Friday, October 23, 2026
WA
Home Bangla আমাদের শিশু পাঠ্যক্রম, আমাদের শিশুদের শৈশব

আমাদের শিশু পাঠ্যক্রম, আমাদের শিশুদের শৈশব

0
20
Childhood
Childhood

#আমাদের_শিশু_পাঠ্যক্রম #আমাদের_শিশুদের_শৈশব

ডাঃ পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ,শিশু বিশেষজ্ঞ ও শিশু মনোবিজ্ঞানী

Kolkata,16 August 2026

আজকাল প্রায়শই চেম্বারে এমন রোগীদের আনাগোনা যাদের ওজন বয়সের তুলনায় অনেক বেশি।

এমন নয় যে তারা বয়ঃসন্ধি অথবা অন্য বিশেষ কোনো বয়সের। হাঁটতে শুরু করা থেকে শুরু করে টিন এজ পর্যন্ত যে কোনো বয়সেই এই প্রবণতা

আমাকে চিন্তায় ফেলে।

অভিভাবকেরা বেশিরভাগই কিন্তু ওই বেশি ওজন নিয়ে চিন্তিত হয়ে আসেননি। এসেছেন অন্য ব্যাপারে। কিন্তু আমার চোখ পড়ে যায় ওদিকেই,আর বেশি ওজনের কুফল নিয়ে পাঁচসাত বলতে বলতে বেশির ভাগ সময় যে সমস্যার জন্য তাঁদের আসা সে প্রসঙ্গের বাইরে চলে যাই।

শিশুরা এখন আর শিশু নেই। কবে থেকে? সেই সর্বনাশা শৈশবঘাতী যুগের প্রথমদিন থেকে যেদিন থেকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের “আধুনিক” হয়ে ওঠা কারিকুলাম তার হাতে “এঁচোড়ে বিদ্বান” হওয়ার বই তুলে দিয়েছে।

সে এক সাংঘাতিক ব্যবস্থা ও অবস্থা।

অভিভাবকদের যদি ভুলক্রমে জিজ্ঞাসা করে ফেলি, আপনার বাচ্চা বিকালে কি খেলে?

উত্তর দেবে কি, প্রশ্ন শুনে তাঁরা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকান। ভাবেন, লোকটা পাগল না তো? তারপর নিজেকে সামলে নেন। বলেন, না ডাক্তারবাবু। খেলার সময় কোথায়। পড়ার খুব চাপ। প্রায় রোজই টেস্ট।

আমি অবশ্য এসব শুনে এখন আর অবাক হই না। কারণ জানি, দু বছর বয়স পর্যন্ত যতদিন পর্যন্ত তাঁদের তত্ত্বাবধানে বাচ্চা আছে ততদিন পর্যন্ত দেশে চলা ভয়াবহ অবৈজ্ঞানিক কারিকুলামে নিষ্পেষিত সেসব বাচ্চাদের সঙ্গে তাঁরাও ইকুয়ালি প্রেসারাইজড। তাঁরাও সেই জোয়ালে জুতে দেওয়া পড়াশোনার প্রতিযোগিতা নামক ইঁদুর দৌড়ের বলদের সহযাত্রী , যাঁদের এ ছদ্ম লড়াই থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই। কিসের লড়াই? পড়াশোনায় একে অপরকে টপকে যাওয়ার অশুভ প্রতিযোগিতার লড়াই।

আমার নয়, পৃথিবীর আচ্ছা আচ্ছা শিশু মনস্তাত্ত্বিকদের কথা হলো, শিশুর প্রথম শিক্ষক হলো প্রকৃতি। যার সঙ্গে পাঁচ ইন্দ্রিয়ের ইন্টার অ্যাকশনে শিশু তার জীবন চলার পথে প্রাথমিক জ্ঞানগুলো লাভ করে। তারা শেখে কোনটা ফুল।কোনটা পাখি। জল কি। হাওয়া কি। রং কাকে বলে। শীত কি। গরম কি। ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই করতে করতে বিদ্যা ও শিক্ষা অর্জন সম্পর্কে তার আগ্রহ বাড়ে। তার মস্তিষ্কের শিক্ষা নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে। তারপর তার মধ্যে বয়সের উপযুক্ত শিক্ষার কারিকুলাম চাপানো হয়, যাতে লেখা, পড়াশোনা, বইপত্র তার কাছে ভীতির নয়, আগ্রহের বস্তু হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে কারিকুলামের ওজন এমন ভাবে বাড়ানো হয় যাতে ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা শিশু খুব সহজেই সে বোঝা বইতে পারে। তার মনে হয় না, পিঠে হাতির বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ছোট ক্লাস থেকে বড় ক্লাস, তারপর স্নাতক, স্নাতকোত্তর, ডক্টরেট, আসলে সব এই লজিকেই ক্রমশ শিক্ষা ও বিদ্যার গভীরতা বাড়ানোর মেথড যা গোটা বিশ্বের যুক্তিবাদী ও শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার কথা ভাবা দেশগুলোতে প্রচলিত। যদিও দুঃখজনক ভাবে আমাদের দেশ সেই গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পড়ে না।

আমরা ছোটবেলায় মা বাবার মুখে শুনেছিলাম , পড়ার সময় পড়া, খেলার সময় খেলা। সে আপ্তবাক্য এখন ব্যকডেটেড। এখন সর্বদা পড়া।

সকালে উঠে স্কুল। তার পর ফিরে খেয়ে ঘুম। ঘুম থেকে উঠে ম্যাম বা স্যারের কাছে কোচিং। ফিরে এসে হোমটাস্ক। তারপর খেয়ে ঘুম। পরের দিন আবার স্কুল আছে তো?

অথচ এটা পরীক্ষিত সত্য যে বিকালে ঘাম ঝরানো খেলা শিশুর পক্ষে কত উপকারী। তা মস্তিষ্ক সমেত শরীরের সমস্ত কোষে ও সিস্টেমে রক্ত বাহিত খাদ্য ও তার জ্বালানি অক্সিজেন পৌঁছে দিতে সাহায্য করে, যা সিস্টেম ধরে ধরে ও সামগ্রিক ভাবে একটা গোটা মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে অপরিহার্য। এতে ক্যালোরি বার্ন হয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। শরীর তার বিভিন্ন সিস্টেম ও মস্তিষ্কে স্থিতিস্থাপকতা বাড়ে। বুদ্ধিবৃত্তি বাড়ে। শারীরিক ও মানসিক ভাবে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল জাতি গঠিত হয়।

কিন্তু হায়! আমাদের শিশুরা শিশু না থেকে এই ব্যবসায়ী, অবৈজ্ঞানিক শিক্ষাক্রমের জাঁতাকলে পড়ে নিরন্তর চাপে ধীরে ধীরে শারীরিক, মানসিক ভাবে আনফিট হয়ে পরিণত হচ্ছে স্থূলত্ব, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের, মানসিক বিষণ্নতা, উদ্বেগ এমনকি আত্মহননের মানসিকতা সমৃদ্ধ একটা পঙ্গু জাতিতে, যে নীরব মহামারি অচিরেই দেশে আরও প্রকট হয়ে দেখা হবে।

দেশের নাগরিক, শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে আবেদন, কারিকুলামকে বয়সের পক্ষে বাস্তবানুগ করে আমাদের শিশুদের বাঁচান। তাদের শৈশব ফিরিয়ে দিন, সঙ্গে ফিরিয়ে দিন আগামীতে ভারতকে উজ্জ্বলতর এক জাতিগোষ্ঠী হিসেবে ফের তৈরি করার এক সম্ভাবনা।

সরকারেরও এ ব্যাপারে বিশেষ নজর দিয়ে কড়া আইন প্রণয়ন দরকার, যাতে শিশুরা ভালো থাকে, সঙ্গে ভবিষ্যতে, অন্য আরও অনেক দেশের মতো আমাদের দেশও আরও ভালো থাকে।

লেখক পরিচিতি

Dr Palash Banerjee -Award.JPG
Dr Palash Banerjee -Award.JPG

ডাঃ পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়
শিশু বিশেষজ্ঞ, নিওনেটোলজিস্ট ও সাহিত্যিক

একজন বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ও নিওনেটোলজিস্ট। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা-অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাতেও তাঁর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। কবিতা, উপন্যাসসহ বিভিন্ন সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্মানগুলির মধ্যে রয়েছে Golden Heart Award এবং Dalit Sahitya Academy Award। চিকিৎসা ও সাহিত্যের দুই ভিন্ন জগতকে একসঙ্গে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর বহুমুখী প্রতিভা তাঁকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights