Saturday, October 24, 2026
WA
Home Bangla অনন্য এক শিক্ষাব্রতী আর জনকল্যাণকামী ব্যক্তিত্বের কর্মকাহিনি

অনন্য এক শিক্ষাব্রতী আর জনকল্যাণকামী ব্যক্তিত্বের কর্মকাহিনি

0
723

অনন্য এক শিক্ষাব্রতী আর জনকল্যাণকামী ব্যক্তিত্বের কর্মকাহিনি

ড. সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়

কে এই মোস্তাক হোসেন—যাকে নিয়ে একের পর এক বই বের হচ্ছে? প্রথমে বের হল ‘নতুন গতি’ থেকে নুরুল আমিন বিশ্বাসের লেখা বই ‘মানবতাবাদী মোস্তাক হোসেন’। আবার ২০২৫-এর আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় বেরোল ফারুক আহমেদ সম্পাদিত বই ‘মোস্তাক হোসেন: জীবন ও ঐতিহ্য’। গবেষণা গ্রন্থটি ‘উদার আকাশ’ প্রকাশন সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই সাতশো কুড়ি পাতা জুড়ে সুবিশাল এই গ্রন্থটি মোস্তাক হোসেনের জীবন ও কাজ নিয়ে লেখা। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন আসবে, কী এমন কাজ করেছেন মোস্তাক হোসেন তাঁর জীবনে যে তাঁকে নিয়ে ৭২০ পাতার বই বের করতে হল? আর এত এত পাতাজুড়ে তাঁর সম্পর্কে এত এত কথা লিখলেনই বা কে? প্রথমেই বলা দরকার যে নুরুল আমিন বিশ্বাসের বই তাঁর নিজের লেখা। অন্যদিকে ফারুক আহমেদ সম্পাদিত বইতে কলম ধরেছেন সৃষ্টির নানান ক্ষেত্রের বহু মানুষ। সত্যি কথা বলতে কি, বাংলার শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও ইতিহাস জগতের এত মানুষ এই বইতে লিখেছেন যে তাদের তালিকা পেশ করার চেয়ে উলটে বলা যায়, কে লেখেননি! লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আসলে লিখেছিলেন মোস্তাক হোসেনের লেখা বই ‘গুহার ভেতরে আলো’ পড়ার প্রতিক্রিয়ায়। সম্পাদকের কৃতিত্ব, এই সমস্ত লেখাকে একটা বইয়ের দু’মলাটের মধ্যে নিয়ে আনা।

   সাধারণত আমরা দেখি, কেউ মারা গেলে তাঁকে নিয়ে তাঁর গুণগ্রাহীরা স্মরণালেখ্য বের করেন। সেই স্মরণিকায় প্রকাশিত প্রয়াণলেখ পড়তে গিয়ে মন খারাপ হয়ে যায়। বারবারই মনে হয়, সেই মানুষটা বেঁচে থাকার সময়ে যদি এই লেখাগুলো পড়তে পারতেন তাহলে কী ভালোই না হত! তাতে যে সেই ব্যক্তি আত্মশ্লাঘা লাভ করতেন, এমনটা নয়। বরং তাঁর কাজ যে এত মানুষের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, বইয়ের মাধ্যমে সেটা জানতে পেরে তিনি ধন্য হতেন; অনুপ্রাণিত হতেন পরে আরও কাজ করার জন্য। অর্থাৎ সেই বই তাঁকে আরও ভালো কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারত। মৃত্যুর পরে প্রকাশিত এই ধরনের বই দেখার সুযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির থাকে না। আর এখানেই ফারুক আহমেদ সম্পাদিত বইটি ব্যতিক্রম যে তা প্রকাশিত হয়েছে মোস্তাক হোসেনের জীবৎকালে।

   মোস্তাক একজন শিল্পপতি। বাঙালি শিল্পবিমুখ বা এ রাজ্যে শিল্প নেই, এ-জাতীয় কথাই যখন সর্বত্র শোনা যায়, তখন মোস্তাক হোসেনের মতো এই রাজ্যেরই কোনও এক শিল্পোদ্যোগীর কৃতিত্বের কথা জেনে বিস্মিত হতে হয়। পারিবারিক ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে তিনি কীভাবে সাফল্যের জয়পতাকা উড়িয়েছিলেন সেই যাত্রাপথের ইতিহাস ক’জনই বা জানেন? সেই কাহিনি জানলে শিল্পোদ্যোগী মোস্তাক হোসেনকে অভিবাদন জানাতেই হবে। সেই বন্ধুর যাত্রাপথের বিবরণ লেখা আছে এই বইতে।

