আমার স্বাস্থ্য আমার অধিকার – ডাক্তার ধীরেশ চৌধুরী , বাঁচবো সংগঠনের প্রাণপুরুষ
By ডাক্তার ধীরেশ চৌধুরী , বাঁচবো সংগঠনের প্রাণপুরুষ
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস, ৭ই এপ্রিল, ২০২৪
আজ ৭ই এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। এটা তো ভ্যালেন্টাইন ডে নয় যে এই নিয়ে খুব মাতামাতি হবে। কর্পোরেটদেরও উৎসাহ নেই, কারণ এই দিবস পালনে তাদের বিক্রি বাটা বাড়ার কোন জায়গা নেই। তাই প্রায় নিরবেই এসব দিবস গুলো পালন হয়। আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে কিছু মানুষের মধ্য।
প্রতিবারের মতনই এবারের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসেরও একটা থিম আছে। সেটা হল “আমার স্বাস্থ্য আমার অধিকার”। খুবই অর্থবহ। কিন্তু আমরা যাঁরা আমাদের সামান্য ক্ষমতার মধ্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা র সাথে জড়িত তাঁদের কাছে কেন জানিনা বিষয়টি বড্ড বেশি পরিহাসের মনে হচ্ছে, বিশেষ করে এদেশের নিরিখে। একজন মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের সাথে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মৌলিক অধিকারের মধ্যে বিবেচ্য হবার কথা। তবেই তো সেটা অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে নির্বাচিত সরকারের তখনই আবশ্যিক সকলকে নূন্যতম স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান করাটা দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বেশিরভাগ দেশেই সেটা আজও হয়ে ওঠেনি, সচেতন ভাবেই বিষয়টিকে সরকারের দায়িত্ব থেকে বাদ রাখা হয়েছে। কারণ? এই বিষয়টি নিয়ে বেশিরভাগ মানুষ সচেতন নয়, সচেতন করার কোন সদর্থক প্রয়াসও নেই, ফলে ভোটে এর প্রভাব খুব কিছুই নেই। ঠিক যেমন আমাদের দেশে। ১৪০ কোটির দেশে ৯০% মানুষের কাছে সুস্বাস্থ্য আজও একটা বিলাসিতা মাত্র। তাদের বেশিরভাগ শিক্ষার সেই স্তরেও উন্নীত নন যাতে তারা ভাবতে পারেন যে একজন নাগরিক হিসেবে “আমার স্বাস্থ্য আমার অধিকার”। কোন সরকারই সেটা গুরুত্ব দেননি। সেই বোধকে জাগ্রত করতে কোন প্রয়াস নেয়নি। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক দল গুলোর ম্যানিফেস্টো দেখুন, দেখবেন স্বাস্থ্য সেখানে একেবারে ব্রাত্য একটা বিষয়। সেখানে মন্দির, মসজিদ, ভাতা গুরুত্ব পায়! কিন্তু পায়না শিক্ষা ও স্বাস্থ্য…ভাবা যায়!!!
আমাদের যাদের প্রান্তিক স্তরে জনগণের কাছাকাছি গিয়ে কিছু কাজ করার সুযোগ হয়েছে তারা জানি কিভাবে অতি সামান্য স্বাস্থ্য-র বিষয়েও তারা উপেক্ষিত। ছিটেফোঁটা যেটুকু তাদের জোটে সেটাই তারা ভাবেন বিরাট প্রাপ্তি, সেই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন বা থাকতে বাধ্য করা হয়। এক একটা প্রাথমিক চিকিৎসালয়ে ১০/১৫ টা (প্রায় সময় তাও নাকি শুনেছি অমিল) ওষুধের মধ্যে সবকিছু চিকিৎসা করতে একপ্রকার বাধ্য থাকেন চিকিৎসকেরা যুগ যুগ ধরে, এমনকি এত আধুনিক যুগেও। তাই বিনা চিকিৎসায় বা কারণ না জেনেই মৃত্য ঘটছে কত কত মানুষের। তারা ভেবে বসেন বা সেভাবে ভাবতে শেখানো হয় এসব দৈবের প্রভাব বা ভবিতব্য। আর তাই বেশিরভাগ মানুষই এখনও স্বাস্থ্যের কোন সমস্যায় গুণী, ওঝাদের কাছে ছুটে যায়!!! হয়তো সেটা চায় প্রশাসকেরাও, মুখে যতই অন্য কথা বলুক।
