
২৭ নভেম্বর পেল রাষ্ট্রসংঘের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: শিশুবিবাহ রুখতে ভারতের উদ্যোগে বদলাচ্ছে ছবিটা
অন্তরা ত্রিপাঠী | IBG NEWS BANGLA
কলকাতা: শিশুবিবাহের বিরুদ্ধে ভারতের দীর্ঘদিনের লড়াই এবার পেল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। রাষ্ট্রসংঘ ২৭ নভেম্বরকে শিশু, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও জোরপূর্বক বিবাহ নির্মূলের আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভারতের ক্ষেত্রে এই দিনটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, কারণ ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বরই কেন্দ্রীয় সরকার ‘বাল বিবাহ মুক্ত ভারত’ অভিযান শুরু করেছিল।
এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পেছনে নাগরিক সমাজের দীর্ঘ প্রচেষ্টাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। Just Rights for Children (JRC)-এর প্রতিষ্ঠাতা ভুবন রিভু শিশুবিবাহ বন্ধে একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক দিবস ঘোষণার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক স্তরে উদ্যোগ চালিয়ে আসছিলেন। ২০২৬ সালের মার্চে রাষ্ট্রসংঘে বক্তব্য রাখার সময়ও তিনি এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণের আহ্বান জানান।
এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন আসে আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনের ফার্স্ট লেডি ড. ফাতিমা মাদা বায়ো-র কাছ থেকে। পরবর্তীতে ভারত-সহ ৬৭টি দেশের সমর্থনে সিয়েরা লিওন রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি পেশ করে। ৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসংঘ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং ২৭ নভেম্বরকে শিশুবিবাহ নির্মূলের আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
পশ্চিমবঙ্গেও প্রতিরোধে সক্রিয় উদ্যোগ
JRC বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিশু সুরক্ষা নেটওয়ার্ক হিসেবে আইন, জবাবদিহিতা এবং বিভিন্ন স্তরের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুবিবাহ বন্ধে কাজ করছে। ভারতে সংগঠনটির সহযোগী সংস্থাগুলি ৭৮২টি জেলায় সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। এই উদ্যোগে কমিউনিটি, স্কুল, পঞ্চায়েত, মহিলা, ধর্মীয় নেতা, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে ২৩টি জেলায় ১৪টি অংশীদার সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে JRC। সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে রাজ্যে ৩৩,২৬২টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তারা।
এই প্রচেষ্টা দেশজুড়ে বৃহত্তর একটি উদ্যোগের অংশ। JRC-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এ পর্যন্ত ৫.৫ লক্ষেরও বেশি শিশুবিবাহ বন্ধ ও প্রতিরোধ করা হয়েছে।
NFHS-এর পরিসংখ্যানে পশ্চিমবঙ্গে কিছুটা অগ্রগতি
শিশুবিবাহের প্রবণতা কমার একটি চিত্র পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে। ২০১৯–২১ সালের NFHS-5 অনুযায়ী, রাজ্যের ২০–২৪ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে ৪১.৬ শতাংশ ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিবাহিত হয়েছিলেন।
প্রদত্ত NFHS-6 (২০২৩–২৪) তথ্য অনুযায়ী, এই হার কমে ৩৬.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে জাতীয় স্তরে একই সূচক ২০.১ শতাংশ, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে শিশুবিবাহের হার এখনও জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ভারত সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে দেশে শিশুবিবাহের প্রবণতা আরও কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। জাতীয় ও রাজ্য স্তরে ধারাবাহিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের শেষে দেশে শিশুবিবাহের প্রবণতা আরও নীচে নামবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রচেষ্টা ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুবিবাহ নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্যের সঙ্গেও যুক্ত।
ভারত থেকে আন্তর্জাতিক আন্দোলনের বিস্তার
‘বাল বিবাহ মুক্ত ভারত’ অভিযানের অভিজ্ঞতা দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও প্রভাব ফেলছে। JRC-এর উদ্যোগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘Child Marriage Free Nepal’ অভিযান শুরু হয়। পরবর্তীতে এই আন্দোলন ৯৯টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে সংগঠনটির দাবি।
JRC-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ নিজেদের সম্প্রদায় ও দেশে শিশুবিবাহ বন্ধের লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সংগঠনটি ‘Child Marriage Free World’ নামে ১০০ দিনের একটি আন্তর্জাতিক অভিযানও পরিচালনা করে। এর লক্ষ্য ছিল ১০০টি দেশের সরকারকে উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা এবং এক লক্ষ স্কুলে পৌঁছানো।
‘বিশ্ব ভারতের দিকে তাকিয়ে আছে’: ভুবন রিভু
রাষ্ট্রসংঘের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে JRC-এর প্রতিষ্ঠাতা ভুবন রিভু বলেন, শিশুসুরক্ষার ক্ষেত্রে ভারতের উদ্যোগ এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিশু ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্যোগে শুরু হওয়া Child Marriage Free India আন্দোলন পরবর্তীতে সরকারের সমর্থনে বৃহত্তর পরিসর লাভ করে।
তিনি শিশু, সম্প্রদায়ের নেতা, ধর্মীয় নেতা এবং NGO-সহ সমস্ত অংশীদারকে এই সাফল্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে ভারত সরকারের নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের ভূমিকারও প্রশংসা করেন।
রিভুর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রসংঘের এই স্বীকৃতি শিশুবিবাহের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইকে আরও জোরদার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুবিবাহ নির্মূলের লক্ষ্যে সরকারগুলিকে আরও দৃঢ় নেতৃত্ব দেওয়া এবং প্রতিটি শিশুর শিক্ষা, সুরক্ষা ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে।
রাষ্ট্রসংঘের এই সিদ্ধান্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) ৫-এর লক্ষ্য ৫.৩-এর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে শিশুবিবাহ, অকাল বিবাহ ও জোরপূর্বক বিবাহের মতো ক্ষতিকর প্রথা নির্মূলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের পরিসংখ্যান বলছে, অগ্রগতি হয়েছে—কিন্তু পথ এখনও দীর্ঘ। রাষ্ট্রসংঘের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সেই লড়াইকে আরও গতি দেওয়ার পাশাপাশি শিশুবিবাহ নির্মূলের জন্য সরকার, প্রশাসন, সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্বের কথাও সামনে নিয়ে এসেছে।