   ১৯৫৮ সালে মুর্শিদাবাদ জেলার অওরঙ্গাবাদের চাঁদড়া গ্রামে জন্ম মোস্তাকের। ন’ ভাই-বোনের পরিবারে তিনি পঞ্চম সন্তান। এই গ্রামেই প্রাথমিক শিক্ষা। পরে নিমতিতা দ্বারকানাথ ইন্সটিটিউট থেকে ১৯৭৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে চলে আসেন বহরমপুরে। রাজা কৃষ্ণনাথ কলেজ বহরমপুর থেকে ১৯৭৮ সালে বি কম পাশ করেন। একই সঙ্গে শুরু করেন ইভনিং-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম কম পড়া আর চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট হওয়ার প্রস্তুতি। কিন্তু সেই চেষ্টা সার্থক হতে পারে না। গ্রাম থেকে তাঁর বাবার অসুস্থতার খবর আসে। কলকাতা থেকে গ্রামে ফেরেন মোস্তাক হোসেন। মনে করেছিলেন, মাস ছয়েক পরে ফের ফিরে যাবেন পড়ার জগতে। কিন্তু তা আর হল না। ব্যবসার হাল ধরতে হল মোস্তাক হোসেনকে।

তাৎক্ষণিক সমস্যা মেটানোর পরিবর্তে মোস্তাক নজর দিলেন দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে। শুরু করলেন সমীক্ষার কাজ। লক্ষ্য তাদের পারিবারিক শিল্পের পণ্যের বাজার সম্পর্কে অনুসন্ধান চালানো। আর তার জন্য তিনি সুদূর উত্তর ভারতেও সমীক্ষা চালান। সমীক্ষার ফল মিলল। উত্তর ভারতে বিস্তৃত হল তাঁর ব্যবসা। আশির দশকের শেষে দক্ষিণ ও মধ্য ভারতেও ছড়িয়ে পড়ে তাঁর ব্যবসা।

শিল্পোদ্যোগী থেকে শিল্পপতিতে রূপান্তরিত হওয়াই যদি এই যাত্রার শেষ গন্তব্য হত তবে তা হয়তো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উত্তরণের এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হত; অনেককে শিল্পোদ্যোগে শামিল হতে অনুপ্রাণিতও করত। কিন্তু মোস্তাক হোসেনের গল্পের শেষ এখানেই নয়। তিনি তাঁর উপার্জিত অর্থের একটা বড় অংশ জনকল্যাণে ব্যয় করতে প্রয়াসী হলেন। আর তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল শিক্ষা।

আজ যে আল-আমীন মিশন থেকে একের পর এক উজ্জ্বল তারকার উত্থান ঘটছে; চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ, গবেষকরা উঠে আসছেন সংখ্যালঘু পরিবার থেকে, তার পেছনেও আড়ালে রয়েছেন মোস্তাক হোসেন। আজ হয়তো ওই মিশনের সঙ্গে তাঁর রোজকার সংস্রব নেই কিন্তু ধ্রুবপদ তো বেঁধে দিয়েছেন তিনি-ই। মিশনকেন্দ্রিক পড়াশোনায়, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা আর অধ্যবসায়কে পাথেয় করে এগিয়ে চলেছে গরিব পরিবারের সংখ্যালঘু ছাত্রেরা। দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। এই বইতে একের পর এক লেখায় মোস্তাকের নেতৃত্বে আল-আমীন মিশনের জয়যাত্রার সেই কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। সেইসব কাহিনিতে এই তথ্য উঠে আসে যে তাঁর জি ডি চ্যারিটেবল সোসাইটির তত্ত্বাবধানে ৬৫টি মিশন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার প্রসারে নিয়োজিত। জিডি স্কলারশিপ পেয়ে আধুনিক শিক্ষা অর্জন করতে পারছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রান্তিক পরিবারের সন্তানরা।

বন্যাত্রাণে এগিয়ে আসার মতো তাৎক্ষণিক বিষয়কে না হোক আলোচনা থেকে বাদ দেওয়া হল, তবে কিছুতেই বাদ দেওয়া যায় না তাঁর ডায়াবেটিস হাসপাতাল গড়ে তোলার উদ্যোগ। এই বইতে রয়েছে এই নিয়ে মোস্তাক হোসেনের নিজের লেখা। তিনি কয়েকটি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার কথা লিখেছেন। যেমন এখানকার মানুষের দক্ষিণ ভারত অভিমুখী চিকিৎসা পর্যটন রুখে দিতে চান তিনি। তাঁর মতে, সেটা করতে হবে যথাযথ চিকিৎসা পরিষেবা জুগিয়ে। এই যথাযথ চিকিৎসা পরিষেবার মধ্যে শুধু রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিরাময় বোঝায় না। পাশাপাশি দরকার সুন্দর ব্যবহার, মমতার স্পর্শ। আজকাল মানুষকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঘটিবাটি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে। চিকিৎসা পরিষেবার পণ্যে পরিণত হওয়ার এই যুগে মোস্তাক হোসেন চিকিৎসা-ব্যয় কমানোর ডাক দিয়েছেন। চেয়েছেন, রুগিকে চিকিৎসার খরচ সম্পর্কে সঠিক আন্দাজ দিতে। সেই খরচের বাজেট রুগি জানলে তাঁর আর সব হারানোর ভয় থাকবে না। মোস্তাকের লক্ষ্য, আগে থেকে ঠিক হওয়া বাজেটের থেকে কিছুটা কমে চিকিৎসা সম্পূর্ণ করা যাতে রুগি হাসিমুখে বাড়ি ফিরতে পারেন। রোগ নিরাময়তেই কাজ শেষ বলে তিনি মনে করেন না। নিরাময়ের পরে দরকার রুগিকে রোগের পুনরাক্রমণ থেকে বাঁচানো। সেজন্যই নিরাময় আর পুনর্বাসনকে সমান গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আর ডায়াবেটিস চিকিৎসার গণ্ডি অতিক্রম করে এই হাসপাতালকে আরও অন্য রোগের চিকিৎসার জন্য নিয়োজিত করার ব্রত নিয়েছেন তিনি। ফলে বলাই যায়, তাঁর চিকিৎসা-উদ্যোগ আরও প্রসারিত হচ্ছে, যেমন প্রসারিত হচ্ছে তাঁর জনকল্যাণমূলক অন্য কাজ। প্রসারিত হচ্ছে তাঁর এইসব কাজের সাফল্যের কাহিনি; এক শিল্পোদ্যোগী পরিচিত হচ্ছেন শিক্ষা প্রসার ঘটাতে আর স্বাস্থ্য-উদ্যোগী রূপে।

মোস্তাক হোসেনের কল্যাণ-উদ্যোগের জয়যাত্রার ইতিবৃত্ত যাঁরা তুলে ধরেছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট সাহিত্যিকরা। এই তালিকায় প্রয়াত মহাশ্বেতা দেবী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন আছেন তেমনই আছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। রয়েছে দুই প্রয়াত বুদ্ধিজীবী গৌতম নিয়োগী আর সুরজিৎ দাশগুপ্তের মূল্যায়ন। অনেক শিক্ষাবিদের লেখা আছে, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সাহিত্যের অধ্যাপক। একঝাঁক সাংবাদিক-সম্পাদক মোস্তাক হোসেন সম্পর্কে লেখার জন্য কলম তুলে নিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা আর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কাজের বাইরে কেউ কেউ তাঁর সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতায় পৃষ্ঠপোষকতা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। মোস্তাক হোসেনকে সাহিত্য সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার অভিভাবক হিসেবে চিহ্নিত করে আহমদ হাসান ইমরান, মোস্তাক হোসেনকে ‘জীবন্ত এক হাজী মুহাম্মদ মহসিন’ রূপে আখ্যায়িত করেছেন। যেটা তাৎপর্যপূর্ণ মোস্তাক হোসেনের কাজের খবর শুধু যে মুসলমান সমাজের বিশিষ্টজন এবং আমজনতা জানেন তা নয়। এই বইতে অ-মুসলমান এমন বহু লেখকের লেখা রয়েছে যাঁরা একটু দূরত্ব থেকেই মোস্তাকের কাজকর্ম লক্ষ করেছেন। কলেজ জীবনের বন্ধু মইনুল হাসান ফেলে আসা দিনের কথা তুলে ধরেছেন তাঁর লেখাতে। অনুগৃহীত অনুগ্রহকারীর গুণকীর্তন করে একথা তো আমরা জানি। কথায় বলে, যার নুন খাই তার গুণ গাই। কিন্তু এই বইয়ের তাৎপর্য হল, এমন সব মানুষের লেখায় সফল উদ্যোক্তা, শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক মোস্তাক হোসেনকে তুলে ধরা, যাঁরা বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে তাঁর কাজের মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তির গুণকীর্তন করতে এই বই সম্পাদনা করেননি সম্পাদক-প্রকাশক ও ইতিহাস বিভাগের গবেষক ফারুক আহমেদ। সামগ্রিকভাবে বাঙালি সমাজের এবং ভারতের সমাজকল্যাণে নবপ্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে গ্রন্থটির সম্পাদকীয় লিখেছেন তিনি। এরকম কাজ যদি মানুষের কাজে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে অন্যকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, তবেই এই বই প্রকৃত অর্থে সার্থক হয়ে উঠতে পারে। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই এই গ্রন্থ নির্মাণের প্রয়াস নিয়েছেন সম্পাদক। উন্নত মানের কাগজে ঝকঝকে ছাপার পাশাপাশি হার্ড বোডে দুর্দান্ত বাঁধাই করা হয়েছে গ্রন্থটি। দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ উপহার দিয়েছে মৌসুমী বিশ্বাস। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে মোস্তাক হোসেন ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষাহীন ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার অফুরন্ত কাজ করেছেন তিনি। সমাজকে আলোকিত করতে বদ্ধপরিকর থেকেছেন। পরবর্তীতে তাঁকে নিয়ে গবেষণার কাজে বইটির গুরুত্ব অপরিসীম।

মোস্তাক হোসেন: জীবন ও ঐতিহ্য
সম্পাদনা: ফারুক আহমেদ
উদার আকাশ
ঘটকপুকুর, ডাকঘর ভাঙড় গোবিন্দপুর ৭৪৩৫০২, জেলা দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
প্রথম প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৫।
মূল্য: ৬৯৯ টাকা।

আলোচক: ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights