ফুটপাতে দুধ ফোটানো থেকে রাষ্ট্রের দায়—দেখতে হবে দুই দিক থেকেই
By ড: ধীরেশ চৌধুরী
সাম্প্রতিক কলকাতার ফুটপাতে এক শিশুর দুধ ফোটানো নিয়ে মাননীয়া মন্ত্রীর একটি মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষিতেই এই লেখা।
একজন সমাজকর্মী হিসেবে সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে সময়ে সময়ে নিজের মতামত জানাই বা লিখি। আমার লেখার সঙ্গে যাঁরা অল্পবিস্তর পরিচিত, তাঁরা জানেন—রাজনৈতিক পক্ষপাত থেকে যতটা সম্ভব মুক্ত থেকেই বিভিন্ন বিষয়কে দেখার চেষ্টা করি। কোনো রাজনৈতিক দলকে তোষামোদ করার দায় বা প্রয়োজন—কোনোটাই আমার নেই।
অনেকেই হয়তো বলবেন, “আপনি আবার কে? আপনার বিশ্লেষণে কী এসে যায়? কে-ই বা আপনার কথা শুনতে বাধ্য?”
একেবারেই ঠিক কথা। কারও শোনার বাধ্যবাধকতা নেই। আবার আমি কিছু না লিখলেও কেউ কেউ হয়তো নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করবেন— “সরকার বদলে গেছে, তাই ধান্দাবাজের মতো চুপ করে গেছেন!”
সেটাও তাঁদের ভাবনা, তাঁদের অধিকার। সেই ধারণা ভাঙার কোনো দায়িত্বও আমার নেই।
তবে বিষয়টিকে আমি অন্তত দুটো দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি।
প্রথম দৃষ্টিকোণটি—যেটি নিয়ে ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যম সরগরম।
“ফুটপাতটা বাচ্চার দুধ ফোটানোর জন্য নয়”—এই বক্তব্যটি নিঃসন্দেহে অনেকের কাছেই কানে লাগার মতো। এবং মানবিক দিক থেকে দেখলে, লাগারই কথা।
একটি শিশুর জন্য দুধ ফোটানো কোনো গর্হিত কাজ নয় যে সেটিকে এমন ভাষায় উল্লেখ করতে হবে। বরং প্রশ্নটা হওয়া উচিত আরও গভীরে।
একটি সমাজ বা রাষ্ট্র যদি এমন ন্যূনতম পরিবেশও নিশ্চিত করতে না পারে, যেখানে একজন মা অন্তত বলতে পারেন— “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”, তাহলে সেই ব্যর্থতার প্রশ্ন তো আমাদের সকলের।
স্বাধীনতার আট দশক পেরিয়ে এসেও যদি কোনো মা-কে সন্তানের দুধ ফোটানোর জন্য ফুটপাতের আশ্রয় নিতে হয়, তাহলে আমাদের উন্নয়নের দাবিগুলোকে একবার নতুন করে প্রশ্ন করা দরকার।
কিসের উন্নয়ন?
কিসের এত বড় বড় ঘোষণা?
কিসের “সবকা বিকাশ”?
যেখানে একজন সহনাগরিকের ন্যূনতম নিরাপত্তা, আশ্রয় ও মর্যাদার নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারিনি, সেখানে শুধু ফুটপাতের নিয়মের কথা বললে তো পুরো ছবিটা দেখা হয় না।
রাষ্ট্রের দায় আছে। সরকারের দায় আছে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায় আছে।
একটি শিশুর দুধ ফোটানোর মতো মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা করতে না পেরে, সেই অসহায়ত্বের প্রকাশকে শুধুমাত্র “ফুটপাতের অনধিকার ব্যবহার” হিসেবে দেখার অধিকার কি আমাদের সত্যিই আছে?
তবে এখানেই বিষয়টির অন্য দিকটিও একই রকম গুরুত্বপূর্ণ।
একটি শহরকে পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও নাগরিকবান্ধব রাখার দায়িত্বও কিন্তু সকলের। ফুটপাত পথচারীর জন্য, শহরের জনপরিসর সবার জন্য—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর সেই ব্যবস্থা কার্যকর করতে গেলে কখনও কখনও কঠোর পদক্ষেপও নিতে হয়।
তাতে কিছু মানুষ বিরাগভাজন হবেন—এটা স্বাভাবিক।
কিছু মানুষ বিষয়টিকে রাজনৈতিক রঙ দেবেন—সেটাও অস্বাভাবিক নয়।
আজকের বিরোধীরা যেমন প্রতিবাদ করছেন, একই পরিস্থিতিতে আগের সরকারের সময় বর্তমান শাসকদলের অনেকেই হয়তো একইভাবে প্রতিবাদ করতেন—এটাও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির খুব পরিচিত বাস্তবতা।
কিন্তু মানবিক হতে হবে বলে সবকিছু মেনে নিতে হবে—এমনটাও নয়।
ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়া দরকার। শহর পরিচ্ছন্ন হওয়া দরকার। নাগরিক শৃঙ্খলা দরকার। প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দরকার।
কিন্তু সেই ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সঙ্গে প্রান্তিক মানুষগুলোর জন্য বিকল্প আশ্রয়, পুনর্বাসন এবং ন্যূনতম মানবিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
কারণ তাঁরাও এই রাজ্যের মানুষ।
তাঁদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান হয়তো আমাদের মতো নয়, কিন্তু মর্যাদার অধিকার তাঁদেরও সমান।
তাই বক্তব্যের উদ্দেশ্য যদি হয় শহরকে পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল রাখা, তাহলে সেই উদ্দেশ্য অবশ্যই সমর্থনযোগ্য। কিন্তু সেই কথাটি বলার ভাষাটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন কথাটি বলছেন একজন মন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধি।
একজন সাধারণ মানুষ যা বলেন, আর একজন জন প্রতিনিধি যা বলেন—তার সামাজিক অভিঘাত এক নয়।
এই ঘটনায় একজন প্রথিতযশা কবির অত্যন্ত মানবিক ও প্রতিবাদী কবিতা দেখলাম। তাঁর ভাষা নিয়ে মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমার নেই। অবশ্যই কুর্নিশযোগ্য।
তবে ব্যক্তিগতভাবে একটা আক্ষেপ থেকেই গেল।
অভয়া-কাণ্ডের সময়ও যদি তাঁর কলম থেকে একই তীব্রতা, একই প্রতিবাদ, একই মানবিকতার ভাষা বেরিয়ে আসত—তাহলে আরও ভালো লাগত।
হয়তো সেই সময় কোনো অজানা কারণে তাঁর কলমের কালি একটু শুকিয়ে গিয়েছিল!
এটা কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। বরং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশার কথা।
কারণ প্রতিবাদেরও তো দল-মত থাকা উচিত নয়। অন্যায়ের রং হয় না।
আর একটা কথা বলতেই হয়—হতাশ লাগলেও এখনও পুরোপুরি হতাশ হচ্ছি না।
কারণ নতুন সরকারকেও তো সময় দিতে হবে। মাত্র তিন মাসের একটি সরকারের কাছ থেকে হয়তো আমরা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি প্রত্যাশা করে ফেলছি। দীর্ঘদিনের সীমাহীন দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং নানা অসঙ্গতিতে আমরা এতটাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম যে পরিবর্তনের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশার মাত্রাটাও অনেক বেড়ে গেছে।
কিন্তু প্রত্যাবর্তন অনেক সময় সহজ; পরিবর্তন কখনওই সহজ নয়।
পরিবর্তন শুধু সরকার বদলানোর নাম নয়।
পরিবর্তন মানে প্রশাসনিক সংস্কৃতি বদলানো।
রাজনৈতিক আচরণ বদলানো।
জবাবদিহি বাড়ানো।
মানুষকে সম্মান করার পদ্ধতি বদলানো।
তাই সেই পরিবর্তনের জন্য কিছুটা সময় দেওয়া অবশ্যই দরকার।
তবে একই গড্ডালিকা প্রবাহে অনেককেই আবার গা ভাসিয়ে দিতে দেখে হতাশা আসবেই।
তবুও— “আশায় মরে চাষা” —সেই আশাতেই বুক বেঁধে আছি।
সময়ই বলবে, সেই আশা কতটা বাস্তবতার মুখ দেখবে।
শেষে শুধু মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি কিংবা ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে একটি কথা—
আপনাদের প্রতিটি কথা, প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গির ওজন আছে।
আপনারা আমাদের মতো সাধারণ “ছাপোষা” মানুষ নন। যে পদগুলো বাইরে থেকে যতটা আকর্ষণীয়, দায়িত্বের দিক থেকে ততটাই ভারী।
তাই সাধারণ মানুষ আবেগের বশে যা বলে ফেলতে পারেন, একজন মন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে সেই একই কথা বলার আগে এক মুহূর্ত থামা দরকার।
কারণ পদ শুধু ক্ষমতা দেয় না—পদ আচরণেরও দায়বদ্ধতা তৈরি করে।
আর সেই দায়বদ্ধতার মধ্যেই থাকে প্রশাসনিক কঠোরতা ও মানবিকতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নেওয়ার আসল পরীক্ষা।
শহর পরিষ্কার চাই।
শৃঙ্খলাও চাই।
কিন্তু তার সঙ্গে মানবিকতাও চাই।
কারণ একটি পরিচ্ছন্ন শহর আমাদের গর্ব হতে পারে, কিন্তু একটি মানবিক শহরই আমাদের সভ্যতার পরিচয়।
©ড: ধীরেশ চৌধুরী।
২২শে আগষ্ট, ২০২৬।
ডঃ ধীরেশ চৌধুরী — বাঁচবো হিলিং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা

মানুষের জীবনে সুস্থতা শুধু শরীরের নয়, মন ও আত্মারও বিষয়। এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক মানবিক উদ্যোগের নাম ‘বাঁচবো হিলিং ফাউন্ডেশন’। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ ধীরেশ চৌধুরী মানুষের জীবন, সুস্থতা ও সামাজিক কল্যাণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন। তাঁর চিন্তাধারায় চিকিৎসা বা নিরাময় কেবল রোগমুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একজন মানুষকে আত্মবিশ্বাস, মানসিক শক্তি ও সুন্দরভাবে বাঁচার প্রেরণা দেওয়াও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সমাজের প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের কাছে স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তাঁর উদ্যোগ একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ‘বাঁচবো’ নামটির মধ্যেই যেন রয়েছে জীবনের প্রতি আস্থা, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং নতুন করে বেঁচে ওঠার প্রত্যয়। ডঃ ধীরেশ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাঁচবো হিলিং ফাউন্ডেশন সেই মানবিক প্রত্যয়কে বাস্তব কর্মযজ্ঞে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে।