তারই প্রতিফলন দেখুন সাম্প্রতিক কেমন নীরবে, নিশ্চুপে, বিনা প্রতিবাদে ৮০০ ওষুধের মূল্য এক ঝটকায় বেড়ে গেল! যার মধ্যে প্রেসার, সুগারের মতন দীর্ঘস্থায়ী রোগের এবং বেশ কিছু জীবনদায়ী ওষুধও রয়েছে। কোনো প্রতিবাদ নেই সেভাবে, যতই বিরোধিতা থাকুক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, এনিয়ে তারাও নিশ্চুপ, এসবে অভিন্ন হৃদয়। কারণ ইলেক্টোরাল বন্ডে প্রায় সব রাজনৈতিক দল গুলোই ওষুধের কোম্পানি গুলো থেকে অনুদান পেয়েছেন শত শত কোটি টাকা। তাই নিশ্চুপ তো থাকতেই হবে। অনেক লোকজনের আবার ধারণা এসবে নাকি চিকিৎসক গোষ্ঠীর অলিখিত হাত! সেটা পরোক্ষ ভাবে মানুষের মনে ঢুকিয়েও দেওয়া হচ্ছে যাতে আসল সত্য থেকে চোখ ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। এই যদি অবস্থা হয় তবে ভাবতে পারেন স্বাস্থ্যের “অধিকার” কতটা অধরা থাকতে পারে! মদের জি এস টি কম, কিন্তু স্বাস্থ্যের জি এস টি বেশি! মেডিক্লেইম এর প্রিমিয়াম আজ আকাশ ছোঁয়া, তারপরেও ভাববো কি করে স্বাস্থ্য আমার অধিকার! আমরাই পারবো না তো গরিবরা তো কোন ছাড়! বলতে পারেন কোন মায়াবলে ৫৮টি ওষুধ গুণগত মান পেরোতে পারেনা অথচ বাজারে চলে আসে! কাদের দাক্ষিণ্য? এই নিয়ে প্রশ্ন জাগেনা মানুষের, কারণ উপরি কিছু ভাতা আর সুবিধে পাইয়ে দিয়ে মানুষকে বুঁদ করে রাখা হয়েছে। শিরদাঁড়া নিজেদের অজান্তেই ক্ষয়ে যাচ্ছে অনেক, চেতনা অস্তমিত আর তথাকথিত মিডিয়ার আলোচনায় এগুলো গুরুত্ব পায় না, কারণ এসবে টি আর পি কম। তাই ব্রাত্য থেকে যায় সে অর্থে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলো। আর তাই এসব ভোটেরও বিষয় হয় না। তাই লোকসভা ভোটে টিভি শোয়ের সুযোগ পাইয়ে দেওয়া, এই ভাতা-ওই ভাতা, কোটি টাকা মূল্যের মন্দির এসব ভোট চাওয়ার ইস্যু করতে পারেন ভোট প্রার্থীরা, বলা যায় সেই সাহস পান! তারপরেও কিভাবে ভাববে দেশের মানুষ স্বাস্থ্য আমার অধিকার? তাই থিম যতই তাত্ত্বিক ভাবে হোক, বাস্তবিক সেটা হতে আজও বহু বহু দশক পেরোতে হবে আমাদের মতন দেশে।
এসবের পরেও আমরা আশাবাদী, পরিবর্তন হবেই, হয়তো শ্লথ গতিতে। আশাহত হলে চলবে কি করে, দম এত তাড়াতাড়ি ফুরোবার নয়…
সেদিন আসবেই যেদিন জঙ্গল মহলের থেকে উঠে আসা সিস্টার খুকুমণি র সেই আক্ষেপের সম্মুখীন হতে হবেনা আমাকে “স্যার, আমার হরমোনের ওষুধের দাম এক লাফে ৭০টাকা বেড়ে গেল…জানিনা ওষুধ চালিয়ে যেতে পারবো কিনা?”, তবে এরই পাশাপাশি এই খুকুমনিই তো নীরবে হয়ে যাওয়া একটা আন্দোলন/মুভমেন্টের ফসল, ওর মতন প্রান্তিক মেয়েরাও যে এই দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার অঙ্গ হতে পারে সেটাও বা কম কি!…এটাও তো “স্বাস্থ্য আমার অধিকার” এর মধ্য পড়ে, কি বলেন আপনারা? তাই শুধু একা নয়, চলুন সকলে মিলে সর্বোচ্চ ভালো থাকার চেষ্টা করি। তাতেই যে আসল আনন্দ…
ভালো থাকবেন আর ভালো রাখবেন।

© ডাঃ ধীরেশ।
ডাক্তার ধীরেশ চৌধুরী , বাঁচবো সংগঠনের প্রাণপুরুষ,বয়স্ক মানুষদের কাছের মানুষ ডাক্তার বাবু শুধু জেরিয়াটিক চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ নন , নানা মানবিক গুণের আধার । তাঁর সংগঠন “বাঁচবো” সুন্দরবন সহ, নানা স্থানে স্কুল ,স্বাস্থ্য পরিসেবা দিচ্ছেন । তাঁর বাঁচবো টিমের সুযোগ্য সহযোগীদের সাহায্যে প্রতিদিন বহু মানুষ নতুন করে বাঁচার আশা দেখছেন।
আমাদের ফাউন্ডার এডিটর কে ধীরেশ বাবু স্নেহের সাথে তাঁর লেখা ছাপানোর অনুমতি দিয়ে থাকেন । আমরা তাঁর এই অনুমোদন দান বা কখনও কখনও আমাদের অত্যাচারের দাবি মেনে নেয়ার উদারতার জন্য তাঁর ও বাঁচবো পরিবারের সকলের কাছে কৃতজ্ঞ ।












