Tuesday, September 29, 2026
WA
Home Bangla রায়ের বাংলা থেকে অ্যালগরিদমিক বিনোদন: কীভাবে আধুনিক মিডিয়া বদলে দিচ্ছে বাঙালির পারিবারিক...

রায়ের বাংলা থেকে অ্যালগরিদমিক বিনোদন: কীভাবে আধুনিক মিডিয়া বদলে দিচ্ছে বাঙালির পারিবারিক মূল্যবোধ

0
30
Culture is the reflection of the mind and social values; what you preach becomes the practice.
Culture is the reflection of the mind and social values; what you preach becomes the practice.

রায়ের বাংলা থেকে অ্যালগরিদমিক বিনোদন: কীভাবে আধুনিক মিডিয়া বদলে দিচ্ছে বাঙালির পারিবারিক মূল্যবোধ

সুমন মুন্সি, চিফ এডিটর, IBG NEWS

কলকাতা একসময় শুধু রাজনীতি বা সাহিত্য নয়, তার সংস্কৃতি ও বিনোদনের জন্যও সারা দেশে আলাদা মর্যাদা পেত। বাংলা সিনেমা ও টেলিভিশন ছিল বাঙালির আবেগ, বুদ্ধিবৃত্তি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। পরিবার একসঙ্গে বসে সিনেমা দেখত, ধারাবাহিক দেখত, আলোচনা করত। গল্পের কেন্দ্রে থাকত মানবিক সম্পর্ক, নৈতিকতা, ত্যাগ ও সমাজের বাস্তব চিত্র — অকারণ উত্তেজনা বা চটক নয়।

কিন্তু গত তিন দশকে — বিশেষ করে ডিজিটাল মিডিয়া, OTT সংস্কৃতি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-র আমলে টলিউডের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক রূপান্তরের পর — বহু সমালোচকের মতে বাংলা বিনোদন জগতে গভীর সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটেছে। আজ অনেকেই মনে করছেন, আধুনিক বিনোদন এবং সফট পর্নোগ্রাফি-নির্ভর মিডিয়া সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক মূল্যবোধকে দুর্বল করছে এবং সমাজের মানসিক গঠনকেও বদলে দিচ্ছে।


সফট পর্নোগ্রাফি ও সাংস্কৃতিক মানসিক প্রভাব

সফট পর্নোগ্রাফি সরাসরি অশ্লীল কনটেন্ট নয়। বরং এটি সমাজে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে — ইঙ্গিতপূর্ণ গান, গ্ল্যামারাস মিউজিক ভিডিও, উস্কানিমূলক ওয়েব সিরিজ, সিনেমার অন্তরঙ্গ দৃশ্য, ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি এবং অতিরিক্ত যৌনতায় ভরা সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্টের মাধ্যমে।

ক্রমাগত এই ধরনের দৃশ্য ও কনটেন্ট দেখতে দেখতে সমাজের মানসিকতা বদলাতে শুরু করে। যা একসময় ব্যক্তিগত বা বিতর্কিত বলে মনে হত, তা ধীরে ধীরে “স্বাভাবিক বিনোদন” হয়ে ওঠে। সমালোচকদের মতে, এই প্রক্রিয়া বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে প্রভাবিত করছে যেখানে সাফল্য, জনপ্রিয়তা ও আকর্ষণকে শারীরিক প্রদর্শন এবং তাৎক্ষণিক আবেগের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।

কলকাতার শহুরে ডিজিটাল সংস্কৃতিতে স্মার্টফোন ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করেছে। আজ বহু কিশোর-কিশোরী পরিবারের নজরের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে কনটেন্ট দেখছে, ফলে তাদের মানসিক গঠন ক্রমশ অ্যালগরিদমের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, পারিবারিক শিক্ষার দ্বারা নয়।

সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, এই অবিরাম এক্সপোজার ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে:

  • আবেগের সংযম,শালীনতা,প্রতিশ্রুতিনির্ভর সম্পর্ক,এবং সাংস্কৃতিক সীমারেখার প্রতি সম্মান।

মূল সমস্যা যৌনতা নয়, বরং মানুষের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।


সিনেমা ও টেলিভিশনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন

একসময় বাংলা বিনোদন জগত মূলত অর্থবহ গল্প বলার উপর নির্ভর করত। ক্লাসিক সিনেমা ও ধারাবাহিকগুলোতে দেখা যেত:

  • মধ্যবিত্তের সংগ্রাম,নৈতিক দ্বন্দ্ব,পারিবারিক ত্যাগ,সামাজিক বৈষম্য,এবং বাস্তব আবেগের প্রতিফলন।

কিন্তু বর্তমানের বহু টেলিভিশন ধারাবাহিক আবর্তিত হচ্ছে:

  • পারিবারিক ষড়যন্ত্র,বিশ্বাসঘাতকতা,বিষাক্ত সম্পর্ক,প্রতিশোধ,অতিরঞ্জিত আবেগ,এবং অবিরাম সংঘাতের চারপাশে।

অনেক ধারাবাহিকে আজ পরিবারকে এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখানো হয় যেখানে চিৎকার, প্রতারণা, মানসিক অস্থিরতা ও চালাকি যেন স্বাভাবিক ঘটনা। সমালোচকদের মতে, এই ধরনের গল্প বাস্তব জীবনেও অস্বাস্থ্যকর আচরণকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে তুলছে।

সিনেমাতেও পরিবর্তন স্পষ্ট। বাণিজ্যিক চাপে নির্মাতারা এখন অনেক সময় গল্পের গভীরতার বদলে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন:

  • গ্ল্যামার,বিতর্ক,রোমান্স-কেন্দ্রিক প্রচার,এবং উস্কানিমূলক কনটেন্টকে।

ফলে কলকাতার বহু প্রবীণ দর্শকের মনে হচ্ছে, আধুনিক বাংলা বিনোদন আর বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিশীলনকে প্রতিফলিত করছে না।


বাংলা বিনোদনের রূপান্তর

১৯৮০, ১৯৯০ এবং ২০০০-এর শুরুর বাংলা বিনোদন ছিল বাঙালির সাহিত্যিক সভ্যতার ধারক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকদের রচনার উপর ভিত্তি করে তৈরি গল্প বাঙালির আত্মপরিচয়ের অংশ ছিল।

সত্যজিৎ রায় এবং মৃণাল সেন-এর মতো পরিচালকরা সিনেমাকে শুধুমাত্র বিনোদন নয়, সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গড়ে তোলার মাধ্যম হিসেবে দেখতেন।

আজ সমালোচকদের মতে বিনোদন ক্রমশ অ্যালগরিদম-নির্ভর হয়ে উঠেছে। সাহিত্যগুণের বদলে প্রযোজকেরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন:

  • ট্রেন্ডিং ফর্মুলা,সোশ্যাল মিডিয়া দৃশ্যমানতা,সেলিব্রিটি ব্র্যান্ডিং,এবং দ্রুত আবেগ তৈরি করার কৌশলকে।

এই পরিবর্তন আসলে শিল্পভিত্তিক গল্প বলার জায়গা থেকে মনোযোগ-নির্ভর ডিজিটাল বিনোদন অর্থনীতির দিকে সমাজের সরে যাওয়া।


টলিউডের রাজনৈতিকীকরণ

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস আমলে কলকাতার বিনোদন জগতে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক ও সেলিব্রিটিরা ক্রমশ রাজনৈতিকভাবে শাসকদলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কেউ সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন, আবার কেউ প্রকাশ্যে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন।

সমালোচকদের মতে, এর ফলে সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আনুগত্যের মধ্যে সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন চলচ্চিত্র, নাটক এবং শিল্পসংক্রান্ত বিতর্কের পর অভিযোগ উঠেছে:

  • পক্ষপাতিত্ব,মতাদর্শগত চাপ,পরোক্ষ সেন্সরশিপ,এবং সৃজনশীল স্বাধীনতার সংকোচনের।

একই সঙ্গে ইউনিয়নের আধিপত্য ও প্রযোজনাগত হস্তক্ষেপের অভিযোগও শিল্পে অস্থিরতা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

“অভিনেত্রী থেকে বিধায়ক হওয়া পাপিয়া অধিকারী এবং রুদ্রনীল ঘোষ-দের যা করা প্রয়োজন, তা হলো বাংলাকে পরিবর্তনের পথে নিয়ে যেতে আমাদের আবার নিজেদের সংস্কৃতির শিকড়ে ফিরে যেতে হবে এবং এই অ্যালগরিদমিক সামাজিক প্রকৌশলের দানবীয় প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

টিএমসি শিল্পজগতকে এমন এক পরিবেশে নিয়ে গেছে যেখানে ‘কাস্টিং কাউচ’-ই যেন একজন তারকা হওয়ার একমাত্র যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধীরে ধীরে বাংলার নারীরা ‘রুটি’ তৈরি করার সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে ক্ষমতাবান ও ধনীদের জন্য ‘পিঠে’ প্রস্তুত করতে বাধ্য হয়েছে। কেউ কেউ আবার এক অঘোষিত যৌনপাচার বা দেহব্যবসার নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠেছে।

যেভাবে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এখন সাধারণ বিষয়, ঠিক তেমনভাবেই ‘প্রস্টিটিউশন ফ্রম হোম’ সমাজে আর কোনো কলঙ্ক হিসেবে দেখা হচ্ছে না, কারণ এটিকে গ্ল্যামার জগতের স্বাভাবিক বর্ণনার অংশ করে তোলা হয়েছে।

তাই এই অ্যালগরিদমিক সামাজিক প্রকৌশলের পরিবর্তনকে উল্টে দিয়ে আবার বাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী আবহ ফিরিয়ে আনতে হবে, যেখানে ভালোবাসা মানে ছিল সম্মান, শুধুমাত্র কামনা নয়।

‘সংস্কৃতি হল মানুষের মন ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিফলন; আপনি যা প্রচার করেন, শেষ পর্যন্ত সমাজ তাই অনুশীলন করে।’
— সুমন মুন্সি, চিফ এডিটর, IBG NEWS।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights