
ডব্লিউটিও-তে অষ্টম বাণিজ্য নীতি পর্যালোচনা সফলভাবে সম্পন্ন করল ভারত, স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত
অন্তরা ত্রিপাঠী
ম্যানেজিং এডিটর, আইবিজি নিউজ
জেনেভা, ২৩ জুলাই, ২০২৬: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)-র সদর দপ্তর জেনেভায় ভারতের অষ্টম ট্রেড পলিসি রিভিউ (Trade Policy Review – TPR) সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই পর্যালোচনার মাধ্যমে ভারত আবারও একটি উন্মুক্ত, স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য এবং WTO-সঙ্গতিপূর্ণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ভারতের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগরওয়াল। তিনি সমাপনী বক্তব্যে WTO-র সদস্য দেশগুলির সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ভারতের বাণিজ্য নীতির প্রতি গভীর আগ্রহের জন্য ধন্যবাদ জানান।
৬৮টি দেশের অংশগ্রহণ
ভারতের ট্রেড পলিসি রিভিউতে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া দেখা যায়।
- ৬৮টি WTO সদস্য দেশ আলোচনায় অংশগ্রহণ করে।
- ৪৪টি সদস্য দেশ ভারতের বাণিজ্য নীতি সম্পর্কে মোট ১,০৯৪টি লিখিত প্রশ্ন জমা দেয়।
- পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২১ ও ২৩ জুলাই, ২০২৬।
এই বিপুল অংশগ্রহণ ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে তার বাড়তে থাকা ভূমিকার প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ভারতের গুরুত্ব বৃদ্ধি
সমাপনী বক্তব্যে রাজেশ আগরওয়াল বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। শুল্ক সংস্কার, কাস্টমস আধুনিকীকরণ এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) সম্প্রসারণ ভারতের বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে ভারত শুধু একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিই নয়, বরং বিশ্বব্যাপী চাহিদা বৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছে।
ভারতের সংস্কার কর্মসূচির প্রশংসা
পর্যালোচনায় অংশগ্রহণকারী একাধিক সদস্য দেশ ভারতের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—
- ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার
- কাস্টমস ও ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন আধুনিকীকরণ
- স্টার্টআপ ও উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম
- আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির সম্প্রসারণ
- ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME)-কে বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ
- WTO-র Agreement on Fisheries Subsidies গ্রহণ
সদস্য দেশগুলির মতে, এই পদক্ষেপগুলি ভারতের বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় ভূমিকা আরও শক্তিশালী করেছে।
উন্নয়ন ও বাণিজ্যের মধ্যে ভারসাম্য
সদস্য দেশগুলির প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্য সচিব বলেন, ভারতের বাণিজ্য নীতি WTO-র নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও দেশের উন্নয়নমূলক প্রয়োজনকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, কৃষিক্ষেত্রে শুল্ক কাঠামো লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জীবিকা রক্ষার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে শিল্পক্ষেত্রে শুল্ক নীতি সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার লক্ষ্যে প্রণীত।
স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলার প্রতিশ্রুতি
ভারত স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং ট্রেড রেমেডি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, অংশীদারদের সঙ্গে পরামর্শ এবং WTO-র নিয়ম মেনে চলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
রাজেশ আগরওয়াল জানান, ভারতের Quality Control Orders (QCOs) জনস্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত এবং অ্যান্টি-ডাম্পিংসহ অন্যান্য তদন্ত নিরপেক্ষ প্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া এবং বিচারিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর
ভারত পর্যালোচনায় আরও তুলে ধরেছে—
- টেকসই উন্নয়ন
- নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন
- ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার
- মেধাস্বত্ব (Intellectual Property) সংস্কার
- পরিষেবা বাণিজ্য
- বিনিয়োগ সহজীকরণ
- Ease of Doing Business
- আর্থিক অন্তর্ভুক্তি
- লজিস্টিকস আধুনিকীকরণ
- পরিবেশগত স্থায়িত্ব
সরকারের মতে, এই উদ্যোগগুলি একটি উদ্ভাবন-নির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
WTO সংস্কারে ভারতের অবস্থান
ভারত আবারও একটি উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ এবং নিয়মভিত্তিক বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
বাণিজ্য সচিব বলেন, WTO সংস্কার এমন হতে হবে যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলির নীতিগত স্বাধীনতা বজায় থাকে, সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পায় এবং বিদ্যমান অঙ্গীকারগুলি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়।
ভারতের ভূমিকায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
এই পর্যালোচনার ডিসকাশ্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত গিলহার্মে দে আগুইয়ার প্যাট্রিওটা মন্তব্য করেন, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে বহু সদস্য দেশ আশা করছে যে ভারত ভবিষ্যতেও সংলাপ, ঐকমত্য ও সহযোগিতার সেতুবন্ধনকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তিনি ভারতের গ্লোবাল সাউথের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকারও প্রশংসা করেন।
অন্যদিকে, সামোয়ার রাষ্ট্রদূত নেলা পেপে টাভিটা-লেভি, যিনি ট্রেড পলিসি রিভিউ বডির চেয়ারপার্সন ছিলেন, বলেন যে WTO-র সদস্য দেশগুলি ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে তার বাড়তে থাকা অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর বার্তা
পর্যালোচনার শেষে রাজেশ আগরওয়াল ভারতের প্রাচীন দর্শন ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ (সমগ্র বিশ্ব এক পরিবার)-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, ভারত ভবিষ্যতেও WTO-র সব সদস্য দেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সমবণ্টিত সমৃদ্ধি, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
ভারতের অষ্টম ট্রেড পলিসি রিভিউর সফল সমাপ্তি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় দেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে আরও একবার তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে যে ভবিষ্যতের নিয়মভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং শক্তিশালী বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার নির্মাণে ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে বিশ্ব।














