Friday, October 23, 2026
WA
Home Bangla জামাতীদের দলবদ্ধ গণধর্ষণের শিকার পূর্ণিমার জন্য কি কিছুই করব না?

জামাতীদের দলবদ্ধ গণধর্ষণের শিকার পূর্ণিমার জন্য কি কিছুই করব না?

0
50
Bangladesh
Bangladesh

জামাতীদের দলবদ্ধ গণধর্ষণের শিকার পূর্ণিমার জন্য কি কিছুই করব না?
অমিত গোস্বামী

কে পূর্ণিমা রাণী শীল?

আপনারা পূর্ণিমা রাণী শীল নামটি জানেন? এপারের হিন্দুরা অনেকেই জানেন না। ২০০১ সালে বাংলাদেশে জামাতীদের দলবদ্ধ গণধর্ষণের শিকার। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় মুসলিম লিগ বলেছিল অন্ত্যজ হিন্দু অর্থাৎ নাপিত, মেথর, ধাঙর, চর্মকার ইত্যাদি শ্রেণীর হিন্দুরা পাকিস্তানে নির্ভয়ে থাকবেন কারণ মুসলমানরা এই কাজ করে না। এদের বোঝানো হয়েছিল যে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তোমাদের জল-অচল মনে করে, কাজেই তোমরা কেন যাবে? সেই মোহে অনেক হিন্দু শ্রেণীর অন্ত্যজ পরিবার পূর্ব-পাকিস্তান ছাড়ে নি। এমনই এক পরিবার ছিল বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্বদেলুয়া গ্রামের শীল পরিবার থেকে গিয়েছিল নিজেদের ভিটেতে।

২০০১ এর পৈশাচিক হিন্দু নির্যাতনঃ

সময়ের অগ্রগতির সাথে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হল। থেকে যাওয়া হিন্দু পরিবারগুলি ‘মালাউন’ হল। এদের ভাবাই হত আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাঙ্ক। ২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল। ব্যস, আর যায় কোথায়? এই বিজয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত আক্রমন সংগঠিত করল বাংলাদেশ জুড়ে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, হিন্দুদের ওপর চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছিল এবং তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল; পাশাপাশি ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে হিন্দু নারীদের বিশেষভাবে যৌন সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

হিন্দু মানেই আওয়ামী লিগঃ

পূর্ণিমা রাণী শীল তখন ১২ বা ১৩ বছরের বালিকা। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচন হয় আর নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর, ২০০১ সালের ৮ অক্টোবর রাতে, আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ জন পুরুষের এক উন্মত্ত জনতা উল্লাপাড়ায় পূর্ণিমার পৈতৃক বাড়িতে আক্রমণ চালায়। এই হামলার সময় পরিবারের উপার্জনের উৎস সেলুন দুবার লুট করা হয়। পূর্ণিমার মায়ের হাত ভেঙে দেওয়া হয় এবং তার ভাই রাখাল চন্দ্র শীলকে এমনভাবে মারধর করা হয় যে তার চোখের মারাত্মক ক্ষতি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। তার বোনও দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। তারপর? পূর্ণিমাকে তার বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নিকটবর্তী শ্মশানঘাট ও সংলগ্ন মাঠে নিয়ে যায়। প্রতিবেশীসহ অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীরা কুপির আলোয় ঘটনাটি অবলোকন করলেও প্রাণের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করেননি।

উল্লাপাড়ার উল্লাসঃ

তারপরের ঘটনা নারকীয়। শ্মশানঘাটের পাশে একটি পতিত ক্ষেতের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জন তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। মায়ের সামনেই মেয়ের ছোট্ট শরীরটার ওপর হামলে পড়েছিল নরপিশাচের দল। মা বলছেন প্রাণের ভয়ে, বাবারা তোমরা একে একে এসো। কয়েক ঘণ্টা পর তাকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ধর্ষকরূপী হায়েনাদের প্রবল প্রতিবন্ধকতার মুখে তাদের আর ভিটেমাটি যাওয়ার সুযোগ হয়নি। উল্লাপাড়া উপজেলা সদরে এক ভাড়া বাসায় আশ্রয় নিলেও স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১০ দিন। ধর্ষকরা বুক ফুলিয়ে ঘুরছিলেন, আর এলাকাবাসীর তির্যক মন্তব্যে বিদ্ধ হতে থাকেন তিনি ও তাঁর পরিবার।

পিতৃবিয়োগঃ

ঘটনার অল্প কিছুদিন পরেই পূর্ণিমার পিতা অনিল চন্দ্র শীল সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেন। ঘটনার ১১ দিন পর ১৯ অক্টোবর ঢাকায় এসে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছিলেন পূর্ণিমা। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘসূত্রিতার কবলে পড়ে মামলাটির কোন তদন্ত হয়নি। এ অবস্থায় পূর্ণিমার পাশে দাঁড়ান বিখ্যাত সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা ওয়াহিদুল হক। সর্বস্ব হারানো মেয়েটি তাঁকে দাদু বলে সম্বোধন করেন। ওয়াহিদুল হক কখনো নিজের বাসায়, কখনো অন্য কোথাও থাকার সুযোগ করে দিলেও বিপদ হত আশ্রয়দাতার। ইতিমধ্যে বাবা অনিল চন্দ্র শীলকে নির্মম প্রহার করা হয়। সেই আঘাতের ঘা তাঁর জীবনকেই শেষ করে দেয়। চারটি বছর ধুঁকে ২০০৫ সালে পৃথিবীকে বিদায় জানান অনিল।

ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইঃ

উপায়ান্তর না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বিখ্যাত সাংবাদিক ওয়াহিদুল হকের সহযোগিতায় অচেনা শহর ঢাকায় পা বাড়ান পূর্ণিমা। কিন্তু কী করবেন? পূর্ণিমা রানী শীল তখন উল্লাপাড়ার হামিদা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী। ঢাকায় বসেই চালিয়ে যান পড়ালেখা। সময়মতো ঢাকা থেকে বোরকা পরে গিয়ে পরীক্ষা দেন। সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যেও এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল (জিপিএ ৪.৮১) অর্জন করেন। কিন্তু কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে দেখেন যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন নাকচ করে দেয় অনেক কলেজ। পূর্ণিমা জানান, বাধ্য হয়ে তিনি নামের শেষে শীল বাদ দিয়ে অন্য পদবী নেন। প্রয়োজনীয় নথিপত্র হাতে পাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হন। এরপর রাজধানীর ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন।

আশার আলো ফুটেছিলঃ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। অবশেষে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বিচারকার্য শুরু হয়। ২০১১ সালের ৪ মে, সিরাজগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গণধর্ষণের দায়ে ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। রায়ের সময় ছয়জন আসামী কারাগারে ছিল, এবং পাঁচজন পলাতক ছিল। ভালো একটি চাকরির আশা করেছিলেন মেয়েটি। কিন্তু কে দেবে? ধর্ষিতা মেয়ে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন চাকরি করার সুযোগ হয়েছিল। তারপরে বাংলাদেশের নিপীড়িত মেয়েদের জন্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পূর্ণিমা ফাউন্ডেশন’। লক্ষ্য একটাই, সারা দেশে ধর্ষিতা মেয়েদের পাশে দাঁড়ানো। ২০১৮ সালে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে নিযুক্ত হয়ে খবরের শিরোনাম হন তিনি।

আবার অন্ধকারেঃ

এরপরে আসে জুলাই, ২০২৪। ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটে। দেশ ছাড়তে বাধ্য হন পুতুল। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে উল্লাপাড়ায় ১১ জন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর মুক্তির দাবিতে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকারীরা দাবি করে যে, মামলাটি “ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের” দ্বারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং তারা পূর্ণিমাকে দেওয়া সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বাতিলসহ মামলার পুনঃবিচারের দাবি জানায়। মামলা আবার বিচারাধীন। ধর্ষকরা জামিনে মুক্ত। ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের সময় বিজেপি “দিদি তুমি আমাদের ভালোবাসো না” শিরোনামে একটি ভিডিওতে পূর্ণিমার ছবি ও কাহিনী প্রদর্শন করে। আজ বিজেপি শাসিত পশ্চিমবঙ্গে পূর্ণিমা আছেন রাজনৈতিক আশ্রয়ে ও অবশ্যই অন্য নামে। আর্থিকভাবে খুবই সংকটে থাকলেও মানসিকভাবে তুলনায় ভাল আছেন তিনি।

আমরা পারি না ফেরাতে?

বাংলাদেশের আইন ও কিছু অংশের মনন আজও মধ্যযুগীয়। সে’দেশে ধর্ষিতার নাম ও ছবি প্রকাশ করা যায়। ফলে গত ২৫/২৬ বছর তিনি প্রথমে সরাসরি কটুক্তি শুনেছেন ও পরে সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলড হয়েছেন অবিশ্বাস্য জিঘাংসায়। আজ আমরা মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় পা’রাখা নিয়ে উত্তেজিত। কিন্তু এই মুহুর্তে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাসিত একজন মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই করা ১৪/১৫ জন ধর্ষকের হাতে ধর্ষিতা হিন্দু নারী যে শিক্ষিত তার জন্যে কি কিছুই করতে পারি না? অন্তত তাকে কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারি না? আমজনতা না পারুন, সরকার না পারুন, আমার দল হয়ত পারে। এটুকুই আবেদন।
@followersSamik BhattacharyaSuvendu Adhikari#BJP4IND#Bangladesh#rapelBangladesh Awami League

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights