Saturday, September 19, 2026
WA
Home Bangla যখন যুক্তি আঘাত হানে স্বস্তির বলয়ে

যখন যুক্তি আঘাত হানে স্বস্তির বলয়ে

0
34
যখন যুক্তি আঘাত হানে স্বস্তির বলয়ে
যখন যুক্তি আঘাত হানে স্বস্তির বলয়ে

যখন যুক্তি আঘাত হানে স্বস্তির বলয়ে

সুরাজ পাল

মানুষ স্বভাবতই শান্তিপ্রিয়, অথবা বলা ভালো, নিজের তৈরি করা স্বস্তির বলয়ে থাকতে ভালোবাসে। বিতর্ক শব্দটিকে তার বড্ড ভয়। যুগ যুগ ধরে লালন করা বিশ্বাস, ছোটবেলা থেকে শুনে আসা গল্প কিংবা মনের মন্দিরে সযত্নে সাজিয়ে রাখা আরাধ্য দেবতাদের গায়ে সমালোচনার সামান্য আঁচড় লাগলেও সে আহত হয়। ক্রুদ্ধ হয়। আবেগের বশে ভুলে যায়, অন্ধ আনুগত্য শেষ পর্যন্ত চিন্তার বিনাশ ঘটায়। চিন্তার প্রবাহ থেমে গেলে স্থবির জলে শ্যাওলা জমার মতোই প্রশ্নহীন মনে বাসা বাঁধে অনড় কুসংস্কার। অথচ, একমাত্র স্বাস্থ্যকর বিতর্ক আর পাল্টা যুক্তিই পারে প্রকৃত প্রজ্ঞার জন্ম দিতে। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, প্রচলিত আখ্যানের গভীরে ডুব দিয়ে ইতিহাস, পুরাণ ও কিংবদন্তিকে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার দুঃসাহসিক কাজ করেছেন দেবাশিস পাঠক তাঁর ‘পুরোটাই বিতর্কিত’ নামক প্রবন্ধ সংকলনে। ‘উদার আকাশ’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটি কেবলমাত্র কিছু বিতর্কিত বিষয়কে তুলে ধরেই থেমে থাকেনি, বরং এমন সব ব্যাখ্যা হাজির করেছে, যা বহুদিনের লালিত স্বস্তির বলয়কে ভেঙে চুরমার করে দেয়। নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

বইয়ের উৎসর্গপত্রটি সচরাচর আমরা সৌজন্য হিসেবেই দেখি এবং দ্রুত চোখ বুলিয়ে পাতা উল্টে যাই। কিন্তু আলোচ্য বইটির ক্ষেত্রে উৎসর্গপত্রটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর মা, শ্রীমতী শিবানী পাঠককে। মাকে তিনি অভিহিত করেছেন তাঁর ‘পুরাণ ইতিহাসের প্রথম শিক্ষয়িত্রী’ হিসেবে। ছোটবেলায় মায়ের মুখে শোনা গল্প বা পুরাণ কথাই ছিল তাঁর জ্ঞানের প্রথম ভিত্তি। পরিণত বয়সে সেই শিকড়কেই লেখক যুক্তির আলোয় পুনরায় পরীক্ষা করতে চেয়েছেন। যেখান থেকে জ্ঞান আহরণ করেছেন, সেই উৎসকেই তিনি যাচাই করেছেন শাণিত যুক্তির কষ্টিপাথরে। বইটিতে মোট একুশটি প্রবন্ধ রয়েছে। প্রতিটি প্রবন্ধই পুরাণ, ধর্ম, ইতিহাস এবং সমাজতত্ত্বের এমন সব চরিত্র ও বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত, যাদের আমরা হয় দেবতার আসনে বসিয়ে পুজো করেছি, নয়তো খলনায়কের তকমা দিয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছি। লেখক দুই চরমপন্থারই বাইরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি আবেগের বশবর্তী না হয়ে নির্মোহ দৃষ্টিতে সত্যের অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর কলম কখনো ইতিহাসের ধুলো ঝেড়েছে, আবার কখনো পুরাণের অলৌকিকতা সরিয়ে রক্ত-মাংসের বাস্তবতাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে।

বইয়ের একেবারে প্রথম প্রবন্ধটিই চিন্তাজগতে বড়সড় ধাক্কা দেয়। প্রবন্ধের নাম ‘রাবণ’। ছোটবেলা থেকে যে রামায়ণ ভক্তিভরে পাঠ করে এসেছি, লেখক তাকে সম্পূর্ণ অন্য আঙ্গিকে পরিবেশন করেছেন। বাল্মীকির রামায়ণ বা কৃত্তিবাসের শ্রীরামের পাঁচালিতে যা পড়েছি, তার নেপথ্যে থাকা রাজনৈতিক সমীকরণগুলো কি কখনো ভেবে দেখেছি? লেখকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, রামের বনবাস কোনো পারিবারিক ষড়যন্ত্র বা বিমাতা কৈকেয়ীর নিছক ঈর্ষাপ্রসূত ঘটনা ছিল না। এর পেছনে ছিল আর্যাবর্তের ঋষিকুল, বিশেষ করে বশিষ্ঠ ও বিশ্বামিত্রের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চক্রান্ত। প্রশ্ন জাগে, কেন চক্রান্ত? লেখকের মতে, অনার্য রাক্ষসদের দমন করা এবং মুনি-ঋষিদের যজ্ঞের নামে চলা অস্ত্র গবেষণাকে সুরক্ষিত রাখাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। তার চেয়েও বড় লক্ষ্য ছিল, সমুদ্র পেরিয়ে স্বর্ণলঙ্কার বিপুল ঐশ্বর্য ও সম্পদ নিজেদের দখলে আনা। লেখক দেখিয়েছেন, রামচন্দ্র নিজেও গোপন পরিকল্পনার বিষয়ে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন। ‘পিতৃসত্য পালন’-এর মহৎ বুলিটি ছিল আসলে আবরণ। এই অজুহাতে তিনি ঋষিদের সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনাকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছিলেন। রাবণের চরিত্রটিকেও লেখক একরৈখিক হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে রাবণ শুধুমাত্র রাক্ষসরাজ নন, তিনি স্নেহপরায়ণ ভাই এবং প্রেমিক। বোন শূর্পণখার অপমানের প্রতিশোধ নিতেই তিনি সীতাকে অপহরণ করেছিলেন। কিন্তু সীতার প্রতি তাঁর আচরণে কোথাও আসুরিক লাম্পট্য ছিল না, বরং ছিল প্রেমিকের করুণ আর্তি। রামচন্দ্র যখন ভাই লক্ষ্মণকে মুমূর্ষু রাবণের কাছে রাজনীতির পাঠ নিতে পাঠান, তখন সেই ঘটনা আর নিছক শত্রুর প্রতি মহানুভবতা থাকে না। তা হয়ে ওঠে এক যোগ্য প্রতিপক্ষের প্রতি অপর প্রতিপক্ষের বিলম্বিত সম্মান প্রদর্শন।

পুরাণের বিনির্মাণ চলতে থাকে ‘রহস্যবতী সরস্বতী’ প্রবন্ধেও। সরস্বতীকে আমরা শ্বেতশুভ্রা, পবিত্রতার প্রতীক ও বিদ্যার দেবী হিসেবে জানি। কিন্তু লেখক ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে দেখিয়েছেন, বৈদিক যুগে সরস্বতী ছিলেন মূলত প্রাণদায়িনী নদী। সেখান থেকে ধীরে ধীরে উর্বরতা ও শস্যের দেবী এবং পরিশেষে বাগদেবী বা বিদ্যার দেবীতে রূপান্তরিত হলেন। পুরাণ ঘেঁটে দেবীর জন্মের বিবর্তন এবং তা নিয়ে থাকা বিতর্কিত দিকগুলোও লেখক সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। কোথাও বলা হয়েছে দেবী কৃষ্ণের মুখ থেকে সৃষ্টি হয়েছেন, আবার ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে সরস্বতী ব্রহ্মার কন্যা। এমনকি সেখানে পিতা ব্রহ্মার দ্বারা কন্যার যৌন নিগ্রহের শিকার হওয়ার ইঙ্গিতও রয়েছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য, উনিশ শতকের বাবু কালচারের বাংলায় উপপত্নীদের আবাসে বা নিষিদ্ধ পল্লীতে সরস্বতী পুজোর ব্যাপক প্রচলন ছিল। সরস্বতী ছিলেন তথাকথিত বেশ্যা পল্লীর দেবী। লেখকের এধরনের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ চেনা বিদ্যার দেবীর প্রচলিত ধারণাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়।

একই যুক্তির শাণিত প্রয়োগ দেখা যায় ‘জগন্নাথ’ সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলোতে। পুরীর জগন্নাথ দেবকে কেন্দ্র করে বাঙালির আবেগের শেষ নেই। লেখক জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তিকে নিছক হিন্দু দেবতার কাঠামোতে ফেলে বিচার করেননি। তিনি মূর্তির গড়ন ও ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করেছেন। লেখকের মতে, মূর্তির মধ্যে লুকিয়ে আছে আদিবাসী শবর সংস্কৃতি এবং বৌদ্ধধর্মের ‘বুদ্ধ-ধর্ম-সংঘ’-এর প্রতীকী প্রভাব। জগন্নাথের অসম্পূর্ণ হাত-পা আসলে কোনো শিল্পীর অক্ষমতা নয়। লেখকের ব্যাখ্যায়, মূর্তির অসম্পূর্ণতা আসলে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ (ন স্ত্রী, ন পুমান) পরম ব্রহ্মেরই প্রতীক। যা একদিকে সৃষ্টির অপূর্ণতা, অন্যদিকে অসীম সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। ব্রাহ্মণ্যবাদের মোড়কে ঢাকা পড়লেও জগন্নাথ সমন্বয়ী সংস্কৃতির ফসল, লেখক অনবদ্য দক্ষতায় সেইদিকটাও উন্মোচন করেছেন।

গ্রন্থের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী অংশ ‘গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু’ সংক্রান্ত তিনটি লেখা। বাঙালি মানসে শ্রীচৈতন্য মানেই ভাবরসে আপ্লুত দিব্যপুরুষ, যিনি দুহাত তুলে হরিনাম বিলিয়েছেন। কিন্তু লেখক শ্রীচৈতন্যকে কেবলমাত্র ভক্তি আন্দোলনের নেতা হিসেবে দেখেননি। তিনি চৈতন্যদেব চিত্রিত হয়েছেন প্রখর যুক্তিবাদী, গণনায়ক এবং দূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশলবিদ হিসেবে। লেখকের মতে, চৈতন্যদেবের সন্ন্যাস গ্রহণের পর ভারত ভ্রমণ নিছক কোনো তীর্থযাত্রা ছিল না। তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক পরিসর ছিল শূন্য। বহিরাগত শাসকদের দাপটে দেশীয় সংস্কৃতি ও সনাতন সভ্যতা তখন বিপন্ন। এই পরিস্থিতিতে দেশীয় রাজন্যশক্তিকে (যেমন প্রতাপরুদ্র ও কৃষ্ণদেব রায়) জোটবদ্ধ করার সচেতন প্রয়াস ছিল তাঁর ভ্রমণ। নবদ্বীপের কাজি দলনের ঘটনাটিকেও লেখক ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেছেন। তাঁর মতে, এটি ছিল পরবর্তীকালে গান্ধীজির অহিংস আইন অমান্য আন্দোলনের সার্থক পূর্বসূরি বা মহড়া। সংকীৰ্তনের মাধ্যমে যে গণজাগরণ চৈতন্যদেব সৃষ্টি করেছিলেন, তা ছিল সমকালীন শাসকের বিরুদ্ধে নীরব বিপ্লব। লেখকের সবচেয়ে সাহসী বিশ্লেষণটি পাওয়া যায় মহাপ্রভুর অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে। পুরীর মন্দিরে জগন্নাথের বিগ্রহে বিলীন হয়ে যাওয়ার অলৌকিক তত্ত্বে বিশ্বাসী ভক্তদের কাছে লেখকের যুক্তি বজ্রপাতের মতো মনে হতে পারে। লেখক তথ্য ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে বলেছেন, মহাপ্রভুর মৃত্যু স্বাভাবিক বা অলৌকিক ছিল না, তা ছিল পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। উৎকলের সিংহাসনের লোভে উচ্চাভিলাষী সেনাপতি গোবিন্দ বিদ্যাধরই জঘন্য ষড়যন্ত্রের মূলে ছিলেন। ১৫৩৩ সালের ২৯ জুন, মন্দিরের দরজা টানা সাত ঘণ্টা বন্ধ রাখা হয়েছিল। অভিযোগ, সেই রুদ্ধদ্বার কক্ষেই চৈতন্যদেব ও তাঁর তিন পার্ষদকে হত্যা করা হয়। জনরোষ এড়াতে তাঁদের মরদেহ মন্দিরের উত্তর দিকের ‘শ্মশান দ্বার’-এর নিচে গোপনে সমাধিস্থ করা হয়।

পুরাণ ও মধ্যযুগ পেরিয়ে লেখক যখন আধুনিক যুগের আইকনদের বিশ্লেষণ করতে বসেন, তখনও তাঁর যুক্তির ধার বিন্দুমাত্র কমে না। ‘সুভাষচন্দ্র’ প্রবন্ধে তিনি নেতাজির অতিমানবীয় ভাবমূর্তির আড়ালে থাকা রক্ত-মাংসের মানুষটিকে খুঁজেছেন। সুভাষচন্দ্র ছোটবেলা থেকেই শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের ভাবাদর্শে বড় হয়েছেন। ‘কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগ’-এর মন্ত্র ছিল তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা। কিন্তু তিনি তো মানুষ! তাই তাঁর জীবনে যখন এমিলি শেঙ্কেলের আগমন ঘটে, তখন শুরু হয় গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। লেখক দেখিয়েছেন, সুভাষের প্রেম ও পরিণয় কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। এটি ছিল তাঁর নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে নিজের মানবিক সত্তার সংঘাত। সুভাষচন্দ্রের আত্মজীবনী ‘অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম’ এবং তাঁর ব্যক্তিগত চিঠিপত্রকে হাতিয়ার করে লেখক প্রমাণ করেছেন, সুভাষ তাঁর জীবনের একটা পর্বে এসে যৌনতাকে জোর করে দমন করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জীবনের পূর্ণতার জন্য প্রেমের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এমিলির প্রতি তাঁর ভালোবাসা তাঁকে দুর্বল করেনি, বরং তাঁকে আরও মানবিক করে তুলেছিল। একইভাবে ‘সারদামণি’ প্রবন্ধে লেখক শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সারদামণির দাম্পত্যের মানবিক ও যুক্তিবাদী চিত্র এঁকেছেন। তাঁদের সম্পর্ক কেবল আধ্যাত্মিক ছিল না, ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধারও। তৎকালীন সমাজের কুসংস্কার (যেমন বারবেলা) এবং শাস্ত্রীয় গোঁড়ামির (যেমন ঋতুকালীন অশুচিতা) ঊর্ধ্বে উঠে সারদামণি যে যুক্তিবাদী মনের পরিচয় দিয়েছিলেন, লেখক তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

লেখক প্রতিটি যুক্তির স্বপক্ষে তথ্য, শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি এবং ঐতিহাসিক দলিল পেশ করেছেন। রামায়ণের সংস্কৃত শ্লোক থেকে শুরু করে ওড়িশার মাদলা পঞ্জি বা সুভাষচন্দ্রের গোপন চিঠি, লেখকের বিচরণ সর্বত্র। তিনি দক্ষ আইনজীবীর মতো কেস সাজিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বিষয়গুলো অত্যন্ত জটিল ও ভারি হলেও লেখকের ভাষা প্রাঞ্জল। সাংবাদিকের মতো ছোট ছোট বাক্যে তিনি বক্তব্য পেশ করেছেন, যা মনে গেঁথে যায়। কোথাও অহেতুক পাণ্ডিত্য জাহির করার চেষ্টা নেই। ফলে সাধারণ পাঠকও ইতিহাসের জটিল অলিগলি দিয়ে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খান না। অবশ্য ‘পুরোটাই বিতর্কিত’ নামটি নিয়ে খানিকটা আলোচনার অবকাশ থাকে। শিরোনাম শুনে মনে হতে পারে, লেখক বুঝি কেবল বিতর্ক সৃষ্টি করার জন্যই কলম ধরেছেন। অথচ, বইটি পড়লে বোঝা যায়, মূল উদ্দেশ্য বিতর্ক নয়, বরং বিতর্কের ধোঁয়াশা সরিয়ে যুক্তি প্রতিষ্ঠা করা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, যেমন শ্রীচৈতন্যের হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে, অকাট্য প্রমাণের চেয়ে লেখকের বলিষ্ঠ অনুমানই প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে। যদিও সেই অনুমান এতটাই যৌক্তিক বিন্যাসে সাজানো যে, তা মূল স্রোতের ইতিহাসকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে যাচ্ছি। চারপাশের অসহিষ্ণুতার পরিবেশে ইতিহাস ও পুরাণকে বিকৃত করে অন্ধবিশ্বাস ও বিদ্বেষের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এরকম দুঃসময়ে দেবাশিস পাঠকের বইটি এক ঝলক শুদ্ধ বাতাসের মতো। তাঁর লেখাগুলো শেখায়, ভক্তি বা শ্রদ্ধা যেন কখনোই যুক্তির পথরোধ না করে। বইটি আমাদের পূর্বপুরুষদের, আমাদের আরাধ্য দেবতাদের এবং আমাদের জাতীয় নায়কদের দেবতা বা শয়তানের ছাঁচে না ফেলে, মানুষ হিসেবে বিচার করতে শেখায়। তাঁদের দোষ-গুণ, ভুল-ত্রুটি সমেত গ্রহণ করতে শেখায়। যাঁরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পান না, যাঁরা অন্ধবিশ্বাসের শিকল ভাঙতে চান, তাদের সংগ্রহে অবশ্যই বইটি থাকা প্রয়োজন। কারণ, দিনশেষে যুক্তিই মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, আর বইটি সেই হাতিয়ারেই শান দেয়।

পুরোটাই বিতর্কিত। দেবাশিস পাঠক। প্রথম প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি, ২০২৪। প্রকাশক: উদার আকাশ। ঠিকানা: ঘটকপুকুর, ভাঙড়, গোবিন্দপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। যোগাযোগ: ৭০০৩৮২১২৯৮। মূল্য: ৩৫০ টাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights