অবরোধ থেকে আত্মোপলব্ধি
সুরাজ পাল
অন্ধকার অন্দরমহলের আগল ভেঙে মেয়েদের রাজপথে হাঁটার পথটি মোটেই সহজ ছিল না। আজ উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন, শিল্প, সাহিত্য কিংবা বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে নারীদের সাফল্য আমাদের কাছে এক স্বাভাবিক দৃশ্য মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনা, প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ এবং অসমাপ্ত সংগ্রামের ইতিহাস। মানবসভ্যতার বিকাশের ইতিহাস মূলত জ্ঞানচর্চার ইতিহাস; কিন্তু সেই জ্ঞানচর্চার পরিসর থেকে নারীকে যুগের পর যুগ পরিকল্পিতভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। কখনও ধর্মীয় অনুশাসনের নামে, কখনও সামাজিক রীতিনীতির আড়ালে, আবার কখনও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে। তবুও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বহু নারী শিক্ষা অর্জনের জন্য লড়াই করেছেন, সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন পথ নির্মাণ করেছেন। ফলে নারীর শিক্ষার ইতিহাস শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার অর্জনের ইতিহাস নয়, বরং আত্মমর্যাদা, আত্মপরিচয় এবং মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠারও ইতিহাস। নারীশিক্ষার এই অন্তহীন লড়াইয়ের গল্পটাই উঠে এসেছে উদার আকাশ থেকে সদ্যপ্রকাশিত চৈতালি বিশ্বাসের ‘উইমেনস এমপ্লয়মেন্ট ইজ নিডেড ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ গ্রন্থে। মোট ২০টি অধ্যায়ে লেখিকা নারীদের আলোয় ফেরার যাত্রাপথকে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
শুরুতেই লেখিকা নারীশিক্ষার প্রকৃত সংজ্ঞা এবং তার সামাজিক পরিধিকে নতুন আলোয় চেনার চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, নারীশিক্ষা কেবল কিছু অক্ষরের পরিচিতি বা পুঁথিগত বিদ্যার খাঁচায় বন্দি নয়। এটি আসলে মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশ, মানসিক পরিপক্বতা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তোলার সামগ্রিক জাগরণ। শিক্ষা মানে কিছু তথ্য মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উগরে দেওয়া নয়; শিক্ষা মানে নিজেকে চিনে নেওয়ার স্পর্ধা, নিজের অস্তিত্বকে ছুঁয়ে দেখার সাহস, চারপাশের পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখার ক্ষমতা। শিক্ষার আলো মানুষকে অজ্ঞতা, কুসংস্কার, বৈষম্য ও নিপীড়নের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে। লেখিকা প্রশ্ন তুলেছেন, জ্ঞানের ওপর অধিকার কার? মানুষের আসল পরিচয় কি কেবল তার লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত হবে, নাকি ভেতরের চেতনা দিয়ে?
