মোদি সরকারের ১২ বছর: ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অ-কংগ্রেস শাসনের সাফল্য ও চ্যালেঞ্জের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ
Antara Tripathy, IBG NEWS Investigation Desk
Kolkata, ১২ জুন:
বাংলার মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আজ সকালে বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে মোদী সরকারের ১২ বছরের সাফল্য তুলে ধরলেন। সাংবাদিক দের প্রশ্নোত্তরে বুঝিয়ে দিলেন , বাংলার রাশ শক্ত হাতেই এসেছে । নানা বিষয় আলোচনা হলো নতুন দুর্নীতির আভাস দিলেন ,বিজিবিএস নিয়ে ৬৫০ কোটির বা তার বেশি দুর্নীতির ইশারা করলেন বিগত সরকারের দিকে । বললেন তেলা মাথায় তেল দেয়ার মতো যে ক্লাবের অনুদান প্রয়োজন নেই , তাদের পুজোর ভাতা বন্ধ, কিন্তু যারা টাকার এভাবে মায়ের আরাধনা করতে পারছেন না তাদের প্রতি সহযোগিতা থাকবে। আইন শৃঙ্খলা ভঙ্গ করি বিশেষ কোনো সংখ্যা লঘু যারা মোথাবাড়ি ,ধুলাগড় জাতীয় বিশৃঙ্খলা করবে তাদের জন্য তিনি ভয়ংকর কঠোর মুখ্যমন্ত্রী হয়ে উঠবেন।
পূর্ণাঙ্গ সাফল্যের বিবরণ শোনার পরএবং নিজেদের শেষ বারো বছরের বাস্তব অভিজ্ঞাতা কে বালান্সশিট হিসাবে দেখানোর চেষ্টা হল ।
২০১৪ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কেন্দ্রে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ২০২৬ সালে সেই সরকারের টানা ১২ বছর পূর্ণ হয়েছে, যা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অ-কংগ্রেস সরকারের মধ্যে অন্যতম দীর্ঘ ও প্রভাবশালী শাসনকাল। এই সময়ে ভারত ডিজিটাল অর্থনীতি, অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও কল্যাণমূলক প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি, শিক্ষা, সামাজিক মেরুকরণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। তাই এই ১২ বছরের মূল্যায়নে সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা—উভয় দিকের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ জরুরি।
ডিজিটাল বিপ্লব: ভারতের নতুন পরিচয়
মোদি সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয় ডিজিটাল ইন্ডিয়া কর্মসূচি। ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI) ভারতের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আজ ছোট দোকান থেকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা পর্যন্ত ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। আধার, জনধন এবং মোবাইল প্রযুক্তির সমন্বয়ে সরকারি ভর্তুকি ও আর্থিক সহায়তা সরাসরি উপভোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে নজির
গত ১২ বছরে এক্সপ্রেসওয়ে, জাতীয় সড়ক, রেলপথ, বন্দে ভারত ট্রেন, বিমানবন্দর, মেট্রো রেল, বন্দর ও লজিস্টিক করিডোর নির্মাণে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। সরকারের দাবি, এই অবকাঠামো উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ভিত্তি শক্তিশালী করবে।
সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি
জনধন যোজনা, উজ্জ্বলা, স্বচ্ছ ভারত, জল জীবন মিশন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা এবং আয়ুষ্মান ভারত—এই প্রকল্পগুলি কোটি কোটি মানুষের কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার দাবি করেছে। বিশেষ করে আয়ুষ্মান ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সরকারি স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
অর্থনৈতিক সংস্কার
পণ্য ও পরিষেবা কর (GST) চালুর মাধ্যমে দেশের পরোক্ষ কর ব্যবস্থাকে একীভূত করা হয়েছে। একই সঙ্গে Production Linked Incentive (PLI) প্রকল্পের মাধ্যমে মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর ও উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা হয়েছে। “মেক ইন ইন্ডিয়া” ও “আত্মনির্ভর ভারত” কর্মসূচিও দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে।
বৈদেশিক নীতি ও ভারতের বৈশ্বিক অবস্থান
গত এক দশকে ভারত আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। G20 সভাপতিত্ব, আন্তর্জাতিক সৌর জোট এবং বিভিন্ন বহুপাক্ষিক মঞ্চে ভারতের উপস্থিতি বিশ্ব রাজনীতিতে দেশের প্রভাব বাড়িয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা
সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সরকার জোর দিয়েছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও কৌশলগত নিরাপত্তা নীতিতেও একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সরকার দাবি করে।




প্রধান চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা
কর্মসংস্থানের সংকট
অর্থনীতি বৃদ্ধি পেলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।
মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়
খাদ্যদ্রব্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
নোটবন্দির বিতর্ক
২০১৬ সালের নোটবন্দির উদ্দেশ্য ছিল কালো টাকা, জাল নোট ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন রোধ করা। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসা, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও নগদনির্ভর খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এখনও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
GST-এর প্রাথমিক জটিলতা
GST দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় কর সংস্কার হলেও, শুরুতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। পরে ধাপে ধাপে অনেক নিয়ম সহজ করা হয়েছে।
কৃষি আইন ও কৃষক আন্দোলন
২০২০ সালে তিনটি কৃষি আইন প্রণয়নের পর দেশব্যাপী দীর্ঘ কৃষক আন্দোলন শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার আইনগুলি প্রত্যাহার করে, যা এই সময়ের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থা
NEET-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও সংস্কারের দাবি জোরদার হয়েছে।
স্বাস্থ্য অবকাঠামো
আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ালেও গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো ও চিকিৎসক সংকট এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
সামাজিক মেরুকরণ
বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে ধর্মীয় ও সামাজিক মেরুকরণ বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের মতে, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় আরও উদ্যোগ প্রয়োজন, যদিও সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
সংবাদমাধ্যম ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক
বিরোধী দল ও কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং কিছু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে সরকার দাবি করে, আইন ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই সমস্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়েছে।
আয় বৈষম্য ও MSME খাত
ভারত বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির মধ্যে থাকলেও সম্পদ বৈষম্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের আর্থিক সমস্যা এবং অসংগঠিত খাতের পুনরুদ্ধার নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
মোদি সরকারের ১২ বছরের শাসনকালকে এক কথায় সাফল্য বা ব্যর্থতা বলা যায় না। ডিজিটাল রূপান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং প্রশাসনিক সংস্কার এই সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক মেরুকরণ এবং গণতান্ত্রিক বিতর্ক—এই বিষয়গুলো এখনও বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ১২ বছর নিঃসন্দেহে একটি পরিবর্তনশীল অধ্যায়। ভবিষ্যতে এর প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালীকরণের ওপর।
তবে শেষে বলা যায় শুভেন্দু বাবু যে মুখ্যমন্ত্রীর জন্য উপযুক্ত মানুষ সেটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সঠিক চিনেছিলেন , আর যাই হোক বাংলার বাইরে , বাঙালিকে তাদের মাথা নিচু করতে হবে না , কোনো অর্বাচীনের মতো যা খুশি উত্তর শুনতে হবে না।
আজ বিজেপির এই সভায় শুভেন্দু বাবুর আন্তরিক কিন্তু প্রশাসকের অনুশাসন ছিল চোখে পড়ার মতো, কিন্তু আগামী দিনে দলের কর্মীরা এই গুণ দেখতে পারবেন কি?নাকি আগের “ঐতিহাসিক ভুল” কি আবার হলো সেটা সময় বলবে , তাই আজ বেনিফিট অফ ডাউট এবং অভিনন্দন সকলকে।



















