কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক: স্ত্রী, স্বামী ও সামাজিক-আইনি দৃষ্টিভঙ্গি
কৌটিল্য বা চাণক্যের অর্থশাস্ত্র শুধু রাজনীতি, অর্থনীতি, গুপ্তচরনীতি কিংবা যুদ্ধকৌশলের গ্রন্থ নয়। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে বিবাহ, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, যৌন অপরাধ, পারিবারিক অধিকার এবং সামাজিক শৃঙ্খলা নিয়ে বিস্তৃত বিধান। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি; এর সঙ্গে পরিবার, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রের আইন-শাসনকেও যুক্ত করা হয়েছে। (Wikisource)
তবে আধুনিক “হাউসওয়াইফ” বা “extra-marital affair” শব্দগুলিকে সরাসরি প্রাচীন সংস্কৃত পরিভাষার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। অর্থশাস্ত্রে ব্যবহৃত “প্রোষিতপতিকা”, “জার”, “অধিচরণ”, “স্ত্রীসঙ্গ্রহণ” ইত্যাদি শব্দের নির্দিষ্ট সামাজিক ও আইনি প্রেক্ষাপট ছিল।
১. স্বামী অনুপস্থিত থাকলে স্ত্রীর আচরণ সম্পর্কে কৌটিল্য
অর্থশাস্ত্রের চতুর্থ অধিকরণ, দ্বাদশ অধ্যায়ের ৩০–৩৩ নম্বর সূত্রে এমন এক পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, যেখানে স্বামী দীর্ঘ সময়ের জন্য বাইরে অবস্থান করছেন এবং তাঁর স্ত্রী অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছেন।
মূল সংস্কৃত পাঠ:
प्रोषितपतिकां अपचरन्तीं पतिबन्धुः तत्पुरुषो वा सङ्गृह्णीयात्।
सङ्गृहीता पतिं आकाङ्क्षेत।
पतिश्चेत् क्षमेत विसृज्येत उभयम्।
अक्षमायां स्त्रियाः कर्णनासाच्छेदनं, वधं जारश्च प्राप्नुयात्॥ (Wikisource)
বাংলা অনুবাদ
“স্বামী বিদেশে বা দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করছেন—এমন অবস্থায় যে স্ত্রী অনুচিত আচরণে লিপ্ত হয়, তাকে স্বামীর আত্মীয় অথবা তাঁর নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি নিজের তত্ত্বাবধানে নেবে। তত্ত্বাবধানে থাকা সেই নারীকে স্বামীর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা করতে হবে। স্বামী যদি তাকে ক্ষমা করেন, তাহলে উভয়কেই মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু স্বামী যদি ক্ষমা না করেন, তাহলে নারীর জন্য কঠোর শাস্তি এবং তার প্রেমিকের জন্য মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত হবে।” (Wikisource)
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—স্বামী ক্ষমা করলে উভয়কে মুক্তি দেওয়ার বিধান। অর্থাৎ কৌটিল্যের আইনি কাঠামোতে অপরাধের পরিণতি একেবারে যান্ত্রিক ছিল না; স্বামীর ক্ষমা বা অক্ষমার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তবে এই বিধানের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর এবং আজকের মানবাধিকার ও ফৌজদারি আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই এটিকে আধুনিক যুগের জন্য কোনো গ্রহণযোগ্য শাস্তির মডেল হিসেবে দেখা উচিত নয়।
২. শুধু নারী নয়—পুরুষের ভূমিকাও অর্থশাস্ত্রে শাস্তিযোগ্য
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রকে অনেক সময় শুধু “নারীর চরিত্র নিয়ন্ত্রণের গ্রন্থ” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে পাঠটি আরও জটিল। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরুষের অপরাধও স্পষ্টভাবে শাস্তিযোগ্য ছিল।
চতুর্থ অধিকরণের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে:
ब्राह्मण्यां अगुप्तायां क्षत्रियस्य उत्तमः, सर्वस्वं वैश्यस्य, शूद्रः कटाग्निना दह्येत।
सर्वत्र राजभार्यागमने कुम्भीपाकः॥ (Wikisource)
এর অর্থ, নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থান ও পরিস্থিতি অনুসারে অন্যের স্ত্রী বা ব্রাহ্মণ নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষের জন্য বিভিন্ন মাত্রার শাস্তির বিধান ছিল। আর রাজপত্নীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। (Wisdom Library)
এখানে স্পষ্ট যে প্রাচীন রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ককে শুধুমাত্র “স্ত্রীর চরিত্রের সমস্যা” হিসেবে দেখা হয়নি; যে পুরুষ সেই সম্পর্কে প্রবেশ করছে, তার বিরুদ্ধেও আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা ছিল।
৩. “ইচ্ছা” বা সম্মতির বিষয়টিও অর্থশাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ
অর্থশাস্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—এটি সম্মতিসূচক সম্পর্ক এবং জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ককে একইভাবে দেখেনি।
চতুর্থ অধিকরণের দ্বাদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে:
न च प्राकाम्यं अकामायां लभेत्। (Wikisource)
অর্থাৎ, যে নারী অনিচ্ছুক, তার উপর কোনো পুরুষ নিজের যৌন ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে না।
আরও একটি সূত্রে বলা হয়েছে:
न च प्राकाम्यं अकामायां लभेत्। (Wikisource)
অর্থাৎ, নারীর অনিচ্ছা বা অসম্মতিকে উপেক্ষা করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন বৈধ নয়।
চতুর্থ অধিকরণের ত্রয়োদশ অধ্যায়েও সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। (YUMPU)
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে কৌটিল্যের আইনি চিন্তায় যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মতির ধারণা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল না।
৪. বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জন্য “জার” শব্দ
অর্থশাস্ত্রে বিবাহিত নারীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে “জার” (जार) বলা হয়েছে।
উপরের সূত্রে রয়েছে:
अक्षमायां स्त्रियाः कर्णनासाच्छेदनं, वधं जारश्च प्राप्नुयात्॥ (Wikisource)
এখানে জার বলতে সেই পুরুষকে বোঝানো হয়েছে যিনি বিবাহিত নারীর সঙ্গে অবৈধ যৌন সম্পর্কে যুক্ত।
বাংলায় সহজভাবে বলা যায়:
“স্বামী ক্ষমা না করলে সংশ্লিষ্ট নারী ও তার অবৈধ পুরুষসঙ্গী—উভয়ের বিরুদ্ধেই কঠোর শাস্তির বিধান ছিল।”
অর্থাৎ, এই বিধানকে কেবল “স্ত্রীর অপরাধের আইন” হিসেবে পড়া অসম্পূর্ণ হবে।
৫. অর্থশাস্ত্রে নারীকে সম্পূর্ণ অধিকারহীন হিসেবে দেখা হয়েছিল কি?
এখানেও বিষয়টি সরল নয়।
অর্থশাস্ত্রের তৃতীয় অধিকরণে বিবাহ, সম্পত্তি, স্ত্রীধন, বিবাহের ধরন এবং নারীর কিছু অধিকার নিয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে। এমনকি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বামী বা বাগদত্ত পুরুষ দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকলে নারীর পুনর্বিবাহের অধিকার সম্পর্কেও বিধান পাওয়া যায়। (Wikipedia)
অর্থাৎ, কৌটিল্যের সমাজব্যবস্থা ছিল পিতৃতান্ত্রিক, কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি বিশদ আইনি কাঠামোও তৈরি করেছিল যেখানে বিবাহ, বিচ্ছেদসদৃশ পরিস্থিতি, অনুপস্থিত স্বামী এবং নারীর সামাজিক অবস্থানকে নিয়ন্ত্রণ করার নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল।
তাই “চাণক্য নারীদের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন”—এমন সরলীকরণও ঐতিহাসিক পাঠের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৬. স্ত্রী যদি স্বামীর প্রতি অবিশ্বস্ত হন—কৌটিল্যের মূল উদ্বেগ কী?
অর্থশাস্ত্রের বৃহত্তর কাঠামো থেকে দেখা যায়, কৌটিল্যের প্রধান লক্ষ্য ছিল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষা।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন তা—
- বিবাহ ও পারিবারিক চুক্তি ভঙ্গ করে,
- সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট করে,
- অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করে,
- প্রতারণা বা গোপন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়,
- অথবা রাষ্ট্রের নির্ধারিত সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে যায়।
এই কারণে অর্থশাস্ত্রে স্ত্রীসঙ্গ্রহণ, পরস্ত্রীগমন এবং বিভিন্ন ধরনের যৌন অপরাধকে বিচারব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। (University of Kota)
৭. কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য: স্বামীরও দায়িত্ব ছিল
অর্থশাস্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—স্ত্রীর আচরণ নিয়ে আলোচনা করলেও পরিবারকে একতরফাভাবে নারীর দায়িত্ব হিসেবে দেখানো হয়নি।
দীর্ঘ অনুপস্থিত স্বামীর ক্ষেত্রে যে বিধান রয়েছে, সেখানে প্রথমে স্ত্রীকে স্বামীর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে এবং স্বামী ফিরে এসে ক্ষমা করলে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। (Wikisource)
এ থেকে বোঝা যায় যে প্রাচীন আইনি চিন্তায় বিবাহ একটি সামাজিক চুক্তি ও পারস্পরিক সম্পর্ক, শুধু নারীর উপর আরোপিত কোনো একতরফা কর্তব্য নয়।
৮. “চাণক্য বলেছেন—ব্যভিচারিণী স্ত্রীকে হত্যা করতে হবে”—এমন দাবি কি ঠিক?
এ ধরনের বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু সরাসরি “চাণক্য বলেছেন, প্রত্যেক অবিশ্বস্ত স্ত্রীকে হত্যা করতে হবে” বলা সঠিক নয়।
মূল অর্থশাস্ত্রের বিধান পরিস্থিতি অনুযায়ী পৃথক। কোথাও জরিমানা, কোথাও সামাজিক বা শারীরিক শাস্তি, কোথাও পুরুষের জন্য মৃত্যুদণ্ড, আবার কোথাও স্বামীর ক্ষমার সুযোগ রয়েছে। (Wikisource)
বিশেষ করে প্রোষিতপতিকা-সংক্রান্ত ৪.১২.৩০–৩৩ সূত্রটি দেখায় যে স্বামীর ক্ষমা বা অক্ষমা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।
অতএব, জনপ্রিয় “Chanakya quotes” দিয়ে নয়, মূল সংস্কৃত পাঠ এবং অধ্যায়-সূত্র ধরে কৌটিল্যের অবস্থান বিচার করা উচিত।
৯. আধুনিক ভারতের আইনের সঙ্গে এর পার্থক্য
এখানে ইতিহাস ও বর্তমান আইনকে অবশ্যই আলাদা করতে হবে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের Joseph Shine v. Union of India (2018) মামলায় IPC-এর Section 497-কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয় এবং adultery-কে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বাতিল করা হয়। (Sci API)
তবে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বৈবাহিক/দেওয়ানি পরিণতি থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, Hindu Marriage Act, 1955-এর Section 13(1)(i)-তে স্বামী বা স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিবাহবিচ্ছেদের একটি ground হিসেবে অন্য ব্যক্তির সঙ্গে voluntary sexual intercourse-এর কথা বলা হয়েছে। (India Code)
অতএব—
কৌটিল্যের প্রাচীন দণ্ডবিধি ≠ আধুনিক ভারতীয় আইন।
প্রাচীন অর্থশাস্ত্রকে ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রচিন্তার দলিল হিসেবে পড়তে হবে; বর্তমান আইনি অধিকার বা শাস্তি নির্ধারণে সেটিকে সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না।
উপসংহার
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের আলোচনা অত্যন্ত কঠোর এবং সেই সময়ের সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। স্বামীর অনুপস্থিতিতে স্ত্রীর অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক, সেই পুরুষের দায়, নারীর সম্মতি, স্বামীর ক্ষমা এবং রাষ্ট্রের শাস্তি—সবকিছুকে একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মূল সংস্কৃত পাঠ পড়লে দেখা যায় যে কৌটিল্যের দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র “নারীকে শাস্তি দেওয়া” নয়; বরং বিবাহ ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নারী ও পুরুষ উভয়ের আচরণকে আইনের আওতায় আনা।
তবে একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে যে অর্থশাস্ত্রে বর্ণিত কিছু শাস্তি আজকের মানবাধিকার, সংবিধান এবং ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাই কৌটিল্যের বক্তব্যের মূল্য আজ মূলত ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রচিন্তার দৃষ্টিকোণ থেকে—আধুনিক ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্য সরাসরি বিধান হিসেবে নয়।
প্রধান মূল-সূত্র
कौटिलीय अर्थशास्त्र, अधिकरण ४, अध्याय १२, सूत्र ३०–३৩: প্রোষিতপতিকা ও তার অবৈধ সম্পর্কের বিধান। (Wikisource)
कौटिलीय अर्थशास्त्र, अधिकरण ४, अध्याय १३, सूत्र २८–४১: যৌন সম্পর্ক, সম্মতি, পরস্ত্রীগমন এবং সংশ্লিষ্ট দণ্ডবিধান। (Wikisource)
R. Shamasastry-এর Arthashastra সংস্করণ: অর্থশাস্ত্রের ইংরেজি অনুবাদের একটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশিত সংস্করণ; সংস্কৃত মূলের পৃথক সংস্করণও বিদ্যমান। (Internet Archive)
আধুনিক আইনি প্রেক্ষাপট: Joseph Shine v. Union of India (Supreme Court, 2018) এবং Hindu Marriage Act, 1955, Section 13। (Sci API)












