চক্ষুর পর পক্ষী নাচে, তাওতো দেখে না
সুরাজ পাল
ধরুন, আপনি ইউটিউবে ‘বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়’ লিখে সার্চ করলেন। শুরুতে আসা ভিডিওগুলো থেকে মেসির কিছু ভিডিও দেখলেন। ইউটিউব অ্যালগরিদম বুঝে নিল, আপনি মেসিকে পছন্দ করেন। এই অবধি ঠিক ছিল, মুশকিল হল, এরপর থেকে ইউটিউব আপনাকে আরও আরও মেসির ভিডিও সাজেস্ট করতে থাকবে। ইউটিউব খুললেই শুরুতেই মেসির খবরাখবর পাবেন। ক্রমে আপনি শুধু মেসির ভিডিওই দেখতে পাবেন, রোনালদো, নেইমার, এমবাপে কিংবা ওজিলের ভিডিও আসবে না। ঠিক একইভাবে, যদি আপনি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতার ভিডিও বা পোস্ট দেখেন, লাইক বা শেয়ার করেন, তখন ফেসবুক, গুগল বা ইউটিউব আপনাকে শুধু সেই দলেরই প্রশংসা এবং প্রতিপক্ষ দলের সমালোচনামূলক ভিডিও ও পোস্ট দেখাবে। এর ফলে আপনি বিরোধী দলের ভালো দিক বা নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ দেখতে পাবেন না। ভাববেন, আপনার দলই সঠিক, সবাই তো তাই-ই বলছে! একইসঙ্গে বিরোধী মতামতকে ভুল বা মিথ্যা ভাবতে শুরু করবেন। এই যে নিজের পছন্দ বা বিশ্বাসের সঙ্গে মিল আছে এমন তথ্যে আটকে যাওয়া এবং নতুন ভিন্ন বা বিপরীত তথ্য না পাওয়া এটাকেই বলে ফিল্টার বাবল।
ফিল্টার বাবলের ধারণাটি প্রথম জনপরিসরে আনেন মার্কিন লেখক ইলি পারিসার। ২০১১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত বই ‘The Filter Bubble: What the Internet Is Hiding from You’। ইলি বলেন, ‘তুমি যদি শুধুমাত্র তোমার পছন্দের তথ্যেই ডুবে থাকো, তাহলে একদিন তোমার জানার দুনিয়া ছোট হয়ে যাবে, আর তুমি বুঝতেও পারবে না তুমি কী হারিয়েছ।’ ইলি কিন্তু শুধু ফিল্টার বাবলের সমস্যাগুলোই তুলে ধরেননি, বরং ব্যাখ্যা করেছেন এর সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মানসিক প্রভাব। তিনি দেখিয়েছেন, ইন্টারনেট কিভাবে আমাদেরকে সংকীর্ণ বাস্তবতার মধ্যে আটকে ফেলে, যেখানে আমরা নিজেদের মতবাদকেই চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নিই। আসলে সব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মই ব্যবহারকারীকে আটকে রাখতে চাই — ব্যবহারকারী সেখানে যত বেশি সময় কাটাবেন, তত বেশি বিজ্ঞাপনের রাজস্ব প্ল্যাটফর্মটির ঘরে ঢুকবে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ক্যাস সানস্টেইন ‘ইকো চেম্বার্স’-এর ধারণা দেন, যা ফিল্টার বাবলের সাথে সম্পর্কিত।
সোশ্যাল মিডিয়া এবং সার্চ ইঞ্জিন অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আমাদের সার্চ হিস্ট্রি, ক্লিক করা লিংক, লাইক, শেয়ার, মন্তব্য সবই বিশ্লেষণ করে, সেই অনুযায়ী পরবর্তীতে তথ্য সরবরাহ করে। আপনি যদি গুগলে ‘সেরা রাজনীতিবিদ’ লিখে সার্চ করেন, তাহলে গুগল আপনার আগের সার্চ ও ব্রাউজিং হিস্ট্রি দেখেই আপনাকে নির্দিষ্ট ধরণের রাজনীতিবিদের তথ্য দেখাবে। আপনার মতের বিপরীত কোনো তথ্য দেখাবে না। মূলকথা, আপনার সামনে শুধুমাত্র সেই তথ্যই আসবে, যা আপনি আগে দেখেছেন এবং পছন্দ করেছেন। এভাবেই আপনি তথ্যের ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে যাবেন। হাসি-মজার ভিডিও দেখলে সেই ধরনের কন্টেন্টই বেশি করে আসবে, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজতত্ত্বের ভিডিও আসবে না।
ফিল্টার বাবলের কারণে যেহেতু মানুষ শুধু একপাক্ষিক তথ্য পায়, ফলে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে; উল্টোদিকে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়ানোও সহজ হয়ে যায়। এটি কেবল ব্যক্তিগত চিন্তাকে প্রভাবিত করে না, তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও বিপজ্জনক। এই যেমন – ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে, ফেসবুকে দুই বিপরীত রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রদর্শিত হয়েছিল। রিপাবলিকানরা এক ধরনের সংবাদ দেখেছে, আর ডেমোক্র্যাটরা অন্য ধরনের। এর ফলে দুই পক্ষের মধ্যে বিভক্তি আরও বেড়ে যায় এবং তারা একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার সুযোগ পায়নি। এতে করে রাজনৈতিক চরমপন্থা ও বিভাজন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। যদি জনগণ একে অপরের মতামত বুঝতেই না পারে, তবে গণতান্ত্রিক আলোচনা ও মতবিনিময় অসম্ভব। আর ভিন্নমত জানার সুযোগ না থাকায় চিন্তার সংকীর্ণতা দেখা যায়, সৃজনশীলতা কমে, অসহিষ্ণুতা ও ধর্মীয় বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিভক্তি বাড়ে, সুসংগঠিত বিতর্কের বদলে অকারণে তর্ক হয়, ঘৃণা বাড়ে কারণ সবাই নিজের মতকেই একমাত্র সত্য মনে করে। মানুষ নিজের বিশ্বাস নিয়ে আরও কঠোর হয়ে পড়ায় যুক্তিপূর্ণ আলোচনার সুযোগ একেবারে কমে যায়।
তাহলে প্রশ্ন আসে ফিল্টার বাবল থেকে বের হব কী করে? প্রথমেই বুঝতে হবে, ইন্টারনেট শুধুমাত্র আপনার পছন্দের জিনিস দেখায়। আর সত্য মোটেও একপাক্ষিক নয়, বরং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়েই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। সুতরাং, শুরুতেই কোনো তথ্যকে সত্য বলে মেনে নেওয়া চলবে না। AltNews, WebQoof, Boom Live, FactChecker.in, The Logical Indian, Snopes, FactCheck.org, এবং BBC Reality Check-এর এর মতো ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট ব্যবহার করা জরুরি। কেবলমাত্র ফেসবুক বা ইউটিউবের সাজেস্ট করা কন্টেন্টের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে বিভিন্ন সংবাদপত্র, ডকুমেন্টারি, গবেষণা প্রতিবেদন এবং বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষদের ফলো করা উচিত। নিজের মতের পাশাপাশি, ভিন্নমতের লোকদের বক্তব্যও সম্মান ও আগ্রহের সঙ্গে শোনা দরকার। প্রয়োজনে ব্রাউজারের ইনকগনিটো মোড বা ভিপিএন ব্যবহার করে সার্চ করা যেতে পারে। জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে, নতুন জ্ঞানে স্নান করতে নতুন নতুন জিনিস শেখার অভ্যাস ও বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট দেখা প্রয়োজন। সবশেষে, নিজের চিন্তার জগৎটিকে খোলা রাখা জরুরি। কোনো সিদ্ধান্তে আসার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত – আমি কি ভিন্নমতের কোনো বিশ্লেষণ পড়েছি বা শুনেছি? তথ্যের বুদবুদে আটকে গেলে ‘সত্য’ আপনার চোখের সামনে পাখি হয়ে তিড়িং-বিড়িং করে নাচলেও, মাথা নিচু থাকায়, দৃষ্টি সংকীর্ণ হওয়ায় আপনি দেখতে পারবেন না।


















