
অশান্ত বিশ্বের শান্তির বার্তা নিয়ে বিশ্ব সফর শেষে কলকাতায় ফিরলেন গৌড়ীয় মিশনের সভাপতি আচার্য্য ভক্তি সুন্দর সন্ন্যাসী মহারাজ
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেম, ভক্তি ও হরিনাম সংকীর্তনের আদর্শ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান
সুপ্রকাশ চক্রবর্তী | IBG NEWS
কলকাতা, ৯ জুলাই: যুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, সামাজিক অবক্ষয়, মানসিক অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান হিংসার আবহে যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তির সন্ধান চলছে, ঠিক সেই সময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেম, ভক্তি, সহিষ্ণুতা ও হরিনাম সংকীর্তনের সার্বজনীন বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়ে কলকাতায় ফিরলেন গৌড়ীয় মিশনের সভাপতি ও আচার্য্য ভক্তি সুন্দর সন্ন্যাসী মহারাজ।
দীর্ঘ প্রায় দুই মাসের এই আন্তর্জাতিক ধর্মপ্রচার সফরে তিনি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্য আমেরিকার একাধিক দেশে ধর্মীয় আলোচনা, আধ্যাত্মিক সভা এবং হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মানবকল্যাণের দর্শন তুলে ধরেন।
লন্ডন থেকে কানাডা—বিশ্বজুড়ে শান্তির বার্তা
গত ১৪ মে কলকাতার বাগবাজার থেকে মাধব মহারাজকে সঙ্গে নিয়ে বিদেশ সফরে রওনা দেন আচার্য্য ভক্তি সুন্দর সন্ন্যাসী মহারাজ। সফরের সূচনা হয় লন্ডনের ঐতিহাসিক শ্রী বাসুদেব গৌড়ীয় মঠে।
পরবর্তীতে তিনি অস্ট্রিয়া, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা, রচেস্টার ও নিউইয়র্ক, পাশাপাশি কলম্বিয়া, কোস্টারিকা এবং কানাডার বিভিন্ন শহরে ধারাবাহিকভাবে ধর্মীয় আলোচনা, হরিনাম সংকীর্তন ও আধ্যাত্মিক সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। প্রতিটি দেশেই বিপুল সংখ্যক ভক্ত, গবেষক এবং সাধারণ মানুষ তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য উপস্থিত ছিলেন।
“বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট আধ্যাত্মিক সংকট”
কলকাতায় ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে আচার্য্য ভক্তি সুন্দর সন্ন্যাসী মহারাজ বলেন,
“বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা কেবল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সামরিক নয়; মানুষের অন্তরের শান্তির অভাবই আজকের অধিকাংশ সংকটের মূল কারণ। মানুষের হৃদয়ে প্রেম, সহমর্মিতা ও ঈশ্বরচেতনার অভাব থেকেই হিংসা, বিভাজন ও সংঘাতের জন্ম হচ্ছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেম, করুণা, সহিষ্ণুতা ও সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা আজ আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।”
‘পরাবিদ্যাপীঠ’-এর দর্শন তুলে ধরা ছিল অন্যতম লক্ষ্য
তিনি জানান, এই বিদেশ সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জগৎগুরু শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদ প্রতিষ্ঠিত ‘পরাবিদ্যাপীঠ’-এর দর্শন ও আদর্শ আন্তর্জাতিক সমাজের সামনে তুলে ধরা।
তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন, আধুনিক শিক্ষা মানুষকে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও কর্মদক্ষতা দিলেও জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য, নৈতিকতা এবং আত্মিক বিকাশের শিক্ষা সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র জাগতিক জ্ঞান নয়, আধ্যাত্মিক শিক্ষার বিকাশই মানবসভ্যতাকে একটি শান্তিপূর্ণ ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
বিদেশে ব্যাপক সাড়া
মহারাজ জানান, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, কলম্বিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আয়োজিত ধর্মীয় সভা ও হরিনাম সংকীর্তনে বিপুল মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং শিক্ষিত সমাজের বহু মানুষ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দর্শন, গৌড়ীয় বৈষ্ণব ভাবধারা এবং আধ্যাত্মিক জীবন সম্পর্কে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন।
অনেক অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, ভোগবাদী জীবনযাত্রার বাইরে প্রকৃত শান্তি, আনন্দ এবং মানবিক মূল্যবোধের সন্ধান তাঁরা এই আধ্যাত্মিক দর্শনের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন।

বিশ্বশান্তির জন্য শ্রীচৈতন্যের আদর্শ
আচার্য্য ভক্তি সুন্দর সন্ন্যাসী মহারাজ বলেন,
“আমাদের এই সামান্য প্রয়াসের মাধ্যমে যদি বিশ্বের মানুষের কাছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেম, শান্তি ও ভক্তির বার্তা আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। বর্তমান বিশ্বের অশান্তি, বিভাজন ও হিংসা দূর করতে শ্রীচৈতন্যের সর্বজনীন প্রেম, সহিষ্ণুতা ও মানবতার শিক্ষা এক অনন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে।”
আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের বিশ্বব্যাপী প্রসার
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সামাজিক মেরুকরণ এবং মানসিক অবসাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন বিভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সংগঠন মানবিক মূল্যবোধ, সহাবস্থান এবং শান্তির বার্তা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
গৌড়ীয় মিশনের এই আন্তর্জাতিক সফর সেই প্রচেষ্টারই একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়, যেখানে ভারতীয় বৈষ্ণব ঐতিহ্য, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দর্শন এবং বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদর্শ আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।












