কেস স্টাডি ৪ – ইন্দ্রমল জৈনের ইন্দ্রমণির হীরে
ঘটনার সময় – ১০ ই মে ২০২৪
স্থান – মাটিগাড়া, শিলিগুড়ি
আবেদনকারী – ইন্দ্রমল জৈন
আবেদনের তারিখ – ১২ ই মে ২০২৪
ঘটনার বিবরণ –
শিলিগুড়ি হিলকার্ট রোডে ইন্দ্রমল জৈন এর সুদৃশ্য জুয়েলারি র দোকান, নাম ইন্দ্রমণি। গত ১০ই মে ২০২৪ দোকান খুলে দেখা যায় ৩০ ক্যারেটের একটি আট গ্রাম ওজনের হীরে নিখোঁজ। যার মূল্য আড়াই কোটি টাকা। সেদিনই লোকাল থানায় এফ আই আর করার পর ইন্দ্রমল জৈন আমাদের কাছে আসেন পরের দিন অর্থাৎ ১১ ই মে ২০২৪ এ। ১২ ই মে তিনি আমাদের অফিশিয়াল প্রসিডিওর মেনে নিয়োগপত্র দেন।
তদন্ত প্রক্রিয়া –
ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ৯ ই মে আমরা দোকানের ভেতরের এবং বাইরের সি সি টিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করি। তাতে চার জন ব্যক্তি কে আমরা আমাদের সন্দেহের তালিকায় আনি। বাকি যারা এসেছেন তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক ছিলোনা।
প্রথম ব্যক্তি –
একজন অপরিচিত মহিলা। যাকে দোকানের কেউই চেনেনা। না তো তিনি পুরনো কোনো কাস্টমার আর না তো কারোর পরিচিত মুখ।তদন্তে জানা যায় তার নাম মাধুরী লেপচা। কার্শিয়াং এর মহিলা। দোকানে তিনি বেশ কিছুক্ষণ মোবাইল বের করে সেল্ফি তুলেছেন। বিশেষ করে স্ট্যান্ডে রাখা হীরেটাকে পেছনে রেখে যাতে হীরের অবস্থান ভালো ভাবে বোঝা যায়।
দ্বিতীয় ব্যাক্তি-
পরিমল সিকদার। তিনি পেশায় জহুরি। ইউনিভার্সিটির কাছে তার একটি ছোটো জুয়েলারি র দোকান। ধারে দেনায় জর্জরিত। দোকানে ঢুকে তিনি একবারও হীরের সামনে থেকে সরেননি। একবার পকেট থেকে গোলমতো গ্লাশ চোখের কাছে ধরে হীরেটাকে জরিপও করেন। দোকানের কাস্টমার ভেবে কর্মচারী রা গুরুত্ব দেয়নি।
তৃতীয় এবং চতুর্থ ব্যাক্তি –
শশধর রায় এবং ইন্দ্রমণি দোকানের ম্যানেজার, মনোজ পোদ্দার। শশধর রায় মিষ্টির বড়ো ব্যবসায়ী। ইন্দ্রমল জৈনের ছেলের জন্মদিনে কিছুদিন আগেই মিষ্টি সাপ্লাই করেছেন। ইন্দ্রমল বাবু তার পেমেন্ট করেছিলেন নিজের দোকানে। সেই সময় হীরেটা শশধর রায় কে আকৃষ্ট করে। হীরেটির সম্ভন্ধে তিনি অনেক কিছু জিজ্ঞেসও করেন। ৯ই মে তিনি দোকানে আসেন সন্ধ্যে সাতটায়। দোকানের ভেতরে না ঢুকে তিনি বাইরের ডাইনিং এ অপেক্ষা করেন। কিছুক্ষন পর ইন্দ্রমল বাবুর ম্যানেজার মনোজ পোদ্দার দোকানের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং তার সাথে কিছুক্ষন কথা বলে হাতে একটা সাদা কাগজ দিয়ে শশধর রায় রাস্তায় বেরিয়ে আসেন।
তদন্তে যোগসূত্র প্রমাণ –
প্রথমে আমি কার্শিয়াং এ মাধুরী লেপচার সম্ভন্ধে খোঁজ করি। একটি টি স্টেট এ কাজ করতেন। চুরির অপবাদে তার চাকরি গেছে এখন বর্তমানে দার্জিলিং এর ম্যালের নিচে মোমোর দোকান দিয়েছে। স্বভাব চরিত্র কোনদিক থেকেই সুবিধের নয়। অনেকের ধারণা মোমো র দোকান লোক দেখানো আড়ালে দেহ ব্যবসাই হলো তার মূল ব্যবসা। যে হোটেলে সে এই ব্যবসা চালায় সেই হোটেলে গোপন সুত্রে জানতে পারি শশধর রায় তার নিত্য কাস্টমার।
কার্শিয়াং থেকে ফিরে আমি যাই পরিমল সিকদার এর দোকানে। পাশের চায়ের দোকান থেকে খবর পাই পরিমল সিকদারের বিস্তর দেনার মধ্যে মুল দেনা আছে শশধর রায়ের কাছে। অর্থাৎ ৯ তারিখ সন্দেহজনক দুজনের সাথেই শশধর রায়ের ঘনিষ্টতা। মোটামুটি দুয়ে দুয়ে চার করে ফেললাম।থাকলো মনোজ পোদ্দার তার সাথে শশধর রায়ের গোপন কথা আইডিয়া করা খুব একটা কঠিন ছিলোনা।
ঘটনার দিন কি ঘটেছিলো –
মিস লেপচা সেল্ফির মাধ্যমে দোকানের মধ্যে হীরের জায়গার ছবি তোলে। তারসাথে এটিও দেখে কাচের স্ট্যান্ড যার ওপরে হীরেটি আছে তার সাথে লাগানো কোনো এলার্ম অথবা ক্যামেরা আছে কিনা। দশ হাজার টাকার বিনিময়ে মিস লেপচা এই কাজটি করেন।এরপর আসল হীরেটাই দোকানে রাখা হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্যে পাঠানো হয় পরিমল সিকদারকে।সবার শেষে শশধর রায় দু লক্ষ টাকার একটি চেক সাদা খামে ভরে পরিকল্পনার অন্যতম অংশিদার মনোজ পোদ্দারকে দিয়ে আসেন। দোকানের লক এন্ড কি মনোজের হাতেই ছিলো তাই রাতের অন্ধকারে দোকানে ঢুকে খুব সহজেই কাজ টি করে বেরিয়ে আসে শশধর রায়ের পাঠানো লোকেরা।
তদন্তের অনুসরণ –
আমি ধুরন্ধর শশধর এর সাথে কথা বলে সেরকম কিছুই বের করতে পারিনা। কিন্তু খবর পাই উনি ১৪ তারিখ রাতের ট্রেন ধরে কোলক্তা যাচ্ছেন। ১৩ তারিখ সারাদিন আমি ওনাকে গোপনে ফলো করি।
উপসংহার –
(আমি নিজের ভাষায় তুলে দিলাম)
হাতের ব্যান্ডেজটা এবার খুলে ফেলুন শশধর বাবু। আপনার অপরাধের রহস্য ফাঁস হয়ে গেছে। এখন আর নাটক করে লাভ কি? চারটি চেয়ারের মধ্যে তিনটি চেয়ার আর শোফা মিলে মোট ছয় জোড়া চোখ এবার শশধর বাবুর দিকে।
- মানে, ইয়ার্কি হচ্ছে? নিজেকে ফেলুদা ভাবছেন না ব্যোমকেশ বক্সী? আমি আপনার নামে মানহানির মামলা করবো মশাই। তখন থেকে আপনার যা নয় তাই গল্প শুনে যাচ্ছি। আপনারা থাকুন আপনাদের হীরের অবাস্তব গল্প নিয়ে আমার অনেক কাজ আছে।
বলে শশধর বাবু উঠতে গেলেন। এবারে ধীর শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় মাটিগাড়া থানার আই সি চঞ্চল দাস বলে উঠলেন,
- বসুন মি. শশধর বাবু। গল্পটা যখন শুরু হয়েছে তখন এর শেষটা ও দেখে যান।
এবারে আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে শশধর বাবু চেয়ারে বসে পরলেন।
-ধন্যবাদ আই সি সাহেব। বলে শশধর বাবুর দিকে তাকালাম।
- কৈ খুলুন ব্যান্ডেজ। আপনার হাতে তো কিছু হয়নি শশধর বাবু। আপনার ফিজিশিয়ান এর সাথে আমার কথা হয়েছে তার রেকর্ডিং তো আপনাকে শোনালাম। ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান তার ওপর আপনার মেজাজ, সেই ভয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আপনার হুকুমে ক্রেপ ব্যান্ডেজ এর কথা প্রেসক্রিপশন এ লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন। আপনাকে এক্সরে করার পরামর্শ দেওয়াতে বলেছিলেন সেটাও প্রেসক্রিপশন এ লিখে দিতে। তা কোথায় আপনার এক্সরে ?
- সেটা আপনাকে দেখাতে আমি বাধ্য নই মি. চক্রবর্তী।
- তা বাধ্য আপনি নন, আর আপনি তা দেখাতেও পারবেন না। কারন আপনি এক্সরে করালে নিশ্চয় তা
আপনার ফিজিশিয়ান এর কাছে নিয়ে যেতেন বিশেষ করে আজ রাতে যখন আপনার কোলকাতা যাওয়ার ফ্লাইট। তাই না?
শশধর রায় এবারে আর কোনো কথা বললেন না। মৌনব্রত অবলম্বন করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
- কি হলো কথা কানে যাচ্ছেনা? ব্যান্ডেজ টা খুলুন।
পুলিশি গলায় ধমকে উঠলেন আই সি সাহেব। শশধর বাবু এবারে কিছুটা হতাশ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে নিজের বাম হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
নতুন কেনা ক্রেপ পুরোটা খুলে আসতে তার ভেতর থেকে বেড়িয়ে এলো ভাজ করা একটা সাদা খাম। সেই খামটা না খুলেই চঞ্চল বাবুর দিকে এগিয়ে দিলাম। তিনি খামটি থেকে বের করে আনলেন কাচের গুলির আয়তনের একটি উজ্জ্বল সাদা পাথর।
মনোজ পোদ্দার এখনো ফেরার। মিস লেপচা পুলিশের জেরার মুখে সব স্বীকার করেছেন আর সিকদারকে আপাতত লকআপে রাখা হয়েছে। আগামীকাল শশধর রায়, মিস মাধুরী লেপচা আর সিকদার তিনজকেই কোর্টে চালান করা হবে।
আর আমি আমার বাকি পেমেন্ট নিয়ে আপাতত আই সি সাহেবের সাথে এক কাপ চায়ে ব্যস্ত, একটু পরে কোলকাতার ট্রেন ধরে ফিরে যাবো।
(ঘটনার গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্যে স্থান এবং পাত্রের নাম গোপন করা হলো)
















