মোহনবাগানকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে রেকর্ড ১৭তম ডুরান্ড কাপ জিতল ইস্টবেঙ্গল
অন্তরা ত্রিপাঠী, সম্পাদক | IBG NEWS BANGLA
কলকাতা, ২৩ আগস্ট ২০২৬
কলকাতা ডার্বির মঞ্চে দুরন্ত ফুটবল প্রদর্শন করে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে ৪-১ গোলে হারিয়ে ১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপের চ্যাম্পিয়ন হল ইস্টবেঙ্গল এফসি। রবিবার বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে অনুষ্ঠিত ফাইনালে এই জয়ের ফলে ইস্টবেঙ্গল তাদের ১৭তম ডুরান্ড কাপ শিরোপা অর্জন করল এবং সর্বাধিক খেতাব জয়ের তালিকায় মোহনবাগানের সঙ্গে সমতা স্থাপন করল।
ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে গোল করেন থ. বিপিন সিং (১০ মিনিট) এবং এডমুন্ড লালরিন্দিকা (১২, ২২ ও ৪৪ মিনিট)। মোহনবাগানের একমাত্র গোলটি আসে মনবীর সিংয়ের পা থেকে ৩৩ মিনিটে।
দুই মিনিটে দুই গোল, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ইস্টবেঙ্গলের হাতে
ম্যাচের শুরুতে মোহনবাগান বলের দখল ও খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছিল। অনিরুদ্ধ থাপা ও লিস্টন কোলাসো আক্রমণ তৈরির চেষ্টা করছিলেন এবং মনবীর সিং ও জেমি ম্যাকলারেনকে সামনে রেখে সুযোগ খুঁজছিলেন।
কিন্তু ইস্টবেঙ্গল আক্রমণে তাদের অসাধারণ কার্যকারিতা দেখিয়ে মাত্র দুই মিনিটের ব্যবধানে দু’টি গোল করে ম্যাচের চেহারা বদলে দেয়।
১০ মিনিটে ইস্টবেঙ্গল অধিনায়ক মহম্মদ বাসিম রশিদ বাঁদিক দিয়ে দৌড়ে ওঠা বিপিন সিংকে অসাধারণ একটি থ্রু বল দেন। বিপিন সুযোগটি নষ্ট করেননি। দূরের পোস্ট লক্ষ্য করে তাঁর নিখুঁত ফিনিশিংয়ে এগিয়ে যায় লাল-হলুদ।
এর মাত্র দুই মিনিট পরেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এডমুন্ড লালরিন্দিকা। বক্সের বাইরে বল পেয়ে তিনি দুরন্ত গতির শটে মোহনবাগানের গোলরক্ষক বিশাল কাইথকে পরাস্ত করেন।
লালরিন্দিকার দ্বিতীয় গোল, ইস্টবেঙ্গলের ৩-০
মোহনবাগান ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ বেশ দৃঢ় ছিল। লিস্টন কোলাসোর ক্রস বিপদ তৈরি করলেও ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্স তা সামলে নেয়। পরে কোলাসো বক্সের বাইরে ফ্রিকিক আদায় করেন। তাঁর নেওয়া ফ্রিকিক গোলের দিকে এগিয়ে গেলেও ইস্টবেঙ্গল গোলরক্ষক প্রভসুখন সিং গিল দুর্দান্ত সেভ করে বিপদ কাটিয়ে দেন।
২২ মিনিটে তৃতীয় গোল করে ইস্টবেঙ্গল।
এটি ছিল একটি চমৎকার দলগত আক্রমণ। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ শুরু করেন এডমুন্ড। বল বামদিকে গিয়ে হার্দিক ভাটের কাছে পৌঁছয়। তাঁর ডেলিভারি ড্যানিয়েল রামিরেজের কাছে যায় এবং সেখান থেকে বল ফের কেন্দ্রে আসে। নিজের দৌড় অব্যাহত রেখে এডমুন্ড বলটি ফিরে পান। এরপর গোলরক্ষক ও ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে অসাধারণ দক্ষতায় কাছের পোস্ট দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন।
স্কোরলাইন তখন ইস্টবেঙ্গল ৩-০ মোহনবাগান।
মনবীরের গোলে ব্যবধান কমায় মোহনবাগান
তিন গোল পিছিয়ে পড়েও মোহনবাগান আক্রমণ চালিয়ে যায়। ৩০ মিনিটে অনিরুদ্ধ থাপার কাছ থেকে ভালো বল পেয়ে জেমি ম্যাকলারেন দূরপাল্লার শট নিলেও তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
শেষ পর্যন্ত ৩৩ মিনিটে একটি গোল শোধ করে মোহনবাগান। মাঝমাঠ থেকে লালেংমাওইয়া দুর্দান্ত থ্রু বল বাড়িয়ে দেন ডানদিকে থাকা মনবীর সিংকে। মনবীর দ্রুত বক্সে ঢুকে ভিতরের দিকে কাট করে দূরের পোস্ট লক্ষ্য করে চমৎকার ফিনিশিংয়ে স্কোর ৩-১ করেন।
মনবীর ফের বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন ৩৭ মিনিটে। বাঁদিক দিয়ে তাঁর দৌড়ের পর বল পৌঁছয় ম্যাকলারেনের কাছে, কিন্তু অস্ট্রেলীয় ফরোয়ার্ড তা কাজে লাগাতে পারেননি।
বিরতির আগে হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ এডমুন্ডের
মোহনবাগান ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বিরতির ঠিক আগে আবারও আঘাত হানে ইস্টবেঙ্গল।
৪৪ মিনিটে ডানদিক থেকে ফ্রিকিক নেন বাসিম রশিদ। বল দূরের পোস্টের দিকে গেলে জয় গুপ্ত সেটি ট্যাপ করে গোলের সামনে পাঠিয়ে দেন। সেখানে প্রস্তুত ছিলেন এডমুন্ড লালরিন্দিকা। কাছ থেকে বল জালে পাঠিয়ে তিনি নিজের হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করেন।
প্রথমার্ধের শেষে ইস্টবেঙ্গল এগিয়ে ছিল ৪-১ গোলে।
দ্বিতীয়ার্ধে চেষ্টা করেও পারেনি মোহনবাগান
বিরতির পর মোহনবাগান আক্রমণের গতি বাড়ায় এবং একাধিক পরিবর্তন আনে। কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ ছিল অত্যন্ত সংগঠিত।
৪৮ মিনিটে শুভাশিস বসুর ক্রস ক্লিয়ার করেন লালচুংনুঙ্গা। কয়েক মিনিট পর আনোয়ার আলি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেপশন করে মিগুয়েল ফেরেইরা ও মনবীরের সম্ভাব্য আক্রমণ আটকে দেন।
৫৮ মিনিটে লিস্টন কোলাসোর ফ্রিকিক থেকে আবারও গোলের সুযোগ তৈরি হয়। বক্সের বাঁদিক থেকে তাঁর শক্তিশালী কার্লিং শট গোলের দিকে এগিয়ে গেলেও প্রভসুখন সিং গিল আরও একবার দুর্দান্ত সেভ করে ইস্টবেঙ্গলের লিড অক্ষুণ্ণ রাখেন।
ইস্টবেঙ্গলও পাল্টা আক্রমণে সুযোগ তৈরি করতে থাকে। ৬৫ মিনিটে বিপিন সিংয়ের শট কাইথ সামলে দেন। এরপর মনবীরের আরেকটি দৌড় জয় গুপ্তের শক্তিশালী ক্লিয়ারেন্সে থেমে যায়।
রক্ষণে দৃঢ় ইস্টবেঙ্গল
দ্বিতীয়ার্ধের শেষদিকে মোহনবাগান বলের দখল বেশি রাখলেও ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণভাগ বারবার আক্রমণ ভেঙে দেয়। সন্দীপ মান্ডি, আনোয়ার আলি ও হার্দিক ভাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মোহনবাগান লালিয়ানজুয়ালা ছাংতে, মিগুয়েল ফেরেইরা ও সাহাল আবদুল সামাদকে মাঠে নামিয়ে আক্রমণে আরও গতি আনার চেষ্টা করে। কিন্তু ইস্টবেঙ্গল নিজেদের সংগঠন বজায় রেখে প্রতিটি বিপদ সামলে যায়।
৭১ মিনিটে বাঁদিক দিয়ে এগিয়ে এসে জেসিন টি.কে. থোনিক্কারা শট নিলেও কাইথ তা আটকে দেন।
৮৬ মিনিটে কিয়ান নাসিরি গিরি বক্সের মধ্যে ঘুরে শট নিলেও তা গিলকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারেনি।
স্টপেজ টাইমেও মোহনবাগান গোলের সন্ধানে ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শেষ মুহূর্তে ম্যাকলারেনের প্রচেষ্টা সহজেই নিয়ন্ত্রণে নেন গিল।
১৭তম ডুরান্ড কাপ ইস্টবেঙ্গলের
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত হয়ে যায় ইস্টবেঙ্গলের ৪-১ গোলের ঐতিহাসিক জয়। ১৩৫তম ডুরান্ড কাপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে লাল-হলুদ শিবিরের হাতে ওঠে ঐতিহ্যবাহী ট্রফি।
এই জয়ের ফলে ইস্টবেঙ্গলের ডুরান্ড কাপ জয়ের সংখ্যা দাঁড়াল ১৭—যা তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানের সমান।
কলকাতা ডার্বির ইতিহাসে এমন বড় মঞ্চে এই জয় তাই ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে নিছক একটি ট্রফি জয় নয়; এটি ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একটি স্মরণীয় অধ্যায়।
ব্যক্তিগত পুরস্কার
গোল্ডেন গ্লাভ: বিশাল কাইথ — মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট
গোল্ডেন বুট: আলাউদ্দিন আজারাই — নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি
গোল্ডেন বল: এডমুন্ড লালরিন্দিকা — ইস্টবেঙ্গল এফসি
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যেক পুরস্কারজয়ীকে ৩ লক্ষ টাকার চেক প্রদান করা হয়। পাশাপাশি গোল্ডেন বলজয়ী এডমুন্ড লালরিন্দিকাকে একটি SUV-এর চাবিও দেওয়া হয়।
ম্যাচের ফল
ইস্টবেঙ্গল এফসি — ৪
থ. বিপিন সিং — ১০’
এডমুন্ড লালরিন্দিকা — ১২’, ২২’, ৪৪’
মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট — ১
মনবীর সিং — ৩৩’
১৭টি ডুরান্ড কাপ—মোহনবাগানের সঙ্গে সমান উচ্চতায় ইস্টবেঙ্গল। কলকাতার ফুটবল ইতিহাসে লাল-হলুদের জন্য ২৩ আগস্ট ২০২৬ তাই স্মরণীয় হয়ে রইল।



— অন্তরা ত্রিপাঠী
সম্পাদক, IBG NEWS BANGLA












