মার্কামারা ল্যাদখোড়, অলস, অপদার্থ না হলে মেয়ের বাবাটা এতদিনে নিশ্চয়ই আমাদের বাড়িতে চলে যেত, তাই না !”
রাজ-এর কথা বলার ভঙ্গিতে মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে হেসে ফেলল সুনেত্রার মা।
পরিস্থিতি একটু পাল্টাতেই, পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে রাজ ছবিটার বিষয়ে সুনেত্রার মতামত জানতে চাইল।
সুনেত্রা এমবিবিএস করার পর এমএস করেছে। তাই ও এখন যা দেখে সেখানেই কাটাকাটি করার জন্য ছোঁকছোঁক করতে শুরু করে।
রাজের একেবারে গা ঘেঁষে সোফায় বসে ছবিটা একনজরে দেখেই সুনেত্রা বলল, “ছবিটা তোমাকে কে পাঠিয়েছে গো ?”
“কেনো !”
“এই ছবিটা আমাকে এখনই হোয়াটসএপে পাঠাও তো!”
“কী আশ্চর্য! আমি মরছি আমার জ্বালায়, আর তুমি বলছো আগে ফটো পাঠাও।”
“আরে আমি থাকতে তোমাকে আর মারবে কে !”
“হুঁ..একবার ফোন করেও খবর নেয়না, মুখে মুখে যত বড়ফট্টাই।”
“আহহা, আমার কথার মানেটা তুমি ঠিক বুঝতে পারনি। আমি বলতে চেয়েছি…।”
সুনেত্রার কথা শেষ হওয়ার আগেই পাশ থেকে বিধু ফুট কাটলো, “মা মাগো রাজ-কে রক্ষা করো মা।”
রাজ-এর সাথে একান্তে কথা বলার সময় হঠাৎ বিধু ফুট কাটতে আবার মাথা গরম হয়ে গেল সুনেত্রার।
“অ্যাই, আমি তোমাকে কতবার বলেছিনা, আমার কাছে আসার সময় একা আসবে!”
“যাহ্, ওভাবে বলতে নেই। বিধু খারাপ কী বলেছে ?”
“সব বিষয়ে ওর মাতব্বরি আমার ভালো লাগেনা।”
“ওসব কথা থাক, এবার ছবিটা দেখে চট করে বলে ফেলো তোমার কী মনে হচ্ছে ..।”
রাজ-এর কথা শুনে ছবিটা আবার দেখতে দেখতে সুনেত্রা বলল, “ছবিটার বাম দিকে ফাঁকা জায়গা, তার মনে লেফ্ট আর্টরিয়মটা ওপেন করতে হবে।
হৃদয়ের বাম অলিন্দের মাইট্রাল ভালভ নয়তো এওরটিক ভালভ-এ সমস্যা হতে পারে।
ইমিডিয়েট ওপেন হার্ট সার্জারি করা দরকার।”
সুনেত্রার কথা শুনে রাজ একটা হেঁচকি তুলে কোন রকমে বলল, “সে কী বলছো ?”
সুনেত্রা ছবিটা দেখতে দেখতে বলল,”ছবি দেখে মনে হচ্ছে বাম অলিন্দে ব্লকেজও আছে, নচেৎ চাবির ছবিটা অন্ততঃ থাকত না বুঝলে বুদ্ধুরাম…।”
সুনেত্রার কথা শেষ হওয়ার আগেই রাজ উঠে পড়ল সুনেত্রার পাশ থেকে।
ওর পাশ থেকে হঠ করে রাজ উঠে দাঁড়াতেই সুনেত্রা জানতে চাইল, “অ্যাই তুমি এতো উত্তেজিত হচ্ছ কেনো, তুমি পেশেন্টকে চেনো নাকি?”
রাজ নীরবে ঘাড় কাত করে বুঝিয়ে দিল ছবির প্রেরককে ও চেনে।
“আরে এসব আমার বাম হাতের খেলা, তুমি উতলা হচ্ছ কেনো, পেশেন্টের ঠিকানা টাবলো, আমি হাসপাতালকে বলে এখনই একটা এসি অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু আজ লাঞ্চ না করে এখান থেকে তুমি মোটেও বেরবেনা,” বলতে বলতে নিজের মোবাইলটা হাতে তুলে নিল সুনেত্রা। “নাও চটপট করে পেশেন্টের মোবাইল নম্বরটা বলো তো, হাসপাতালে জানিয়ে দিই।”
একটা ছবি যে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে কত ভাবে ভাবিত করতে পারে তা সাধারণতঃ আমরা কেউই সেভাবে ভেবে দেখিনা।
সামাজিক মাধ্যমে পছন্দসই একটা ছবি এলেই সাতসকালে বা মাঝরাতে আমরা অপরের ফোনে ঠেলে দিয়ে অন্য কাজে মন দিই বা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ি।
কিন্তু, এই ছবিগুলো কতো লোকের ঘুমের বারোটা যে কীভাবে বাজাতে পারে আমরা তা ভেবে দেখিনা বা ভাবতে চাইওনা।
আসুন শপথ নিই, এবার থেকে প্রিয়জনকে যা বলার তা সামনাসামনি বলব বা অন্ততঃ লিখে জানাবো। কিন্তু এভাবে আর কাউকে ভাবাবো না।












