ভারতকে বিশ্বের ‘ফুড বাস্কেট’ হিসেবে গড়ে তুলতে ‘টিম এগ্রিকালচার’-এর আহ্বান শিবরাজ সিং চৌহানের
নয়াদিল্লি, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬: দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা, কৃষকদের আয় ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং ভারতীয় কৃষিপণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলিকে দলমত নির্বিশেষে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানালেন কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ এবং গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান।
জাতীয় কৃষি সম্মেলন—রবি অভিযান ২০২৬-এর দ্বিতীয় দিনে বিভিন্ন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন আধিকারিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি ‘টিম এগ্রিকালচার’ বা সমন্বিত কৃষি-দলের ধারণার ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল কেন্দ্র, রাজ্য, কৃষি বিজ্ঞানী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কৃষকদের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা। PIB-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্স কমপ্লেক্সে রবি অভিযান ২০২৬-এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। (Press Information Bureau)
চৌহান বলেন, সরকার ও রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও দেশের কৃষক এবং দেশের স্বার্থ দীর্ঘস্থায়ী। তাই কৃষি উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
১০ রাজ্যের জন্য ১,২০০ কোটির বেশি টাকা অনুমোদন
প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনা (PM-RKVY)-এর আওতায় ১০টি রাজ্যের জন্য মোট ১,২০০ কোটিরও বেশি টাকার আর্থিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যভিত্তিক অনুমোদনের পরিমাণ হল—
- পশ্চিমবঙ্গ: ₹২৯০ কোটি
- হরিয়ানা: ₹১৯৮ কোটি
- ছত্তিশগড়: ₹১৮১ কোটি
- অরুণাচল প্রদেশ: ₹১৫৪ কোটি
- বিহার: ₹১১৪ কোটি
- কর্ণাটক: ₹১০৪ কোটি
- মিজোরাম: ₹৭৫ কোটি
- হিমাচল প্রদেশ: ₹৬৪ কোটি
- ঝাড়খণ্ড: ₹৫৮ কোটি
- পাঞ্জাব: ₹৪৩ কোটি
চৌহান জানান, কেন্দ্রের লক্ষ্য শুধু নীতি তৈরি করা নয়; প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য রাজ্যগুলির কাছে সময়মতো প্রয়োজনীয় অর্থ ও অন্যান্য সম্পদ পৌঁছে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি বৃদ্ধির হার ৪.৫ শতাংশে পৌঁছেছে: কেন্দ্র
কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর দেশে কৃষি খাতের বৃদ্ধির হার ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। তাঁর দাবি, খাদ্যশস্য উৎপাদনের গড় বার্ষিক পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬ সময়কালে রবি শস্য উৎপাদনেও বড় ধরনের বৃদ্ধি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই অগ্রগতির পেছনে কৃষক, কৃষি দফতর এবং বিজ্ঞানীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
রাজ্য ও জেলা স্তরে নিয়মিত ‘কৃষি দল’
কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে মাসিক ভার্চুয়াল পর্যালোচনা বৈঠকের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজ্য স্তরে প্রস্তাবিত ‘রাজ্য কৃষি দল’-এ কৃষিমন্ত্রী, কৃষি সচিব, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ICAR প্রতিষ্ঠান, কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র, ATMA, Farmer Producer Organisation (FPO), প্রগতিশীল কৃষক, প্রক্রিয়াজাতকারী, রপ্তানিকারক এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
জেলা স্তরেও নিয়মিত বৈঠকে জেলা প্রশাসন, কৃষি আধিকারিক, KVK, ICAR বিজ্ঞানী, ব্যাংকার এবং কৃষকদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খরিফ ও রবি মরশুমের আগে নির্দিষ্ট সময়সূচি
কৃষি মরশুম শুরু হওয়ার আগেই প্রস্তুতি ও সমন্বয় নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট বার্ষিক সময়সূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।
খরিফ মরশুমের জন্য:
- ১০ মে — জেলা স্তরের বৈঠক
- ১৭ মে — রাজ্য স্তরের বৈঠক
রবি মরশুমের জন্য:
- ১০ সেপ্টেম্বর — জেলা স্তরের বৈঠক
- ১৭ সেপ্টেম্বর — রাজ্য স্তরের বৈঠক
কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে কৃষি মন্ত্রী, আধিকারিক ও কৃষি বিজ্ঞানীদের অংশগ্রহণে দেশব্যাপী একটি বিশেষ একদিনের সভার পরিকল্পনাও রয়েছে।
২২ অক্টোবর থেকে ‘খেত বাঁচাও অভিযান’
মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ২২ অক্টোবর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী ‘খেত বাঁচাও অভিযান’ চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন চৌহান।
মৃত্তিকা স্বাস্থ্য কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ, মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ এবং উপকারী জীব ও কীটপতঙ্গ রক্ষার বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করার ওপর জোর দেওয়া হবে।
পূর্ব ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে ধান কাটার পর একই জমিতে ডালজাতীয় ফসল চাষ বাড়ানোর জন্যও রাজ্যগুলিকে উদ্যোগী হতে বলা হয়েছে।
রবি মরশুমে মাটি, জল ও ফসল সুরক্ষায় নজর
রবি মরশুমের প্রস্তুতিতে ফসল ও বীজ সংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়ার সময় মাটির আর্দ্রতা এবং জলের প্রাপ্যতা বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি রোগ-পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, যোগ্য কৃষকদের Kisan Credit Card-এর আওতায় আনা এবং প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার অধীনে স্বচ্ছভাবে Crop Cutting Experiment (CCE) পরিচালনার বিষয়েও রাজ্যগুলিকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
নকল সার ও নিম্নমানের বীজের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ
দেশে বীজ ও সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে জানিয়ে চৌহান নকল সার, ভেজাল বীজ এবং নিম্নমানের কীটনাশক বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
কৃষকদের ওপর অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার মতো বাধ্যতামূলক ‘ট্যাগিং’ প্রথা বন্ধ করার কথাও বলা হয়েছে।
কৃষিকে আরও টেকসই ও লাভজনক করার জন্য প্রাকৃতিক কৃষি, সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা এবং ফসলের বৈচিত্র্যকরণের মতো পদ্ধতিকে ‘মিশন মোডে’ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষিপণ্যের জন্য লাভজনক বাজার তৈরির লক্ষ্য
কৃষকরা যাতে তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের আরও ভালো মূল্য পান, সে জন্য উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, বৈজ্ঞানিক গুদামজাতকরণ এবং উন্নত বিপণন পরিকাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চৌহানের বক্তব্য অনুযায়ী, তুর, উরদ এবং মসুর ডাল MSP-তে সরকারি সংগ্রহের আওতায় আনার পাশাপাশি কৃষকদের দ্রুত মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থাও করা হবে।
আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে তৈরি নতুন বাজারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারতীয় কৃষিপণ্য, ফল, শাকসবজি ও খাদ্যশস্যের রপ্তানি বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববাজারে ভারতীয় কৃষির বড় ভূমিকার লক্ষ্য
কেন্দ্রের বক্তব্য অনুযায়ী, কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিপণন এবং রপ্তানি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে ভারতকে আন্তর্জাতিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
এই বৃহত্তর লক্ষ্য বাস্তবায়নে কেন্দ্র, রাজ্য, কৃষক, বিজ্ঞানী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প এবং রপ্তানিকারকদের সমন্বিত উদ্যোগই ‘টিম এগ্রিকালচার’-এর মূল ভিত্তি বলে সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে।
রিপোর্ট: অন্তরা ত্রিপাঠী
এডিটর, IBG NEWS BENGAL


















