বিট্টু মহারাজ… এবং
ড: রঘুপতি ষড়ঙ্গী
এক নবাগত অতিথি আসিল। না, ‘আসিল’ বলিলে কিয়দংশে ভুল হইবে, স্বেচ্ছায় আনা হইল বলাই যথার্থ হইবে। স্বেচ্ছা-তাড়িত বস্তু মাত্রই মূল্যবান হয়। তাই, এ ক্ষেত্রেও তাহার বিক্ষেপন ঘটিবার যো নাই। আর, ইহাই স্বাভাবিক ও।
দশ-বিধ সংস্কারের অন্যতম, সেই নামকরণ হইল।স্নেহভারে নুব্জ পিতামহ নাম রাখিলেন…. ‘বিট্টু’।
পিতামহি সম্বল সংসারে কাজ বাড়িল। আনন্দের আতিসহ্যে উনার পদযুগল প্রায়শই ক্ষত-বিক্ষত হইতে লাগিল। শাড়ি’র প্রান্ত ছিঁড়িল। তথাপি
মাতৃস্তনে কামড় পড়িলে যেমন সন্তানে প্রীতি বর্ধিত হয়…. এক্ষেত্রে ও একপ্রকার তাহাই হইল। পিতামহের আপিস যাত্রার পূর্বে, নির্ধারিত কর্মে কিঞ্চিৎ বিঘ্ন ও ঘটিয়া থাকে এখন। আপিস হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া সহাস্যে, ইঙ্গিত পূর্ণ কৌশলে কখনো সখনো কিছু কহিলেও, গমনকালে কদাচ নয়। এই গৃহে পদার্পনের তিন-দশক কালেও গৃহকর্ত্রী’র যে ভ্রম হয় নাই, ইহকালে মধ্যে-মধ্যেই সেই ভ্রম হয়। গৃহকর্তা সবই বুঝিতে পারিয়া নিজমুখে বলেন, “কী …. আর করা যাইবে, ভ্রম- প্রমাদ বিপ্রলিপ্সা আদি কলিযুগের বৈশিষ্ঠ্য।
মনে মনে ভাবেন, নিঃসঙ্গ অবলা এতদিনে বুঝি সচল সবলা হইল! যথা-সময়ে, জল-পাত্র সাথে দিতে ভুল হইলেও মহোদয়ের দয়ায়, বোধ হইতেছে, মধুমেহ’র ঔষধ এবার কম কিনিলে হইবে! ইহাই বা কম কীসে ! ব্যবস্থাপত্র হইতে একটি ঔষধ কমিলেই কেরানীর মাস পিছু ছয় শত টাকার সাশ্রয় !
দিন-রাত, সব সূর্য-ঘড়ির নিয়মেই বেশ চলিতে ছিল।বাদ সাধিল, একদিন প্রত্যূষে কর্ত্রী’র নিদ্রাভঙ্গ।
সহসা চোখে পড়িল, কাগজ হস্তে কর্তা-মহাশয় পরিত্যক্ত মল ফেলিয়া…… ‘লাইফবয়’ সহযোগে হস্ত-পদ প্রক্ষালন করিয়াই সিংহ-দ্বার দিয়া হনহন্ করিয়া গৃহাভিমুখে আসিতেছেন। সহসা যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হইল !
সবিনয়ে কর্তা কহিলেন, ” আহা, শিশু… কী না !” ” রাখিয়া দাও তোমার এই সুবিধাবাদী শিশু-তত্ব।
গৃহে থাকিলে, গৃহ-দেবতার অনুশাষণ মানিয়া চলিতে হয়। নিজেরই হউক, পৌত্রে’র হউক… কী বা আইসে যায়? পত্রপাঠ গাত্র ধৌত করিয়া গৃহ-প্রবেশে আজ্ঞা হউক।”
রাগতঃস্বরে কথাকটি কহিয়াই সেই দিনের মতো প্রবীনা’র প্রস্থান হইল ঠিকই, কিন্তু ইহা যে বর্তমানে কর্তার নির্ধারিত কর্মের তালিকাতে অঙ্গীভূত হইয়া গিয়াছে !
শিশুটিকে যে কালে গো-দুগ্ধ পান করান, পক্ক-কদলিও ভক্ষণ করান, সশব্দে গর্জর অথবা গবাক্ষ চর্বনের অব্যবহিত পরেই হরষিত মনে মৎস বা মাংস গ্রহণ করিতে দেখিয়া রস-সিক্ত চিত্তে উল্লাসে মত্ত হন যিনি, বর্জ্য-বস্তুর কথাতে তাঁহার এতো অনীহা কেন ? জিজ্ঞাসা করিবার যো কদাচ নাস্তি। করিলেই……”পঞ্চ-মুখে হরিনাম গান ত্রিপুরারী”।
সে যাহা হউক, এ মত বিস্তারিত বিষয়ে প্রবেশের পূর্বে মহারাজ এর ক্ষুদ্র পরিচয় একটি জানিয়া রাখা বুঝি সমীচীন হইবে। বিট্টু মহারাজ। নামে কিঞ্চিৎ সাদৃশ্য থাকিলেও ইনি কিন্তু লাট্টু মহারাজ এর কেহ নহেন। আবার, কোনো সাদৃশ্য নাই কহা টাও নিতান্তই সঠিক নহে। মাতৃ-বিয়োগের পরক্ষনেই জীবন গতিতে পরিবর্তন আসিয়াছিল,উভয়ের। প্রথম জনের বিহারের ছাপরা হইতে সর্বসান্ত আপন খুল্ল-তাত এর হস্ত ধরিয়া কলিকাতা আগমন হইয়াছিল। দ্বিতীয় জন, ঠিক খুল্ল-তাত নহে, তবে পিতৃতুল্য এক যুবার আবেগে আশ্রয় করিয়া অজানা পথ-শত্রুদের হইতে জীবন পাইয়া তাঁহারই গৃহে হইল ঠাঁই।
বৈসাদৃশ্যের ও অভাব নাই। লাট্টু মহারাজ কদাচ দরজার অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতেন না। বিট্টু ভ্রম-বসেও দরজা অতিক্রম করিয়া বহির্মুখী হয় না। কন্বমুনি সদৃশ এই পালক-পিতার চক্ষুর অন্তরালে যাইবার কদাচ সুযোগ মাত্র ও তার নাই।
বিট্টু বাক্য স্ফূরণ আরম্ভ হইল। প্রারম্ভে ইহা কেবল পালক-পিতা বুঝিতে সমর্থ হইলেও ধীরে-ধীরে তাহা অন্যের ও বোধগম্য হইতে লাগিল। শ্রূত হয়, বিহারী লাট্টু’র ক্ষেত্রেও নাকি ইহাই হইয়াছিল। ভাষা-গত তারতম্যে কিয়ৎকাল আশ্রম জুড়িয়া হাস্য-রোল উঠিত।
কাল কদাচ কাহারো তরে স্থির নহে। বিট্টু শিশু হইতে কৈশোরে পদার্পণ করিল। পালক-পিতাও পৌগন্ড হইতে পূর্ণ যৌবনে প্রবেশ করিলেন।
পিতামহ-পিতামহীর আর কালমাত্র বিলম্ব সহে না। বৃদ্ধকালে, কোন ক্ষণে কাহার কী অঘটন ঘটিয়া যায় ! পৌত্র-বধূ দর্শনে চক্ষু পবিত্র করিবার অদম্য উৎসাহ কিনা। হইতে পারে, এই কারণেই কেবল স্বল্প আয়াশেই সু-দিনে, সুলক্ষণা কে বরণ করা হইল।
বিট্টুর কপালে…. সুখ আর সাচ্ছ্বন্দ্য এই দুই ই দিনে দিনে বর্ধিত হইতে লাগিল। মাতৃত্বের কোমল আস্বাদনে দুষ্ট চাহনি আর বিরামহীন লম্ফ-ঝম্ফ। একপ্রকার, তাঁহার বাহুপার্শ্বেই কাটিয়া যাইতে লাগিল তাহার দিবা-রাত্র। সন্তান-অভিলাসীনির সহিত মাতা-অভিলাসীর এই মিলন দৃশ্য নিতান্তই দূর্লভ। দিনান্তে একটিবার হইলেও হয়ত বা তাহার অনুভূত হইত, পিতা তাহার ‘পালক’ হইলেও হইতে পারেন, এ মাতা তাহার জন্মদাতাই। কিন্তু, ইহা কী কদাপি ভুলিয়া যাইতে আছে, সুখ বা দুঃখ কোনটাই কাহারো জীবনে “তৈল-ধারাবৎ অবিচ্ছিন্ন” হইতে পারে না?
প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে, বৎসরান্তে, নব্য-মাতা সন্তান-সম্ভাবা হইয়া উঠিলেন। তিন- চার মাস গত হইলে, পিতা-মাতা- বদ্যি আদি গুরুজনদের কঠোর বাধায়, অদ্যাবধি মাতা-পুত্রের মধ্যকার কঠিন-বন্ধন সাময়িক হইলেও কিঞ্চিৎ শিথিল হইতে বাধ্য হইল। উপায়ান্তর না দেখিয়া, মাতা নিজ মনকে প্রবোধ দান করিলেও অপত্যে তাহা বুঝিবে কি প্রকারে?
দশম্ মাসের দশ দিন অতিক্রান্ত হইতে না হইতেই প্রসব যন্ত্রণা উঠিল। মাতৃ-যন্ত্রণা কী, কেন, সম্যক অনুধাবন না করিতে পারিবার কারণেই হয়ত, অনশনে থাকিয়া, কেবল মাতৃ মুখ দর্শণেই কালাতিপাত করিতে লাগিল মহারাজ।
মধ্যনিশায় অগত্যা মা’কে স্থানান্তরিত করা হইল বদ্যিখানায়। বিট্টু নিশ্চুপে তাকাইয়া দেখিল সব।
দীর্ঘ এক শ্বাস ছাড়িল। কহিল না কিছু। পরিশেষে, গুটি-গুটি পায়ে অন্তর্মুখী হইয়া ঈশান কোনে গৃহ-দেবতার বন্ধ-ফটকের সামনে মাথা মুড়িয়া সেই যে বসিল…. আর মুখ তুলিল না।
প্রভাতে সংবাদ আসিল, যথাসময়ে সন্তান জন্ম লইয়াছে। মা এবং সন্তান উভয়েই এখন নিরাপদ।
সারা পরিবারে হৈ-চৈ পড়িল। মাতা-পিতার নির্দেশক্রমে সদ্য-পিতা, বিপ্লববাবু ব্যক্তিগত শকটের সম্মুখের আসনে বিট্টুকে বসাইয়া সন্তান দর্শনে
রওনা হইলেন। স্বচ্ছ কাঁচের ভিতর দিয়া ……
কুঠুরি-মধ্যস্থ, মাতৃ-ক্রোঢ়ে শায়িত কিছু দেখিয়া মহারাজ এর মন কিয়দংশে প্রসন্নই হইল বা।
জ্যেষ্ঠ-পুত্র দর্শনে এলোকেশী মা ও খুশি হইলেন।
প্রহর কাল অতিক্রান্ত হইলে, পূর্ববৎ আসনে বসিয়া ঘাড় ঘুরাইয়া পথের দুই-দিক দেখিতে দেখিতে পিতা-পুত্র গৃহে ফিরিল। নাম-মাত্র শুভ-সংবাদ পরিবেশন করিয়াই মহারাজকে খাওয়াইবার তোড়জোড় পড়িল। বিট্টুবাবু ও পরম্পরা মতোই,আহ্লাদিত হইয়া, প্রদত্ত সামগ্রী সবই সানন্দে গ্রহন
করিয়া নিদ্রায় গেলে….সবার মন হইতেই উদ্বেগ কমিল, শান্তি আসিল।
এক্ষনে…. খাইতে বসিয়া, মাতা-ঠাকুরাণীর গৃহে প্রত্যাবর্তন, নব্য-সদস্যের নামকরণ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে পর্যালোচনা ও রঙ্গ-রসিকতা চলিতে লাগিল গৃহ সদস্যদের মধ্যে, বেশ কিছুক্ষণ ধরিয়া। নিদ্রা যাইতে দেরি হইল সবার।
পরদিন প্রভাত হইল। গৃহের মুখ্য-দ্বার খুলিল। বিট্টু-মহারাজ নিত্যদিনের মতো প্রাতঃকালীন কর্মে সেই যে বাহির হইল আর ফিরিল না। আজ ও না……..|

Dr. Raghupati Sharangi, a renowned homeopath and humanitarian who lives for the people’s cause. He is also a member of the Editor panel of IBG NEWS. His multi-sector study and knowledge have shown lights on many fronts.