দর্শনের সাথে শিক্ষার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ভাববাদ, বস্তুবাদ, প্রকৃতিবাদ কিংবা প্রয়োগবাদের মতো দার্শনিক ধারা যুগে যুগে শিক্ষার লক্ষ্য ও পদ্ধতিকে প্রভাবিত করেছে। প্রাচীন ভারতে গার্গী, মৈত্রেয়ী বা অপালারা পুরুষ-শাসিত সভায় দাঁড়িয়ে পরম ব্রহ্মের তত্ত্বে তর্কের ঝড় তুলতেন। কিন্তু পরবর্তী বৈদিক যুগ এবং মধ্যযুগে এসে সেই পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। মনুস্মৃতির কঠোর অনুশাসন, বাল্যবিবাহ, পর্দা প্রথা এবং সতীদাহের মতো ভয়ংকর অন্ধকার মেয়েদের বন্দি করে ফেলে চার দেওয়ালের স্তব্ধতায়। এই পতন এবং তার পেছনের সামাজিক কারণগুলোর নিরপেক্ষ ব্যবচ্ছেদ রয়েছে গ্রন্থটিতে। লেখিকা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইউনেস্কোর মেয়েদের শিক্ষার ওপর জোর দেওয়াটা কোনো দাক্ষিণ্য নয়, বরং পৃথিবীকে সুন্দর করতে হলে নারীর অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তোলা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ থেকে শুরু করে আধুনিক ভারতের সামাজিক রূপান্তর, সবক্ষেত্রেই নারী শিক্ষার ভূমিকা ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। সতীদাহ প্রথার মতো নারকীয় আচারের বিরুদ্ধে রাজা রামমোহনের একক লড়াইয়ের বিবরণের পাশাপাশি বইটিতে উঠে এসেছে বিদ্যাসাগরের অদম্য জেদের কথা। বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ আইন পাশ করিয়েই ক্ষান্ত হননি, রক্ষণশীল সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাংলার গ্রামে গ্রামে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। একই সঙ্গে আলোচিত হয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের মানুষ গড়ার শিক্ষার ধারণাও। বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেকটি মানুষের ভেতরেই পরম সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে; শিক্ষকের কাজ সেই সুপ্ত অগ্নিকে বাইরে টেনে আনা। নারীদের জন্য তিনি শক্তির আরাধনার কথা বলেছিলেন। তাঁর ভাষায়, মেয়েদের দয়া করার কোনো প্রয়োজন নেই, শুধু তাদের সামনের বাধার পাথরগুলো সরিয়ে দিলেই তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরা গড়ে তুলতে পারবে।
নারী মুক্তির লড়াইয়ের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে, সারা পৃথিবীতে। ১৮৪৮ সালে পুনেতে যখন সাবিত্রীবাই ফুলে প্রথম দলিত ও পিছিয়ে পড়া বর্গের মেয়েদের স্কুল খুলছেন, সমাজ তাঁকে ছেড়ে দেয়নি। রাস্তায় বেরোলে তাঁর গায়ে কাদা, পাথর, গোবর ছুড়ে মারা হত। মহাত্মা গান্ধীর নঈ তালিম কীভাবে মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখিয়েছিল, তা-ও বইতে সুন্দরভাবে আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে ড. বি আর আম্বেদকরের ঐতিহাসিক স্লোগান ‘শিক্ষিত হও, সংগঠিত হও, আন্দোলন করো’ কীভাবে দলিত ও প্রান্তিক নারীদের মুক্তির প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠল এবং দয়ানন্দ সরস্বতীর বৈদিক পুনরুজ্জীবনবাদ কীভাবে নারীশিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখেছিল, তারও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। ভারতের মাটিতে ছড়িয়ে থাকা বিচিত্র কণ্ঠস্বরগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে দেখানো লেখিকার সাধনার ফল।
বইয়ের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পাশ্চাত্যের মনন-বিশ্বের নিবিড় দার্শনিক সফর। প্রাচীন গ্রিক দর্শনের তিন মহীরুহ সক্রেটিস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের শিক্ষাদর্শ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখিকা দেখিয়েছেন, প্লেটো তাঁর ‘দ্য রিপাবলিক’ গ্রন্থে আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে আদর্শ রাষ্ট্রের সুরক্ষায় নারী ও পুরুষের সমান শিক্ষার কথা বলে চমকে দিয়েছিলেন। অথচ তাঁরই ছাত্র অ্যারিস্টটলের চোখে নারী ছিল জৈবিক সীমাবদ্ধতার খাঁচায় বন্দি। জ্ঞানদীপ্তির যুগে জন লকের মানুষের মনকে ফাঁকা স্লেট বলার তত্ত্বে পুরুষ ও নারীর সমান সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। আবার জঁ-জাক রুশোর মতো প্রগতিশীল মানুষ যখন তাঁর ‘এমিল’ উপন্যাসে ছেলেদের জন্য অবারিত মুক্তির কথা বললেও, মেয়ে চরিত্র ‘সোফি’র জন্য পরাধীন ও পুরুষ-তোষণকারী শিক্ষার খসড়া তৈরি করেন, তখন রুশোর লৈঙ্গিক সংকীর্ণতা ধরা পড়ে। এই বৈপরীত্যের বিরুদ্ধে মেরি উলস্টোনক্র্যাফট তাঁর ‘আ ভিন্ডিকেশন অফ দ্য রাইটস অফ ওম্যান’ গ্রন্থের মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ফ্রোয়েবেলের কিন্ডারগার্টেন আন্দোলন মেয়েদের সামনে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে খুলে দিয়েছিল। অন্যদিকে জন ডিউই-এর প্রয়োগবাদী শিক্ষা সাহায্য করেছিল গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে। এইসব তত্ত্বের পথ বেয়ে লেখিকা নিয়ে এসেছেন বিংশ শতাব্দীর সিমন দ্য বোভোয়ারের বিখ্যাত উচ্চারণ ‘কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, বরং সমাজই তাকে নারী করে তোলে’। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের ভাবুকদের চিন্তার মিল ও অমিলগুলোকে সুন্দরভাবে পাশাপাশি রেখে আলোচনা নিঃসন্দেহে অভিনব সংযোজন। একদম শেষে এসে লেখিকা ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ কিংবা বর্তমান সরকারের বিভিন্ন লিঙ্গ-অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিগুলো কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে, তার খতিয়ান তুলে ধরেছেন।
বইটির যেমন অনেক ভালো দিক আছে, তেমনই কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও বলা দরকার। প্রথম আপত্তিটি বইটির নাম নিয়ে। ‘উইমেনস এমপ্লয়মেন্ট ইজ নিডেড ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামটা শুনলে মনে হয় এটা বোধহয় কোনো স্লোগান কিংবা অর্থনীতির কোনো শুকনো, ডেটা-ভিত্তিক বই। অথচ বইটির আসল নির্যাস নারীশিক্ষার দর্শন এবং তার ইতিহাস। তাছাড়া, প্রাচীন ও মধ্যযুগের বঞ্চনা নিয়ে লেখিকা যতটা দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, তার তুলনায় একুশ শতকের প্রান্তিক আদিবাসী, দলিত বা সংখ্যালঘু মেয়েদের স্কুলছুট হওয়ার পেছনের সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটগুলো নিয়ে আলোচনা কম। কোনো কোনো অধ্যায়ে, বুলেট পয়েন্ট ও উপশিরোনামের আধিক্য পাঠের স্বাভাবিক প্রবাহকে খানিকটা বাধা দেয়।
মুখের আধুনিকতা আর ভেতরের বাস্তবতায় আকাশ-পাতাল ফারাক। আজও বহু পরিবারে মেয়ের চেয়ে ছেলের পড়ালেখাই অগ্রাধিকার পায়। অথচ একটু সুযোগ পেলেই মেয়েরা আকাশ ছুঁতে পারে। তাদের আটকে রাখে কিছু অদৃশ্য সামাজিক দেওয়াল ও পুরনো সংস্কার। ভারতের বহু অঞ্চলে এখনও নারীশিক্ষার হার পুরুষদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। গ্রামীণ সমাজে ধারণা, মেয়ের বেশি পড়াশোনার দরকার নেই। এমনকি কর্মক্ষেত্রেও পা বাড়ালে জোটে লিঙ্গ বৈষম্য, বেতনের ফারাক এবং মানসিক হেনস্থা। চৈতালি বিশ্বাসের বইটি ‘মেয়েদের পড়াও’ ধরনের প্রচারমূলক আহ্বানে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং শিক্ষা, মর্যাদা এবং মানবমুক্তির সম্পর্ককে বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে তুলে ধরে।
উইমেনস এমপ্লয়মেন্ট ইজ নিডেড ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। চৈতালি বিশ্বাস। প্রথম প্রকাশ: ১৪ মার্চ, ২০২৬।
প্রকাশক: ফারুক আহমেদ,
উদার আকাশ,
ঘটকপুকুর, ভাঙড়, দক্ষিণ ২৪ পরগনা।
মূল্য: ৪৯৯ টাকা। যোগাযোগ: ৭০০৩৮২১২৯৮।



















