বর্তমান অস্থির বিশ্বে রাখিবন্ধনের তাৎপর্য ও অজানা ইতিহাস।
আজ রাখি, কল্পনা করছিলাম, যদি আজ আফগান নারীরা রাখি পরিয়ে হিংস্র তালিবানভাইদের বরণ করে নিয়ে তাদের শান্ত ও মৈত্রীর বার্তা দিতে পারতেন। কি ভালোই না হত। কিন্ত তা হবার নয় আমরা জানি, হয়তো আজই এই পবিত্র দিনে ঘটে যেতে পারে, আফগান মহিলাদের উপর কড়া ইসলামিক শাসন। ধর্ষিত লাঞ্ছিত হতে পারেন আফগান মহিলারা। হিংস্র তালিবানেরা নির্বিচারে গুলি করে মেরে দিতে পারে আফগান বা অন্য কোনো দেশের শিশু, মহিলা ও পুরুষদের। তবুও সংস্কৃতির পরম্পরা অনুযায়ী আজ হবে রাখিবন্ধন উৎসব।
রাখিবন্ধন সৌভ্রাতৃত্বের উত্সব। রাখিবন্ধন উত্সবের কথা রয়েছে হিন্দু পুরাণেও। পূরাণ মতে দেব-দেবীরাও রাখি বাঁধতেন বলে জানা যায়। এই রাখিকে আসলে শুভ শক্তির প্রতিক হিসাবে মনে করা হয়। দীর্ঘ দিন ধরেই এই রাখি বাঁধার রীতি চলে আসছে। যুদ্ধে যাওয়ার আগেও রাখি বাঁধা হত। পুরুর রাজ্য আক্রমণের আগে আলেকজান্ডারের স্ত্রী পুরুকে রাখি পাঠিয়েছিলেন। হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ব বাড়াতে রাখি উৎসব করেন বিশ্বকবি। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে তিনি এই উৎসব করেন।
১৯০৫-এর ১৯ জুলাই। ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ঘোষণা করলেন। অবিভক্ত বাংলাকে শোষণ করা সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল ক্রমশ। তাই প্রশাসনিক কারণে ইংরেজ শাসকরা ঠিক করলেন, ধর্মের ওপর ভিত্তি করে ভাগ করা হবে বাংলাকে। হিন্দু জনসংখ্যার আধিক্যযুক্ত অঞ্চল আলাদা করা হবে মুসলিম অধ্যুষিত বাংলা থেকে। বাংলার মুসলিমদের এমন মগজ ধোলাই ততক্ষণে হয়ে গেছে, তাঁরা প্রায় খুশি মনেই মেনে নিয়েছেন প্রস্তাব।
তখনকার অবিভক্ত বাংলা মানে কিন্তু বাংলা, বিহার, আসাম, শ্রীহট্ট সবটা মিলে। তত দিনে ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে বাংলা। ইংরেজদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাকে ভাগ করে দিয়ে বিদ্রোহের গতি কমিয়ে আনা। অতএব পাশ হয়ে গেল বঙ্গ ভঙ্গের প্রস্তাব। তখন শ্রাবণ মাস। ১৬ আগস্ট। কাকতালীয় ভাবে সেটা ছিল রাখি পূর্ণিমা। হিন্দু ঘরের মেয়েরা তাদের ভাই-এর হাতে পরাবে রাখি। অন্যরকম রাখি বন্ধনের কথা মাথায় এল রবীন্দ্রনাথের। ভাই-বোনের নয়, রাখিবন্ধন হয়ে উঠল হিন্দু-মুসলিমের সম্প্রীতি উৎসব। এ ধর্মের মানুষ ভালোবেসে জড়িয়ে ধরে হাতে রাখি পরিয়ে দিচ্ছে যার হাতে, তার ধর্ম আলাদা। হাতে হাত রেখে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হল প্রতীকী প্রতিবাদ। একটা মানুষের ডাকে ধর্ম নির্বিশেষে সারা বাংলা এক হয়েছিল সে দিন। প্রতিবাদের ভাষা, চরিত্র বদলেছে ক্রমশ। দীর্ঘ ৬ বছর পর ১৯১১ সালে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ রদ করে দেন বাংলা ভাগের প্রস্তাব।
পুরাণমতে, একবার দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের প্রচণ্ড যুদ্ধের সময় দেবরাজ ইন্দ্রের স্ত্রী ইন্দ্রাণী তাঁকে সব অশুভ শক্তির থেকে রক্ষা করার জন্য হাতে একটি রেশমের সুতো বেঁধে দেন। পুরাণে আরও রয়েছে যে শ্রীবিষ্ণু রাক্ষস রাজা বালিকে আশীর্বাদ করেন যে তিনি বালির প্রাসাদে থাকবেন। এই ঘটনায় মর্মাহত লক্ষ্মীদেবী বালির হাতে রাখি বেঁধে তাঁকে বিষ্ণুকে ফিরিয়ে দিতে রাজি করান।
গণেশের দুই পুত্র শুভ ও লভ যখন দেখেন যে গণেশের বোন তাঁকে রাখি পরাচ্ছে, তখন তাঁরাও একটি বোনের জন্য প্রার্থনা করেন। তাঁদের প্রার্থনা শুনেই আগুন থেকে একটি কন্যার সৃষ্টি করেন গণেশ, যিনি সন্তোষী মা নামে পরিচিত হন। মহাভারতে পাওয়া যায়, একবার ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ নিজের হাত কেটে ফেলেন। তখন দ্রৌপদী নিজের শাড়ি থেকে একটা টুকরো ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দেন। এর বিনিময়ে কৃষ্ণ তাঁকে সারাজীবন রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন। যা তিনি দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময় পালন করেছিলেন।
মধ্যযুগে যুদ্ধে যাওয়ার আগে রাজপুত রমণীরা পুরুষদের হাতে রাখি বেঁধে দিতেন। রাখিকে শুভশক্তির প্রতীক হিসেবে মনে করা হয়। আলেকজান্দার যখন ভারত আক্রমণ করেন, তখন তাঁর স্ত্রী রাজা পুরুর হাতে রাখি বেঁধে দেন। সেই থেকে পুরু তাঁকে নিজের বোন হিসেবে স্বীকার করেন এবং আলেকজান্দারের কোনও ক্ষতি না করতে সম্মত হন। ইতিহাসে আরও পাওয়া যায় যে চিতোরের রানি কর্নাবতী দিল্লির বাদশাহ হুমায়ুনকে একটি রাখি পাঠিয়ে গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহের আক্রমণ থেকে তাঁর রাজ্য বাঁচানোর অনুরোধ করেন। হুমায়ুন রাখি পেয়ে চিতোর রক্ষা করতে আসলেও বেশ কিছুটা দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে জওহর ব্রত পালন করে আত্মাহুতি দিয়েছেন রানি। বাহাদুর শাহকে হারিয়ে রানির পুত্রের হাতে চিতোর তুলে দেন হুমায়ুন।
আসুন আজ আমরা মহৎ পবিত্র রাখিবন্ধন উৎসবের দিনে, মন থেকে ঘৃণা বিদ্বেষ সরিয়ে একে অপরকে আপন করে নিই। পৃথিবী থেকে চলে যাক রাজনৈতিক ঘৃণা ও হানাহানি। মধুর কূটনৈতিক উন্নয়নমুখী কাজ শুরু হোক। আস্ফালন নয়, ক্ষমতার দম্ভ নয়। শান্তি ও মানবতার হোক জয়। সবার মঙ্গলের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি।

Author
প্রশান্ত দাস মতিঝিল কলেজে অ্যাডমিন বিভাগের দ্বায়িত্বপূর্ন পদে কর্মরত । নানা বিষয়ে পড়াশুনা ও গবেষণা নিয়ে ব্যাস্ত থাকেন , নতুন নতুন রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট , বাগান ও পরিবেশ সচেতন নাগরিক ও ছাত্রদরদী সোশিওলজির শিক্ষক ।















