Tuesday, September 29, 2026
WA
Home Bangla মহালয়ার কণ্ঠে জেগে ওঠে বাংলা: বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, মহিষাসুরমর্দিনী এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়

মহালয়ার কণ্ঠে জেগে ওঠে বাংলা: বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, মহিষাসুরমর্দিনী এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়

0
22
মহালয়ার কণ্ঠে জেগে ওঠে বাংলা: বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, মহিষাসুরমর্দিনী এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়
মহালয়ার কণ্ঠে জেগে ওঠে বাংলা: বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, মহিষাসুরমর্দিনী এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়

মহালয়ার কণ্ঠে জেগে ওঠে বাংলা: বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, মহিষাসুরমর্দিনী এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়

By Suman Munshi

কলকাতা: শরতের আগমনী হাওয়া, শিউলি ফুলের গন্ধ, কাশফুলে ভরা প্রান্তর এবং ভোরের অন্ধকার ভেদ করে ভেসে আসা এক অমর কণ্ঠস্বর—এই চারটি উপাদান ছাড়া বাঙালির দুর্গাপূজার সূচনা যেন কল্পনাই করা যায় না। সেই কণ্ঠস্বরের নাম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, আর সেই অনুষ্ঠান ‘মহিষাসুরমর্দিনী’, যা আজ শুধু একটি রেডিও অনুষ্ঠান নয়, বরং বাঙালির সম্মিলিত সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের অংশ।

প্রতি বছর মহালয়ার ভোরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাঙালি একসঙ্গে যুক্ত হন এক অনন্য আবেগের বন্ধনে। কলকাতা থেকে লন্ডন, ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক, সিডনি থেকে টরন্টো—যেখানেই বাঙালি থাকুক না কেন, মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ শোনার মধ্য দিয়েই শুরু হয় দেবীপক্ষ।

একটি রেডিও অনুষ্ঠান থেকে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে উত্তরণ

১৯৩১ সালে তৎকালীন ইন্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং সার্ভিস, যা পরে আকাশবাণী নামে পরিচিত হয়, প্রথম সম্প্রচার করে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। এই অসামান্য সৃষ্টির পেছনে ছিলেন তিন কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব—বাণীকুমারের রচনা, পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সুরসৃষ্টি এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বাচিক পরিবেশনা।

সংস্কৃত স্তোত্র, চণ্ডীপাঠ, বাংলা বর্ণনা এবং ভক্তিমূলক সংগীতের এক অনন্য সমন্বয়ে নির্মিত এই অনুষ্ঠান ধীরে ধীরে বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। প্রায় এক শতাব্দী পরেও এর জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমেনি।

কেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী?

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ছিল এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি, যা কেবল শব্দের মাধ্যমে নয়, অনুভূতির মাধ্যমে শ্রোতাদের স্পর্শ করত। তাঁর কণ্ঠে দেবী দুর্গার আবির্ভাব, মহিষাসুর বধ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের কাহিনি যেন জীবন্ত হয়ে উঠত।

বহু সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকের মতে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠস্বর বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে। তাঁর পাঠ কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাঙালির আবেগ, নস্টালজিয়া এবং শিকড়ের সঙ্গে সংযোগের প্রতীক।

১৯৭৬ সালের বিতর্ক: যখন বাঙালি প্রত্যাখ্যান করেছিল পরিবর্তন

মহালয়ার সঙ্গে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সম্পর্ক কতটা গভীর, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ দেখা যায় ১৯৭৬ সালে। সেই বছর আকাশবাণী ‘দেবী দুর্গতিহারিণী’ নামে একটি নতুন অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে, যেখানে মহানায়ক উত্তম কুমার অংশগ্রহণ করেছিলেন।

কিন্তু বাঙালি শ্রোতারা সেই পরিবর্তন মেনে নিতে পারেননি। চারদিকে প্রবল সমালোচনা শুরু হয়। মানুষ মনে করেছিলেন, মহালয়া থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে সরিয়ে দিলে অনুষ্ঠানটির আত্মাই হারিয়ে যায়। জনরোষের মুখে পরবর্তীকালে আকাশবাণীকে আবার পুরনো অনুষ্ঠান ফিরিয়ে আনতে হয়।

ভারতীয় সম্প্রচার ইতিহাসে এটি শ্রোতাদের সাংস্কৃতিক শক্তির এক বিরল উদাহরণ।

মহালয়া: বাঙালিয়ানার বার্ষিক পুনর্জাগরণ

মহালয়া বাঙালির কাছে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক পুনর্জন্মের মুহূর্ত। এই ভোরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক বন্ধন এবং উৎসবের প্রত্যাশা।

অনেকের কাছে মহালয়া মানে—

  • ঠাকুমা-দাদুর সঙ্গে রেডিও শোনা
  • ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠা
  • শিউলি ফুল কুড়োনো
  • নতুন জামাকাপড়ের পরিকল্পনা
  • দুর্গাপূজার কাউন্টডাউন শুরু

এই স্মৃতিগুলিই মহালয়াকে বাঙালির আবেগের অন্যতম শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত করেছে।

ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

মহালয়ার আবেদন শুধুমাত্র হিন্দু সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বহু মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিও প্রতি বছর এই অনুষ্ঠান শোনেন। কারণ তাঁদের কাছে এটি ধর্মীয় আচারের চেয়ে অনেক বেশি—এটি বাংলা সংস্কৃতির একটি সম্মিলিত ঐতিহ্য।

এ কারণেই মহালয়া আজ বাঙালি সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিল হিসেবে বিবেচিত।

কারিগরি কবিয়াল এবং মহালয়ার বিশ্বায়ন

ডিজিটাল যুগে বাংলা সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কারিগরি কবিয়ালের ইংরেজি ভাষায় মহালয়ার ব্যাখ্যা ও অনুবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ হিসেবে উঠে এসেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের বহু বাঙালি বাংলা ভাষায় সাবলীল নয়। কিন্তু তারা নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখতে চায়। কারিগরি কবিয়ালের ইংরেজি অনুবাদ সেই প্রজন্মের কাছে মহিষাসুরমর্দিনীর আধ্যাত্মিক, ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্য পৌঁছে দেওয়ার একটি সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।

মহালয়ার মূল আবেগ, পৌরাণিক গভীরতা এবং সাহিত্যিক সৌন্দর্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে ইংরেজি ভাষায় উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি বাংলা ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এর ফলে মহালয়া আজ শুধু বাংলার নয়, বিশ্বব্যাপী বাঙালি প্রবাসীদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে।

ডিজিটাল যুগেও অমর সেই কণ্ঠ

আজ মহিষাসুরমর্দিনী শোনা যায় রেডিও, টেলিভিশন, ইউটিউব, পডকাস্ট এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। প্রযুক্তি বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত রয়েছে—বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠস্বর।

তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশক পরেও প্রতি মহালয়ার ভোরে সেই কণ্ঠস্বরই বাঙালিকে মনে করিয়ে দেয়—দেবীপক্ষ এসেছে, উৎসবের দিন শুরু হয়েছে, আর বাংলা আবারও জেগে উঠেছে তার চিরন্তন সাংস্কৃতিক সত্তায়।

উপসংহার

মহালয়া কেবল একটি রেডিও অনুষ্ঠান নয়; এটি বাঙালির সম্মিলিত স্মৃতি, ঐতিহ্য এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র তাঁর কণ্ঠের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণ করেছিলেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে আছে। আর কারিগরি কবিয়ালের মতো নতুন প্রজন্মের সাংস্কৃতিক অনুবাদকরা সেই ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছেন।

দুর্গাপূজার সূচনালগ্নে তাই মহালয়া শুধু দেবীর আগমনের বার্তা নয়—এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের বার্ষিক পুনর্জাগরণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights