সুস্বাস্থ্য কি মুখের কথা – কত গুলি ভ্রান্ত ধারণা ও তার সঠিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।।
ড: পলাশ বন্দোপাধ্যায় , কলকাতা , ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
(১)বিট,গাজর খেলে রক্ত হয়।
প্ৰচলিত ভ্রান্ত একটি ধারণা।বিট এবং গাজরের টকটকে রং হয়তো এই ভ্রান্ত ধারণার মূলে।রক্ত শরীরে উৎপন্ন হতে গেলে শরীরে সঠিক মাত্রায় প্রোটিন,এবং আয়রণ থাকা দরকার।অস্থিমজ্জার কার্যকারিতা থাকা দরকার।সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে(যাতে পরিমিত পরিমানে প্রোটিন, শর্করা, ফ্যাট,ভিটামিন, মিনারেল এবং ফাইবার থাকে) শরীরে সঠিক মাত্রায় রক্ত তৈরি হয়।বিট গাজরে শর্করা এবং ভিটামিন A থাকে।
(২)ফলের রস বাচ্চাদের জন্য খুব জরুরী
ফলে সাধারণত: ভিটামিন ও মিনারেল থাকে,যা অতীব কম মাত্রায় বাচ্চার শরীরে প্রয়োজন।শাক সব্জিতেও এগুলি থাকে।সুতরাং শাক সব্জী খেলেও মোটামুটি একই কাজ হয়।পেট খারাপের সম্ভাবনা কমে এবং খরচটাও বাঁচে।ফলের রস খেলে পেটখারাপ এবং এসিডিটির সম্ভাবনা।ফল চিবিয়ে খাওয়াই ভালো।
(৩)দাঁত কিড়মিড় করলে কৃমি হয়েছে ভাবা হয়।
অবৈজ্ঞানিক ধারণা।ঘুমন্ত বাচ্চা মুখ নাড়লে দাঁতে দাঁতে ঘষা লেগে কড়মড় আওয়াজ হয়।জেগে থাকা বাচ্চা অনেক সময় অবচেতনে দাঁতের আওয়াজ করে।কখনো এর কোনো কারণ থাকে না।কখনো তা মানসিক অস্থিরতা অথবা নিরাপত্তাহীনতা বোধের সূচক।
(৪)চিনি খেলে বা মিষ্টি জিনিস খেলে কৃমি হয়।
কৃমি আসলে এক প্রকার আনুবীক্ষনীক প্রাণী।অপরিস্কার বা রান্না না করা শাক সব্জী অথবা অশোধিত জলে কৃমি থাকে।খালি পায়ে হাঁটলে সংক্রমিত মাটি থেকেও চামড়া ভেদ করে হুক ওয়ার্ম জাতীয় কৃমি শরীরে প্রবেশ করে।এর সঙ্গে মিষ্টি খাবারের কোনো সম্পর্ক নেই।
(৫)প্রেসার,সুগার এবং থাইরয়েডের সমস্যা ওষুধ খেয়ে সেরে গেলে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
সাংঘাতিক ঝুঁকির এবং ভ্রান্ত ধারণা।উপরোক্ত রোগগুলি হয়েছে অর্থ,এই তন্ত্রগুলির উপর উক্ত রোগীর কোনো শারীরবৃত্তীয় নিয়ন্ত্রণ নেই।বাইরে থেকে ওষুধের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলি আজীবন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।ওষুধ বন্ধ কোনো মতেই করা যাবে না।
(৬)ভিতর ভিতর জ্বর,চাপা অম্বল,চোরা জন্ডিস বলে কি কিছু হয়?
এগুলি রোগ নয়।রোগের উপসর্গ।উপসর্গ সবসময় পরিস্ফুট হয়।লুকিয়ে থাকে না।হয়তো বা শরীর ম্যাজ ম্যাজ করাকে ভিতর ভিতর জ্বর, অধিক খাবার খেয়ে ক্ষুধামান্দ্যকে চাপা অম্বল এবং যেকোনো কারণে বমি পাওয়াকে চোরা জন্ডিস বলে ভুল করেন সাধারণ মানুষ।
(৭)চামড়ায় সাদা স্পট মানে লিভারের রোগ।
বহুল প্ৰচলিত অবৈজ্ঞানিক ধারণা।সাদা চামড়া সাধারণত: চামড়ার বা শারীরবৃত্তীয় অন্য রোগের উপসর্গ হিসাবে হয়। লিভার শরীরের বিপাক এবং পরিপাক ক্রিয়ার সার্বিক নিয়ন্ত্রক।লিভারের সমস্যা মারাত্মক একটি রোগ।এতে চামড়ার এ ধরণের উপসর্গ হয় না।
(৮)টিবি গরীব মানুষের রোগ।
এখন অবশ্য অনেকেরই এই ভুল ধারণা ভেঙেছে।যে কোনো রোগই অপুষ্টির কারণে যোতিক আকার ধারণ করে।কারণ অপুষ্টির কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে।টিবি’র ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই ই।আর পাঁচটা জীবাণু ঘটিত রোগের মত টিবি ও একটি জীবানু ঘটিত রোগ।…এরকম আর একটি ভ্রান্ত ধারণা হল, চিনি খেলে সুগার হয়।আসলে সুগার হল শরীরে শর্করার বিপাক জনিত এক বৈকল্য,যা ইনসুলিনের অভাবে হয়।চিনি ,সেক্ষেত্রে বেশি থেকে চিকিৎসায় সমস্যা হয়,এইমাত্র,আর কিছু নয়।
(৯)কোনো রোগের টিকা দিলে সে রোগটি আর হবে না।
টিকার কাজ হল কোনো রোগের তীব্রতা থেকে শরীরকে রক্ষা করা।স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল,খাদ্যগ্রহণ,পরিমিত বিশ্রাম,স্বাস্থ্য সচেতনতা ভীষণ জরুরি।
(১০)ডেট এক্সপায়ার ওষুধ খাওয়া আসলে মৃত্যুবাণের সামিল।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভ্রান্ত এ ধারণা।ওষুধের কার্যকারিতা যে কাল পর্যন্ত,তার পরে ওষুধের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়।তার মধ্যে কোনো বিষের উৎপত্তি হয় না।
(১১)ওষুধ বেশি খাওয়া কি দরকার রোগ তো সেরে গেছে!
এটি মারাত্মক ঝুঁকির মানসিকতা।ধরে নেওয়া যাক,একটি রোগ হওয়ার জন্য 10 টি জীবাণু দরকার।ওষুধ খেয়ে ধরে নেওয়া যাক 5 টি জীবাণুর মৃত্যু হল,এবং বাকি 5 টি জীবাণু শরীরে থাকলেও শক্তি হ্রাসের কারণে সে রোগের উপসর্গ গুলিকে পরিস্ফুট করতে পারলো না।তার অর্থ কি রোগটি সেরে যাওয়া? দেখা যায় কালে কালে এই 5 টি জীবাণু আবার বংশ বিস্তার করে সংখ্যায় বেড়ে আবার দ্বিগুণ ক্ষমতায় রোগের বিস্তার ঘটায়, এবং যা প্রতিরোধ করতে তুলনায় বেশি শক্তিশালী ওষুধের দরকার হয়।আলোচ্য 10 টি জীবাণুই মারতে যত দিন যত পরিমানে ওষুধ লাগে তাকে বলে কোর্স।এবং ওষুধের কার্যহীনতা কে বলে রেসিস্টেন্স।
(১২)জ্বর হলে ভাত খেতে নেই,জামা কাপড় বেশি পরতে হয়।স্নান করতে নেই।
