খাজুরাহোর ‘মৈথুন ভাস্কর্য’: অশ্লীলতা, নাকি পুরাণ, প্রতীক ও শিল্পদর্শনের এক গভীর ভাষ্য?
Suman Munshi
Chief Editor, IBG NEWS
ভারতের মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত খাজুরাহোর মন্দিরসমূহ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য ও ভাস্কর্য ঐতিহ্য। ৯ম থেকে ১২শ শতাব্দীর মধ্যে চন্দেলা রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই মন্দিরসমূহ আজ ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য (UNESCO World Heritage Site)। অথচ এই মন্দিরগুলির নাম উচ্চারিত হলেই অধিকাংশ মানুষের মনে প্রথম যে বিষয়টি আসে, তা হল তথাকথিত “ইরোটিকা” বা “মৈথুন ভাস্কর্য”।
বহু পর্যটক, এমনকি কিছু জনপ্রিয় লেখক ও গাইডও এই ভাস্কর্যগুলিকে কেবলমাত্র যৌনতার প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু শিল্প-ইতিহাস, পুরাণ, আগমশাস্ত্র এবং হিন্দু দর্শনের আলোকে বিষয়টি এতটা সরল নয়। বরং অধিকাংশ গবেষকের মতে, এই ভাস্কর্যগুলি বহুমাত্রিক প্রতীক, যার অর্থ একাধিক স্তরে অনুধাবন করতে হয়।
খাজুরাহোর ভাস্কর্য কি শুধুই যৌনতার প্রতীক?
খাজুরাহোর প্রায় ৮৫টি মন্দিরের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২৫টি অবশিষ্ট রয়েছে। বিস্ময়করভাবে, এই মন্দিরগুলির মোট ভাস্কর্যের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশে মৈথুন বা যৌন মিলনের দৃশ্য রয়েছে। বাকি অংশজুড়ে দেব-দেবী, নৃত্য, সঙ্গীত, যুদ্ধ, দৈনন্দিন জীবন, প্রাণী, পৌরাণিক কাহিনি, যোগসাধনা এবং আধ্যাত্মিক ভাবনার অসংখ্য চিত্র ফুটে উঠেছে।
অর্থাৎ, খাজুরাহোকে কেবল “যৌন মন্দির” বলা ঐতিহাসিকভাবে বিভ্রান্তিকর।
মৈথুন ভাস্কর্যের ব্যাখ্যা
ভারতীয় শিল্পতত্ত্বে এই ভাস্কর্য সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রচলিত—
- পুরুষ ও প্রকৃতির মিলন—সাংখ্য দর্শনের প্রতীক।
- শিব ও শক্তির ঐক্য—তান্ত্রিক সাধনার রূপক।
- চার পুরুষার্থ—ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষের সমন্বিত জীবনদর্শন।
- সংসারজীবন থেকে আধ্যাত্মিক জীবনের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রতীক।
- অশুভ শক্তিকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যে বহির্ভাগে মানবজীবনের সমস্ত রূপের চিত্রায়ণ।
এই ব্যাখ্যাগুলির কোনওটিকেই সর্বসম্মত বলা যায় না, তবে এগুলি শিল্প-ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত আলোচনার অংশ।
বিতর্কিত পশুমৈথুন ভাস্কর্য—আসলেই কী দেখায়?
খাজুরাহোর কয়েকটি ভাস্কর্য প্রথম দর্শনে এমন মনে হয় যেন একজন মানুষ কোনও প্রাণীর সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত। এই দৃশ্যগুলি বহু বছর ধরে বিতর্কের বিষয়।
কিছু জনপ্রিয় লেখক এগুলিকে “পশুমৈথুন” বলে অভিহিত করেছেন। আবার অন্যদিকে বহু ভারতীয় শিল্প-ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই ভাস্কর্যগুলিকে আক্ষরিক অর্থে পড়া উচিত নয়। এগুলি হতে পারে—
- কোনও পৌরাণিক ঘটনার প্রতীক,
- কোনও রূপান্তর (Transformation)-এর শিল্পরূপ,
- অথবা মানুষের প্রবৃত্তির রূপক প্রকাশ।
তবে উল্লেখ করা জরুরি যে আজ পর্যন্ত কোনও প্রামাণ্য প্রত্নতাত্ত্বিক বা শিল্প-ঐতিহাসিক গবেষণা নিশ্চিতভাবে বলেনি যে খাজুরাহোর কোনও নির্দিষ্ট তথাকথিত “পশুমৈথুন” ভাস্কর্য সূর্য ও সংজ্ঞার কাহিনিকেই চিত্রিত করছে। তাই এটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দাবি করা গবেষণার দৃষ্টিতে সঙ্গত নয়।
সূর্য, সংজ্ঞা ও ছায়া: পুরাণে কী বলা হয়েছে?
এই প্রসঙ্গে যে পৌরাণিক কাহিনিটি প্রায়শই আলোচনায় আসে, তা হল সূর্যদেব, তাঁর পত্নী সংজ্ঞা (সঞ্জ্ঞা বা সারণ্যু) এবং ছায়া দেবীকে নিয়ে।
এই কাহিনি বিষ্ণু পুরাণ (তৃতীয় অংশ, অধ্যায় ২), ভাগবত পুরাণ (ষষ্ঠ স্কন্ধ), মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ব্রহ্ম পুরাণ এবং ভবিষ্য পুরাণের বিভিন্ন অংশে বর্ণিত হয়েছে।
সংজ্ঞার প্রস্থান
বিশ্বকর্মার কন্যা সংজ্ঞা সূর্যদেবের প্রখর তেজ সহ্য করতে পারছিলেন না। ফলে তিনি নিজের ছায়ামূর্তি সৃষ্টি করে তার নাম দেন ছায়া, এবং তাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে তপস্যার উদ্দেশ্যে চলে যান।
অশ্বরূপ ধারণ
সংজ্ঞা উত্তর কুরু বা তপোভূমিতে গিয়ে মাদি ঘোড়া (ঘোটকী)-র রূপ ধারণ করেন।
পরবর্তীতে সূর্যদেব তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানতে পেরে অশ্বরূপ ধারণ করে সংজ্ঞার কাছে পৌঁছান।
দেবসন্তানের জন্ম
পুরাণ অনুযায়ী, এই মিলনের ফলে জন্মগ্রহণ করেন—
- অশ্বিনী কুমারদ্বয়—নাসত্য ও দস্র, যাঁরা দেবতাদের চিকিৎসক।
- বহু পুরাণে একই প্রসঙ্গে রেভন্ত (রেবন্ত)-এরও জন্মের উল্লেখ পাওয়া যায়। রেভন্তকে সূর্যপুত্র এবং অশ্বারোহীদের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
যম ও শনির পরিচয়
অনেক জনপ্রিয় বর্ণনায় বিভ্রান্তি দেখা যায়। কিন্তু অধিকাংশ প্রামাণ্য পুরাণ অনুসারে—
- যম ও যমুনা হলেন সংজ্ঞার সন্তান।
- শনি, তপতী এবং সাবর্ণি মনু হলেন ছায়া দেবীর সন্তান।
অতএব, “যম ছায়ার সন্তান”—এই বক্তব্য পুরাণসম্মত নয়।
প্রতীক না বাস্তব?
ভারতীয় শিল্পকলায় দেবদেবীর রূপান্তর কোনও অস্বাভাবিক বিষয় নয়।
বিষ্ণুর বরাহ অবতার, নরসিংহ অবতার, হয়গ্রীব, গণেশের গজমস্তক কিংবা দেবদেবীদের বিভিন্ন প্রাণীরূপ ধারণ—এসবই ভারতীয় পুরাণের সুপরিচিত অংশ।
অতএব, কোথাও যদি অশ্বরূপী দেবদেবীর চিত্রায়ণ দেখা যায়, তাকে সরাসরি মানুষের সঙ্গে প্রাণীর যৌনসম্পর্কের বাস্তব দৃশ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা সবসময় সঠিক নাও হতে পারে।
শিল্পকে পড়তে হলে প্রেক্ষাপট জানতে হবে
খাজুরাহোর শিল্পকে বোঝার জন্য শুধু একটি ভাস্কর্যের দিকে তাকালেই হবে না। জানতে হবে—
- পুরাণ,
- আগমশাস্ত্র,
- তন্ত্র,
- শিল্পশাস্ত্র,
- চন্দেলা যুগের ইতিহাস,
- এবং ভারতীয় নন্দনতত্ত্ব।
প্রেক্ষাপট ছাড়া কোনও ভাস্কর্যের ব্যাখ্যা করলে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
খাজুরাহোর আইকনোগ্রাফি (Iconography): প্রতিমা-তত্ত্ব, প্রতীক ও শিল্পভাষা
খাজুরাহোর ভাস্কর্য বোঝার জন্য আইকনোগ্রাফি (Iconography) বা প্রতিমা-তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকা অপরিহার্য। আইকনোগ্রাফি হল এমন একটি শাস্ত্র যেখানে দেব-দেবী, পৌরাণিক চরিত্র, প্রাণী, অলংকার, অঙ্গভঙ্গি (মুদ্রা), বাহন, অস্ত্র, ভঙ্গিমা এবং প্রতীকগুলির মাধ্যমে শিল্পকর্মের অন্তর্নিহিত অর্থ বিশ্লেষণ করা হয়। ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যে প্রতিটি ভাস্কর্য কেবল অলংকরণ নয়, বরং একটি ধর্মীয়, দার্শনিক বা সাংস্কৃতিক বার্তার বাহক।
শিল্পশাস্ত্রের নির্দেশনা
খাজুরাহোর অধিকাংশ মূর্তি ভারতীয় শিল্পশাস্ত্র (Śilpaśāstra), আগমশাস্ত্র এবং বাস্তুশাস্ত্র-এর নীতিমালা অনুসরণ করে নির্মিত। বিশেষত মানসার (Mānasāra), ময়মত (Mayamata), অপরাজিতপৃচ্ছা (Aparājitapṛcchā), সমরাঙ্গণ সূত্রধার (Samarāṅgaṇa Sūtradhāra) এবং বিশ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ-এর চিত্রসূত্র অংশে দেবমূর্তি নির্মাণ, অনুপাত, ভঙ্গিমা এবং অলংকরণের বিশদ নির্দেশ পাওয়া যায়।
চন্দেলা শিল্পশৈলীর বৈশিষ্ট্য
খাজুরাহোর মন্দিরগুলি নাগর (Nāgara) স্থাপত্যশৈলী-র পরিণত রূপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে চন্দেলা রাজারা যে শিল্পধারা গড়ে তুলেছিলেন, তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল—
- দীর্ঘায়ত ও নমনীয় মানবদেহ।
- ত্রিভঙ্গ (Tribhaṅga) ও অতিভঙ্গ ভঙ্গির ব্যাপক ব্যবহার।
- মুখাবয়বে শান্ত, মৃদু ও আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তি।
- অলংকারের সূক্ষ্ম খোদাই এবং পোশাকের স্বচ্ছতার ভাস্কর্যিক প্রকাশ।
- গতিশীলতা, নৃত্যভঙ্গি এবং শরীরের ছন্দময় গঠন।
- প্রতিটি মূর্তির সঙ্গে পারিপার্শ্বিক লতা, বৃক্ষ, প্রাণী, গণ, যক্ষ, কিন্নর ও অপ্সরাদের সমন্বয়।
এই বৈশিষ্ট্যগুলি খাজুরাহোর ভাস্কর্যকে ভারতীয় মধ্যযুগীয় শিল্পকলার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
সুরসুন্দরী ও মিথুনমূর্তি
খাজুরাহোর বহুল আলোচিত নারী মূর্তিগুলিকে শিল্প-ইতিহাসে সুরসুন্দরী (Surasundarī) বলা হয়। কোথাও তাঁরা আয়না দেখছেন, কোথাও নূপুর বাঁধছেন, কোথাও কাঁটা তুলছেন, আবার কোথাও বৃক্ষশাখা স্পর্শ করছেন। এগুলি সৌন্দর্যের প্রদর্শনমাত্র নয়; ভারতীয় নন্দনতত্ত্বে এগুলি সমৃদ্ধি, উর্বরতা, মঙ্গল এবং জীবনশক্তির প্রতীক।
একইভাবে, নারী-পুরুষের যুগল মূর্তিগুলিকে মিথুন (Mithuna) বলা হয়। প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যে মিথুনমূর্তি শুভলক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতো। অনেক শিল্পতাত্ত্বিকের মতে, এগুলি সংসার, সৃষ্টি, প্রজননশক্তি এবং মহাজাগতিক ঐক্যের প্রতীক।
প্রতিটি ভাস্কর্যের একাধিক অর্থ থাকতে পারে
ভারতীয় আইকনোগ্রাফির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল—একটি প্রতিমা বা ভাস্কর্যের অর্থ একটিমাত্র নয়। একই চিত্রকে ধর্মীয়, দার্শনিক, সামাজিক, তান্ত্রিক কিংবা নান্দনিক—বিভিন্ন স্তরে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
এই কারণেই খাজুরাহোর কোনও একটি ভাস্কর্যকে কেবলমাত্র যৌনতার প্রতীক, কিংবা কেবলমাত্র কোনও নির্দিষ্ট পুরাণকাহিনির দৃশ্য বলে চিহ্নিত করা গবেষণার দৃষ্টিতে যথেষ্ট নয়। শিল্প-ইতিহাসবিদরা ভাস্কর্যের অবস্থান, পার্শ্ববর্তী মূর্তি, মন্দিরের দেবতা, স্থাপত্য পরিকল্পনা, শিলালিপি এবং শাস্ত্রীয় নির্দেশ—সবকিছুকে একত্রে বিচার করে তার ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
খাজুরাহো: মানবজীবনের এক বিশ্বকোষ
বিশিষ্ট শিল্প-ইতিহাসবিদ স্টেলা ক্রামরিশ (Stella Kramrisch) এবং দেবাঙ্গনা দেশাই (Devangana Desai)-এর গবেষণায় খাজুরাহোকে কেবল কামদৃশ্যের সংগ্রহ নয়, বরং মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকোষ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ—এই চার পুরুষার্থ, দেবোপাসনা, নৃত্য, সংগীত, যুদ্ধ, রাজনীতি, দৈনন্দিন জীবন এবং আধ্যাত্মিক সাধনা—সবকিছুরই সমন্বিত শিল্পরূপ প্রতিফলিত হয়েছে।

উপসংহার
খাজুরাহোর মন্দির ভারতীয় সভ্যতার এক অসামান্য শিল্পভাণ্ডার। সেখানে মৈথুন ভাস্কর্য রয়েছে, কিন্তু সেই ভাস্কর্যগুলিকে শুধুমাত্র অশ্লীলতা বা যৌনাচারের নিদর্শন হিসেবে দেখা ইতিহাস, শিল্প ও ধর্মীয় দর্শনের প্রতি অবিচার।
একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, কোনও নির্দিষ্ট ভাস্কর্যকে সূর্য–সংজ্ঞার পুরাণকাহিনির দৃশ্য বলে নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করার মতো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই গবেষণার সততা বজায় রেখে বলা যায়—এটি একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য নয়।
ভারতীয় মন্দিরশিল্পের সৌন্দর্য এখানেই—প্রতিটি ভাস্কর্য কেবল চোখে দেখার বিষয় নয়; তা বোঝার জন্য প্রয়োজন শাস্ত্র, ইতিহাস এবং শিল্পদর্শনের সমন্বিত পাঠ।
প্রধান গবেষণা-তথ্যসূত্র
- Viṣṇudharmottara Purāṇa (Chitrasūtra)
- Mānasāra
- Mayamata
- Aparājitapṛcchā
- Samarāṅgaṇa Sūtradhāra (রাজা भोज)
- Stella Kramrisch – The Hindu Temple
- Devangana Desai – The Religious Imagery of Khajuraho
- Krishna Deva – Temples of Khajuraho
- Michael Meister – গবেষণা প্রবন্ধসমূহ (Indian Temple Architecture)



















