প্রসঙ্গ: সুন্দরবন, ত্রাণ ও উন্নয়ন
ড:বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী
আমরা ভারী অদ্ভুত প্রাণী জানেন! গাছ কাটি, গাছের ছাল থেকে কাগজ বানাই আবার তাতেই বড় বড় অক্ষরে লিখি “একটি গাছ একটি প্রাণ। গাছ বাঁচান প্রাণ বাঁচান।” ব্যাপারটা সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও বেশ প্রযোজ্য।
আমরা জানি ভূ-প্রাকৃতিক দিক থেকে সুন্দরবন মানচিত্রের এমন একটি স্থানে অবস্থান করে, যেখানে এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন তাকে বারবারই হতে হবে। কিন্তু সমস্যা আসলে সুন্দরবনকে নিয়ে নয় সমস্যা বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে নিয়ে। জনসংখ্যার মানসিকতা এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কে নিয়ে। যদিও আমরা জানি যে পৃথিবীর 90% মানুষ বসবাসের জন্য মূলত স্থলভাগের 10% অঞ্চলের উপরই নির্ভরশীল। সেই অর্থে ধরতে গেলে সমতল ভূমি হিসেবে সুন্দরবনও যে সেই লিস্টের বাইরে থাকবে না তা খুব সহজেই অনুমেয়। আর তাই প্রাকৃতিক নিয়মে আর সব অঞ্চলের মতো সুন্দরবনেও মানুষ তার বাসস্থান গড়ে তুলেছে। বেচারা সুন্দরবন হয়তো ভাবতেও পারেনি যে একদিন বন্যপ্রাণীদের পাশাপাশি সামাজিক প্রাণী কেও তার বুকে জায়গা করে দিতে হবে।
এবার মজা হলো একই মাঠে যখন মানুষ আর বাঘ কিংবা মানুষ আর জঙ্গল একই সাথে খেলতে নামে তখন সবচেয়ে দুর্বল যে তাকে তো পিছু হটতে ই হবে। অতএব শুরু হল বেঁচে থাকার লড়াই। ডারউইনের ভাষায় যাকে বলে survival of the fittest। ঘটনাচক্রে এই লড়াইয়ে প্রথম রাউন্ডে মানুষ খানিকটা এগিয়ে গেলেও পরবর্তী যে রাউন্ড গুলো ক্রমাগত তার দিকে ধেয়ে আসছে তার বিপদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য প্রতিনিহত বুকে আতঙ্ক নিয়ে তাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। এই বুঝি কোন সাইক্লোন এলো, এই বুঝি সমুদ্র মাথার ওপর দিয়ে বয়ে গেল ইত্যাদি ইত্যাদি। তো কর্ম যখন ঘটিয়ে ফেলেছে তখন কর্মফল ভোগতো করতেই হবে। কাজেই ম্যানগ্রোভ কাটার ফলাফল সে হাতেনাতে পেতে শুরু করলো। ঠিক এইখান থেকেই একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। পাঠ্যপুস্তক এর ভাষায় যার পোশাকি নাম – দুর্যোগ ও বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা, যার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় আর না যাওয়াই ভালো। কিন্তু এই দুর্যোগ আর বিপর্যয়কে কিছু মানুষ নিজের পেট চালানোর সহজ কথায় রোজগার বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলো। জন্মসূত্রে আমরা যেহেতু দুর্বল প্রতিবেশীর জন্য সহৃদয়তা বুকে নিয়েই জন্মাই, সেহেতু একদল মানুষ ঘোষণা করলেন সুন্দরবনের মানুষেরা প্রান্তিক, অসহায় ও দুর্বল। তাদের পাাশে দাঁড়াাতে। অস্বীকার করছি না । তাদের সে সামর্থ্য থাকলে তারা সুন্দরবনে বাড়ি না করে রাজারহাট নিউটাউন এ ফ্লাট নিতেন। অতএব সেই সহৃদয়তা থেকে জন্ম নিল বেশকিছু NGO যারা তাদের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সুন্দরবনের মানুষদের পাশে দাঁড়ালো। কেউ শিক্ষাকেে, কেউ স্বাস্থ্যকেে, কেউবা ত্রাণ কে হাতিয়ার করে মাঝেমাঝেই ছুটে যায় সুন্দরবনের সেই প্রান্তিক মানুষগুলোর কাছে, তাদের livelihood development এর উদ্দেশ্যে। এই পর্যন্ত কোন সমস্যা ছিল না।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এত বছর ধরে এত NGO, এত সরকারি অনুদান, এত টাকা সুন্দরবনের মানুষ এবং তাদের livelihood development এর পেছনে খরচা করা সত্ত্বেও তাদের কোনো পরিবর্তন আজ পর্যন্ত কেন দেখতে পেলাম না ? সুন্দরবনের মানুষগুলো আজো নিজেদের পেট ভরার জন্য শহর কলকাতার বাবুদের দিকে হাপিত্যেশ করে তাকিয়ে থাকে। তারা তো কই স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারল না ? অথচ তাদের সাহায্যার্থে তৈরি হওয়া NGO গুলো রিকশা থেকে স্করপিও তে বহু বছর আগেই শিফট হয়ে গেছে। একটা সাইক্লোন এলে কিংবা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস হলে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল গুলো জলের তলায় দিনের পর দিন চলে যাচ্ছেে- তাকে নিয়ে আমরা রাজনীতি করতে পারি, চাল ডাল তেল নুন নিয়ে সেলফি তুলতে তুলতে মানুষগুলোকে ত্রাণ বিলোতে বিলোতে নিজেদেরকে ছোটখাটো ভগবান ভাবতে পারিি, কিন্তু সুন্দরবনের প্রকৃত উন্নয়ন টা কোথায় আর কিভাবে করা যায় সেটা নিয়ে কি ভাবছি ? আমার মনে হয় না।
তাহলে গলদটা কোথায় ? আমাদের চিন্তা ভাবনায়, মানসিকতায় নাকি পরিকল্পনায় ? আমাদের আগে ঠিক করতে হবে আমরা কোনটা চাই – সুন্দরবনের মানুষগুলোর প্রকৃত উন্নয়ন নাকি ফি বছর একটা সাইক্লোন এলে দলবেঁধে ত্রাণ জোগাড় করে এই মানুষগুলোকে একটু আশা দেখানো যে আমরা তোমার পাশে আছি ? পরেরবার আবার সাইক্লোন এলে আবার আসবো। আপনাদের মহৎ উদ্দেশ্য ও উদ্যোগ কে আমি কুর্নিশ জানাই। কিন্তু বুকে হাত রেখে বলুন তো এই ভাবে কি সত্যিই কারুর পাশে দাঁড়ানো যায়? নাকি সাময়িক পাশে দাড়িয়ে আমরা তাদের আদৌ কোন উপকার করছি ? তার থেকে আমরা এমন কি কিছু করতে পারি না যা থেকে সেই মানুষগুলোকে আমাদের উপর ভরসা করতে না হয় ? প্রত্যেক বছরই ত্রাণ বিলোনোর থেকে যদি সারা বছর আমরা তাদের ম্যানগ্রোভ গাছ লাগাতে এবং ম্যানগ্রোভ এর উপকারিতা বোঝাতে কিছু মুহূর্ত সময় দিই তাহলে মনে হয় আগামী দিনে সুন্দরবনের মানুষ নিজেই নিজের রক্ষা করার মত সামর্থ্য অর্জন করতে পারবে। পাশাপাশি যেটা দরকার সেটা হলো শিক্ষার মাধ্যমে তাদের সামর্থ্য করে তোলা। পুঁথিগত শিক্ষার কথা বলছি না, বলছি সেই শিক্ষার কথা যা তাদেরকে local resources থেকে livelihood generate করতে শেখাবে। আমার বিশ্বাস সুন্দরবনের মানুষেরাও তাই চায়। না হলে প্রকৃতির রোষ হয়তো একদিন এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছবে যেদিন আমাদেরকেই হাত পেতে কারোর কাছ থেকে ত্রাণ নিতে হবে আর তারা ত্রাণ দেওয়ার সময় আমাদেরকে নিয়ে সেলফি তুলবে।
পুনশ্চ, জানি মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোটা সবচেয়ে বড় কর্তব্য। কিন্তু Sustainable Development এর দিক থেকে দেখতে গেলে সুন্দরবনের মানুষদের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য ত্রাণের থেকেও বেশি জরুরী ম্যানগ্রোভ জঙ্গলটা। কারণ প্রথমটা Subsidy আর দ্বিতীয়টা Necessity.
ইতি BRC
Dr. Biswajit Roy Choudhury, A pioneer in advance SKILL Development in the niche area of Science and Technology in entire eastern India. His jewel in the Crown South Asian Institute for Advance Research and Development is now an internationally admired institute by many pioneer in the similar field. He is the Chairman of SAIARD & IGST .

