আসল ঘটনাগুলো আসলে এই ভ্রান্ত ধারণাগুলির ঠিক উল্টো।জ্বরের কারণে শরীরে হজমশক্তি হ্রাস পায়।সেক্ষেত্রে ভাত সবচাইতে সহজপাচ্য খাদ্য।জামাকাপড় বেশি পরে থাকলে শরীরের তাপ চামড়ার মাধ্যমে বেরোতে পারে না।স্নান করলে শরীর ঠান্ডা থাকে।চামড়ার সংক্রমণের কারণে রোগের জটিলতা বাড়ে না।জ্বর সারতে সুবিধে হয়।
(১৩) পেটখারাপ হলে জল খেতে হয় না।উপোস করতে হয়।
বিপজ্জনক ধারণা ও মানসিকতা।পেট খারাপ ও বমির ফলে শরীর থেকে প্রচুর খাদ্য এবং জল বেরিয়ে গিয়ে ডিহাইড্রেশন,অপুষ্টি এবং আরো কিছু শারীরবৃত্তীয় বিপত্তি হয়।ফলে রোগ সারতে সমস্যা হয়।লঘুপাক খাদ্য, স্যালাইন জল এসব খেতে হবে।দেখা গেছে বমির সময় জল খেলেও সবটা জল বাইরে বেরিয়ে যায় না।কিছুটা শরীরে প্রবেশ করে, যা লাভজনক।
(১৪)মাথায় চোট লেগেছে।ঘুমোতে দিয়ো না।
অবৈজ্ঞানিক ধারণা।বেশির ভাগ মানুষ ঘুমানো এবং ঝিমিয়ে পড়ার মধ্যে গুলিয়ে এই কান্ডটি করে।মাথায় আঘাত একটি স্ট্রেস।তাতে ঘুম পায় ।সে ঘুমে বাধা দিলে স্ট্রেস বাড়ে।ঘুমোতে দিলে তাড়াতাড়ি শরীর ভিতর থেকে আঘাত সামলে ওঠে।
(১৫)বাচ্চা খিঁচুনি হয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে।ওকে জল আর খাবার খাওয়াও।
বিপজ্জনক এবং অবৈজ্ঞানিক ধারণা।খিঁচুনি কি কারণে হল তা বুঝে চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা শুরু করা সবচাইতে জরুরি।এক আধ বেলা খাবার বা জল না খেলে ততখানি বিপত্তি হয় না যতখানি অজ্ঞান অবস্থায় খাবার খাওয়ানোর চেষ্টাতে হয়।শ্বাসনালীতে খাবার চলে যাওয়ার কারণে এক্ষেত্রে যা কিছু ঘটতে পারে।সাবধান।দরকার হলে বাচ্চাকে হাসপাতালে ভর্তি করুন
(১৬)বাচ্চাকে ধুলোর মধ্যে ছেড়ে দিন,দূষিত জল খাওয়ান,তা না হলে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে না।
মারাত্মক ভুল বিশ্বাস।এখন ধুলোতে এবং জলে অস্বাভাবিক দূষণ।ভবিষ্যতে আরো বাড়বে।এ ব্যাপারে সচেতন হয়ে চলতে হবে।বাচ্চাদের শরীরে প্ৰতিরোধ শক্তি কম।সুতরাং স্বাস্থ্যবিধির এই সামান্য ব্যাপার গুলি মেনে চললে অনেক শ্বাসযন্ত্র ও পেটের রোগ থেকে মুক্ত হওয়া যায়।
কথায় বলে রোগের চিকিৎসার থেকে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা অনেক ভালো।অর্থাৎ Prevention is better than cure. চিকিৎসা শাস্ত্র অতীব জটিল এক বিজ্ঞান।যা বহুদিনের সাধনায় রপ্ত করতে হয়।চিকিৎসক শুধুমাত্র রোগের চিকিৎসাই করেন না,বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করেন উপরোক্ত আলোচনাতে চিকিৎসা সংক্রান্ত মানুষের ভ্রান্ত এবং অবৈজ্ঞানিক ধারণা এবং তার উপর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করে সাধারণকে অবহিত করার চেষ্টা করলাম।
পলাশ_বন্দ্যোপাধ্যায়
০৪.০৯.২০২০

















