
প্রাচীনতম টুর্নামেন্টের বোধনে চিরপ্রাচীন দ্বৈরথ: ১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপের পর্দা উঠছে মেগা ‘কলকাতা ডার্বি‘ দিয়ে!
কলকাতা, ২৪ জুলাই, ২০২৬:
আগামী শনিবার, ২৫শে জুলাই, বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মুখোমুখি হতে চলেছে ইস্টবেঙ্গল এফসি এবং মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। আর এই মেগা ‘কলকাতা ডার্বি’ দিয়েই পর্দা উঠছে ১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপের। এশিয়ার প্রাচীনতম ফুটবল টুর্নামেন্টের বোধন এর চেয়ে বড় কোনো ম্যাচ দিয়ে হতেই পারত না! ভারতীয় ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় স্পন্দন, সবচেয়ে বড় আবেগের এই লড়াইয়ের প্রথম বাঁশি বাজবে বিকেল ৫টায়।
১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপের সমস্ত ৪৩টি ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচারিত হবে সোনি টেন৫–এ এবং লাইভ স্ট্রিমিং দেখা যাবে সোনি লিভ অ্যাপে।
ইতিহাসের অঙ্কে সেয়ানে–সেয়ানে লড়াই ইতিহাসের খাতা খুললেই বোঝা যায়, এই দ্বৈরথে সংখ্যাগুলো কেবল নিছক সংখ্যা নয়। ১৭টি ডুরান্ড কাপের শিরোপা জিতে সবচেয়ে সফল ক্লাব হিসেবে এবারও টুর্নামেন্টে নামছে সবুজ-মেরুন ব্রিগেড। এই টুর্নামেন্টের দীর্ঘ ইতিহাসে আর কোনো দলের এই নজির নেই। ঠিক তাদের ঘাড়ের কাছেই নিঃশ্বাস ফেলছে লাল-হলুদ ব্রিগেড। তাদের ঝুলিতে রয়েছে ১৬টি ট্রফি। ব্যবধান মাত্র একটা ট্রফির! তাই যখনই এই দুই দল মুখোমুখি হয়, তখন ইস্টবেঙ্গলের কাছে সুযোগ থাকে ব্যবধান কমানোর, আর মোহনবাগানের কাছে সুযোগ থাকে দূরত্বটা আরও বাড়িয়ে নেওয়ার।
ডুরান্ড কাপের ইতিহাসে ২০ বারের বেশি এই দুই দল মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে ইস্টবেঙ্গল সামান্য এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে এক ডজনবার তারা ফাইনালে লড়েছে, যার সবশেষটি ছিল ২০০৪ সালে। ফাইনালে ইস্টবেঙ্গল জিতেছে ৬ বার, মোহনবাগান ৪ বার এবং দুটি ম্যাচ অমীমাংসিত থেকেছে। তবে ২০২৩ সালের ডুরান্ডে দীর্ঘ ২৩ বছরের খরা কাটিয়ে এই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে ফাইনালে ১-০ গোলে হারিয়েই নিজেদের ১৭তম শিরোপা ঘরে তুলেছিল মোহনবাগান। পৃথিবীর খুব কম দ্বৈরথেই এরকম একটা অন্তর্নিহিত উত্তেজনা থাকে।

আইএসএল চ্যাম্পিয়নের তকমা আর নতুন দলের শক্তি তবে শুধু ইতিহাসই নয়, বর্তমানের হাওয়াও এই ম্যাচের উত্তাপ বাড়াচ্ছে। গত মরশুমে দীর্ঘ খরা কাটিয়ে জাতীয় লিগের (আইএসএল) মুকুট জিতে নিয়েছে ইস্টবেঙ্গল এফসি। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই তারা ডুরান্ড কাপে নামছে। ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিরোপা জেতার পর এই দলের মধ্যে একটা স্থির বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। লাল-হলুদ জনতাও এবার গ্যালারি ভরাবে এই বিশ্বাস নিয়ে যে, তাদের দল শুধু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে লড়তে নামছে না, বরং তাদের হারানোর জন্যই তৈরি হয়েছে।
গতবারের খেতাবজয়ী দলের অন্যতম সদস্য, মিডফিল্ডার জিকসন সিং থৌনাওজাম নতুন কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের অধীনে দলের মেজাজ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা একটা পরিবারের মতো একত্রিত হচ্ছি। গত মরশুমের শেষে আমরা আমাদের লক্ষ্য পূরণ করেছিলাম। আমি নতুন মরশুমের জন্য মুখিয়ে আছি, যাতে আরও বেশি জেদ নিয়ে একই লক্ষ্য পূরণ করতে পারি। কোচের অভিজ্ঞতা এবং তাঁর জেতা ট্রফিগুলোর কথা মাথায় রাখলে, ইস্টবেঙ্গলের হয়ে তাঁর অধীনে খেলাটা আমার কাছে একটা বিশাল পাওনা। আমার কাছে অবশ্যই আমরাই ফেভারিট দল।”
ডাগআউটে দুই নতুন মুখ, লড়াইয়ে নতুন ছক মজার ব্যাপার হলো, এবার দুই দলের ডাগআউটেই নতুন মুখ দেখা যাবে। গ্রিক কোচ প্যানাজিওতিস দিলম্পেরিসের হাত ধরে নতুন যাত্রা শুরু করছে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। পঞ্জাব এফসি-তে দু’বছর নীরবে দারুণ কাজ করার পর সবুজ-মেরুন শিবিরে এসেছেন তিনি। এবার তাঁর হাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী একটা স্কোয়াড, যার অন্যতম বড় চমক মিগুয়েল ফিগুয়েরা দামাসেনোর যোগদান।
নিজের প্রথম ম্যাচের আগে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে দিলম্পেরিস বলেন, “ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে ডার্বি দিয়ে শুরু করাটা আমাকে দারুণ রোমাঞ্চিত করছে, কারণ ফুটবল তো এই কারণেই বেঁচে আছে। মোহনবাগানের মতো একটা ক্লাবে যোগ দেওয়া, যাদের এত বড় ফ্যান বেস, ইতিহাস এবং এত প্রত্যাশা রয়েছে, সেটা আমার কাছে কোনো উদ্বেগ নয়, বরং একটা বড় মোটিভেশন।”
মিগুয়েল ফিগুয়েরার দলবদলটা যেন একটা নীরব কবিতার মতো। ভারতীয় ফুটবলে আসার মাত্র এক বছরের মধ্যেই এই ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার আইএসএল-এর সেরা খেলোয়াড় হয়ে গোল্ডেন বল জিতেছিলেন এবং ইস্টবেঙ্গলের খেতাব জয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। আজ তিনি সবুজ-মেরুন জার্সি গায়ে। শনিবার যদি তিনি মাঠে নামেন, তাহলে হয়তো প্রথমবার বুঝতে পারবেন প্রতিপক্ষ শিবিরের দিক থেকে এই ডার্বির উত্তাপটা কতটা ব্যক্তিগত হতে পারে।
মোহনবাগানের আক্রমণভাগেও নতুন অস্ত্র এসেছে। সার্বিয়ান ফরোয়ার্ড দেজান ড্র্যাজিক শহরে পা রেখেছেন কয়েকদিন আগেই। গত মরশুমে মোহনবাগানের ফরোয়ার্ড লাইনে যে ধার কিছুটা কমে গিয়েছিল, তা ফেরাতেই তাকে আনা হয়েছে। ইতিমধ্যেই তিনি ডার্বির উত্তাপ টের পেয়ে গেছেন। তিনি বলেন, “বিদেশি হোক বা ভারতীয়, যেকোনো খেলোয়াড়ের কাছেই কলকাতায় ডার্বির মতো ম্যাচ খেলাটা একটা অদ্ভুত অনুভূতি। আমি বিমানবন্দরে দারুণ চমকে গিয়েছিলাম, জীবনে প্রথমবার আমার সাথে এমনটা হলো এবং আমি ওই অভ্যর্থনার জন্য অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আমরা মোহনবাগান, আর সবার মতোই আমরাও এই ম্যাচটা জিততে চাই।”
হাবাসের প্রত্যাবর্তনে অন্য মাত্রা মাঠের অন্য প্রান্তে, ইস্টবেঙ্গল এমন একজন কোচের ওপর ভরসা রেখেছে, যিনি জানেন প্রতিপক্ষ শিবিরে কী চলছে, কারণ তিনি নিজেই আগে সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন। অভিজ্ঞ স্প্যানিশ স্ট্র্যাটেজিস্ট আন্তোনিও লোপেজ হাবাস এবার লাল-হলুদ ব্রিগেডের দায়িত্বে। এর আগে তিনি মোহনবাগানকে ২০২৩-২৪ আইএসএল লিগ শিল্ড জিতিয়েছিলেন, মরশুমের মাঝপথে এসে দলের হাল ধরে অপরাজিত থেকে শিরোপা এনে দিয়েছিলেন।
পুরনো ক্লাবের বিরুদ্ধে নামার আগে কোনো নস্টালজিয়া কাজ করছে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে হাবাস সোজাসাপটা জবাব দেন, “কোনো নস্টালজিয়া নেই। আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে, কারণ অতীত অতীতই। ভারতে আমার আগের কাজ, আমার খেলোয়াড় এবং ফ্যানদের আমি সম্পূর্ণ সম্মান করি। কিন্তু পেশাদার জীবনে এটা একটা নতুন কাজ, নতুন দল। আমাকে এখন আমার স্বপ্নের জন্য লড়াই করতে হবে।”
ভারতীয় ফুটবলে খুব কম কোচের ক্ষেত্রেই এমন নাটকীয়তা দেখা যায়, যেখানে একজন কোচ নিজের পুরনো সাফল্যের জায়গায় ফিরে আসছেন, আর এবার লক্ষ্য সেই দলকে হারানো, যাদের তিনি আগে জিতিয়েছিলেন।
শনিবারের এই ম্যাচ হয়তো ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের চিরকালীন তর্কের কোনো মীমাংসা করবে না। কারণ এই তর্কের কোনো শেষ নেই। কিন্তু এই ম্যাচ গোটা টুর্নামেন্টের সুর বেঁধে দেবে। আর ডুরান্ড কাপের মতো একটা টুর্নামেন্ট শুরু করার জন্য ফ্লাডলাইটের আলোয় ভেজা কলকাতার মেগা ডার্বির চেয়ে ভালো মঞ্চ বিশ্ব ফুটবলে আর কোথাও হতে পারে না!


















